যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবং ডেমোক্র্যাট নেতা রাহম ইমানুয়েল বলেছেন, কোনো শর্ত ছাড়াই বছরের পর বছর ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার মার্কিন নীতি একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক নতুনভাবে মূল্যায়নের সময় এসেছে।
বুধবার তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইমানুয়েল বলেন, ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের নীতির কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তাঁর ভাষায়, এই পরিস্থিতি ইসরায়েলকে এক ধরনের ‘আঞ্চলিকভাবে একঘরে রাষ্ট্রে’ পরিণত করেছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বড় একটি অংশ যখন আর আপনার অবস্থানকে সমর্থন করছে না, তখন অনির্দিষ্টকাল ধরে একই পথে সংঘাত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এর পরিবর্তে শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য টেকসই নতুন পথ খুঁজে বের করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রচেষ্টায় পাশে থাকতে প্রস্তুত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বক্তব্যে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও সমালোচনা করেন ইমানুয়েল। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, দেশটির সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অর্জনের মধ্যে অন্যতম হলো সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতি—যে অঞ্চলটিই এখনো আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক স্বীকৃতি পায়নি।
রসিকতার ছলে তিনি তাঁর দাদির একটি কথাও উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘ইউরোপ হারালে, আমেরিকাও হারালে, আর বদলে পেলেন সোমালিল্যান্ড—কী দারুণ চুক্তি!’ তাঁর এই মন্তব্যে উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে।
ইসরায়েল সফরে দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে বৈঠক করলেও প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি ইমানুয়েল। এর আগে ২০০৯ সালে অবৈধ ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের সমালোচনা করায় নেতানিয়াহু তাঁকে ‘নিজ জাতির বিরোধী ইহুদি’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হারজগ বলেন, ইসরায়েলের জন্য ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, সংবাদমাধ্যম এপি-কে ইমানুয়েল জানান, আসন্ন ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক এড়িয়ে চলছেন। তাঁর ভাষায়, তিনি চান না তাঁর সফরকে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার সুযোগ পান।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট সমাধানে প্রচলিত দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পরিবর্তে নতুন একটি ধারণাও তুলে ধরেন ইমানুয়েল। তিনি বলেন, তাঁর প্রস্তাবিত ‘২৩ রাষ্ট্র সমাধান’-এ ২১টি আরব রাষ্ট্র ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে সক্রিয় ভূমিকা নেবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের ভূখণ্ডসংক্রান্ত দাবিকেও আলোচনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
পুরো বক্তব্যজুড়ে ইমানুয়েল ইঙ্গিত দেন, ইসরায়েলকে ঘিরে ডেমোক্র্যাটদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্ক এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান নীতিতে পরিবর্তন এনে নতুন দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল যেখানে ইসরায়েলের সমালোচনা করাকেই নিরুৎসাহিত করা হতো। ফলে নীরবতাই পরোক্ষভাবে সব কর্মকাণ্ডের সমর্থন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি সমালোচনা করে ইমানুয়েল বলেন, নিঃশর্ত মার্কিন সমর্থনের কারণে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ উপেক্ষা করেও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়নি ইসরায়েলের সরকারকে।
তিনি আরও প্রস্তাব করেন, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতে যুক্তরাষ্ট্র যে আর্থিক সহায়তা দেয়, তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলায় জড়িত ইসরায়েলি ব্যক্তি এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে সমর্থনকারী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান।
রাহম ইমানুয়েল দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। নব্বইয়ের দশকে অসলো শান্তি প্রক্রিয়ার সময় তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০০৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চিফ অব স্টাফ হিসেবেও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখেন। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এখনো কোনো প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা না দিলেও ইমানুয়েল প্রকাশ্যেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চের এক জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে আমেরিকানদের মধ্যে আগের তুলনায় সমর্থন কমেছে। জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ৫৮ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সমর্থন দিচ্ছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৪৫ শতাংশ।
এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক এবং প্রায় অর্ধেক ডেমোক্র্যাট মনে করেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের প্রশ্নটি এখন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রাইমারি নির্বাচনে ইসরায়েল নীতির সমালোচক প্রগতিশীল প্রার্থীদের জয়ও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

