বিশ্ব অর্থনীতির দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি চীন ও ইউরোপের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা, নির্ভরতা এবং প্রতিযোগিতার এক জটিল সমীকরণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ইউরোপের বিশাল ভোক্তাবাজার চীনের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ইউরোপের বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, উৎপাদনব্যবস্থা এবং চীনা বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
কিন্তু এই পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক এখন দ্রুত সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, চীনের শিল্পনীতি, সরকারি ভর্তুকি, কম দামে বিপুল পণ্য রপ্তানি এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ইউরোপের শিল্পভিত্তিকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ফলে কয়েক বছর আগেও যেসব বাণিজ্যিক পদক্ষেপকে রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব মনে করা হতো, এখন সেগুলোই ইউরোপের আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। শুল্ক বৃদ্ধি, সরকারি ক্রয়ে বিধিনিষেধ, ভর্তুকি তদন্ত, পণ্যের নিরাপত্তা যাচাই এবং চীনের সম্ভাব্য প্রতিশোধ মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রস্তুতির মতো বিষয় সামনে আসছে।
বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চীন ও ইউরোপের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য সংঘাত এড়ানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বন্ধুত্বের আহ্বান, কিন্তু উদ্বেগের সমাধান নেই
২০২৫ সালে চীনের নেতা সি চিন পিং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে চীনকে একটি দায়িত্বশীল বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে তিনি বহুপক্ষীয়তা, ন্যায়বিচার এবং একতরফা চাপের বিরোধিতায় একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
তবে ইউরোপের দৃষ্টিতে এসব রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে বাস্তব বাণিজ্যিক পরিবর্তনের মিল ছিল না। ইউরোপীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ—চীন তার দেশীয় কোম্পানিগুলোকে বিপুল সরকারি সহায়তা দিচ্ছে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাজারে সমান সুযোগ নিশ্চিত করছে না এবং উৎপাদনক্ষমতার অতিরিক্ত অংশ কম দামে বিদেশে পাঠাচ্ছে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ইউরোপীয়দের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে নতুন সুযোগের দিকে নজর দিতে বলেন। কিন্তু ইউরোপের অনেক নেতা এখন আর চীনের বাজারকে শুধু সুযোগ হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের আশঙ্কা, চীনের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে ইউরোপের গাড়ি, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, ওষুধ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানিসংশ্লিষ্ট শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
আগের চীনা অভিঘাতের চেয়ে নতুন সংকট কেন আলাদা
২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের প্রবেশের পর যুক্তরাষ্ট্রের আসবাবপত্র, বস্ত্র ও ধাতুসহ বিভিন্ন শ্রমনির্ভর শিল্পে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। উৎপাদন ধীরে ধীরে কম খরচের দেশগুলোতে চলে যায় এবং বহু শ্রমিক চাকরি হারান। এই ঘটনাকে প্রথম বড় চীনা বাণিজ্য অভিঘাত হিসেবে দেখা হয়।
ইউরোপে যে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে, তার প্রকৃতি ভিন্ন। এবার শুধু তুলনামূলকভাবে কম প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প নয়, বরং উন্নত উৎপাদনব্যবস্থার মূল খাতগুলোও ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
গাড়ি নির্মাণ, শিল্পযন্ত্র, রাসায়নিক পদার্থ, ওষুধ, সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি এবং অন্যান্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে ইউরোপ বহু দশক ধরে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। এসব খাত শুধু রপ্তানি আয়ই তৈরি করে না, বরং গবেষণা, দক্ষতা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং উচ্চ বেতনের বিপুল কর্মসংস্থানের ভিত্তিও গড়ে তোলে।
এই শিল্পগুলো একবার হারিয়ে গেলে শুধু কারখানা বন্ধ হবে না। এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে দক্ষ শ্রমশক্তি, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, গবেষণাগার, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং নতুন উদ্ভাবনের ক্ষমতা। তাই ইউরোপের বর্তমান উদ্বেগ কেবল বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
৩০ শতাংশ সুরক্ষাশুল্কের প্রস্তাব
চীনা পণ্যের চাপ মোকাবিলায় ইউরোপে এখন আগের তুলনায় অনেক কঠোর অবস্থান দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ফ্রান্সের সরকার চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০ শতাংশ সাধারণ শুল্কের সমপরিমাণ সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়।
জার্মানি শুরুতে এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে দ্বিধায় ছিল। কারণ দেশটির গাড়ি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য চীনা বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসও চীনের কথিত অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছেন।
স্পেন ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশের নেতা ইউরোপীয় কমিশনকে সম্ভাব্য পদক্ষেপের পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্ব দিয়েছেন। এটি দেখায়, চীনের প্রশ্নে ইউরোপের রাজনৈতিক অবস্থান দ্রুত বদলাচ্ছে।
তবে ঐকমত্য তৈরি হওয়া আর বাস্তবে একযোগে ব্যবস্থা নেওয়া এক বিষয় নয়। ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতি, রপ্তানি কাঠামো এবং চীনের ওপর নির্ভরতার মাত্রা এক নয়। কোনো দেশের গাড়ি শিল্প চীনা বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল, আবার কোনো দেশ কম দামের চীনা পণ্য থেকে সরাসরি সুবিধা পায়। ফলে কঠোর শুল্ক আরোপের প্রশ্নে মতবিরোধ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
চীনের জন্য ইউরোপ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইউরোপ বর্তমানে উচ্চ ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন বড় বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে চীনা পণ্য তুলনামূলকভাবে সহজে প্রবেশ করতে পারে। চীনের দেশীয় চাহিদা দুর্বল থাকা এবং বহু প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমে যাওয়ার কারণে ইউরোপীয় বাজারের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। অন্যান্য উন্নত দেশও ধীরে ধীরে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপ যদি ব্যাপক শুল্ক বা আমদানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তাহলে চীনের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
সে কারণেই ধারণা করা হচ্ছে, ইউরোপীয় বাজার খোলা রাখতে বেইজিং কূটনৈতিক চাপ, পাল্টা শুল্ক, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কিংবা নির্দিষ্ট ইউরোপীয় দেশের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে পারে।
চীনের কৌশল হতে পারে পুরো ইউরোপের বিরুদ্ধে একযোগে ব্যবস্থা না নিয়ে এমন কিছু দেশ বা শিল্পকে লক্ষ্য করা, যাদের ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে মতবিরোধ তৈরি করা সহজ হতে পারে।
ইউরোপের দীর্ঘদিনের আত্মতুষ্টি
চীনের শিল্পোন্নয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। ২০১৫ সালে বেইজিং ‘চীনে নির্মিত ২০২৫’ কৌশল প্রকাশ করে। এর লক্ষ্য ছিল উচ্চ প্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদনে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমানো।
সে সময় ইউরোপের বহু ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারক মনে করেছিলেন, উন্নত প্রযুক্তি, গুণগত মান এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে না।
কিন্তু চীন দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌরপ্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, ইস্পাত, রাসায়নিক পদার্থ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করেছে। সরকারি সহায়তা, বিশাল দেশীয় বাজার এবং বিপুল উৎপাদনের কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত খরচ কমাতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপ জ্বালানির উচ্চ মূল্য, জটিল নিয়মকানুন, ধীর অনুমোদনপ্রক্রিয়া, বিনিয়োগ ঘাটতি এবং রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারিয়েছে।
অর্থাৎ ইউরোপের বর্তমান সংকটের জন্য শুধু চীনের নীতিকে দায়ী করলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। চীনের শিল্পনীতি যেমন একটি বড় কারণ, তেমনি ইউরোপের নিজস্ব দুর্বলতা, বিলম্বিত সিদ্ধান্ত এবং সংস্কারের অভাবও পরিস্থিতিকে কঠিন করেছে।
বৈদ্যুতিক গাড়িতে প্রথম বড় পদক্ষেপ
চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের দ্রুত উত্থান ইউরোপকে প্রথম বড় প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীন থেকে আমদানি করা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে।
ইউরোপের অভিযোগ ছিল, চীনা নির্মাতারা সরকারি সহায়তার কারণে এমন দামে গাড়ি বিক্রি করতে পারছে, যার সঙ্গে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। চীনের পক্ষ থেকে অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং ইউরোপের পদক্ষেপকে সুরক্ষাবাদ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ইউরোপীয় কমিশন আশা করেছিল, চীনের বাণিজ্যনীতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু ট্রাম্প ইউরোপের বিরুদ্ধেও বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকি দিলে ব্রাসেলসের মনোযোগ অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ সামলানোর দিকে চলে যায়।
উৎপাদনে চীনের উত্থান, ইউরোপের পতন
পরিসংখ্যানগুলো ইউরোপের উদ্বেগের গভীরতা বোঝায়। ২০০০ সালে বৈশ্বিক উৎপাদনে চীনের অংশ ছিল ৬ শতাংশ। বর্তমানে তা প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে।
একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ ৩০ শতাংশ থেকে কমে ১৭ শতাংশে নেমেছে।
২০১৫ সালের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনের রপ্তানির মূল্য ৮৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে দুই পক্ষের বাণিজ্য ঘাটতি চার গুণ হয়েছে। ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত প্রায় ৪১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
২০২৬ সালে শুধু জার্মানির বাণিজ্য ঘাটতিই ১১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের চীনবিষয়ক বাণিজ্য সংগঠনের সভাপতি ইয়েন্স এস্কেলুন্ড পরিস্থিতিকে এমন একটি ৪০০ মিটার দীর্ঘ জাহাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেটি ২৪,০০০ পণ্যবাহী বাক্স নিয়ে ইউরোপে যাচ্ছে, কিন্তু প্রায় খালি অবস্থায় চীনে ফিরে আসছে।
এই তুলনার মূল বক্তব্য হলো, চীন থেকে ইউরোপে পণ্যপ্রবাহ দ্রুত বাড়লেও বিপরীত দিকে একই মাত্রায় ইউরোপীয় পণ্য যাচ্ছে না।
প্রতি মাসে ১০,০০০ চাকরি হারাচ্ছে জার্মান শিল্প
চীনা প্রতিযোগিতার প্রভাব শুধু বাণিজ্য পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নেই। জার্মান শিল্পে প্রতি মাসে প্রায় ১০,০০০ চাকরি হারিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জার্মানির শিল্পখাত দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। গাড়ি, রাসায়নিক দ্রব্য, যন্ত্রপাতি এবং প্রকৌশলপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশটি বিপুল আয় করে। তাই জার্মান শিল্পের দুর্বলতা পুরো ইউরোপের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগে প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো তৃতীয় দেশের বাজারেও ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চীনা কোম্পানির কাছে অংশ হারাচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা শুধু ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বাজারে নয়; বৈশ্বিক বাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ভর্তুকি ও মুদ্রামানের বিতর্ক
চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দেশটির বিশাল দেশীয় বাজার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় পরিসরে উৎপাদনের সুযোগ দেয়। শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং দ্রুত উদ্ভাবনের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে ইউরোপের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি ভর্তুকি। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার একটি প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০০৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ওই সংস্থাভুক্ত দেশের প্রতিষ্ঠানের তুলনায় গড়ে তিন থেকে আট গুণ বেশি সরকারি সহায়তা পেয়েছে।
এ ছাড়া চীনা মুদ্রার মূল্য প্রকৃত অবস্থার তুলনায় ১৬ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম রাখা হয়েছে বলে কিছু বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়েছে। এর ফলে চীনা রপ্তানি তুলনামূলকভাবে সস্তা থাকে এবং বিদেশি পণ্য চীনের বাজারে বেশি ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
তবে মুদ্রার সঠিক মূল্য নির্ধারণ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সরকারি সহায়তার সব ধরনও সরাসরি অবৈধ ভর্তুকি হিসেবে গণ্য করা যায় না। তাই ইউরোপকে অভিযোগের পাশাপাশি স্বচ্ছ তথ্য, নির্দিষ্ট প্রমাণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।
সৌরশিল্পের পতন থেকে সতর্কবার্তা
ইউরোপের সৌরবিদ্যুৎ শিল্পের ইতিহাস বর্তমান উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে বৈশ্বিক সৌরপণ্য উৎপাদনে জার্মানি ও ইউরোপের সম্মিলিত অংশ ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে মাত্র ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
কম দামের চীনা সৌরপণ্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ইউরোপীয় ভোক্তা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা এতে আর্থিকভাবে লাভবানও হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ইউরোপের বহু সৌরপণ্য নির্মাতা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি।
এখানে ইউরোপের সামনে মূল দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট। কম দামের আমদানি স্বল্পমেয়াদে ভোক্তাদের সুবিধা দেয় এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন পুরোপুরি হারিয়ে গেলে সরবরাহ, মূল্য এবং প্রযুক্তির জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়।
গাড়ি, ব্যাটারি, ওষুধ বা শিল্পযন্ত্রের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটলে কয়েক লাখ চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। হারিয়ে যাওয়া এসব উৎপাদনক্ষমতা পরে পুনর্গঠন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হবে।
সস্তা পণ্যের আড়ালে কৌশলগত নির্ভরতা
চীন থেকে কম দামে পণ্য আমদানি ইউরোপের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য তাৎক্ষণিক সুবিধা তৈরি করে। কিন্তু কোনো গুরুত্বপূর্ণ খাতে স্থানীয় প্রতিযোগী পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেলে বাজারের ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কোনো খাতে কার্যত একক সরবরাহকারীতে পরিণত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ বন্ধ কিংবা রাজনৈতিক শর্ত আরোপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ওষুধের উপাদান, ব্যাটারি, বিরল খনিজ, সৌরপণ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পযন্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নির্ভরতা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ইউরোপের পুনরায় সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও শক্তিশালী শিল্পভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। গাড়ি, ধাতু, রাসায়নিক পদার্থ, যন্ত্রপাতি ও উন্নত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা দুর্বল হলে প্রতিরক্ষা খাতের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
শুধু শুল্ক দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না
চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় সমাধান মনে হতে পারে। কিন্তু শুধু সীমান্তে কর বাড়িয়ে ইউরোপের শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক করা যাবে না।
ইউরোপকে একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় কমাতে, জটিল নিয়ম সরল করতে, দ্রুত অনুমোদন দিতে, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের বাধা দূর করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিল্পভিত্তিক ব্যবহার, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং নতুন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ছাড়া ইউরোপ শুধু সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারবে না।
অতএব, বাণিজ্য প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারকে একই নীতির দুই অংশ হিসেবে দেখতে হবে। সুরক্ষাব্যবস্থা ইউরোপীয় শিল্পকে কিছুটা সময় দিতে পারে, কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে উৎপাদনক্ষমতা ও দক্ষতা না বাড়ালে শুল্ক কেবল সমস্যাকে পিছিয়ে দেবে।
সহযোগী দেশগুলোর জোট গঠনের পরিকল্পনা
চীনা পণ্যের চাপ শুধু ইউরোপের সমস্যা নয়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নত শিল্পও একই ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে। ব্রাজিল, মালয়েশিয়া ও তুরস্ক ইতিমধ্যে কিছু চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।
এই দেশগুলোকে নিয়ে সমমনা বাণিজ্যিক জোট গড়ার প্রস্তাব সামনে এসেছে। জোটের সদস্যরা একই ধরনের শুল্ক, ভর্তুকি যাচাই এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মানদণ্ড গ্রহণ করলে চীনের সঙ্গে আলোচনায় তাদের সম্মিলিত শক্তি বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যে সদস্যদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। তবে শর্ত থাকবে, তারা যেন তৃতীয় দেশের মাধ্যমে চীনা পণ্য পুনরায় ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের পথ তৈরি না করে।
এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে পণ্যের উৎপত্তি নির্ধারণ, সরবরাহব্যবস্থা যাচাই এবং শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন হবে।
একক বড় শুল্কের বদলে বহু ছোট ব্যবস্থা
চীনের সব পণ্যের ওপর সমানভাবে বড় শুল্ক আরোপ করা সবচেয়ে সরল পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্যরাষ্ট্রের সম্মতি পাওয়া কঠিন।
এর বিকল্প হিসেবে খাতভিত্তিক একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ বেড়ে যাওয়া আমদানির বিরুদ্ধে অস্থায়ী সুরক্ষা, বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি তদন্ত, সরকারি ক্রয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার, পণ্যের নিরাপত্তা যাচাই এবং কৌশলগত খাতে বিনিয়োগ পরীক্ষা—এসব ব্যবস্থা একযোগে ব্যবহার করা যেতে পারে।
একটি বড় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে চীন সহজে নির্দিষ্ট পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে থাকা বহু নিয়ন্ত্রণের মোকাবিলা তুলনামূলকভাবে কঠিন। একই সঙ্গে এসব ব্যবস্থার প্রতিটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তৈরি করা সম্ভব।
তবে নিয়ন্ত্রণের নামে অপ্রয়োজনীয় বাধা তৈরি হলে ইউরোপীয় ভোক্তাদের খরচ বাড়বে, মূল্যস্ফীতি তৈরি হবে এবং ইউরোপের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পেতে সমস্যায় পড়তে পারে। তাই ব্যবস্থা হতে হবে লক্ষ্যভিত্তিক, সাময়িক এবং নিয়মিত পর্যালোচনাযোগ্য।
চীনের পাল্টা আঘাত কেমন হতে পারে
ইউরোপ কঠোর পদক্ষেপ নিলে চীন নীরব থাকবে—এমন সম্ভাবনা কম। বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, শিল্পযন্ত্রের উপাদান কিংবা প্রযুক্তিপণ্যের রপ্তানি সীমিত করতে পারে।
চীন ইউরোপীয় গাড়ি, কৃষিপণ্য, বিলাসপণ্য বা অন্যান্য নির্দিষ্ট খাতের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারে। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর চীনা বাজারে ব্যবসা পরিচালনাও কঠিন করে তোলা হতে পারে।
এমন পরিস্থিতির জন্য ইউরোপীয় কমিশন ও সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে আগে থেকেই বিভিন্ন সম্ভাব্য সংঘাতের চিত্র তৈরি করে প্রস্তুতি নিতে হবে।
ইউরোপের অর্থনৈতিক জবরদস্তি প্রতিরোধব্যবস্থা দ্রুত সক্রিয় করার পাশাপাশি যেসব দেশ বা শিল্প চীনের পাল্টা ব্যবস্থায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা প্রয়োজন। তা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো সম্মিলিত অবস্থান থেকে সরে যেতে পারে।
ইউরোপও চীনের কিছু নির্ভরতার জায়গাকে চাপ তৈরির উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অর্ধপরিবাহী উৎপাদনের বিশেষ যন্ত্রপাতি, রক্ষণাবেক্ষণসেবা এবং উড়োজাহাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার সুযোগ রয়েছে।
ইউরোপ কি মুক্ত বাণিজ্য ছেড়ে দিচ্ছে?
কঠোর বাণিজ্যনীতির অর্থ এই নয় যে ইউরোপ সব ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে সরে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও মেরকোসুরের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে।
মূল পরিবর্তনটি অন্য জায়গায়। ইউরোপ এখন প্রশ্ন তুলছে—একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি যদি ব্যাপক ভর্তুকি, সুরক্ষিত দেশীয় বাজার এবং কৌশলগত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে, তাহলে শুধু নিজের বাজার খোলা রেখে কি ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব?
মুক্ত বাণিজ্য তখনই স্থায়ী হয়, যখন উভয় পক্ষ তুলনামূলকভাবে সমান নিয়ম মেনে চলে। এক পক্ষের বাজার খোলা কিন্তু অন্য পক্ষের বাজার সীমিত হলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তবে ইউরোপকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ধারণা নির্বিচার সুরক্ষাবাদের অজুহাতে পরিণত না হয়। প্রতিটি বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে স্পষ্ট প্রমাণ, নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং সময়সীমা থাকা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ
চীনের বৈশ্বিক উৎপাদনক্ষমতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্মিলিত বাজার, প্রযুক্তি এবং শিল্পক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ ও বহুমুখী শিল্প উপাদানের মতো কিছু ক্ষেত্রে ইউরোপীয় নির্মাতারা চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বিকল্প। এসব প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হলে শুধু ইউরোপ নয়, যুক্তরাষ্ট্রও চীনা সরবরাহের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের সঙ্গে সমন্বয় করলে চীনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী শিল্পজোট গড়ে উঠতে পারে। এতে যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সুরক্ষা, ভর্তুকির সমন্বয় এবং সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্য বাড়ানো সম্ভব।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি একই সঙ্গে ইউরোপের বিরুদ্ধে শুল্কযুদ্ধ শুরু করে, তাহলে চীনের প্রশ্নে পশ্চিমা ঐক্য দুর্বল হবে। বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার চীনের পরিবর্তে ইউরোপীয় মিত্রদের লক্ষ্য করে নিজের দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের বিরুদ্ধেই কাজ করেছেন।
শেষ পর্যন্ত কে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে
পূর্ণমাত্রার বাণিজ্যযুদ্ধে কোনো পক্ষই সহজে জয়ী হবে না। ইউরোপে চীনা পণ্যের দাম বাড়তে পারে, সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটতে পারে এবং বহু প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ সীমিত হলে চীনের রপ্তানি, কারখানা, কর্মসংস্থান এবং মুনাফায় চাপ বাড়বে। দেশটির দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের আঘাত আরও গভীর হতে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, বিরোধ যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থা আরও বিভক্ত হবে। পণ্যের দাম বাড়বে, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো দুই পক্ষের চাপের মধ্যে পড়বে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও ইউরোপ উভয়ই বাংলাদেশের বাণিজ্য, পোশাকশিল্প, যন্ত্রপাতি আমদানি এবং অবকাঠামো অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দুই পক্ষের সংঘাত বাড়লে পণ্যের চাহিদা, পরিবহন ব্যয়, কাঁচামালের দাম এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগপ্রবাহে পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে সরবরাহব্যবস্থা অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়লে বাংলাদেশ কিছু নতুন শিল্প ও বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগও পেতে পারে। এ জন্য বন্দর, বিদ্যুৎ, দক্ষতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং দ্রুত ব্যবসায়িক সেবার উন্নতি জরুরি হবে।
সংঘাত এখনো ঠেকানো সম্ভব কি?
চীন ও ইউরোপের বাণিজ্যযুদ্ধ নিশ্চিতভাবে ঘটবেই—এ কথা বলা যায় না। আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর সুযোগ এখনো রয়েছে।
চীন দেশীয় ভোগ বাড়াতে, অতিরিক্ত উৎপাদন কমাতে, ভর্তুকির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাজারে আরও সমান সুযোগ দিতে পারে। ইউরোপও অযৌক্তিক বাধা কমিয়ে চীনের সঙ্গে নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক সমঝোতার পথ খুঁজতে পারে।
কিন্তু উভয় পক্ষ যদি মনে করে অন্য পক্ষ শেষ পর্যন্ত চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে, তাহলে সমঝোতার সম্ভাবনা কমে যাবে।
বেইজিংয়ের ধারণা হতে পারে, ইউরোপীয় দেশগুলোর স্বার্থ এতটাই আলাদা যে তারা দীর্ঘদিন ঐক্য ধরে রাখতে পারবে না। অন্যদিকে ইউরোপ মনে করতে পারে, তাদের বিশাল বাজারে প্রবেশের প্রয়োজনেই চীন শেষ পর্যন্ত ছাড় দিতে বাধ্য হবে।
এই পারস্পরিক ভুল হিসাবই বড় সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক কারণ।
সামনে ইউরোপের কঠিন সিদ্ধান্ত
ইউরোপের সামনে এখন দুটি ঝুঁকি। প্রথমটি হলো, চীনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে পাল্টা প্রতিশোধ, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহসংকটের মুখে পড়া। দ্বিতীয়টি হলো, কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হারানো।
প্রথম ঝুঁকিটি তাৎক্ষণিক এবং রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান। দ্বিতীয় ঝুঁকিটি ধীরে তৈরি হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হতে পারে।
তাই ইউরোপের জন্য কার্যকর পথ হতে পারে—আলোচনার দরজা খোলা রাখা, অন্যায্য প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া, মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা এবং একই সঙ্গে নিজেদের শিল্পসংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেওয়া।
বিশ্লেষণটির শেষ বক্তব্যও সতর্কতামূলক। যথাযথ প্রস্তুতি ও সমন্বয় ছাড়া বাণিজ্যিক সংঘাতে ইউরোপ পরাজিত হতে পারে। চীন শুল্কের জবাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উপাদানের সরবরাহ বন্ধ করলে ইউরোপের ভোটাররা সংঘাতের ব্যয় বহনে অনিচ্ছুক হয়ে নেতাদের পিছু হটতে চাপ দিতে পারেন।
তবে এমন পরিণতি অবশ্যম্ভাবী নয়। ইউরোপের হাতে এখনো শক্তিশালী বাজার, উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং মূল্যবান শিল্পভিত্তি রয়েছে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে এলেও সমন্বিত পরিকল্পনা, অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং কৌশলগত দৃঢ়তা দেখাতে পারলে ইউরোপ এখনো নিজের শিল্পক্ষমতা রক্ষা করতে পারে।

