যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা আবারও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। পাল্টাপাল্টি হামলার ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ায় বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে।
১৩ জুলাই, সোমবার লেনদেন শুরুর পরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা যায়। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছায়। এর আগে এই তেলের দাম নেমে এসেছিল ব্যারেলপ্রতি ৭০ দশমিক ১৪ ডলারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৩ দশমিক ৮৩ ডলারে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল এই নৌপথ দিয়েই বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অতিথি গবেষক ওমিদ শোকরির মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম খুব সহজেই ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের সীমা অতিক্রম করতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের ঝুঁকি যত বাড়বে, ব্যবসায়ীরাও তত বেশি ঝুঁকির মূল্য হিসাবের সঙ্গে যুক্ত করবেন। ফলে বাজারে দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা। যদি এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল ব্যাহত হয় অথবা উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাব শুধু তেলের দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং বিভিন্ন পণ্যের মূল্যও বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার শুধু বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে নেই, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকিকেও মূল্য নির্ধারণে বিবেচনায় নিচ্ছে। ফলে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত না হলেও অনিশ্চয়তা যতদিন থাকবে, ততদিন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।
ওমিদ শোকরি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতার ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, সেটি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। এই অনিশ্চয়তা বাজারে আস্থার সংকট তৈরি করছে। তাই পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে শান্ত থাকলেও তেলের দামে ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। কারণ এসব দেশের বড় অংশই জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাবে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক উত্তেজনা এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্যও একটি বড় অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংঘাত দ্রুত প্রশমিত না হলে এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উদ্বেগ দূর না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।

