যুক্তরাষ্ট্রের ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক যেন শেষই হচ্ছে না। নির্বাচনের প্রায় ছয় বছর পর আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, চীন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুলসংখ্যক ভোটারের তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে সেই তথ্য ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে।
১৬ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে ট্রাম্প বলেন, সদ্য প্রকাশ করা গোপনীয় গোয়েন্দা নথিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁর বক্তব্যে চীনকে এমন একটি শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়, যারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেনি, বরং ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পরিকল্পনা করেছিল।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আগের মূল্যায়নের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি তথ্য থেকে চীন ২০২০ সালের কোনো ভোট পরিবর্তন করেছে, ভোটযন্ত্রে প্রবেশ করেছে কিংবা নির্বাচনের ফল বদলে দিয়েছে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তাই মূল প্রশ্নটি হলো, চীন কি সত্যিই নির্বাচনী তথ্য চুরি করে ভোটের ফল পাল্টেছিল, নাকি ভোটার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল? এই দুটি বিষয় দেখতে কাছাকাছি মনে হলেও বাস্তবে এক নয়।
ট্রাম্প ঠিক কী অভিযোগ করেছেন?
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, চীন কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের প্রায় ২২০ মিলিয়ন নথি অবৈধভাবে সংগ্রহ করেছে। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্বাচনী তথ্য ফাঁস বা দখলের ঘটনা।
এসব নথিতে ভোটারদের নাম, ঠিকানা এবং নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য ছিল বলে তিনি দাবি করেন। ট্রাম্প আরও বলেন, চীন ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দলের প্রার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিল। এর মাধ্যমে ২০২০ সালে তাঁর পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনাও দুর্বল করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
ভাষণে তিনি দাবি করেন, বিদেশি শক্তিগুলো এমন প্রচার চালাতে চেয়েছিল, যাতে ভোটারদের মনে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। ট্রাম্পের মতে, তাঁর প্রশাসনের সাফল্য আড়াল করে তাঁকে অযোগ্য বা অজনপ্রিয় হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
একই দিনে ট্রাম্প প্রশাসন শত শত আগে-গোপনীয় নথি প্রকাশ করে। এসব নথিকে প্রেসিডেন্টের দাবির সমর্থনকারী প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু নথিগুলোর বক্তব্য গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে চীনের তথ্য সংগ্রহ, রাজনৈতিক বার্তা প্রচার এবং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সম্ভাবনার কথা আছে; সরাসরি ভোটের ফল পরিবর্তনের নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
তথ্য সংগ্রহ আর ভোট পরিবর্তন এক নয়
এই বিতর্ক বুঝতে সবচেয়ে জরুরি হলো ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ এবং ভোটে কারচুপির মধ্যে পার্থক্য করা।
ভোটার নিবন্ধনের অনেক তথ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্যভাবেই পাওয়া যায়। কোনো ব্যক্তির নাম, নিবন্ধিত এলাকা, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক বা পূর্ববর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইতিহাস বিভিন্ন রাজ্যে আইনগতভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব।
বিদেশি সরকার, রাজনৈতিক পরামর্শক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রচার সংস্থা এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। এর মাধ্যমে তারা কোনো এলাকার রাজনৈতিক প্রবণতা, সম্ভাব্য ভোটের ফল এবং ভোটারদের আচরণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করে।
কিন্তু এই তথ্য হাতে থাকার অর্থ এই নয় যে তারা ভোটের সংখ্যা বদলে দিতে পারে। ভোট পরিবর্তনের জন্য ভোটযন্ত্র, গণনা ব্যবস্থা, ব্যালট বা নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় প্রবেশ করতে হবে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অভিযোগে এমন কোনো প্রমাণ স্পষ্টভাবে দেখানো হয়নি।
অর্থাৎ ২২০ মিলিয়ন ভোটারের তথ্য সংগ্রহের দাবি সত্য হলেও, তা থেকেই ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল চীন বদলে দিয়েছিল—এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
২০২১ সালের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছিল?
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি বিস্তৃত মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, চীন ২০২০ সালের নির্বাচনকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত দেশটি নির্বাচনী ফল বদলানোর লক্ষ্যে কোনো বড় প্রভাব বিস্তারকারী অভিযান পরিচালনা করেনি।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মূল্যায়ন তৈরি হয়েছিল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক জন র্যাটক্লিফের অধীনে। র্যাটক্লিফ বর্তমানে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন অন্তত ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটার, রাজনৈতিক দল এবং জনমত সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছে। কিন্তু এ ধরনের তথ্য সাধারণত নির্বাচনী পূর্বাভাস, রাজনৈতিক অবস্থান বোঝা এবং কূটনৈতিক পরিকল্পনার জন্য ব্যবহার করা যায়। সরাসরি ভোট বদলানোর ক্ষেত্রে এগুলো কার্যকর নয়।
তবে তখন গোয়েন্দা মহলের দুই কর্মকর্তা ভিন্ন একটি মত দিয়েছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতির কারণে চীনের অর্ধপরিবাহী শিল্প ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এ আশঙ্কায় বেইজিং তাঁর নির্বাচনী সম্ভাবনা দুর্বল করার চেষ্টা করে থাকতে পারে।
১৬ জুলাই প্রকাশিত আংশিক গোপনীয়তা-মুক্ত নথিতে দেখা যায়, ওই দুই কর্মকর্তা মনে করেছিলেন চীন প্রকাশ্য রাজনৈতিক বার্তা, প্রাথমিক পর্যায়ের গোপন অনলাইন প্রভাব, কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক চাপ ব্যবহার করে থাকতে পারে।
তবে তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করেছিলেন, এগুলো চীনের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ ছিল না। নিজেদের এই মূল্যায়ন নিয়েও তাঁদের আস্থা ছিল নিম্ন থেকে মাঝারি মাত্রার।
ফলে সংখ্যালঘু মত হিসেবে কিছু সন্দেহ থাকলেও, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধান মূল্যায়ন ছিল—চীন ২০২০ সালের নির্বাচনে কোনো ভোট পরিবর্তন করেনি এবং ফল পাল্টানোর মতো সরাসরি অভিযান চালায়নি।
কেন এখন আবার ২০২০ সালের নির্বাচন সামনে আনলেন ট্রাম্প?
ট্রাম্পের নতুন অভিযোগ এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। তাঁর প্রশাসন নির্বাচনী আইন আরও কঠোর করার চেষ্টা করছে এবং ভোটারদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করতে চাইছে।
ট্রাম্পের সমর্থকেরা যে আইনকে ‘আমেরিকা রক্ষা আইন’ নামে প্রচার করছেন, সেটি ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর পরিচয়পত্রের নিয়ম চালু করবে। একই সঙ্গে অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচনী ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগও বাড়াবে।
প্রস্তাবটি প্রতিনিধি পরিষদে পাস হয়েছে। কিন্তু উচ্চকক্ষে বিরোধী দলের আপত্তির কারণে এর অগ্রগতি থেমে আছে।
এ অবস্থায় বিদেশি হস্তক্ষেপ, অবৈধ ভোটার এবং ডাকযোগে ভোটের অনিয়ম নিয়ে ট্রাম্পের ধারাবাহিক বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অভিযোগগুলো নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ বাড়াতে পারে এবং কঠোর পরিচয়পত্র আইন পাসের পক্ষে জনমত তৈরি করতে পারে।
সমালোচকেরা মনে করছেন, ২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে পুরোনো সন্দেহ নতুন করে তুলে ধরে ট্রাম্প আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পরিবেশকে নিজের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের পুরোনো অবস্থান
২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে পরাজয়ের পর ট্রাম্প ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে তাঁর বিজয় কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
তাঁর প্রচারশিবির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মামলা করলেও আদালতে এমন কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি, যা নির্বাচনের ফল পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট ছিল। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের পরিচালিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে ভোট পুনর্গণনা এবং নিরীক্ষা করেও বাইডেনের বিজয় বহাল থাকে।
তবু নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ৬ জানুয়ারি ২০২১ ট্রাম্পের সমর্থকেরা কংগ্রেস ভবনে হামলা চালায়। সে সময় আইনপ্রণেতারা নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় ছিলেন।
এই সহিংসতা যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তাই ২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বক্তব্যকে শুধু অতীতের বিতর্ক হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
চীন কী বলেছে?
ট্রাম্পের ভাষণের আগে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ চ্যাং অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি বলেন, চীন সব সময় অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন দেশটির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এর ফল সে দেশের জনগণের ভোটেই নির্ধারিত হয়।
চীনা মুখপাত্র আরও দাবি করেন, বেইজিং কখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।
অবশ্য কোনো দেশের আনুষ্ঠানিক অস্বীকারই তার নির্দোষতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায় সব দেশই গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অস্বীকার করে থাকে। তাই চীনের বক্তব্যের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়ন, প্রযুক্তিগত প্রমাণ এবং স্বাধীন তদন্তের ফলও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এখন পর্যন্ত এসব উৎস চীনের তথ্য সংগ্রহের আগ্রহের কথা বললেও, ভোটের ফল পরিবর্তনের প্রমাণ দেয়নি।
ডেমোক্র্যাটদের প্রতিক্রিয়া
ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার ট্রাম্পের অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলে আখ্যা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক বার্তায় তিনি দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট আসন্ন নভেম্বরের নির্বাচনের পরিবেশ প্রভাবিত করার জন্য চীনকে নিয়ে অতিরঞ্জিত তথ্য দিচ্ছেন।
ওয়ার্নারের বক্তব্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একমত হয়েছিল যে চীন ২০২০ সালের নির্বাচনে একটি ভোটও পরিবর্তন করার চেষ্টা করেনি।
তিনি স্বীকার করেন, একটি পৃথক মূল্যায়নে চীন ভোটারদের মতামত প্রভাবিত করার চেষ্টা করে থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে এই বিষয়টি ২০২১ সাল থেকেই জনসমক্ষে রয়েছে। ফলে নতুন নথিকে সম্পূর্ণ নতুন বা বিস্ফোরক আবিষ্কার হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।
রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে উভয় পক্ষই বিষয়টিকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করছে। ট্রাম্পপন্থীরা নথিগুলোকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। বিরোধীরা বলছেন, তথ্যগুলোকে প্রসঙ্গের বাইরে এনে ২০২০ সালের ফল নিয়ে আবার সন্দেহ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
ডাকযোগে ভোট নিয়ে ট্রাম্পের দাবি কতটা শক্তিশালী?
ভাষণে ট্রাম্প ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাকে স্বভাবগতভাবে দুর্নীতিপ্রবণ বলে দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটার সরাসরি কেন্দ্রে উপস্থিত না হলে জালিয়াতির ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা তাঁর দাবির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রক্ষণশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের তথ্য বিশ্লেষণে ১৯৮২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ডাকযোগে ভুয়া ভোট দেওয়ার মাত্র ৩০০টি ঘটনা পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের হিসাব অনুযায়ী, ডাকযোগে দেওয়া প্রতি ১০ মিলিয়ন ভোটের মধ্যে প্রতারণার ঘটনা প্রায় ৪টি।
কোনো নির্বাচনী ব্যবস্থাই শতভাগ ত্রুটিমুক্ত নয়। ভুল ঠিকানা, মৃত ব্যক্তির নামে নিবন্ধন থেকে যাওয়া, স্বাক্ষরের অমিল বা ফরম পূরণের ভুল ঘটতে পারে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ত্রুটি এবং পরিকল্পিতভাবে লাখ লাখ অবৈধ ভোট দেওয়ার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
এখন পর্যন্ত পাওয়া সংখ্যাগুলো দেশব্যাপী নির্বাচনের ফল বদলে দেওয়ার মতো ব্যাপক ডাকভোট জালিয়াতির প্রমাণ দেয় না।
ভেনেজুয়েলা ও ভোটযন্ত্রের প্রসঙ্গ
ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে ভেনেজুয়েলা সম্পর্কিত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি নথির কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ওই নথি প্রমাণ করে যে বৈদ্যুতিক ভোটব্যবস্থা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তন করা সম্ভব।
গত মাসে প্রকাশিত নথিটিতে ২০০৪ থেকে ২০২০ সালের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, ভেনেজুয়েলার সরকার নিজ দেশের বৈদ্যুতিক ভোটব্যবস্থা প্রযুক্তিগতভাবে পরিবর্তন করার সক্ষমতা রাখত।
কিন্তু নথিটি যুক্তরাষ্ট্রের ভোটব্যবস্থা নিয়ে ছিল না। এতে ভেনেজুয়েলার সরকার ২০২০ সালের যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রবেশ করেছিল—এমন কোনো প্রমাণও দেওয়া হয়নি।
ট্রাম্পের কিছু সমর্থক দীর্ঘদিন ধরে দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ভোটযন্ত্রে হস্তক্ষেপ করেছিল। কিন্তু এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তিগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
একটি দেশে কোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা থাকার অর্থ এই নয় যে সেই দেশ অন্য দেশের নির্বাচনে একই কাজ করেছে। সক্ষমতা এবং বাস্তব অপরাধের মধ্যে প্রমাণের একটি দীর্ঘ ব্যবধান রয়েছে।
২৭৮,০০০ অবৈধ ভোটার নিবন্ধনের দাবি
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, প্রায় ২৭৮,০০০ অ-নাগরিক বেআইনিভাবে কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। তিনি স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের একটি পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করেন।
এই অভিযোগ এমন সময়ে এসেছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের কাছ থেকে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য চেয়ে চাপ দিচ্ছে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন অঙ্গরাজ্যগুলো এই উদ্যোগ নিয়ে গোপনীয়তা এবং কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
দ্বিদলীয় নীতি কেন্দ্রের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ববর্তী পর্যালোচনায় মোট ভোটারের প্রায় ০.০৪ শতাংশকে অ-নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল।
এই সংখ্যাও সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। অ-নাগরিক হিসেবে তালিকাভুক্ত কেউ নিবন্ধিত থাকলেই তিনি ভোট দিয়েছেন—এমন নয়। আবার নাগরিকত্বের তথ্য হালনাগাদ না থাকায় বৈধ নাগরিকও ভুলভাবে সন্দেহভাজন তালিকায় পড়ে যেতে পারেন।
তাই নিবন্ধন তালিকায় সম্ভাব্য অ-নাগরিকের সংখ্যা এবং বাস্তবে অবৈধভাবে দেওয়া ভোটের সংখ্যা একই হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
মিশিগানের পুরোনো মামলা আবার খোলার ঘোষণা
ট্রাম্প বলেন, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা মিশিগানের ২০২০ সালের একটি নির্বাচনী জালিয়াতির মামলা পুনরায় তদন্ত করবে। মিশিগান ডেমোক্র্যাটদের গুরুত্বপূর্ণ শক্তঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
ওই ঘটনায় ভোটার নিবন্ধনের কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠান কিছু ভুয়া বা ভুল তথ্যে পূর্ণ আবেদন সংগ্রহ করেছিল। তবে নির্বাচনের আগেই সেগুলো শনাক্ত করা হয় এবং বাতিল করে দেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষ সে সময় বলেছিল, ভুল আবেদনগুলো ব্যবহার করে কেউ ভোট দিতে পারেনি। ফলে ঘটনাটি নির্বাচনী নজরদারির ব্যর্থতার চেয়ে বরং যাচাইব্যবস্থা কার্যকর থাকার একটি উদাহরণ হিসেবেও দেখা যায়।
তারপরও মামলা পুনরায় খোলা হলে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কোন দেশগুলো ২০২০ সালের নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল?
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্তে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে রাশিয়ার নাম উঠে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কয়েকটি সরকারি সংস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ঘিরে প্রভাব বিস্তারের অভিযান চালানোর অনুমোদন দিয়েছিলেন।
রুশ কার্যক্রমের লক্ষ্য ছিল জো বাইডেনের প্রচারকে দুর্বল করা, ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন বাড়ানো, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের বিশ্বাস কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করা।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরান গোপনে ট্রাম্পের নির্বাচনী সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিল।
কিউবা, ভেনেজুয়েলা এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ তুলনামূলক ছোট পরিসরে নির্বাচনী মতামত প্রভাবিত করার কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
তবে বিদেশি প্রচার বা জনমত প্রভাবিত করার অভিযান এবং ভোটের ফল সরাসরি পরিবর্তন করা এক বিষয় নয়। রাশিয়া বা ইরানের অনলাইন প্রচার মানুষের রাজনৈতিক মতামত প্রভাবিত করে থাকতে পারে। কিন্তু তারা ভোটগণনা বদলে দিয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
ব্রাজিলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়েছিল ষড়যন্ত্রতত্ত্ব
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ব্রাজিলকে সরাসরি হস্তক্ষেপকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিক সংগঠন এজেন্সিয়া পাবলিকার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালের নির্বাচন ঘিরে ব্রাজিল থেকে হাজার হাজার বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল।
এসব বার্তার অনেকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী জালিয়াতি নিয়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করা হয় এবং ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের পক্ষে স্লোগান ছড়ানো হয়।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্বয়ংক্রিয় ভুয়া হিসাব এবং ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর সমর্থকেরা এই প্রচারে বড় ভূমিকা রাখেন। বলসোনারো ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
এ ঘটনা দেখায়, নির্বাচনী প্রভাব সব সময় কোনো সরকারের আনুষ্ঠানিক নির্দেশে পরিচালিত হয় না। রাজনৈতিক কর্মী, মতাদর্শিক গোষ্ঠী, স্বয়ংক্রিয় হিসাব এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি সীমান্তের বাইরে থেকেও তথ্যের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারেন।
ট্রাম্পের দাবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়?
ট্রাম্পের বক্তব্যে কয়েকটি ভিন্ন বিষয়কে প্রায় একই প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রথমত, বিদেশি শক্তির ভোটারদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।
দ্বিতীয়ত, অনলাইনে রাজনৈতিক মতামত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা।
তৃতীয়ত, ভোটার নিবন্ধনে ভুল বা জাল তথ্য জমা পড়া।
চতুর্থত, ভোটযন্ত্রে প্রযুক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা থাকা।
পঞ্চমত, বাস্তবে ভোটের ফল পরিবর্তন করা।
এই পাঁচটি বিষয় আলাদা। প্রথম চারটির কোনো একটি ঘটেছে বলেই পঞ্চমটি ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
চীন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করে থাকতে পারে। বেইজিং ট্রাম্পের নীতি নিয়ে উদ্বিগ্নও থাকতে পারে। চীনা কর্মকর্তা বা সমর্থক গোষ্ঠী অনলাইনে রাজনৈতিক বার্তা ছড়ানোর চেষ্টা করে থাকতে পারে। কিন্তু এসব থেকে চীন ভোট চুরি করেছে বা ফল পরিবর্তন করেছে—এ দাবি প্রমাণিত হয় না।
এখানেই ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা। তিনি সম্ভাব্য গোয়েন্দা তৎপরতা এবং প্রমাণিত নির্বাচনী কারচুপির মধ্যকার সীমারেখা অস্পষ্ট করে দিয়েছেন।
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আগে অভিযোগের তাৎপর্য
ট্রাম্পের চীনবিরোধী বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন সেপ্টেম্বরে তাঁর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
গত এক বছরে দুই দেশের মধ্যে তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধ চলেছে। শুল্ক, প্রযুক্তি, অর্ধপরিবাহী শিল্প, সরবরাহব্যবস্থা এবং কৌশলগত প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক বড় ধরনের চাপে রয়েছে।
নির্বাচনী হস্তক্ষেপের অভিযোগ আসন্ন বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের দরকষাকষির অবস্থান শক্ত করার কৌশলও হতে পারে। ট্রাম্প প্রায়ই প্রতিপক্ষ দেশের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে চাপ তৈরি করে পরে আলোচনার টেবিলে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে নির্বাচনী নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়কে কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে দেশের ভেতরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে মানুষের সন্দেহ আরও বাড়তে পারে।
নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নির্বাচনে হারলে ফল নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতন্ত্রে অস্বাভাবিক নয়। পুনর্গণনা, আদালতে মামলা এবং স্বাধীন তদন্তের সুযোগও থাকা উচিত।
কিন্তু প্রমাণ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে পুরো নির্বাচনকে চুরি করা হয়েছে বলে দাবি করলে জনগণের একটি অংশ নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাতে পারে।
এই অবিশ্বাস শুধু একটি নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরবর্তী নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থী হেরে গেলেও মানুষ ফল প্রত্যাখ্যান করতে পারে। নির্বাচনী কর্মকর্তা হুমকির মুখে পড়তে পারেন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৬ জানুয়ারি ২০২১-এর ঘটনা দেখিয়েছে, নির্বাচনী কারচুপির অপ্রমাণিত দাবি বাস্তবে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
বিদেশি শক্তিগুলোও এই বিভাজনকে কাজে লাগায়। তাদের সব সময় ভোটযন্ত্রে প্রবেশ করতে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা যদি নিজেরাই নির্বাচনের ফলকে বিশ্বাস না করেন, তাতেই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর রাজনৈতিক লক্ষ্য অনেকটা অর্জিত হয়ে যায়।
তাহলে চীন কি ২০২০ সালের নির্বাচনী তথ্য চুরি করেছিল?
উপলভ্য তথ্যের ভিত্তিতে সরল উত্তর দেওয়া কঠিন।
চীন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটার, রাজনৈতিক দল এবং জনমত সম্পর্কে বিপুল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছে—এমন মূল্যায়ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে রয়েছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই তথ্যের পরিমাণ ছিল ২২০ মিলিয়ন ভোটার নথি।
তবে এসব তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল, এর সবই গোপন বা ব্যক্তিগত ছিল কি না এবং এগুলো নির্বাচনে ঠিক কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল—সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন কোনো ভোট পরিবর্তন করেছে, ভোটযন্ত্রে প্রবেশ করেছে অথবা জো বাইডেনকে বিজয়ী করতে নির্বাচনের ফল বদলে দিয়েছে—এমন প্রমাণ নেই।
২০২১ সালের প্রধান গোয়েন্দা মূল্যায়নও বলেছিল, চীন প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা বিবেচনা করলেও শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের নির্বাচনী প্রভাব অভিযান পরিচালনা করেনি।
তাই চীন তথ্য সংগ্রহ করেছে কি না—এটি তদন্তযোগ্য প্রশ্ন। কিন্তু চীন ২০২০ সালের নির্বাচন চুরি করেছে—এই সিদ্ধান্ত বর্তমানে প্রকাশিত প্রমাণের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও শক্তিশালী দাবি।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ভাষণ ২০২০ সালের নির্বাচনী বিতর্ককে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। চীনের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন প্রভাব এবং রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। বড় শক্তিগুলো নিয়মিতভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের রাজনীতি, জনমত এবং ভোটারদের আচরণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে।
কিন্তু তথ্য সংগ্রহ, মতামত প্রভাবিত করা এবং ভোটের ফল পরিবর্তন—এই তিনটি বিষয়কে এক করে দেখা বিপজ্জনক।
প্রকাশিত নথিতে চীন ভোটের ফল বদলে দিয়েছে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বরং আগের সরকারি মূল্যায়ন বলছে, রাশিয়া সবচেয়ে সংগঠিতভাবে বাইডেনকে দুর্বল এবং ট্রাম্পকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ইরান ট্রাম্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চেয়েছিল। অন্য কয়েকটি দেশ ও গোষ্ঠী ছোট পরিসরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিল।
চীন নিয়ে কিছু গোয়েন্দা সন্দেহ থাকলেও সেগুলোর আস্থার মাত্রা ছিল নিম্ন থেকে মাঝারি। সেগুলোকে ভোট চুরির চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখানো যথার্থ নয়।
নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে অনুসন্ধান অবশ্যই প্রয়োজন। বিদেশি তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন বিভ্রান্তি, ভুয়া প্রচার এবং প্রযুক্তিগত ঝুঁকির বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। তবে সেই ব্যবস্থা প্রমাণ, স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে।
কারণ নির্বাচনের নিরাপত্তা রক্ষা করতে গিয়ে যদি অপ্রমাণিত অভিযোগের মাধ্যমে মানুষের আস্থাই ধ্বংস করা হয়, তাহলে বিদেশি প্রতিপক্ষকে আর ভোট চুরি করতে হবে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষতি দেশের ভেতর থেকেই শুরু হয়ে যাবে।

