মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় বড় পরিসরের হামলা চালিয়েছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ইরান দাবি করেছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ফলে অঞ্চলজুড়ে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কমান্ড জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের এমন সামরিক অবকাঠামো, যেগুলো হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছিল।
ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর আব্বাস, সিরিক, জাস্ক এবং কেশম দ্বীপে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে খুজেস্তান, হরমোজগান ও সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের বিভিন্ন এলাকাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
মার্কিন বাহিনীর দাবি, এই অভিযানে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দ্রুতগতির নৌযানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
এবারের অভিযানে যুদ্ধবিমান, নৌযান, আকাশপথে একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন এবং সমুদ্রপথে পরিচালিত বিশেষ আক্রমণকারী ড্রোনও ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন পক্ষ। তাদের দাবি, এ ধরনের সমুদ্রভিত্তিক ড্রোন প্রথমবারের মতো এই অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছে।
ইরানের পাল্টা হামলার দাবি
মার্কিন হামলার পরপরই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানায়, তারা কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করেছে।
ইরানের নূর সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী যৌথভাবে এই অভিযান পরিচালনা করছে।
তাদের দাবি অনুযায়ী, জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে হামলায় কয়েকটি জ্বালানি ডিপো ও গোলাবারুদ সংরক্ষণাগারে আগুন লেগেছে।
এ ছাড়া বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটির হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র, সামুদ্রিক নজরদারি বিমানের হ্যাঙ্গার এবং একটি ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রেও হামলা চালানোর দাবি করেছে তারা।
কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে জ্বালানি ট্যাংক ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আহমেদ আল-জাবের বিমানঘাঁটির গুরুত্বপূর্ণ রাডার ব্যবস্থাও ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।
তবে এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেই নতুন উত্তেজনা
ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ রেখে দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করলে সেগুলোকে থামানো হয়। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা শুরু করে।
অন্যদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের হামলার সক্ষমতা কমিয়ে আনতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
তাদের দাবি, অভিযানের সময় একটি ইরানি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটি আক্রমণকারী ড্রোনও ধ্বংস করা হয়েছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল লক্ষ্যবস্তু
বিশ্লেষকদের মতে, এবার যেসব এলাকায় হামলা হয়েছে সেগুলো ইরানের সামরিক ও নৌ কৌশলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে জাস্ক, সিরিক, কেশম দ্বীপ এবং বন্দর আব্বাস হরমুজ প্রণালির প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব এলাকায় রাডার স্টেশন, নৌঘাঁটি এবং বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা রয়েছে।
এ ছাড়া খোন্দাব এলাকার হামলাও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ সেখানে ইরানের সংবেদনশীল ভারী পানির স্থাপনা অবস্থিত।
বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য
ইরানের স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমোজগান প্রদেশের সাম্প্রতিক হামলায় কোনো বেসামরিক নাগরিক নিহত হননি এবং বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া যায়নি।
তবে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, খুজেস্তানের মাশহরে একটি কৃষি সেচকেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে সেখানে দায়িত্বরত একজন নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন এবং আরও চারজন আহত হন।
সংঘাত কোন দিকে যাচ্ছে?
টানা কয়েক দফা হামলা ও পাল্টা হামলার পর স্পষ্ট হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর পড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

