খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত এক গ্রাম থেকে উঠে আসা আশুতোষ নাথের জীবনের গল্পটি সংগ্রাম আর অধ্যবসায়ে ভরা। দোকানে কাজ করা থেকে শুরু করে সরকারি চাকরিতে অফিস সহকারী হিসেবে যোগদান—নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি শেষ করে যোগ দিচ্ছেন ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণায়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবা-মায়ের সঙ্গে পিএইচডি ডিগ্রি উদযাপনের একটি ছবি শেয়ার করেছিলেন আশুতোষ। জানা গেছে, চলতি মাসেই তিনি ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের কলেজ অব ফার্মেসিতে পিএইচডি-পরবর্তী গবেষক হিসেবে যোগ দিতে যাচ্ছেন, যেখানে তাঁর মূল গবেষণা ক্ষেত্র হবে ওষুধবিষয়ক রসায়ন ও নতুন ওষুধ উদ্ভাবন।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেওয়া আশুতোষের পরিবার জীবিকার তাগিদে পরে পাড়ি জমায় খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে। সেখানেও জীবনযুদ্ধ সহজ ছিল না—ধান ভাঙার মেশিন নিয়ে ঘুরে ঘুরে যা আয় হতো, তা দিয়েই সংসার চালাতেন তাঁর মা। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট আশুতোষ, আর ভাইবোনদের কেউই উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি।
তবে বড় ভাইয়ের বিশেষ স্নেহ ও ত্যাগ আশুতোষের এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। পোশাক সেলাইয়ের কাজ করা এই ভাই নিজের আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করতেন ছোট ভাইয়ের পড়াশোনায়। এই আত্মত্যাগই আশুতোষকে সবসময় সেরাটা দেওয়ার তাগিদ দিত।
নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফলাফল করেন আশুতোষ। এরপর চট্টগ্রামের একটি সরকারি কলেজে রসায়ন বিভাগে স্নাতকে ভর্তি হন। তখন বইয়ের খরচ জোগাড় করাও কঠিন ছিল তাঁর জন্য, তাই একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ নেন—সেই আয় দিয়েই নিজের খরচ চালাতেন এবং বাড়িতেও কিছু পাঠাতেন।
২০১৬ সালে ঢাকায় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি পেয়ে রাজধানীতে চলে আসেন তিনি। তবে বেতনে সংসার না চলায় রাতে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন, যা থেকে একসময় উল্লেখযোগ্য আয়ও করতেন।
স্নাতক শেষে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) রসায়নে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন আশুতোষ। এখানেই মূলত গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশ পেতে শুরু করে। এরপরই বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। ২০২১ সালের মার্চে ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টন তাঁর পিএইচডির আবেদন গ্রহণ করে এবং সেই বছরের আগস্টে শতভাগ শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি।
পিএইচডি চলাকালে জটিল রাসায়নিক অণু তৈরির কার্যকর পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেন আশুতোষ, যেখানে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে অর্গানিক সিনথেসিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নত বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে। এই সময় হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও বোস্টন চিলড্রেন’স হসপিটালের গবেষকদের সঙ্গেও যৌথ গবেষণায় অংশ নেন তিনি, যার ফলাফল হিসেবে প্রকাশিত হয় একাধিক আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণাপত্র।
আশুতোষের ভাষায়, গবেষণাগারের প্রতিটি দিন সাফল্যের ছিল না—বারবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েও আবার নতুন করে শুরু করার এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে ধৈর্য ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে।
এবার আশুতোষের গবেষণার পরিধি বদলাচ্ছে। এতদিন মূলত মৌলিক রসায়ন নিয়ে কাজ করলেও এখন তিনি সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবেন সরাসরি ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণায়—নতুন ও কার্যকর ওষুধ তৈরির লক্ষ্যে জৈবিকভাবে সক্রিয় অণুর নকশা ও বিশ্লেষণে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটেশনাল মডেলিংকেও নিজের গবেষণায় যুক্ত করে মানুষের চিকিৎসাসেবায় বড় অবদান রাখতে চান তিনি।

