জুন মাসে সাত শিল্পোন্নত দেশের সম্মেলনে বিশ্বের সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি ছিল ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ সমঝোতার দিকে। সবাই অপেক্ষা করছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কী বলেন, কীভাবে যুদ্ধের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং তাঁর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে।
কিন্তু ট্রাম্প দ্রুত আলোচনাকে ঘুরিয়ে নিলেন তাঁর পছন্দের আরেক বিষয়ে—জানুয়ারির শুরুতে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযানে।
ট্রাম্প দাবি করেন, অভিযানটি মাত্র ৪৮ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের খরচের তুলনায় ভেনেজুয়েলা থেকে নেওয়া লাখ লাখ ব্যারেল তেলের মূল্য ছিল ৪০ গুণ বেশি। তিনি এটিকে এমন একটি ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা—দুই পক্ষই লাভবান হচ্ছে।
এই বক্তব্য শুধু ট্রাম্পের আত্মপ্রশংসার উদাহরণ নয়। এটি তাঁর পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেয়। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার বদলে তাঁর প্রশাসনের বিশেষ মনোযোগ এখন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের প্রতিবেশী অঞ্চল লাতিন আমেরিকার দিকে।
৯ জুলাই ২০২৬-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অন্তত ৪০ বছরের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রশাসন লাতিন আমেরিকায় এত বেশি মনোযোগ, রাজনৈতিক শক্তি ও সম্পদ ব্যয় করেনি। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও অঞ্চলটি বর্তমান সময়ের মতো গুরুত্ব পায়নি।
প্রশ্ন হলো, কেন লাতিন আমেরিকা হঠাৎ ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে? এর উত্তর কোনো আদর্শবাদী বৈশ্বিক নীতির মধ্যে নেই। বরং বিষয়টি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক, জ্বালানি এবং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত।
ঘরের সমস্যার সমাধান খোঁজা হচ্ছে প্রতিবেশী অঞ্চলে
ট্রাম্পের কাছে লাতিন আমেরিকা শুধু প্রতিবেশী অঞ্চল নয়; তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি ক্ষেত্র।
প্রথম লক্ষ্য অনিয়মিত অভিবাসন কমানো। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রবেশ করাকে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
দ্বিতীয় লক্ষ্য মাদকজনিত মৃত্যুর সংখ্যা কমানো। বিশেষ করে কৃত্রিম মাদক ফেন্টানিল যুক্তরাষ্ট্রে জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বড় সংকট সৃষ্টি করেছে। এর সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে মেক্সিকোর অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর যোগাযোগ রয়েছে বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে আসছে।
তৃতীয় লক্ষ্য জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করা। ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ মার্কিন কৌশলগত পরিকল্পনায় ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
চতুর্থ লক্ষ্য চীনের প্রভাব সীমিত করা। গত দুই দশকে চীন বন্দর, সড়ক, খনি, জ্বালানি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বাণিজ্যে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে লাতিন আমেরিকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকেরাই এখন এই উপস্থিতিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।
ফলে ট্রাম্পের আঞ্চলিক নীতিতে অভিবাসন, মাদক, অপরাধ, বাণিজ্য, খনিজ, জ্বালানি এবং চীনবিরোধী প্রতিযোগিতা একসঙ্গে মিশে গেছে।
পুরোনো মুনরো নীতির নতুন সংস্করণ
ট্রাম্পের লাতিন আমেরিকা নীতির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এর প্রকাশ্য বলপ্রয়োগমূলক চরিত্র। এ নীতিতে পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌমত্বের ভাষার চেয়ে হুমকি, চাপ এবং সামরিক ক্ষমতার প্রদর্শন বেশি দৃশ্যমান।
এই পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের বড় লাঠির নীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। ওই নীতির মূল ধারণা ছিল—আলোচনা করা হবে, তবে পেছনে থাকবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের স্পষ্ট হুমকি।
ট্রাম্প প্রশাসনের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বলা হয়, বহু বছরের অবহেলার পর যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে নিজের প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে এবং মুনরো নীতি কার্যকর করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মুনরো ২০৩ বছর আগে যে ধারণাটি সামনে এনেছিলেন, তার মূল বক্তব্য ছিল—পশ্চিম গোলার্ধে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না।
কিন্তু এই নীতির ইতিহাস শুধু বাইরের শক্তিকে দূরে রাখার নয়। এর আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র বহুবার লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সরকার, রাজনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেছে।
শীতল যুদ্ধের পরবর্তী মার্কিন প্রশাসনগুলো লাতিন আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্তত প্রকাশ্যে সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং পারস্পরিক সম্মানের কথা বলত। ট্রাম্প সেই পর্দা অনেকটাই সরিয়ে দিয়েছেন।
তিনি পানামা খাল আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। মেক্সিকোর অপরাধী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একতরফা হামলার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। বিভিন্ন নির্বাচনে নিজের আদর্শের কাছাকাছি থাকা প্রার্থীদের প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন। আর ভেনেজুয়েলায় এমন একজন নেতাকে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন, যাকে তিনি পছন্দ করতেন না।
জানুয়ারিতে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী আটক হওয়ার পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নের মুখে পড়বে না। তিনি নতুন এই ব্যবস্থাকে নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে একটি নতুন নীতি হিসেবেও তুলে ধরেন।
কঠোর পদ্ধতিতে মিলেছে কিছু তাৎক্ষণিক ফল
অনেকের ধারণা ছিল, এ ধরনের প্রকাশ্য চাপ ও হুমকি লাতিন আমেরিকায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। কিন্তু অন্তত স্বল্পমেয়াদে ট্রাম্প কিছু উল্লেখযোগ্য ফল পেয়েছেন।
অঞ্চলের বেশ কয়েকটি সরকার অভিবাসন, মাদক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের তুলনায় বেশি সহযোগিতা করছে। চিলি, কলম্বিয়া ও পেরুসহ কয়েকটি দেশে ট্রাম্পঘনিষ্ঠ ডানপন্থী নেতাদের নির্বাচনী বিজয়ও তাঁর কাজ সহজ করেছে।
গত ১৫টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধ্যে ১২টিতে ডানপন্থী অথবা মধ্য-ডানপন্থী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এর ফলে এমন এক নতুন নেতৃত্বগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা অপরাধ দমন, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও চীনের প্রভাব সীমিত করার প্রশ্নে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
তবে এই সহযোগিতা কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। কারণ কোনো অঞ্চলের সরকার সাময়িকভাবে সহযোগিতা করলেই জনগণের ক্ষোভ দূর হয় না।
বিশ শতকে মার্কিন দখল, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে জমে থাকা অসন্তোষ থেকেই কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রো এবং আর্জেন্টিনায় হুয়ান পেরনের মতো মার্কিনবিরোধী নেতার উত্থান ঘটেছিল।
ট্রাম্পের নীতিও ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। স্বল্পমেয়াদে চীনের প্রভাব কমানোর চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে দেশগুলোকে আরও বেশি করে বেইজিংয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ভেনেজুয়েলা দৃশ্যমান সাফল্য, কিন্তু ফল এখনো অনিশ্চিত
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ ট্রাম্পের আঞ্চলিক নীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান ঘটনা। মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর দেশটিকে একটি স্থিতিশীল, বিনিয়োগবান্ধব এবং যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তবে ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই স্থিতিশীলতা নয়।
মাদুরোর সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ডেলসি রদ্রিগেজ বর্তমানে মার্কিন তত্ত্বাবধানে দেশ পরিচালনা করছেন। ট্রাম্প তাঁর প্রশংসা করছেন, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি প্রায় ৪৬ শতাংশ বাড়ানোর জন্য।
কিন্তু দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।
জুনে দুটি ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। এতে রদ্রিগেজের নেতৃত্বের প্রতি আগে থেকেই দুর্বল জনআস্থা আরও কমে যায়। দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি এখনো ৫০০ শতাংশের ওপরে। শত শত রাজনৈতিক বন্দী কারাগারে রয়েছেন। তেল রপ্তানি বাড়লেও এর সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে খুব কমই পৌঁছেছে।
মাদুরো অপসারণের পর ট্রাম্পের প্রতি যে কৃতজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুত কমে আসছে। মানুষের আশঙ্কা, গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজনের ঝুঁকি না নিয়ে ট্রাম্প হয়তো রদ্রিগেজকেই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখতে চাইবেন।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের তেলসমৃদ্ধ অর্থনীতির আশায় কারাকাসের হোটেলগুলোতে ভিড় করছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বৈধতা ছাড়া শুধু তেল উৎপাদন বাড়িয়ে স্থায়ী স্থিতিশীলতা আনা কঠিন।
ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে রদ্রিগেজকে নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে বাধ্য করা না হলে ভেনেজুয়েলার অভিযান তাঁর বড় সাফল্যের বদলে আরেকটি অসম্পূর্ণ ক্ষমতা পরিবর্তনের ঘটনায় পরিণত হতে পারে।
মেক্সিকোর সঙ্গে অপ্রত্যাশিত সহযোগিতা
ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে মেক্সিকোর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক।
মেক্সিকোর বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমের সঙ্গে ট্রাম্পের সহযোগিতা অনেক পর্যবেক্ষকের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কার্যকর হয়েছে। একদিকে তিনি উচ্চ শুল্ক এবং সামরিক হামলার হুমকি ব্যবহার করেছেন, অন্যদিকে শেইনবাউমের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে তুলনামূলক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।
এই চাপ ও সম্পর্কের সমন্বয়ে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যাকে উভয় দেশের কর্মকর্তারা নজিরবিহীন বলছেন।
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বাড়িয়েছে। মেক্সিকো কয়েক ডজন অপরাধী গোষ্ঠীর নেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছে বা প্রত্যর্পণ করেছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে আগের মার্কিন প্রশাসনগুলো বহু বছর ধরে চেয়েছিল।
মেক্সিকো তৃতীয় দেশের অভিবাসীদের ২,০০০ মাইল দীর্ঘ মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্তে পৌঁছানো ঠেকাতে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে।
এর ফলে ট্রাম্প তাঁর ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি—অনিয়মিত সীমান্ত অতিক্রম নাটকীয়ভাবে কমানো—বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছেন।
মাদক দমনে মিশ্র ফল
মাদক সরবরাহ এবং মাদকসংশ্লিষ্ট সহিংসতার প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের ফল একরকম নয়।
ক্যারিবীয় অঞ্চলে সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানের ওপর মার্কিন হামলায় ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। স্বাধীন অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে কোকেনের সরবরাহে উল্লেখযোগ্য হ্রাসের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ কারণে এসব হামলা শুধু কার্যকারিতা নয়, বৈধতার প্রশ্নেও সমালোচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক অতিমাত্রায় গ্রহণজনিত মৃত্যুর মোট সংখ্যা ১৪ শতাংশ কমেছে। এটি ছিল টানা তৃতীয় বছরের পতন।
বিশেষজ্ঞরা এই উন্নতির পেছনে একাধিক কারণের কথা বললেও মার্কিন কর্মকর্তারা ফেন্টানিলজনিত মৃত্যুর ২২ শতাংশ হ্রাসকে মেক্সিকোর সঙ্গে বাড়তি সহযোগিতার ফল হিসেবে তুলে ধরছেন।
শেইনবাউম ২০২৪ সালের শেষ দিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর মেক্সিকোর সরকারি হত্যার হার ৪০ শতাংশ কমেছে। এই পতন অব্যাহত থাকলে তা শুধু মেক্সিকোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত পরিস্থিতির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কোস্টারিকা, গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাসও ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর মাদক আটক এবং নিরাপত্তা অভিযানে নিজেদের তৎপরতা বাড়িয়েছে।
চীনের প্রভাব ঠেকাতে একের পর এক চাপ
গত দুই দশকে লাতিন আমেরিকায় চীনের বিস্তার প্রায় বাধাহীন ছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ কয়েকটি দেশকে বেইজিংয়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট অংশীদারত্ব সীমিত করতে বাধ্য করেছে।
ডিসেম্বরে মেক্সিকো কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করে। এর প্রধান প্রভাব পড়ে চীনা পণ্যের ওপর। বিষয়টি এমন এক আশঙ্কার জবাব হিসেবে দেখা হয় যে চীন মেক্সিকোকে ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে মার্কিন বাজারে প্রবেশ করছে।
জানুয়ারিতে পানামা হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পানামা খালের দুটি বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়। এর আগে মার্কিন কর্মকর্তারা সেখানে চীনের উপস্থিতি নিয়ে বারবার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
একই মাসে চিলি ভালপারাইসো ও হংকংয়ের মধ্যে প্রস্তাবিত চীনা সমুদ্রতল যোগাযোগ তারের পরিকল্পনা স্থগিত করে। এর কিছুদিন আগে সান্তিয়াগোয় মার্কিন দূতাবাস চিলির যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠিয়েছিল। পরে প্রস্তাবটি বিবেচনায় যুক্ত তিন কর্মকর্তার কূটনৈতিক প্রবেশানুমতিও বাতিল করা হয়।
২০১৭ সাল থেকে লাতিন আমেরিকার পাঁচটি দেশ তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ত্যাগ করে চীনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে হন্ডুরাসের নতুন প্রেসিডেন্ট নাসরি আসফুরা আবার তাইওয়ানের দিকে ফেরার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
এসব ঘটনা বেইজিংয়ের জন্য উল্লেখযোগ্য ধাক্কা। যদিও অঞ্চলের অন্য অনেক ক্ষেত্রে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি এখনো শক্তিশালী এবং বাড়ছে।
আদর্শিক মিত্রদের জন্য অর্থ, অস্ত্র ও সমর্থন
ট্রাম্প শুধু চাপ প্রয়োগ করেননি; নিজের রাজনৈতিক মিত্রদের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তাও দিয়েছেন।
অক্টোবর ২০২৫-এ আর্জেন্টিনার জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের উদ্ধার সহায়তা অনুমোদন করেন তিনি। এই অর্থ দেশটির অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়।
এর ফলে প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেইয়ের দল ওই মাসের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী আইনসভা নির্বাচনে জয় পায় এবং তাঁর ব্যবসাবান্ধব সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
ইকুয়েডরে প্রেসিডেন্ট দানিয়েল নোবোয়ার সরকারকে অপরাধী গোষ্ঠীর সহিংসতা মোকাবিলায় সহায়তা করতে ট্রাম্প মার্কিন সেনা পাঠিয়েছেন।
নোবোয়া এপ্রিল ২০২৫-এর সফল পুনর্নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে ট্রাম্পের সঙ্গে ছবি তুলতে মার-আ-লাগো গিয়েছিলেন। বর্তমানে ইকুয়েডর দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ হত্যার হারের দেশ।
নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থন সব দেশে সমান প্রভাব ফেলেনি। তবে হন্ডুরাসে নাসরি আসফুরা জনমত জরিপে তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন। ট্রাম্পের সমর্থনের পর তাঁর অবস্থান নাটকীয়ভাবে শক্তিশালী হয়।
এতে স্পষ্ট হয়, লাতিন আমেরিকার অন্তত কিছু দেশে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সমর্থন এখনো নির্বাচনী সম্পদ হিসেবে কাজ করতে পারে।
সাফল্যের নিচে জমছে সার্বভৌমত্বের ক্ষোভ
সরকারগুলোর সহযোগিতা এবং নেতাদের সঙ্গে হাসিমুখের ছবি দেখে মনে হতে পারে ট্রাম্পের নীতি নির্বিঘ্নে সফল হচ্ছে। কিন্তু এর নিচে গভীর ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।
২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বৈশ্বিক মনোভাব নিয়ে পরিচালিত জরিপে লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক ধারণা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এই প্রবণতা শুধু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অজনপ্রিয়তার ফল নয়। অনেকের ধারণা, তাঁর প্রশাসন এমনকি মিত্র দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকেও যথেষ্ট সম্মান করছে না।
ট্রাম্পঘনিষ্ঠ একটি লাতিন আমেরিকান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষোভের সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, তাঁরা কারও অধীনস্থ রাষ্ট্র হবেন না।
এই একটি বক্তব্যের মধ্যেই আঞ্চলিক উদ্বেগের গভীরতা ফুটে ওঠে। সরকারগুলো অপরাধ ও অভিবাসনের প্রশ্নে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করতে পারে, কিন্তু প্রকাশ্য অপমান বা নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
ব্রাজিলে চাপ প্রয়োগ করে উল্টো ফল
ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক ব্যর্থতা ঘটেছে ব্রাজিলে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহার করতে ব্রাজিল সরকার ও সর্বোচ্চ আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করেন।
কিন্তু এতে প্রত্যাশিত ফল হয়নি। বরং ব্রাজিলে জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং ট্রাম্পবিরোধী বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়।
বলসোনারো শেষ পর্যন্ত কারাগারে যান। ট্রাম্পও পরে শুল্ক প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।
ট্রাম্পের প্রতি হতাশা আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়েকে নিয়ে গঠিত আঞ্চলিক জোটের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলেছে। এক-চতুর্থাংশ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে আলোচনা চলার পর জোটটি এ বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে সম্মত হয়।
অর্থাৎ ওয়াশিংটনের চাপ লাতিন আমেরিকাকে সব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনেনি; কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প অংশীদার খুঁজতে উৎসাহিত করেছে।
অপরাধভীতি ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক সুযোগ
লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রিয় না হলেও তাঁর কিছু নীতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের মিল রয়েছে।
চিলি, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশে জনমত জরিপে অপরাধকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত এক দশকে কোকেন উৎপাদন, অবৈধ খনন, মানব পাচার এবং অপরাধী চক্রের বিস্তারের কারণে বহু অঞ্চলে সহিংসতা বেড়েছে। এই বাস্তবতাই ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তিগুলোর একটি।
ট্রাম্প যখন সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠী ধ্বংস করার কথা বলেন, তখন তাঁর ভাষা কঠোর হলেও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষের একটি অংশের কাছে তা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
মাদুরোর সরকারকে অঞ্চলে অভিবাসন ও অপরাধ বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হতো। ফলে তাঁকে আটক করার মার্কিন সামরিক অভিযান অনেক দেশে জনপ্রিয়তা পায়।
জানুয়ারির এক জরিপে পেরুর ৭৪ শতাংশ এবং কলম্বিয়ার ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা অভিযানটির প্রতি সমর্থন জানান।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের দুটি স্থানীয় অপরাধী সংগঠনকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে। লুলার সরকার এর প্রতিবাদ করলেও ব্রাজিলের একটি জরিপে ৫৯ শতাংশ উত্তরদাতা এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন।
এই ফলাফল দেখায়, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে মানুষ মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও অপরাধ দমনের প্রশ্নে তাদের একটি বড় অংশ কঠোর পদক্ষেপ সমর্থন করছে।
নির্বাচনী রাজনীতিতে ট্রাম্পের প্রভাব
সব ডানপন্থী প্রার্থী ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন নিতে আগ্রহী নন।
চিলিতে হোসে আন্তোনিও কাস্ত এবং পেরুতে কেইকো ফুজিমোরি নিজেদের প্রচারে ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন থেকে কিছুটা দূরে থেকেছিলেন। তাঁরা শেষ পর্যন্ত জয়ীও হন।
অন্যদিকে কলম্বিয়ায় আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা এবং ব্রাজিলে ফ্লাভিও বলসোনারো ট্রাম্পের সমর্থনকে নিজেদের প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছেন।
দে লা এসপ্রিয়েলা জুনে এক শতাংশেরও কম ব্যবধানে কলম্বিয়ার নির্বাচন জেতেন। ফ্লাভিও বলসোনারো তাঁর কারাবন্দী বাবার রক্ষণশীল রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তরসূরি হিসেবে অক্টোবরের ব্রাজিলীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এতে বোঝা যায়, ট্রাম্পের নাম অঞ্চলজুড়ে সমানভাবে কার্যকর নয়। কোথাও এটি ভোট বাড়াতে পারে, কোথাও আবার জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
কিউবা কি পরবর্তী লক্ষ্য?
ভেনেজুয়েলায় তুলনামূলক সাফল্যের পর অনেকেই মনে করছেন ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে কিউবা।
ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সরঞ্জাম ও বাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এই শক্তি মাদুরোকে সরানোর আগে মোতায়েন করা নৌবহরের তুলনায় ছোট হলেও কিউবার কর্মকর্তাদের আটকসহ বিভিন্ন সামরিক বিকল্প বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
কিউবা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমদানি করা তেলের ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন অবরোধের কারণে দেশটিতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। ক্যারিবীয় অঞ্চলের গরমকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্প কিউবা সরকারের সঙ্গে আলোচনা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে। রুবিও দীর্ঘদিন ধরে কিউবায় সরকার পরিবর্তনের কঠোর সমর্থক।
একটি সম্ভাবনা হলো ভেনেজুয়েলার মতো সমঝোতা। এতে কিউবার বর্তমান ব্যবস্থার একটি অংশ ক্ষমতায় থাকবে, কিন্তু অর্থনীতি খুলে দেবে এবং ভবিষ্যতে নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেবে।
অন্য সম্ভাবনা আরও নাটকীয়—১৯৫৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা এবং ১৩ জন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে মোকাবিলা করা শাসনব্যবস্থার সরাসরি পতন।
এ ধরনের পরিবর্তন সফল হলে নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনা থেকে ট্রাম্পের মনোযোগ সরাতে পারে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালে রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে রুবিওর অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
কিন্তু কিউবার মতো একটি রাষ্ট্রে সামরিক বা রাজনৈতিক ধাক্কার পর কী ঘটবে, তা নিশ্চিত নয়। সরকার পতন ঘটানো এবং কার্যকর রাষ্ট্র গঠন করা এক বিষয় নয়।
মেক্সিকোর সঙ্গে সম্পর্কের সামনে বড় পরীক্ষা
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শক্তিশালী সহযোগিতা থাকলেও মেক্সিকোর সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জুলাইয়ে ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, মার্কিন-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্যচুক্তি বর্তমান রূপে নবায়ন করতে তারা সম্মত নয়।
এই সিদ্ধান্তে চুক্তিটি সঙ্গে সঙ্গে শেষ হচ্ছে না, কিন্তু দীর্ঘ ও জটিল আলোচনা শুরু হবে। এর ফলে মেক্সিকোর অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়বে।
মেক্সিকো তার মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায়। তাই বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে বিরোধ শুধু মেক্সিকোর জন্য নয়, মার্কিন প্রতিষ্ঠান ও সরবরাহব্যবস্থার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে ট্রাম্প শেইনবাউমের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন। তাঁর দলের একজন অঙ্গরাজ্য গভর্নরকে মাদক পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রত্যর্পণের দাবি জানানো হয়েছে।
শেইনবাউম এতে সম্মত হলে তাঁর বামপন্থী দলের ভেতরে বড় বিভাজন তৈরি হতে পারে। কারণ দলটির একটি অংশের মধ্যে শক্তিশালী মার্কিনবিরোধী মনোভাব রয়েছে।
আর তিনি অস্বীকৃতি জানালে ট্রাম্প মেক্সিকোর ভূখণ্ডে অপরাধী গোষ্ঠীর অবস্থানে একতরফা মানববিহীন আকাশযান হামলা বা অন্য সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।
মেক্সিকোতে এ ধরনের অভিযানকে চূড়ান্ত সীমা হিসেবে দেখা হয়। এটি ঘটলে ঊনবিংশ শতাব্দীর মার্কিন হস্তক্ষেপের স্মৃতি আবার জেগে উঠবে এবং দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।
তখন শেইনবাউম সীমান্তে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণসহ নিরাপত্তা সহযোগিতা কমিয়ে দিতে বাধ্য হতে পারেন।
চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতাই দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে
দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, ট্রাম্প লাতিন আমেরিকায় চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কীভাবে পরিচালনা করেন।
দক্ষিণ আমেরিকার বড় অংশে চীন এখন উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। এমনকি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ নেতারাও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চান না।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মিলেই চীনকে চমৎকার অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইকুয়েডরের নোবোয়া আগস্টে দ্বিতীয়বারের মতো বেইজিং সফরের পরিকল্পনা করেছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের কাছে কী চায়, সে বিষয়ে মিশ্র বার্তা দিচ্ছে।
মে মাসে কলম্বীয় বংশোদ্ভূত রিপাবলিকান সিনেটর বার্নি মোরেনো বলেছিলেন, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর উচিত ওয়াশিংটনের সঙ্গে একক সম্পর্ক বজায় রাখা।
কিন্তু এর কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প বড় একটি মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল নিয়ে বেইজিং যান। সেই দলে ইলন মাস্ক এবং টিম কুকও ছিলেন। সফরের লক্ষ্য ছিল চীনের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায়িক চুক্তি করা।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র নিজে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করবে, কিন্তু লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে বেইজিং থেকে দূরে থাকতে বলবে—এমন দ্বৈত অবস্থান দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা কঠিন।
সম্ভবত ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত একটি সীমিত ভারসাম্যের পথ নেবেন। যোগাযোগব্যবস্থা, বন্দর, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সংবেদনশীল খাতে চীনা বিনিয়োগ ঠেকানোর চেষ্টা করবেন, কিন্তু সাধারণ বাণিজ্য চালু রাখার বিষয়টি মেনে নেবেন।
তবু আঞ্চলিক সরকারগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—দুই শক্তির মধ্যেই ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইবে। কারণ একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা কমিয়ে দিতে পারে।
ট্রাম্পের পদ্ধতি কেন কাজ করছে?
২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার শুরু করার সময় ট্রাম্প মেক্সিকোর বিরুদ্ধে মাদক, অপরাধ ও অপরাধী পাঠানোর অভিযোগ করেছিলেন। সেই রাজনীতিকই এখন লাতিন আমেরিকায় অন্তত আংশিক সাফল্য পাচ্ছেন—বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর।
তবে তাঁর সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে।
প্রথমত, লাতিন আমেরিকার বহু দেশে অপরাধ ও সহিংসতা এতটাই বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে যে সাধারণ মানুষ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে আগ্রহী।
দ্বিতীয়ত, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, অনেক লাতিন আমেরিকান সরকারও অনুভব করছে।
তৃতীয়ত, শুল্ক ও অর্থনৈতিক চাপের হুমকি খুব দ্রুত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যেসব দেশের অর্থনীতি মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তাও ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন, ট্রাম্পের পদ্ধতি অপ্রত্যাশিতভাবে কার্যকর হয়েছে।
তাঁদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, বাইডেন যদি শুল্ক বা অন্য ধরনের চাপের হুমকি দিতেন, তাহলে তৎকালীন মেক্সিকো সরকার হয়তো অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় হতো। এতে মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্তের সংকট এড়ানো সম্ভব হতে পারত।
অনেক ডেমোক্র্যাট মনে করেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাঁদের পরাজয়ের পেছনে সীমান্ত পরিস্থিতি বড় ভূমিকা রেখেছিল।
সাফল্য নাকি ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়ার সূচনা?
ট্রাম্পের লাতিন আমেরিকা নীতি বর্তমানে দৃশ্যমান কিছু ফল দিয়েছে।
অনিয়মিত সীমান্ত অতিক্রম কমেছে। মেক্সিকো নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ অপরাধী নেতা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পৌঁছেছেন। চীনের কিছু প্রকল্প বাধার মুখে পড়েছে। ডানপন্থী মিত্ররা নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি বেড়েছে।
কিন্তু এসব সাফল্যের নিচে বড় ঝুঁকিও জমছে।
সার্বভৌমত্বের প্রতি অবজ্ঞা জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। সামরিক শক্তি ব্যবহার করে সরকার পরিবর্তন করলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। শুধু আদর্শিক মিত্রদের সঙ্গে কাজ করলে ক্ষমতার পালাবদলের পর সহযোগিতার কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে।
চীনকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চাপও বাস্তবসম্মত নয়। কারণ অনেক দেশের অর্থনীতি এখন চীনা বাণিজ্য, ঋণ ও বিনিয়োগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সবচেয়ে বড় কথা, ভয় দেখিয়ে সহযোগিতা আদায় করা যায়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী আস্থা তৈরি করা যায় না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প লাতিন আমেরিকাকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় মঞ্চে ফিরিয়ে এনেছেন। অন্তত ৪০ বছরের মধ্যে অঞ্চলটি ওয়াশিংটনের কাছ থেকে এতটা মনোযোগ পায়নি।
তাঁর পদ্ধতি স্পষ্ট—অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক শক্তির হুমকি, রাজনৈতিক মিত্রদের সহায়তা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান।
এই নীতি স্বল্পমেয়াদে ফল দিচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, লাতিন আমেরিকায় মার্কিন বলপ্রয়োগ প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
ট্রাম্প যদি নিরাপত্তা সহযোগিতাকে পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন, তবে তাঁর নীতির কিছু অংশ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কিন্তু তিনি যদি অঞ্চলটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা হিসেবে দেখতে থাকেন, তাহলে আজকের সহযোগিতাই আগামী দিনের তীব্র মার্কিনবিরোধিতায় পরিণত হতে পারে।
তখন চীনকে দূরে রাখার জন্য নেওয়া নীতিই লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে আরও দ্রুত বেইজিংয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অতএব ট্রাম্পের বর্তমান সাফল্যের চূড়ান্ত মূল্যায়ন এখনই সম্ভব নয়। এটি লাতিন আমেরিকায় মার্কিন নেতৃত্বের পুনরুত্থানও হতে পারে, আবার দুই শতাব্দীর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ও অপ্রত্যাশিত পরিণতির আরেকটি নতুন অধ্যায়ও হতে পারে।

