সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব হলো পৃথিবীতে যা ঘটছে, তা নির্ভুলভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু যখন কোনো দেশের রাজনৈতিক শক্তি নির্ধারণ করতে শুরু করে কোন শব্দ ব্যবহার করা যাবে আর কোন শব্দ এড়িয়ে যেতে হবে, তখন শুধু সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতাই নয়, বরং বাস্তবতাকে বোঝার ক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বর্তমান বিশ্বে চীনকে ঘিরে এমন একটি বিতর্ক ক্রমেই বড় হচ্ছে। অভিযোগ উঠছে, চীন তার রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে এমন কিছু সীমারেখা তৈরি করেছে, যা শুধু দেশের অভ্যন্তরের সংবাদ পরিবেশ নয়, বরং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ভাষা ও প্রতিবেদনের ধরনকেও প্রভাবিত করছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের নেতৃত্বে দেশটির ক্ষমতাসীন দল রাজনৈতিক ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতার একটি মৌলিক দায়িত্ব—ঘটনাকে সঠিকভাবে বর্ণনা করা—চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
তবে বিষয়টি শুধু সংবাদমাধ্যম বনাম একটি রাষ্ট্রের সংঘাত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যবসায়িক স্বার্থ, কূটনৈতিক সম্পর্ক, তথ্য পাওয়ার সুযোগ এবং বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল হিসাব।
প্রবেশাধিকারের বিনিময়ে কতটা ছাড়?
আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো—একটি দেশে থেকে স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহ করা। বিশেষ করে চীনের মতো বড় ও প্রভাবশালী দেশে কাজ করা বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন।
২০১৩ সালের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের তৎকালীন প্রধান সম্পাদক ম্যাথিউ উইঙ্কলার চীনের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের গোপন সম্পদ নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ তাঁর আশঙ্কা ছিল, প্রতিবেদনটি প্রকাশ করলে চীনে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই ঘটনা পরবর্তীতে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে—একটি সংবাদমাধ্যম কি একটি দেশের ভেতরে কাজ করার সুযোগ ধরে রাখতে কিছু তথ্য বা ভাষা ব্যবহারে সতর্ক হবে, নাকি সব পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখবে?
সময়ের সঙ্গে এই দ্বন্দ্ব আরও জটিল হয়েছে। অনেক সাংবাদিক ও সংবাদ প্রতিষ্ঠান বুঝতে শুরু করেন, চীনের কিছু বিষয়ে নির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে। ফলে অনেক সময় প্রকাশের আগেই কিছু শব্দ বাদ পড়ে যায় বা ভাষা পরিবর্তিত হয়।
এখানেই মূল সমস্যা। সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও যদি সাংবাদিকরা সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করে নিজেদের ভাষা পরিবর্তন করেন, তাহলে সংবাদ পরিবেশনের স্বাধীনতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে পারে।
বেইজিং থেকে দূরে সরে গেল একটি বড় সংবাদকেন্দ্র
২০২২ সালে কানাডার সংবাদ সংস্থা কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন তাদের বেইজিং কার্যালয় বন্ধ করে দেয়। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।
ঘটনাটি কোনো সরাসরি বহিষ্কারের মাধ্যমে ঘটেনি। বরং চীনা কর্তৃপক্ষ ধীরে ধীরে তাদের সাংবাদিকদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে বাস্তব ফলাফল দাঁড়ায় একই—চীনের ভেতর থেকে সংবাদ সংগ্রহের সক্ষমতা হারায় প্রতিষ্ঠানটি।
তৎকালীন প্রধান সম্পাদক ব্রোডি ফেনলন বলেন, পদ্ধতি যাই হোক, ফলাফল একই।
একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি কমে গেলে শুধু একটি অফিস বন্ধ হয় না; কমে যায় স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির সুযোগ।
চীনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনীতি ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেশটির কার্যক্রম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।
কোন শব্দগুলো হয়ে উঠেছে স্পর্শকাতর?
রাজনৈতিক ভাষা কখনোই শুধু শব্দের বিষয় নয়। একটি শব্দ পাঠকের কাছে একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করে।
চীনকে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে কিছু শব্দ ব্যবহার করলেই সাংবাদিকদের নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা, মানবাধিকার পরিস্থিতি বা শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট শব্দগুলো নিয়ে বেইজিং অত্যন্ত সংবেদনশীল।
২০২৩ সালে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে “একনায়ক” হিসেবে উল্লেখ করলে বেইজিং তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বড় অংশে বিষয়টি খুব বেশি আলোচিত হয়নি।
এই নীরবতাই অনেক বিশ্লেষকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকতার কাজ হলো রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করা, কোনো সরকারের পছন্দ বা অপছন্দ অনুযায়ী শব্দ বেছে নেওয়া নয়।
সাংবাদিকদের ওপর চাপের উদাহরণ
চীনের সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিবেদন করার ঝুঁকি নতুন নয়।
২০২০ সালে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বড় সংবাদ প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১৩ জন সাংবাদিককে বহিষ্কার করে। এর মধ্যে ছিল নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিকরা। এটি ছিল তিয়েনআনমেন আন্দোলনের সময়ের পর সবচেয়ে বড় সাংবাদিক বহিষ্কারের ঘটনা।
২০২১ সালে বিবিসির সাংবাদিক জন সাডওয়ার্থ চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সিনচিয়াং অঞ্চল নিয়ে প্রতিবেদনের পর চাপের মুখে দেশ ছাড়েন।
এই ঘটনাগুলো দেখায়, বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য চীনে কাজ করা শুধু তথ্য সংগ্রহের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং পেশাগত নিরাপত্তা।
সরাসরি নিষেধাজ্ঞার চেয়েও ভয়ংকর আত্মনিয়ন্ত্রণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় প্রভাব আসে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা থেকে নয়, বরং আগেভাগে তৈরি হওয়া সতর্কতা থেকে।
যখন কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠান মনে করে একটি নির্দিষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তাদের কার্যালয় বন্ধ হতে পারে, সাংবাদিকদের ভিসা বাতিল হতে পারে বা ভবিষ্যতের সংবাদ সংগ্রহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, তখন তারা নিজেরাই ভাষা পরিবর্তন করতে শুরু করে।
এটি এক ধরনের নীরব নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেরি লিং চীনের সেন্সর ব্যবস্থাকে একটি ঝাড়বাতির ওপর বসে থাকা অজগরের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সাপ সবসময় আক্রমণ করে না, কিন্তু নিচে থাকা সবাই তার উপস্থিতি অনুভব করে।
অর্থাৎ ভয়টি সবসময় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর তার প্রভাব থাকে।
ভাষা বদলালে কি বাস্তবতাও বদলে যায়?
একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে ব্যবহৃত শব্দ শুধু পরিচয়ের বিষয় নয়; এটি বিশ্লেষণের অংশ।
অনেক গবেষকের মতে, কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোকে বর্ণনা করতে নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করা প্রয়োজন, কারণ এসব শব্দের সঙ্গে দীর্ঘ গবেষণা ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের ভিত্তি রয়েছে।
কিন্তু যখন কোনো শব্দকে রাজনৈতিকভাবে অপছন্দনীয় বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়, তখন পাঠকের সামনে বাস্তবতার একটি পরিবর্তিত ছবি তৈরি হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কেউ যদি শুধু “একদলীয় শাসন” হিসেবে উল্লেখ করেন, আবার কেউ “জনগণের অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা” ধরনের সরকারি ভাষা ব্যবহার করেন, তাহলে দুটি বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
তথ্য একই থাকতে পারে, কিন্তু উপস্থাপনার কাঠামো বদলে গেলে পাঠকের উপলব্ধিও বদলে যায়।
সিনচিয়াং ও হংকং: শব্দের লড়াই
চীন সম্পর্কিত সংবাদে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো—কোন ঘটনাকে কী নামে বর্ণনা করা হবে।
সিনচিয়াং অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে কেউ “শিবির” শব্দ ব্যবহার করেন, আবার কেউ সরকারি ভাষার কাছাকাছি শব্দ ব্যবহার করেন।
হংকংয়ের নিরাপত্তা আইন নিয়েও একই ধরনের বিতর্ক রয়েছে। কেউ এটিকে স্বাধীনতা সীমিত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন, আবার কেউ এটিকে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
এই শব্দ নির্বাচনই ঠিক করে দেয় পাঠক একটি ঘটনা কীভাবে বুঝবেন।

