মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর আনুগত্য যাচাই করছে। ফাঁস হওয়া একটি প্রশ্নপত্র থেকে এমন তথ্য সামনে এসেছে। নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, মিত্রদেশগুলোর সামরিক সহায়তা ও নিরাপত্তা সুরক্ষা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ট্রাম্পের প্রতি তাদের আনুগত্যের মাত্রা যাচাই করা হচ্ছে। সূত্র: ব্লুমবার্গ
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গ নিউজের পর্যালোচনা করা ওই নথিতে প্রতিটি ন্যাটো সদস্যদেশের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে কি না। এর মধ্যে ন্যাটোর সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত সামরিক হামলার বিষয়ও রাখা হয়েছে।
মিত্রদেশগুলো তাদের ভূখণ্ডে থাকা ঘাঁটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনীর ওপর কী ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এসব নিষেধাজ্ঞা কমানো বা পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে তারা রাজি কি না, সেই প্রশ্নও রাখা হয়েছে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ন্যাটোর মিত্রদেশগুলো এই উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের ধারণা, মার্কিন নিরাপত্তা সুরক্ষার বিনিময়ে মিত্রদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রশ্নপত্রের একটি প্রশ্নে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি মিত্রদের মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শক্ত অবস্থান নেওয়া, নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা এবং নীরব থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ন্যাটোর অনুমোদন ছাড়াই ইরানে হামলা চালানোর পর কয়েকটি দেশ ওয়াশিংটনকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এসব দেশের মধ্যে স্পেনও ছিল। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে এখন সরাসরি এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছে।
একইভাবে জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযান চালিয়েছিল, সেটিও পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন উদ্যোগের প্রতি মিত্রদের সমর্থন নিয়ে করা প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউরোপে ওই অভিযানকে ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়েছিল।
প্রশ্নপত্রে প্রতিরক্ষা খাতে মিত্রদেশগুলো মার্কিন কোম্পানিগুলোকে চুক্তি দেওয়ার দিকে এগোচ্ছে কি না, ইউরোপে তৈরি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার নীতির প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছে কি না, সেসবও জানতে চাওয়া হয়েছে। কোনো দেশ এ ধরনের বিরোধিতা না করে থাকলে ভবিষ্যতে তারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে রাজি কি না, সেটিও প্রশ্নের মধ্যে রাখা হয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়ায় এসব প্রশ্ন ন্যাটোর মিত্রদেশগুলোর মধ্যে বিশেষ বিতর্ক তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে পেন্টাগনের ছয় মাসব্যাপী পর্যালোচনা চলার মধ্যেই প্রশ্নপত্রটি ফাঁস হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ওই পর্যালোচনা শেষ হওয়ার কথা। এরই মধ্যে ন্যাটোর মিত্রদেশগুলো ইউরোপে মার্কিন সেনা কমিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, জার্মানি থেকে ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহার করা হবে। একই সময়ে পোল্যান্ডে আরও ৫ হাজার মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ওয়াশিংটন। দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জাতীয়তাবাদী মিত্র জয়ী হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে অবশ্য ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি পর্যালোচনার বিষয়টিকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন। ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে উল্লেখ করে তিনি এ ধরনের পর্যালোচনাকে যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, এই প্রক্রিয়া ন্যাটোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠতা তৈরি করছে।
তবে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে সামরিক সুরক্ষার সঙ্গে রাজনৈতিক আনুগত্যকে সরাসরি যুক্ত করার যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন নীতির সঙ্গে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা এই জোটের অন্যতম ভিত্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। সদস্যদেশগুলোর পৃথক নীতিগত মতপার্থক্য থাকলেও সেই নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বহাল থাকার কথা।
চলতি মাসের শেষ দিকে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিতব্য এক বৈঠকে ন্যাটোর মিত্রদেশগুলোর প্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে চলমান পর্যালোচনার বিষয়টি আরও আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে।

