ইউক্রেন ও রাশিয়ার সামরিক অবস্থানের মধ্যবর্তী বিপজ্জনক এলাকায় এগিয়ে যাচ্ছিল সাঁজোয়া গাড়ির একটি বহর। চারদিকে মাইন বিস্ফোরণের আশঙ্কা, গোলাগুলির শব্দ, ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবন, পোড়া গাড়ি এবং নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে চলা মানুষের দীর্ঘ সারি। সেই অনিশ্চিত মুহূর্তে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বিশেষজ্ঞ দলকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
দলটির সামনে তখন দুটি পথ ছিল। গোলাগুলির ঝুঁকি উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাওয়া, অথবা ফিরে গিয়ে সম্ভাব্য পারমাণবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাকে আরও বাড়তে দেওয়া। কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর অভিযানটি সম্ভব হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা সামনে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এই ঘটনা শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কর্মকর্তাদের সাহসী উপস্থিতির গল্প নয়। এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বড় একটি দুর্বলতাও তুলে ধরে। যুদ্ধ এখন আর শুধু যুদ্ধরত দুটি দেশের সীমান্তে আটকে থাকে না। একটি অঞ্চলে সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি বাজার, খাদ্য সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অভিবাসন, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপর।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—বিশ্ব যখন একের পর এক সংকটের মুখোমুখি, তখন জাতিসংঘ কোথায়?
যুদ্ধের সীমানা এখন আর মানচিত্রে সীমাবদ্ধ নয়
শীতল যুদ্ধের পর যে বিশ্ব অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল, সেখানে পণ্য, অর্থ, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে সহজে এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলাচল করত। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ, কূটনৈতিক বিরোধ এবং পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কারণে সেই ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
আগে বাণিজ্য, নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং পরিবেশকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখা হতো। এখন একটি সমস্যার সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক এতটাই গভীর যে এগুলোকে আলাদা করে বোঝা কঠিন। একটি দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হামলা হলে তার প্রভাব শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে হাসপাতাল, ব্যাংক ও যোগাযোগব্যবস্থা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। নির্বাচনব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোও এখন এ ধরনের ঝুঁকির বাইরে নয়।
ইউরোপে যুদ্ধ ফিরে আসায় মহাদেশটির নিরাপত্তা পরিকল্পনা আমূল বদলে গেছে। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে, সামরিক জোটগুলো শক্তিশালী হচ্ছে এবং জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজতে দেশগুলো নতুনভাবে ভাবছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও এখন আর ওই অঞ্চলের মধ্যে সীমিত থাকে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে এর প্রভাব পড়ে তেলের দাম, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, খাদ্যের মূল্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর।
এশিয়ায় প্রতিযোগিতা চলছে সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং সমুদ্রসীমা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। আফ্রিকায় বিপুল জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেও অর্থায়নের অসম সুযোগ এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাতিন আমেরিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আন্তদেশীয় অপরাধী চক্র বন্দর, আর্থিক ব্যবস্থা, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোকে কাজে লাগাচ্ছে।
ফলে বর্তমানে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ব্যর্থতার প্রভাব আগের তুলনায় অনেক দ্রুত এবং অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
দুর্বল হচ্ছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কাঠামো
বিশ্বকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার জন্য আন্তর্জাতিক আইন, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং নির্দিষ্ট কিছু চুক্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
শীতল যুদ্ধের সময় তৈরি হওয়া বেশির ভাগ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাস চুক্তি এখন হয় বিলুপ্ত, নয়তো মারাত্মকভাবে দুর্বল। নতুন কৌশলগত অস্ত্র হ্রাস চুক্তি এবং মধ্যপাল্লার পারমাণবিক শক্তি চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো আগের মতো কার্যকর নেই।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী বড় রাষ্ট্রগুলো তাদের অস্ত্রের সংখ্যা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কমানোর বদলে আধুনিকায়ন এবং সম্প্রসারণ করছে। একই সঙ্গে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি প্রতিরোধে যেসব নিয়মিত যোগাযোগব্যবস্থা প্রয়োজন, সেগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেসব দেশ দীর্ঘদিন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে, সেসব দেশের মধ্যেও এখন নিজস্ব পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতি বিশ্বকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ছোট একটি ভুল হিসাব, ভুল তথ্য অথবা হঠাৎ নেওয়া সামরিক সিদ্ধান্ত বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এমনকি পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করা প্রজন্ম ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে লাগামহীন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ স্মৃতিও। ফলে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেক ক্ষেত্রে এমন ঝুঁকি নিচ্ছে, যার প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে হয়তো তাদের গভীর উপলব্ধি নেই।
আশি বছরের প্রতিষ্ঠান কেন আস্থার সংকটে?
গত ৮০ বছরে জাতিসংঘ বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করেছে। উপনিবেশমুক্তির প্রক্রিয়ায় সহায়তা, মানবিক বিপর্যয়ে ত্রাণ সমন্বয়, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা উন্নয়ন এবং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
জাতিসংঘ পৃথিবীর প্রতিটি যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি। কিন্তু দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়াতে এর ভূমিকা একেবারে অস্বীকার করা যায় না।
তা সত্ত্বেও বর্তমান সময়ে প্রতিষ্ঠানটি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে অনেক বিশ্লেষক এর ভবিষ্যৎকে জাতিপুঞ্জের পরিণতির সঙ্গে তুলনা করছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত জাতিপুঞ্জ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, জাতিসংঘও কি একইভাবে ধীরে ধীরে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে?
ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা এবং এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে জাতিসংঘকে কেন্দ্রীয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় খুব কমই দেখা যাচ্ছে।
জাতিসংঘ সব যুদ্ধ থামিয়ে দেবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু সংঘাত প্রতিরোধ, যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং শান্তির সম্ভাব্য পথ খুঁজে বের করা প্রতিষ্ঠানটির মূল দায়িত্বের অংশ।
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার টেবিলে জাতিসংঘ উপস্থিত না থাকলে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে হতাশা বাড়ে। মানুষ ও সরকার যখন বুঝতে পারে না একটি প্রতিষ্ঠান তাদের জন্য কী বাস্তব ফল এনে দিচ্ছে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ ও সমর্থন কমে যায়।
বর্তমানে জাতিসংঘের অর্থসংকটকে শুধু হিসাবের ঘাটতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর গভীরে রয়েছে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আস্থার সংকট। দেশগুলো যখন প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান হয়, তখন তারা সময়মতো অর্থ প্রদান, রাজনৈতিক সমর্থন এবং কূটনৈতিক সহযোগিতা দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।
মহাসচিবকে শুধু প্রশাসক হলে চলবে না
জাতিসংঘকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ পদে এমন একজনকে প্রয়োজন, যিনি শুধু সদর দপ্তরে বসে বিবৃতি দেবেন না; বরং সংঘাতের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাবেন, পক্ষগুলোর সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন এবং আলোচনার দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই হস্তক্ষেপ করবেন।
ইতিহাসে সক্রিয় মহাসচিবদের কার্যকর ভূমিকার উদাহরণ রয়েছে। ইতিহাসবিদ থান্ট মিন্ট-উর বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর দাদা উ থান্টের নীরব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ১৯৬০-এর দশকের কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
প্রায় দুই দশক পরে মহাসচিব জাভিয়ের পেরেজ দে কুয়েলার কম্বোডিয়া ও মধ্য আমেরিকার সংঘাতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করতে সহায়তা করেছিলেন।
এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, মহাসচিব কোনো যুদ্ধরত পক্ষকে আদেশ দিয়ে থামাতে না পারলেও আলোচনায় ফিরে আসার পথ তৈরি করতে পারেন। দীর্ঘ সংঘাতে ক্লান্ত পক্ষগুলো অনেক সময় এমন একটি সম্মানজনক সুযোগ খোঁজে, যার মাধ্যমে তারা সরাসরি পরাজয় স্বীকার না করেও সহিংসতা থেকে সরে আসতে পারে।
এ ধরনের সুযোগ তৈরির জন্য মহাসচিবকে বার্তা আদান-প্রদান, অবস্থান পরিষ্কার করা, ভুল বোঝাবুঝি কমানো এবং উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করতে হয়। প্রয়োজন হয় গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষমতা, রাজনৈতিক সাহস এবং এমন পক্ষের সঙ্গেও কথা বলার মানসিকতা, যার সঙ্গে অন্যরা যোগাযোগ করতে আগ্রহী নয়।
তবে সংকট শুরু হওয়ার পর হঠাৎ সম্পর্ক তৈরি করা যায় না। আলোচনা শুরু হওয়ার বহু আগে থেকেই বিভিন্ন রাষ্ট্র, সরকার, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়।
শুধু বিপর্যয়ের পর সহায়তা নয়, দরকার আগাম প্রতিরোধ
জাতিসংঘের বড় দুর্বলতা হলো, এটি প্রায়ই সংকট তৈরি হওয়ার পর সক্রিয় হয়। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা শরণার্থী সংকট শুরু হলে সংস্থাটি ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। এসব কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কেবল পরিণতি মোকাবিলা করে মূল সমস্যার সমাধান করা যায় না।
যেসব সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সংঘাত সৃষ্টি করে, সেগুলো আগেই চিহ্নিত করতে হবে। শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকারকে আলাদা তিনটি কাজ হিসেবে না দেখে পরস্পরনির্ভর লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
একটি দেশে যখন কর্মসংস্থান নেই, সরকারি সেবা দুর্বল, বৈষম্য বাড়ছে এবং জনগণের অভিযোগ প্রকাশের শান্তিপূর্ণ পথ বন্ধ, তখন সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর থাকলে সংঘাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। তাই শান্তিরক্ষা মানে শুধু যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ নয়; একটি সমাজের ভেতরে স্থিতিশীলতা তৈরির ভিত্তিগুলো শক্তিশালী করাও শান্তির অংশ।
শেষ মুহূর্তে বিপুল অর্থ ব্যয় করে মানবিক সহায়তা দেওয়ার চেয়ে সংঘাত প্রতিরোধ, উন্নয়ন এবং কার্যকর শাসনব্যবস্থায় আগাম বিনিয়োগ অনেক বেশি ফলপ্রসূ।
উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর বড় একটি অংশ নির্ধারিত পথে এগোচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। দারিদ্র্য কমানো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান বৃদ্ধি, বৈষম্য হ্রাস, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যগুলো অর্থের অভাব ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের বোঝা বাড়ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তার বরাদ্দ এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। একের পর এক যুদ্ধ, মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক ধাক্কা বহু দেশের বছরের পর বছর ধরে অর্জিত উন্নয়ন নষ্ট করে দিচ্ছে।
রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদ হারায়। সামাজিক আস্থা দুর্বল হয় এবং রাজনৈতিক ক্ষোভ বাড়তে থাকে। এই হতাশা থেকে অভ্যন্তরীণ সংঘাত, অভিবাসন এবং চরমপন্থার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জাতিসংঘের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। জাতিসংঘের শক্তি শুধু অর্থ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা এবং ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর বক্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ।
বাইরের সহায়তা তখনই স্থায়ী ফল দেয়, যখন তা দেশের নিজস্ব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সাহায্য করে। বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, জ্বালানির সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আধুনিক অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
জ্বালানি রূপান্তরের বোঝা কার ওপর?
বিশ্বব্যাপী পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। কিন্তু এই পরিবর্তন সব দেশে সমান গতিতে ঘটছে না। আধুনিক অর্থনীতির জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি অপরিহার্য। বিদ্যুৎ ছাড়া উন্নত হাসপাতাল, প্রতিযোগিতামূলক শিল্প, আধুনিক শিক্ষা কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি কোনোটিই কার্যকরভাবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
সমস্যা হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী দেশগুলোই অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি রূপান্তরের ব্যয় বহনে সবচেয়ে কম সক্ষম। ধনী দেশগুলো যদি প্রয়োজনীয় অর্থ ও প্রযুক্তি না দেয়, তাহলে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে দ্রুত পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে যাওয়া কঠিন হবে।
যে রূপান্তর সাধারণ মানুষের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করে অথবা বিদ্যুৎবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি দিতে ব্যর্থ হয়, তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও বাড়াতে পারে বৈষম্য
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উৎপাদন, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং প্রশাসনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। একই সঙ্গে এটি অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে অল্প কয়েকটি দেশ ও প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত করার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে বহু প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যেতে পারে। প্রযুক্তির মালিকানা, তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত গণনাসুবিধায় প্রবেশাধিকার না থাকলে দরিদ্র দেশগুলো আরও পিছিয়ে পড়তে পারে। সামরিক ক্ষেত্রে এর ব্যবহার নতুন ধরনের নিরাপত্তা সংকটও তৈরি করছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব এককভাবে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। তবে তিনি নিশ্চিত করতে পারেন যে প্রযুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং কম সক্ষম দেশগুলোর বক্তব্যও শোনা হচ্ছে।
মানবাধিকার শুধু ঘোষণায় রক্ষা হয় না
মানবাধিকার ও মানুষের মর্যাদা জাতিসংঘের মূল উদ্দেশ্যের অংশ। কিন্তু মানবাধিকারকে শান্তি ও উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে এর সুরক্ষা সম্ভব নয়।
যেখানে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা রয়েছে, সেখানে অধিকার রক্ষা তুলনামূলকভাবে সহজ। আর এসব ভিত্তি দুর্বল হলে মানুষের অধিকারও দ্রুত ঝুঁকির মুখে পড়ে।
শুধু প্রতিবেদন প্রকাশ, উদ্বেগ জানানো বা নীতিগত ঘোষণা দিয়ে অধিকার নিশ্চিত করা যায় না। নাগরিক সেবা, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
অর্থাৎ মানবাধিকার রক্ষার লড়াইকে বাস্তব জীবনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
বাস্তববাদী জাতিসংঘের প্রয়োজন
বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে জাতিসংঘের নেতৃত্বকে বাস্তববাদী হতে হবে। রাষ্ট্রগুলো মূলত নিজেদের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়—এই সত্য অস্বীকার করে কার্যকর কূটনীতি করা সম্ভব নয়।
তবে জাতীয় স্বার্থ মানেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অসম্ভব নয়। বিভিন্ন দেশের স্বার্থ যেখানে একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়, সেখানেই সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়। পারমাণবিক যুদ্ধ, মহামারি, আর্থিক বিপর্যয়, জলবায়ু সংকট অথবা নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তিগত ঝুঁকি কোনো একটি দেশের সীমান্ত মানে না।
আর্জেন্টিনার লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসের একটি বক্তব্যের ভাবার্থ হলো—মানুষকে সব সময় ভালোবাসা একত্র করে না; কখনো কখনো অভিন্ন ভয়ও তাদের কাছাকাছি আনে।
রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গভীর মতবিরোধ থাকতে পারে। তারপরও তারা বুঝতে পারে, যুদ্ধের বিস্তার, পারমাণবিক অস্ত্রের বৃদ্ধি, মহামারি বা বিশ্ব অর্থনীতির পতন সবার জন্যই ক্ষতিকর।
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতারাও এই বাস্তবতা বুঝেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসের পর তারা এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যেখানে রাজনৈতিক বিরোধ পুরোপুরি দূর না হলেও আলোচনা ও নিয়মের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তাই জাতিসংঘকে কোনো কল্পিত বিশ্বশান্তির প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটিকে এমন একটি বাস্তব কূটনৈতিক মঞ্চ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলো অন্তত কথা বলা চালিয়ে যেতে পারে।
সংস্কার শুধু ব্যয় কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়
জাতিসংঘের ৮০ বছর পূর্তি ঘিরে যে সংস্কার আলোচনা চলছে, তা প্রতিষ্ঠানটিকে আরও সাশ্রয়ী, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু একটি সংস্কার কার্যক্রম দিয়ে এত বছরের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
দীর্ঘদিনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং অস্পষ্ট অগ্রাধিকারের কারণে জাতিসংঘের দায়িত্বের পরিধি অতিরিক্ত বেড়েছে। একই ধরনের কাজ একাধিক সংস্থা করছে। একই তথ্য নিয়ে বারবার প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে। অসংখ্য সভা, ঘোষণা ও প্রক্রিয়ায় সময় ব্যয় হলেও মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না।
ফলে প্রতিষ্ঠানটি অর্জনের তুলনায় ঘোষণায় বেশি ভারী হয়ে উঠেছে।
একটি কার্যকর জাতিসংঘকে এমন কাজে মনোযোগ দিতে হবে, যা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান সহজে করতে পারে না। যেসব পক্ষ সাধারণভাবে একসঙ্গে বসবে না, তাদের আলোচনায় আনা; রাজনৈতিক আস্থা ভেঙে পড়লেও যোগাযোগ চালু রাখা; এবং বৈশ্বিক ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কথা শোনার ব্যবস্থা করা—এগুলোই জাতিসংঘের বিশেষ শক্তি।
সংস্কারের অর্থ শুধু দপ্তর একীভূত করা বা কর্মী কমানো নয়। জাতিসংঘের কর্মপরিধিও পর্যালোচনা করতে হবে। কম গুরুত্বপূর্ণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ বাদ দিয়ে দৃশ্যমান ফল তৈরির দিকে এগোতে হবে।
উপস্থিতিই হতে পারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন
একজন মহাসচিব একা জাতিসংঘের সব সমস্যা সমাধান করতে পারবেন না। তিনি কোনো দেশের সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন না, সদস্যরাষ্ট্রের ওপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন না এবং প্রতিটি যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষমতাও তাঁর নেই।
তবে তাঁর হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে—বিরোধপূর্ণ পক্ষগুলোকে এক জায়গায় আনার ক্ষমতা।
এই ক্ষমতা তখনই কার্যকর হয়, যখন মহাসচিব নিজে উপস্থিত থাকেন। যুদ্ধের সম্মুখভাগে, সংকটে থাকা জনগোষ্ঠীর পাশে এবং গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে জাতিসংঘের নেতৃত্বকে দেখা যেতে হবে।
অনুপস্থিত থেকে শুধু বিবৃতি দিলে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরবে না। জাতিসংঘকে প্রমাণ করতে হবে, এটি কেবল দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে না; প্রয়োজন হলে ঝুঁকি নিয়েও শান্তির পথ তৈরির চেষ্টা করে।
রাষ্ট্রগুলো ভালোবাসা, ভয় অথবা অভিন্ন স্বার্থ—যে কারণেই আলোচনায় আসুক না কেন, তাদের আলোচনার টেবিলে পৌঁছানোর আগেই সেখানে জাতিসংঘকে উপস্থিত থাকতে হবে।
কারণ বর্তমান বিশ্বে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় কাজ শুধু কথা বলা নয়। সবচেয়ে বড় কাজ হলো সময়মতো সঠিক জায়গায় উপস্থিত হওয়া।

