রাতের অন্ধকারে জ্বলছে সড়ক, চারদিকে ছড়িয়ে আছে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা। এমন একটি দৃশ্য যেন ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্কেরই প্রতীক। দুই দেশের মধ্যে নতুন একটি কাঠামোগত সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে। কাগজে-কলমে এর লক্ষ্য লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু চুক্তির শর্তগুলো বিশ্লেষণ করলে শান্তির চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার আশঙ্কাই বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জুন ২০২৬-এর শেষ দিকে লেবানন ও ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় একটি কাঠামোগত চুক্তিতে পৌঁছায়। লেবাননের প্রধান আলোচক নাদা হামাদেহ মৌয়াওয়াদ এটিকে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা ফিরিয়ে আনার পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন।
কিন্তু মূল সংকটটি এখানেই। দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহারকে হিজবুল্লাহর যাচাইকৃত নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ হিজবুল্লাহ পুরোপুরি অস্ত্র ত্যাগ না করা পর্যন্ত ইসরায়েল সরে যাবে না। অন্যদিকে হিজবুল্লাহকে অস্ত্র, অর্থ ও রাজনৈতিক সহায়তা দেওয়া ইরানি যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা চুক্তিতে নেই।
ফলে এমন একটি শর্ত তৈরি হয়েছে, যা বাস্তবে পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আর যে শর্ত পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তার ওপর সেনা প্রত্যাহার নির্ভর করলে চুক্তিটি শান্তির পথ নয়, বরং অনির্দিষ্ট সময়ের সামরিক উপস্থিতির বৈধতা হয়ে উঠতে পারে।
একটি দেশের ভেতরে একাধিক ক্ষমতার কেন্দ্র
লেবাননের রাজনৈতিক বাস্তবতা সাধারণ রাষ্ট্রগুলোর মতো সরল নয়। দেশটির সরকার, সামরিক বাহিনী, বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য অত্যন্ত জটিল।
হিজবুল্লাহ শুধু একটি সশস্ত্র সংগঠন নয়। এটি লেবাননের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ, সামাজিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং একটি শক্তিশালী সামরিক কাঠামো। সংগঠনটি ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র। ফলে লেবাননের কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেই একক সিদ্ধান্তে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে পারবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
এখানে বড় প্রশ্ন হলো, যে কাজ লেবাননের সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বহু বছরেও করতে পারেনি, নতুন একটি চুক্তি সেটি কীভাবে বাস্তবায়ন করবে?
চুক্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু লক্ষ্য পূরণের কার্যকর পথ স্পষ্ট করা হয়নি। হিজবুল্লাহর অস্ত্র কে সংগ্রহ করবে, কোথায় জমা দেওয়া হবে, কীভাবে যাচাই করা হবে এবং সংগঠনটি অস্বীকৃতি জানালে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের কোনো দৃশ্যমান উত্তর নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইরানের সামরিক ও আর্থিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে শুধু লেবাননের ভেতরে নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানানো সমস্যার অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করার মতো।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বিপরীত পথ
নতুন চুক্তির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকেই পরিচালিত পরস্পরবিরোধী কূটনৈতিক উদ্যোগ।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যস্থতায় তৈরি ইসরায়েল–লেবানন কাঠামোতে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণকে ইসরায়েলি প্রত্যাহারের পূর্বশর্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জে ডি ভ্যান্স ইরানের সঙ্গে যে সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করেন, সেখানে পাকিস্তান ও কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। সেই আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া। কিন্তু ইরান স্পষ্ট করে দেয়, ইসরায়েলকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং লেবানন থেকে সরে যেতে হবে।
অর্থাৎ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র দুটি ভিন্ন ধারণার ওপর ভিত্তি করে আলোচনা চালিয়েছে।
একটি উদ্যোগে ইরানকে লেবানন সংকটের কেন্দ্রীয় পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অন্য উদ্যোগে ইসরায়েল–লেবানন সংঘাতকে এমনভাবে দেখা হয়েছে, যেন ইরান এর বাইরের কোনো শক্তি।
এই দ্বন্দ্ব শুধু কূটনৈতিক বিভ্রান্তিই তৈরি করেনি; বরং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়েও সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। শান্তি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর অবস্থান অস্পষ্ট হলে কোনো পক্ষই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখতে পারে না।
ট্রাম্পকে যুদ্ধ থেকে বের করে আনার চেষ্টা
বিশ্লেষণটিতে জে ডি ভ্যান্সের উদ্যোগকে অত্যন্ত সমালোচনামূলকভাবে দেখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত থেকে বের হওয়ার একটি পথ খুঁজছিলেন। ভ্যান্স দ্রুত একটি চুক্তি তৈরি করে তাঁকে সেই সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন।
এই অবস্থাকে ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার নিয়ে হেনরি কিসিঞ্জারের আলোচনার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তখন মূল লক্ষ্য ছিল এমনভাবে যুদ্ধ থেকে বের হওয়া, যাতে তা প্রকাশ্য পরাজয় হিসেবে দেখা না যায়।
ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের মানসিকতা কাজ করেছে বলে লেখকের ধারণা। অর্থাৎ চুক্তিটি কতটা স্থায়ী বা কার্যকর হবে, তার চেয়ে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যভাবে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাজারের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা তুলে ধরে পরিস্থিতিকে সফলতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু নিজ দলের মধ্যেই এ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়।
মার্কিন সিনেটের সশস্ত্র বাহিনীবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার মনে করেন, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করা ভুল সিদ্ধান্ত হবে। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইরান ও হিজবুল্লাহকে ঘিরে একক নীতি নেই।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরই বড় হামলা
ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবানন, হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলসহ সব রণক্ষেত্রে পূর্ণ যুদ্ধবিরতির প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যেই ইসরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহর অস্ত্রভান্ডারে বড় ধরনের হামলা চালায়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র বা লেবাননের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বড় ধরনের প্রকাশ্য প্রতিবাদ দেখা যায়নি।
এতে বোঝা যায়, বাস্তবে রুবিওর কূটনৈতিক অবস্থান ভ্যান্সের দ্রুত সমঝোতার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ইসরায়েল ও লেবাননের সম্পর্ক নতুন ও আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
বরং হামলাটি দেখিয়েছে, চুক্তি থাকার পরও সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার রাজনৈতিক সুযোগ ইসরায়েলের হাতে রয়েছে।
১৯৮৩ সালের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়নি
লেবাননকে ঘিরে এমন উচ্চাভিলাষী কিন্তু বাস্তবতাবিচ্ছিন্ন চুক্তির ইতিহাস নতুন নয়।
১৯৮৩ সালে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানের প্রায় এক বছর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রশাসন ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি উচ্চাভিলাষী শান্তিচুক্তি করাতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু চুক্তিটি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে। কারণ এতে লেবাননের জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে ইসরায়েলি সরকারের কঠোর অবস্থানও অপরিবর্তিত ছিল।
প্রথম লেবানন যুদ্ধ আরও দুই বছর চলেছিল। পরে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে একটি নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরি করে। সেই অঞ্চল মে ২০০০ পর্যন্ত ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের নেতৃত্বে ইসরায়েল একতরফাভাবে সেনা প্রত্যাহার করে।
এই ইতিহাস দেখায়, কেবল চুক্তি স্বাক্ষর করলেই যুদ্ধ শেষ হয় না। স্থানীয় রাজনীতি, আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগকে একই কাঠামোর মধ্যে সমাধান করতে না পারলে চুক্তি দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বর্তমান চুক্তিতেও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।
নিরস্ত্রীকরণ কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু কতটা বাস্তবসম্মত?
হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ লেবাননের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের ভেতরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরে শক্তিশালী সামরিক সংগঠন সক্রিয় থাকলে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়।
কিন্তু একটি লক্ষ্য ভালো হলেই সেটি বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে যায় না।
হিজবুল্লাহ বহু বছর ধরে ইরানের সামরিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক সহায়তা পাচ্ছে। সংগঠনটির নিজস্ব যুদ্ধক্ষমতা, স্থানীয় সমর্থন এবং লেবাননের রাজনীতিতে প্রভাব রয়েছে। ফলে শুধু একটি চুক্তির মাধ্যমে সংগঠনটিকে অস্ত্র ছাড়তে বাধ্য করা প্রায় অসম্ভব।
বরং নিরস্ত্রীকরণকে ইসরায়েলের প্রত্যাহারের শর্ত বানালে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে স্থির থাকার যুক্তি পায়।
ইসরায়েল বলতে পারে, হিজবুল্লাহ অস্ত্র না ছাড়ায় সেনা প্রত্যাহার সম্ভব নয়।
হিজবুল্লাহ বলতে পারে, ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ডে থাকায় অস্ত্র ত্যাগ করা যাবে না।
এই দুই অবস্থান পরস্পরকে শক্তিশালী করে। ফলে এমন এক বৃত্ত তৈরি হয়, যেখানে কোনো পক্ষই আগে পদক্ষেপ নিতে রাজি হয় না।
৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর বদলে যাওয়া ইসরায়েল
৭ অক্টোবর ২০২৩ হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা ভাবনায় বড় পরিবর্তন আসে। হামাসের আকস্মিক আক্রমণ ইসরায়েলি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।
এর পর থেকে সম্ভাব্য হুমকিকে আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। গাজায় চলমান ভয়াবহ সামরিক অভিযান এবং গোলান মালভূমি ঘেঁষে সিরীয় ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অগ্রযাত্রা এই পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আগে যেখানে সামরিক প্রতিক্রিয়ার মাত্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির হিসাবকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, এখন সেখানে সম্ভাব্য হুমকি পুরোপুরি ধ্বংস করার নীতি প্রাধান্য পাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহ অক্ষত থাকা অবস্থায় কোনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী স্বেচ্ছায় লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবেন—এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
বিশেষ করে নতুন চুক্তি যদি ইসরায়েলকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লেবাননের ভূখণ্ডে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ দেয়, তাহলে প্রত্যাহারের আগ্রহ আরও কমে যাবে।
হিজবুল্লাহও পিছু হটার বার্তা দিচ্ছে না
হিজবুল্লাহর নেতা নাঈম কাসেম স্পষ্ট করেছেন, সংগঠনটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে না। তাঁর বক্তব্যের মূল অর্থ হলো, সবচেয়ে কঠিন সময়েও হিজবুল্লাহ লড়াই ছেড়ে যায়নি এবং ভবিষ্যতেও যাবে না।
লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরিও চুক্তিটির সমালোচনা করেছেন। তিনি আমাল দলের প্রতিনিধি এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাঁর দলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর মতে, এই সমঝোতা লেবাননের অভ্যন্তরে গৃহসংঘাত উসকে দিতে পারে।
এই আশঙ্কার ভিত্তি রয়েছে। লেবাননের সরকার বা সামরিক বাহিনী যদি বাইরের চাপের কারণে হিজবুল্লাহকে জোর করে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে, তাহলে সংঘাত শুধু ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সীমিত থাকবে না। তা লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
অর্থাৎ হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ ভুল লক্ষ্য নয়, কিন্তু ভুল পদ্ধতিতে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা পুরো লেবাননকে নতুন সংকটে ফেলতে পারে।
ইসরায়েলের হামলা অসম, কিন্তু হুমকিটিও বাস্তব
বিশ্লেষণে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে মাত্রাতিরিক্ত বলা হলেও হিজবুল্লাহর নিরাপত্তা হুমকিকে অস্বীকার করা হয়নি।
হিজবুল্লাহর অস্ত্রভান্ডার, যোদ্ধা এবং ইরানের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের জন্য বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করে। কিন্তু লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী সেই ঝুঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
২০০৬ সালে দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবে সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানানো হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল হিজবুল্লাহকে রাষ্ট্রীয় সামরিক কাঠামোর বাইরে অস্ত্র ধরে রাখা থেকে বিরত করা।
কিন্তু লেবাননের সামরিক বাহিনী কিংবা জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী বাহিনী সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
দুই দশক পরও যদি একই লক্ষ্য নতুন ভাষায় আবার সামনে আনা হয়, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষমতা ও পদ্ধতি আগের মতোই দুর্বল থাকে, তাহলে ফল ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
মূল সমস্যা অস্ত্র নয়, অস্ত্রের উৎস
মার্কো রুবিওর লক্ষ্য—হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ—নীতিগতভাবে যৌক্তিক। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি সরাসরি অর্জনের চেষ্টা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আরও কার্যকর কৌশল হতে পারত হিজবুল্লাহর ইরানি সহায়তার পথ সীমিত করার জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া।
হিজবুল্লাহর সামরিক ক্ষমতা শুধু লেবাননের ভেতরে অস্ত্র জমিয়ে রাখার ওপর নির্ভর করে না। এর পেছনে রয়েছে অর্থ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, অস্ত্র সরবরাহ এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমর্থনের বিস্তৃত কাঠামো।
এই সহায়তার উৎস অক্ষত রেখে শুধু সংগঠনটির হাতে থাকা অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি করলে নতুন অস্ত্র আবারও আসতে পারে।
তাই সমস্যার মূল জায়গায় আঘাত করতে হলে ইরান থেকে হিজবুল্লাহর কাছে পৌঁছানো সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ বা সীমিত করতে হবে। একই সঙ্গে লেবাননের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ভুল ক্রম
শান্তি প্রতিষ্ঠায় শুধু কী করতে হবে, তা নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়। কোন কাজটি আগে এবং কোনটি পরে করা হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান চুক্তিতে বলা হয়েছে, আগে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র হতে হবে, তারপর ইসরায়েল সরে যাবে। কিন্তু হিজবুল্লাহর অবস্থান হচ্ছে, ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে থাকা অবস্থায় অস্ত্র ত্যাগ করলে সংগঠনটি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের যুক্তি, হিজবুল্লাহর সামরিক ক্ষমতা বহাল থাকলে সেনা প্রত্যাহার উত্তর সীমান্তকে আবার ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
এখানে একটি ধাপে ধাপে সমন্বিত প্রক্রিয়ার প্রয়োজন ছিল। যেমন নির্দিষ্ট এলাকা থেকে পর্যায়ক্রমে ইসরায়েলি প্রত্যাহার, একই সঙ্গে ওই এলাকায় হিজবুল্লাহর ভারী অস্ত্র অপসারণ, লেবাননের বাহিনী মোতায়েন এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ।
কিন্তু সবকিছুকে একটি চূড়ান্ত ও প্রায় অসম্ভব শর্তের সঙ্গে যুক্ত করায় চুক্তিটি বাস্তব অগ্রগতির পরিবর্তে স্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে।
সামনে কী ঘটতে পারে?
বর্তমান কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে তিনটি সম্ভাবনা সামনে আসে।
প্রথমত, একটি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করবে এবং হিজবুল্লাহ অস্ত্র ছাড়বে না। মাঝেমধ্যে হামলা হলেও কোনো পক্ষ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে যাবে না।
দ্বিতীয়ত, সীমিত কিন্তু ধারাবাহিক যুদ্ধ চলতে পারে। ইসরায়েল অস্ত্রভান্ডার ও সামরিক স্থাপনায় হামলা করবে, হিজবুল্লাহ পাল্টা আক্রমণ চালাবে এবং সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষ বারবার বাস্তুচ্যুত হবে।
তৃতীয়ত, ভুল হিসাব বা বড় ধরনের হামলা পরিস্থিতিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে নিয়ে যেতে পারে। তখন ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়বে এবং সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এই তিনটির কোনোটিই প্রকৃত শান্তির চিত্র নয়।
শান্তির জন্য কী প্রয়োজন?
স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে লেবানন সংকট শুধু ইসরায়েল ও লেবাননের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নয়। এর সঙ্গে ইরান, হিজবুল্লাহ, যুক্তরাষ্ট্র, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গভীরভাবে যুক্ত।
ইরানকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে কোনো চুক্তি করলে সেটি বাস্তবতার বড় একটি অংশ বাদ দেয়। আবার ইরানের সব দাবি মেনে চুক্তি করলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ অমীমাংসিত থাকে।
তাই এমন একটি সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা হ্রাস, ইরানি সহায়তা সীমিত করা এবং লেবাননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব শক্তিশালী করার কাজ একসঙ্গে এগোবে।
শুধু হিজবুল্লাহকে অস্ত্র ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে অথবা শুধু ইসরায়েলকে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না।
ইসরায়েল ও লেবাননের নতুন চুক্তিটি প্রথম দেখায় শান্তির দিকে অগ্রগতি মনে হতে পারে। কিন্তু এর মূল শর্তগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এতে যুদ্ধ থামানোর চেয়ে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার উপাদানই বেশি।
হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণকে ইসরায়েলি প্রত্যাহারের পূর্বশর্ত করা হয়েছে, অথচ সংগঠনটির ইরানি সহায়তা বন্ধ করার কোনো কার্যকর পথ রাখা হয়নি। এর ফলে ইসরায়েল বলবে প্রত্যাহারের পরিবেশ তৈরি হয়নি, আর হিজবুল্লাহ বলবে দখল বা সামরিক উপস্থিতি বহাল থাকায় অস্ত্র ত্যাগ করা সম্ভব নয়।
এভাবে চুক্তিটি শান্তির সেতু না হয়ে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
প্রকৃত সমাধান চাইলে সমস্যার দৃশ্যমান অংশ নয়, উৎসের দিকে নজর দিতে হবে। হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি দুর্বল করতে হলে ইরানি সহায়তার পথ সীমিত করতে হবে। একই সঙ্গে লেবাননের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে দেশের নিরাপত্তা কোনো দলীয় সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল না থাকে।
তা না হলে নতুন চুক্তি ইতিহাসের আরেকটি ব্যর্থ দলিল হয়ে থাকবে—যার নামে শান্তির কথা লেখা থাকবে, কিন্তু যার ভেতরে লুকিয়ে থাকবে দীর্ঘ যুদ্ধের সব উপাদান।

