ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলো একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মস্কোর সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা চালায়। শত শত রুশ কূটনীতিক ও সন্দেহভাজন গোয়েন্দাকে বিভিন্ন দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত উন্নত প্রযুক্তি, মাইক্রোচিপ, যোগাযোগ সরঞ্জাম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রাশিয়ার হাতে পৌঁছানো ঠেকাতে কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস দাবি করেছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়া প্রযুক্তি সংগ্রহের নতুন কেন্দ্র হিসেবে জাপানকে ব্যবহার করছে। তাদের অনুসন্ধান অনুযায়ী, টোকিওকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এমন একটি গোপন নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ বিভিন্ন মধ্যবর্তী দেশের সাহায্যে শেষ পর্যন্ত রাশিয়ায় পৌঁছে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানটি সরকারি নথি, করপোরেট তথ্য এবং তিনটি মহাদেশের একাধিক বর্তমান ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ার পর রুশ গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের একটি অংশ জাপানে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, তুলনামূলক দুর্বল গুপ্তচরবিরোধী আইন এবং উন্নত প্রযুক্তি শিল্পের উপস্থিতি রাশিয়ার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
ইউক্রেন সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে রাশিয়ার ব্যবহৃত প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে জাপানে তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে। যদিও এসব যন্ত্রাংশ সরাসরি জাপান থেকে রাশিয়ায় গেছে—এমন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, পুরো কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ-এর একটি বিশেষ ইউনিট, যার নাম ২০তম ডিরেক্টরেট। পশ্চিমা গোয়েন্দাদের দাবি, এই ইউনিটের সদস্যরা কূটনীতিক বা ব্যবসায়ীর পরিচয়ে প্রযুক্তি সংগ্রহ করেন এবং পরে বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে সেগুলো রাশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, টোকিওতে এই কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাক্সিম ভ্লাদিমিরোভিচ ফিলচেনকভ নামে একজন ব্যক্তি। সরকারি নথিতে তাকে রুশ রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার একজন কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পশ্চিমা গোয়েন্দাদের মতে, তিনি মূলত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে টোকিওতে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বিভিন্ন পরিবহন ও সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জাল নথি ব্যবহার করে সংবেদনশীল প্রযুক্তি সংগ্রহ এবং সেগুলো বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানোর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়।
রাশিয়ায় সরাসরি প্রযুক্তি রপ্তানি নিষিদ্ধ থাকায় বিকল্প পথ ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অনুসন্ধান অনুযায়ী, ভিয়েতনাম অন্যতম বড় ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া শ্রীলঙ্কা ও উজবেকিস্তান হয়ে বিভিন্ন পণ্য রাশিয়ায় পৌঁছানোর তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
টোকিওভিত্তিক একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের মালিক তাকেহিকো মিকি স্বীকার করেছেন যে, ২০১৮ সাল থেকে ফিলচেনকভের সঙ্গে তার পরিচয় রয়েছে। তবে তিনি দাবি করেছেন, ফিলচেনকভের সঙ্গে কোনো গোয়েন্দা তৎপরতার বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না এবং নিষিদ্ধ কোনো পণ্য রপ্তানির সঙ্গেও তিনি জড়িত নন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইউক্রেনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ধ্বংসস্তূপে জাপানি প্রতিষ্ঠানে তৈরি বিভিন্ন সার্কিট বোর্ড, সেমিকন্ডাক্টর ও যোগাযোগ যন্ত্রাংশ পাওয়ার দাবি করেছে কিয়েভ। এসব তথ্য জানিয়ে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকেই জাপান সরকারকে একাধিক কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়েছে ইউক্রেন।
তালিকায় জাপানের কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে রাশিয়ায় পণ্য বিক্রির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, তারা জাপানের রপ্তানি আইন ও নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে অনুসরণ করে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের নয়, প্রযুক্তিরও প্রতিযোগিতা। তাই উন্নত যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন প্রতিটি দেশের জন্য কৌশলগত অগ্রাধিকার। এই কারণেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও বিভিন্ন মধ্যবর্তী দেশ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও জটিল সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তরের অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নিউইয়র্ক টাইমসের এই অনুসন্ধানে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রুশ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে উপস্থাপিত সব দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিষয়টি এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্ত ও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

