ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন এক রহস্য তৈরি হয়েছে। একসময় তিনি ছিলেন ইসরায়েলের সবচেয়ে কড়া সমালোচকদের একজন। তার ভাষণ, রাজনৈতিক অবস্থান এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অবস্থান তাকে ইরানের কট্টরপন্থী রাজনীতির পরিচিত মুখে পরিণত করেছিল। অথচ সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন এক দাবি, যা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার রাজনীতিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল বহু বছর ধরে আহমাদিনেজাদকে নিজেদের কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছিল। লক্ষ্য ছিল, সুযোগ তৈরি হলে তাকে ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে সামনে আনা। এই পরিকল্পনা শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সঙ্গে ছিল গোপন বৈঠক, বিদেশ সফরের আড়াল, নিরাপদ আশ্রয়, এমনকি যুদ্ধের সময় তাকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টার মতো নাটকীয় ঘটনাও।
তবে এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ এখনো বহু প্রশ্নে ঘেরা। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি। আহমাদিনেজাদের পক্ষ থেকেও সরাসরি ব্যাখ্যা আসেনি। ফলে ঘটনাগুলোকে নিশ্চিত রাজনৈতিক সত্য হিসেবে নয়, বরং একটি বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দাবি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য হিসেবে দেখা উচিত।
বুদাপেস্টের সেই অস্বাভাবিক আমন্ত্রণ
ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায় ২০২৪ সালের শুরুর দিকে। হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে অবস্থিত লুডোভিকা ইউনিভার্সিটি অব পাবলিক সার্ভিসের রেক্টর অধ্যাপক গের্গেই দেলির কাছে সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তা একটি অদ্ভুত প্রস্তাব নিয়ে যান। প্রস্তাব ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটি সম্মেলন আয়োজন করতে হবে এবং সেখানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানাতে হবে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে।
প্রথম দেখায় বিষয়টি ছিল বিস্ময়কর। ইরানের সাবেক একজন কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্টকে ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু সম্মেলনে আমন্ত্রণ—এটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক বা একাডেমিক আয়োজনের মতো দেখাচ্ছিল না। পরে জানা যায়, সম্মেলনটি ছিল মূলত একটি আড়াল। প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল আহমাদিনেজাদকে বুদাপেস্টে এনে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপন আলোচনার সুযোগ করে দেওয়া।
রেক্টর দেলি জানতেন, এই আমন্ত্রণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আহমাদিনেজাদের অতীত বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তার উপস্থিতি বিতর্ক তৈরি করাই স্বাভাবিক ছিল। তবু দেলির যুক্তি ছিল, দুই শত্রু যদি কথা বলতে চায়, তবে সেই কথোপকথনকে সম্ভব করে দেওয়া কখনো কখনো বড় সংঘাত ঠেকানোর পথ হতে পারে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি কূটনীতির একটি পুরোনো বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। অনেক সময় প্রকাশ্য শত্রুতার আড়ালেও গোপন যোগাযোগ চলে। রাষ্ট্রগুলো মুখে কঠোর অবস্থান নিলেও পর্দার আড়ালে সম্ভাব্য বিকল্প পথ খুঁজে রাখে। বুদাপেস্টের ঘটনাটি সেই ধরনের এক গোপন রাজনৈতিক মঞ্চের ইঙ্গিত দেয়।
ইসরায়েলের পরিকল্পনায় আহমাদিনেজাদ কেন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল আহমাদিনেজাদকে শুধু যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, ইসরায়েল বহু বছর ধরে আহমাদিনেজাদকে গোয়েন্দা সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল, উপযুক্ত সময় এলে তাকে ইরানের নতুন নেতা হিসেবে সামনে আনা।
এই দাবি শুনতে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কারণ আহমাদিনেজাদ একসময় ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্যের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ছিলেন। তার শাসনামলে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি আবার জোরদার করে। তিনি নিয়মিত ইসরায়েলকে আক্রমণাত্মক ভাষায় সমালোচনা করতেন এবং হলোকাস্ট অস্বীকার করায় তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন।
তাহলে এমন একজন ব্যক্তিকে কেন ইসরায়েল সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে ভাববে?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আহমাদিনেজাদের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক অবস্থান ও ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে। প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর তিনি ধীরে ধীরে মূল ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে দূরে সরে যান। তাকে বারবার নির্বাচনে অংশ নিতে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও ক্ষমতাসীন কাঠামোর সঙ্গে তার সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে। তিনি নিজের পুরোনো কট্টর ভাবমূর্তি থেকে সরে এসে নিজেকে তুলনামূলক মধ্যপন্থী, জনমুখী ও সংস্কারবাদী চরিত্রে তুলে ধরতে শুরু করেন।
ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দৃষ্টিতে হয়তো এই পরিবর্তনই ছিল সুযোগ। একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট, যার এখনো শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু সমর্থন আছে, আবার একই সঙ্গে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ক্ষোভও আছে—এমন ব্যক্তিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়।
বদলে যাওয়া আহমাদিনেজাদ
২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আহমাদিনেজাদ। ওই সময় তিনি ছিলেন ইরানের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত রাজনীতিকদের একজন। তার শাসনামলে পারমাণবিক কর্মসূচি, বিরোধী দমন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পশ্চিমবিরোধী বক্তব্য ইরানের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল নিয়ে ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। সেই বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়। তার আমলে বিরোধী রাজনীতিক, ভিন্নমতাবলম্বী ও নাগরিক অধিকারকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগও ছিল।
কিন্তু ক্ষমতা ছাড়ার পর আহমাদিনেজাদ নিজের ভাষা ও চেহারায় পরিবর্তন আনতে শুরু করেন। তিনি আগের মতো তীব্র ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য কমিয়ে দেন। নিজেকে সাধারণ মানুষের পাশে থাকা একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চান। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর আচরণের সমালোচনা করেন, শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেন এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করে সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
তার পোশাকেও পরিবর্তন আসে। একসময় পরিচিত সাধারণ খাকি রঙের পোশাকের বদলে তিনি পরিপাটি স্যুট পরতে শুরু করেন। নিজের ব্যক্তিগত উপস্থাপনাও বদলান। এমনকি ইংরেজি শেখার চেষ্টার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তেহরানে নিজের কার্যালয়ে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করতেন, তাদের অভিযোগ শুনতেন এবং কখনো কখনো মন্ত্রণালয়ে সুপারিশপত্র পাঠাতেন। এসব আচরণ তাকে নতুন করে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির মঞ্চে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।
ক্ষমতায় ফেরার আকাঙ্ক্ষা
আহমাদিনেজাদের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবদোলরেজা দাভারির বক্তব্য অনুযায়ী, আহমাদিনেজাদ অর্থের জন্য এ ধরনের ঝুঁকি নেবেন না; যদি কিছু করেন, তা করবেন ক্ষমতার জন্য। এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আহমাদিনেজাদের রাজনৈতিক চরিত্র বোঝার একটি সূত্র দেয়। তিনি অর্থনৈতিকভাবে অসহায় কেউ নন; তার নিজের নেটওয়ার্ক আছে। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় চালিকা শক্তি হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ মহলের এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, তিনি অল্প কয়েকজন আস্থাভাজনকে জানিয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে আবার নেতা হওয়ার ইচ্ছা তার আছে এবং বিদেশি শক্তির সহায়তায় সেই লক্ষ্য অর্জনের বিষয়েও তিনি ভাবছিলেন।
তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর তার মধ্যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বর্তমান কাঠামো নিয়ে হতাশা তৈরি হয় বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি মনে করতে শুরু করেন, এই ব্যবস্থা বহাল থাকলে তার পক্ষে আর ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব নয়।
এখানেই তার রাজনৈতিক হিসাব বদলে যেতে পারে। কেউ যখন নিজ দেশের ক্ষমতা কাঠামোর ভেতর থেকে ফিরে আসার পথ বন্ধ দেখে, তখন সে বাইরের শক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকিও নিতে পারে। তবে এটি এখনো দাবি মাত্র; আহমাদিনেজাদ নিজে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।
ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার সম্ভাব্য প্রতিশ্রুতি
প্রতিবেদনে আরও একটি বিস্ময়কর দাবি করা হয়েছে। আহমাদিনেজাদ নাকি নিজের ঘনিষ্ঠদের বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে ইরান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে পারে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে হাঁটতে পারে। তিনি এমনকি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হওয়ার কথাও বলেছিলেন বলে দাবি এসেছে।
যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে এটি আহমাদিনেজাদের পুরোনো রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একেবারেই বিপরীত। ইরানের যে নেতা একসময় ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত ছিলেন, তার পক্ষ থেকে এমন সম্ভাব্য অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিত।
কিন্তু এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন। কারণ এটি এসেছে ঘনিষ্ঠ মহলের বেনামি সূত্রের মাধ্যমে। তবে কৌশলগত দৃষ্টিতে বিষয়টি বোঝা যায়। ইসরায়েলের কাছে ইরানের ভেতর এমন একজন পরিচিত মুখ যদি পাওয়া যায়, যিনি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এসে সম্পর্ক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন, তাহলে তাকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বিদেশ সফরের আড়ালে গোপন যোগাযোগ
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ঠিক কখন আহমাদিনেজাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে তার গুয়াতেমালা সফরের সময় অন্তত কিছু যোগাযোগ হয়েছিল বলে ইরানি কর্মকর্তারা মনে করছেন। তিনি সেখানে পরিবেশবিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। গুয়াতেমালার সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় সফরটি ইরানের নিরাপত্তা মহলের নজর কাড়ে।
তেহরানের বিমানবন্দরে তাকে প্রথমে দেশ ছাড়তে বাধা দেওয়া হয়। বোর্ডিং পাস দেওয়া হয়নি। তিনি কয়েক ঘণ্টা বিমানবন্দরে অবস্থান করেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে ছবি তোলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি তুলে ধরেন। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ তাকে যেতে দেয়।
এরপর ২০২৪ সালে তিনি হাঙ্গেরির লুডোভিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে যোগ দেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সেই সফরে তিনি মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার সঙ্গে বুদাপেস্টে বৈঠক করেন। বার্নিয়া তখন ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন।
২০২৫ সালেও আহমাদিনেজাদ আবার বুদাপেস্টে যান। এর কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানে যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। ওই সফরও গোপন বৈঠকের আড়াল ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
তার বিদেশ সফরে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর দেহরক্ষীরা থাকতেন। কিন্তু ২০২৫ সালের জুনের সফরে অন্তত দুইবার তিনি নিরাপত্তারক্ষীদের চোখ এড়িয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য অদৃশ্য হয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। পরে জানতে চাইলে তিনি নাকি বলেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।
এই ধরনের ঘটনা ইরানের নিরাপত্তা মহলে সন্দেহ আরও বাড়ায়।
ফেব্রুয়ারির ব্যর্থ অভিযান
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ঘটনাপ্রবাহ আরও নাটকীয় হয়। তখন ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয়েছে। আহমাদিনেজাদ তেহরানে কঠোর নজরদারির মধ্যে ছিলেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার একটি অভিযান চালানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল বর্তমান সরকারকে সরিয়ে তাকে সম্ভাব্য নেতৃত্বে আনার পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের একটি বিমান হামলা আহমাদিনেজাদের কম্পাউন্ডে আঘাত করে। হামলার লক্ষ্য ছিল তার দেহরক্ষীদের ভবন ও সাঁজোয়া যান। ইরানের চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দাবি, হামলার পরপরই একটি কালো পিউজো গাড়ি সেখানে আসে এবং আহমাদিনেজাদকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়।
অভিযান সম্পর্কে অবগত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন মোসাদের কর্মকর্তারা। তারা তাকে ইরানের ভেতর একটি গোপন নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।
তবে এখানেই পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে বলে মনে হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তড়িঘড়ি উদ্ধার অভিযানে আহমাদিনেজাদ সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাকে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা নিয়েও তিনি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে চলে যান। কীভাবে বা কোন পরিস্থিতিতে তিনি চলে যান, তা স্পষ্ট নয়।
এরপর দীর্ঘদিন তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। পরে তিনি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও শোকযাত্রায় অল্প সময়ের জন্য উপস্থিত হন। সেখানে তাকে নীরব, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার চারপাশে নিরাপত্তারক্ষী ছিল।
এখন তিনি কোথায়
আহমাদিনেজাদের বর্তমান অবস্থান নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। প্রতিবেদনে ইরানের চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, যাদের দাবি অনুযায়ী তিনি এখন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের গোয়েন্দা শাখার হেফাজতে আছেন। ইসরায়েলের সঙ্গে তার যোগাযোগের নানা সূত্র পাওয়ার পর তাকে গৃহবন্দী রাখা হয়েছে বলে তাদের দাবি।
তবে এ বিষয়েও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ নেই। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। মোসাদের পক্ষ থেকেও কোনো মন্তব্য আসেনি। আহমাদিনেজাদের মুখপাত্র আলী আকবর জাভানফেকর মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এই নীরবতা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে। কারণ এত বড় অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা কৌশলের ইতিহাসে বড় ঘটনা। আর যদি পুরো পরিকল্পনা আংশিক সত্য বা ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলেও এটি প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যের তথ্যযুদ্ধ কতটা জটিল হয়ে উঠেছে।
ইরান বদলের বৃহত্তর ছক
আহমাদিনেজাদকে ঘিরে পরিকল্পনাটি নাকি একা ছিল না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সরকার পরিবর্তনের একটি বড় ছকের অংশ হিসেবে উত্তর ইরাকভিত্তিক ইরানি কুর্দি বিরোধী শক্তিকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, তারা পশ্চিম ইরানে ঢুকে কিছু এলাকা দখল করবে এবং পরে তেহরানের দিকে অগ্রসর হবে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান তামির হেইম্যানও এক আলোচনায় ইরানের সরকার পরিবর্তন পরিকল্পনায় ব্যতিক্রমী বিশেষ অভিযানের কথা বলেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আহমাদিনেজাদ সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি অংশ ছিলেন।
এখানে বোঝা যায়, ইরানের বিরুদ্ধে কৌশল শুধু সামরিক হামলা বা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং ভেতর থেকে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানো, অসন্তুষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করা এবং সশস্ত্র বিরোধী শক্তিকে কাজে লাগানোর মতো বহুস্তরীয় চিন্তা ছিল।
এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য
আহমাদিনেজাদকে ঘিরে এই রহস্যের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রুতা অনেক সময় কৌশলগত হিসাবের সামনে বদলে যেতে পারে। যে ব্যক্তি একসময় ইসরায়েলের কঠোর বিরোধিতার মুখ ছিলেন, তাকেই ইসরায়েল সম্ভাব্য রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ভাবতে পারে—এটাই বাস্তব রাজনীতির নির্মমতা।
দ্বিতীয়ত, ইরানের ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বাইরের শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করে। যখন কোনো সাবেক প্রেসিডেন্ট নিজ দেশের ক্ষমতাকাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তখন তাকে ঘিরে নানা পক্ষ আগ্রহী হতে পারে। আহমাদিনেজাদের ক্ষেত্রে তার জনপ্রিয়তার অবশিষ্ট অংশ, শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে দূরত্ব এবং ক্ষমতায় ফেরার আকাঙ্ক্ষা তাকে একটি সম্ভাব্য চরিত্রে পরিণত করেছিল।
তৃতীয়ত, বিদেশি শক্তির সহায়তায় নেতৃত্ব বদলের পরিকল্পনা প্রায় সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো দেশের ভেতরের বাস্তবতা না বুঝে বাইরে থেকে নেতা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। আহমাদিনেজাদ নিজেও নাকি আশঙ্কা করেছিলেন, বিদেশে থাকা কোনো বিরোধী নেতাকে ইরানের ওপর বসানো হলে দেশটি অরাজকতায় পড়তে পারে। সেই তুলনায় তিনি নিজেকে ইরানকে চেনা একজন অভ্যন্তরীণ বিকল্প নেতা হিসেবে ভাবতেন।
চতুর্থত, এই ঘটনা ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরের উদ্বেগও দেখায়। আহমাদিনেজাদ আগেই নজরদারিতে ছিলেন। তার বিদেশ সফর, বিদেশি নেতাদের উদ্দেশে চিঠি, নিরাপত্তারক্ষীদের এড়িয়ে অদৃশ্য হওয়া—সবকিছু ধীরে ধীরে সন্দেহের কারণ হয়ে ওঠে। ইসরায়েলি হামলার পর সেই সন্দেহ আরও দৃঢ় হয়।
রহস্য এখনো শেষ হয়নি
আহমাদিনেজাদ এখনো ইরানের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত চরিত্র। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট, আবার ক্ষমতার মূল বলয় থেকে দূরে। তিনি একসময় কট্টরপন্থী ছিলেন, পরে নিজেকে বদলে উপস্থাপন করেছেন। তিনি ইসরায়েলবিরোধী রাজনীতির মুখ ছিলেন, আবার এখন তার সঙ্গে ইসরায়েলি যোগাযোগের অভিযোগ উঠেছে। তিনি জনসমক্ষে কম দেখা যাচ্ছেন, কিন্তু তাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কৌতূহল বাড়ছে।
এই পুরো ঘটনা প্রমাণ করে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি শুধু দৃশ্যমান যুদ্ধ, বক্তব্য ও কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভেতরে আছে গোপন যোগাযোগ, মনস্তাত্ত্বিক খেলা, ভাঙন ধরানোর কৌশল, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টা এবং ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা।
তবে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ এই ধরনের প্রতিবেদনে অনেক তথ্যই আসে বেনামি কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সূত্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবির মাধ্যমে। তাই এগুলো বিশ্লেষণের উপাদান, কিন্তু সরাসরি আদালতসম প্রমাণ নয়। ইসরায়েল, ইরান ও আহমাদিনেজাদ—তিন পক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থান না জানা পর্যন্ত পুরো সত্য অন্ধকারেই থাকবে।
শেষ কথা
আহমাদিনেজাদকে ঘিরে যে গল্প সামনে এসেছে, তা শুধু একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের গল্প নয়। এটি ইরানের ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ইসরায়েলের আঞ্চলিক কৌশল, বিদেশি হস্তক্ষেপের ঝুঁকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বদলে যাওয়া রাজনীতির গল্প।
একসময় যিনি ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্যের প্রতীক ছিলেন, তাকেই যদি ইসরায়েল সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে বিবেচনা করে থাকে, তবে সেটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গভীর বাস্তবতা তুলে ধরে: ক্ষমতার খেলায় অবস্থান বদলায়, শত্রুও কখনো কখনো সম্ভাব্য হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়—আহমাদিনেজাদ কি সত্যিই নিজের ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্নে বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, নাকি তিনি বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাবের একটি ব্যবহৃত চরিত্র হয়ে পড়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে লড়াই শুধু তেহরানের রাস্তায় বা যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনকক্ষ, গোপন বৈঠক, গোয়েন্দা নথি এবং অদৃশ্য রাজনৈতিক আলোচনার ভেতরেও চলছে।

