মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে অঞ্চলটিতে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমান এবং বাড়তি সেনা মোতায়েনের উদ্যোগকে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি জোরদার করছে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। টানা আট রাত ধরে উভয় পক্ষের সামরিক অভিযান চলার পর পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রতিটি অভিযানের আগে ও পরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করছে। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি জানিয়ে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
শনিবার রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্তও একই ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল। রোববার সকালে কুয়েতে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠার ঘটনাও অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য আরও বড় সামরিক অভিযানের জন্য নিজেদের প্রস্তুতির মাত্রা বাড়াচ্ছে। শুধু যুদ্ধবিমান নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে অতিরিক্ত সেনা পাঠানো, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান মোতায়েন, ভ্রমণ সতর্কতা কঠোর করা এবং সামরিক কৌশলে পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে একটি বিস্তৃত প্রস্তুতির চিত্র ফুটে উঠছে।
তবে পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় ওয়াশিংটন হয়তো সংঘাতকে সীমিত রাখার চেষ্টা করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরানের সঙ্গে যেকোনো সীমিত সংঘর্ষও খুব দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে।
সম্প্রতি জর্ডানে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং একজন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে কয়েক ডজন মার্কিন সেনা আহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে আরও কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে।
ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা মহলে এখন আরেকটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান এমন কিছু দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি এসে গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম। পাশাপাশি ইরান লক্ষ্য নির্ধারণ প্রযুক্তিতে চীন বা রাশিয়ার সহায়তা পাচ্ছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। যদিও এসব দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এদিকে সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ ভবিষ্যৎ অভিযানের কৌশলেও পরিবর্তন আনছে। বিশেষ করে ড্রোন এবং অন্যান্য মানববিহীন যুদ্ধব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়।
সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ইসরায়েলে অতিরিক্ত ট্যাংকার বিমান পৌঁছাতে শুরু করেছে। শুরুতে এসব বিমানের ক্রুরা তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে অবস্থান করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির স্পাংডাহলেম বিমানঘাঁটি থেকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং যুক্তরাজ্য থেকে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব যুদ্ধবিমান প্রয়োজনে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা অবকাঠামো লক্ষ্য করে অভিযানে অংশ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, নতুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন এবং পাল্টাপাল্টি হামলার ধারাবাহিকতা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। কূটনৈতিক উদ্যোগে দ্রুত অগ্রগতি না হলে বর্তমান উত্তেজনা আরও বড় আকারের সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।

