মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের ধরন অনেকটাই বদলে গেছে। শুরুতে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সীমিত হামলা হিসেবে যে পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল, তা এখন ক্রমেই একটি বড় যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু বাড়ছে, নতুন নতুন দেশ সংঘাতের প্রভাবে পড়ছে এবং কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনাও কমে আসছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ওয়াশিংটন ও তেহরান কেউই এখন পিছিয়ে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেই প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সীমিত হামলা থেকে বড় সংঘাত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা জাহাজে ইরান হামলা বন্ধ না করলে যুদ্ধের পরিধি আরও বাড়ানো হতে পারে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলার লক্ষ্যবস্তু সম্প্রসারণ করে। আগে মূলত উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থা ও ড্রোন পরিচালনার স্থাপনায় আঘাত করা হচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলায় সড়ক, টানেল, রেলপথ এবং বন্দর অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, একটি পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র বা ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টেও হামলা হয়েছে। এ ধরনের স্থাপনা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই যুদ্ধের লক্ষ্য যখন সামরিক স্থাপনা থেকে সরে গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোর দিকে যায়, তখন মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়।
সাত দেশে ইরানের হামলার বিস্তার
যুক্তরাষ্ট্র হামলার পরিধি বাড়ানোর পর ইরানও তার লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বড় করেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি দেশে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
এর মধ্যে কুয়েত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির একটি পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র এবং একটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জর্ডানেও নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় ও সরকার-সমর্থিত গণমাধ্যমে আরও বলা হয়েছে, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোও ভবিষ্যতে হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
এই হুমকি বাস্তবায়িত হলে সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতেও বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
দুই পক্ষই আলোচনায় অনাগ্রহী
বর্তমান পরিস্থিতিকে সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখান থেকে আবার মধ্যস্থতা ও আলোচনার পথে ফিরে যাওয়া সম্ভব হলেও বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ আপাতত সেই সম্ভাবনা কম দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—কোনো পক্ষই এখন আলোচনার জন্য প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে না। কয়েক সপ্তাহের কঠিন আলোচনার পর জুন মাসে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক বা MoU হয়েছিল, সেটি আর কার্যকর নেই বলে উভয় পক্ষ জানিয়েছে।
শুক্রবার জর্ডানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় দুই মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার মনে করেন, যুদ্ধের সামনের দিনগুলো সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়গুলোর একটি হতে পারে।
রোববার উত্তর ইরাকে আরও একজন মার্কিন সেনাসদস্যের মৃত্যুর খবর জানায় যুক্তরাষ্ট্র। এর পরপরই ওয়াশিংটন জানায়, এসব হামলার জন্য তেহরানকে দ্রুত শাস্তি দেওয়া হবে। একই দিনে ইরান আবারও জর্ডানকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
পরিস্থিতি কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে?
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে এমন অবস্থায় যাচ্ছে, যেখানে কোনো পক্ষের পক্ষেই পুরো সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।
শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই সম্ভবত যুদ্ধকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলা দেখাচ্ছে, সেই সীমা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছে।
একটি ক্ষেপণাস্ত্র নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত না করে অন্য দেশে পড়লে, কিংবা কোনো হামলায় অপ্রত্যাশিতভাবে অনেক মানুষ নিহত হলে পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে বদলে যেতে পারে।
তখন রাজনৈতিক নেতাদের ওপর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ বাড়বে। এর ফলে সংঘাত এমনভাবে বিস্তৃত হতে পারে, যা প্রথমে কোনো পক্ষই পরিকল্পনা করেনি।
ইসরায়েলও জড়িয়ে পড়তে পারে
রোববার ইরান জর্ডানের আকাবা শহর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইসরায়েলের দাবি, ওই হামলার ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু ধ্বংসাবশেষ তাদের ভূখণ্ডে পড়েছে।
এখন পর্যন্ত ইসরায়েল সরাসরি এই সংঘাতে অংশ নেয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অনুরোধেই দেশটি যুদ্ধ থেকে দূরে রয়েছে।
তবে ইরানের সঙ্গে করা সমঝোতা নিয়ে ইসরায়েলি সরকারের অসন্তুষ্টি গোপন নয়। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি সরাসরি ইসরায়েলে হামলা চালায়, তাহলে তারা শক্তিশালী পাল্টা জবাব দেবে।
ইসরায়েল সরাসরি যুদ্ধে যুক্ত হলে সংঘাতের মাত্রা অনেক বেড়ে যাবে। তখন ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে ঘিরে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
ইরানের পাল্টা কৌশল
ইরান মনে করছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজে পেয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে উচ্চগতির এবং চলার পথে দিক পরিবর্তনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে।
ক্ষয়ক্ষতি বাড়াতে দেশটি আরও বড় পরিসরে ক্লাস্টার বিস্ফোরকও ব্যবহার করছে বলে জানানো হয়েছে।
জর্ডানে মার্কিন সেনাদের হতাহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে ইরানের নতুন কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করছে।
তেহরানের নেতৃত্ব সম্ভবত মনে করছে, তারা দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে চাপের মধ্যে ফেলতে পারবে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যকে কেন্দ্র করে জনগণের সমর্থন সংগঠিত করার চেষ্টা করেছে দেশটির সরকার।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতিতে যে যৌথ নেতৃত্ব সামনে এসেছে, তারাও আপাতত প্রতিরোধকেই একমাত্র পথ হিসেবে দেখছে।
দুর্বল অর্থনীতি নিয়েও কেন পিছিয়ে যাচ্ছে না ইরান?
ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে গুরুতর সংকটে রয়েছে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, ওষুধের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি রয়েছে এবং অর্থনৈতিক কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তারপরও ইরানের নেতৃত্ব মনে করছে, এখন সংযম দেখালে যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি চাপ প্রয়োগ করবে।
ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক ভ্যালি নাসরের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি নৌ অবরোধ আরোপ করলে যে অর্থনৈতিক কষ্ট তৈরি হবে, তেহরান সেটিও সহ্য করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ইরানের হিসাব হলো, হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা সীমিত করে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পাল্টা চাপ তৈরি করা সম্ভব। এতে তেলের দাম বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে।
তেহরান সম্ভবত আশা করছে, সেই চাপের মুখে ট্রাম্প প্রশাসনই শেষ পর্যন্ত আগে সমঝোতার দিকে এগোবে।
সংঘাতের কেন্দ্রে হরমুজ প্রণালি
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বর্তমান সংঘাতের শুরু হলেও বিষয়টি এখন অনেকটাই পেছনে চলে গেছে। বিরোধের কেন্দ্রে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ।
পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত এই সরু সমুদ্রপথ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ হরমুজে অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে চায়। অন্যদিকে ইরান মনে করে, এই পথ দিয়ে চলাচল করা জাহাজ নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা থাকা উচিত।
জুন মাসের MoU-তে অস্পষ্ট ভাষার মাধ্যমে এই দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মৌলিক বিরোধের কোনো সমাধান হয়নি।
মার্চ মাসে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেওয়া প্রথম বার্তায় মোজতবা খামেনি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ক্ষমতাকে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
বিশ্ব অর্থনীতির মাথার ওপর ঝুলছে হুমকি
ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালি এমন একটি শক্তিশালী অস্ত্র, যার মাধ্যমে তারা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে। পরিবহন খরচ, জাহাজের বিমা ব্যয় এবং বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ইউরোপ, এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও তা অনুভূত হবে।
সংঘাত আরও বাড়লে ইরান ইয়েমেনের হুতি মিত্রদেরও সক্রিয় করতে পারে। হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে একই সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ঝুঁকিতে পড়বে।
একদিকে হরমুজ, অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব—এই দুই পথেই সমস্যা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা বড় সংকটে পড়তে পারে।
উদ্বিগ্ন উপসাগরীয় মিত্ররা
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতারসহ যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা এর আগেও যুদ্ধের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে ফি আদায়ের একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করতে কয়েকটি সরকার ট্রাম্পকে রাজি করেছিল।
এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগী হলেও তারা ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়াতে চায় না। কারণ তাদের অর্থনীতি তেল, বন্দর, পর্যটন, বিমান চলাচল এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
যুদ্ধ বিস্তৃত হলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, বিনিয়োগ কমতে পারে এবং হরমুজ নিয়ে ভবিষ্যৎ সমঝোতাও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র একসময় যুদ্ধ থেকে সরে গেলে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি চাপ মূলত এসব দেশকেই সামলাতে হবে।
বন্দরগুলো কি পরবর্তী লক্ষ্য?
ইরানের আধা-সরকারি ফারস নিউজ এজেন্সি শুক্রবার সতর্ক করে জানায়, চাবাহার বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর একটি নেটওয়ার্ক লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
এমন হামলা হলে বেসামরিক বাণিজ্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বন্দর বন্ধ হয়ে গেলে খাদ্য, ওষুধ, শিল্পপণ্য এবং জ্বালানি পরিবহনে বিলম্ব দেখা দিতে পারে।
তাই উপসাগরীয় দেশগুলো আবার এককভাবে কিংবা সম্মিলিতভাবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তবে তারা উদ্যোগ নিলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সেই আহ্বানে সাড়া দেবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিজয় কতটা সম্ভব?
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত ও চূড়ান্ত সামরিক বিজয়ের সম্ভাবনা আপাতত দূরের বিষয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরানের মতো বড় দেশকে সামরিকভাবে পরাজিত করতে হলে শুধু বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যথেষ্ট নাও হতে পারে। এর জন্য স্থলসেনা পাঠানো এবং বর্তমানে চলমান হামলার তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত অভিযান প্রয়োজন হতে পারে।
তেহরানের নেতৃত্ব বর্তমান সংঘাতকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছে। তাই সীমিত আকাশ হামলার মাধ্যমে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করানো কঠিন হতে পারে।
ট্রাম্প গত সপ্তাহে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সরাসরি স্থলযুদ্ধে যেতে চান না বলে জানিয়েছেন। তবে তিনি এটাও বলেছেন, কখনো কখনো স্থল অভিযান প্রয়োজন হয় এবং অন্য কেউ যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে সেই অভিযান চালাতে পারে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপে হামলার বিষয়টিও ট্রাম্প প্রশাসন আবার বিবেচনা করছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
স্থলযুদ্ধ কেন ভয়ংকর হতে পারে?
দক্ষিণ ইরানে স্থল অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন হবে। সেখানে প্রচণ্ড গরম, কঠিন ভূপ্রকৃতি, পূর্ণ প্রস্তুতিতে থাকা ইরানি সামরিক বাহিনী এবং যুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত জনগণের মুখোমুখি হতে হবে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনা তুসি মনে করেন, এমন অভিযান একটি বিশাল জুয়া হবে এবং তা ঐতিহাসিক বিপর্যয়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
সৌদি আরবের মতো মিত্রদেশ নিজেদের ভূখণ্ড ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দিলে অভিযান আরও জটিল হবে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান জানুয়ারি মাসে ইরানের প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছিলেন, ইরানে হামলার জন্য সৌদি ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
মধ্যস্থতাকারীরা নীরব কেন?
পাকিস্তান ও কাতার জুন মাসে সুইজারল্যান্ডের লুসার্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈঠকে মধ্যস্থতা করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশ দুটি তুলনামূলকভাবে নীরব রয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ১০ জুলাই একটি কাতারি প্রতিনিধিদল তেহরান সফর করেছিল।
তেলের বাজারে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি হলে মধ্যস্থতার চেষ্টা আবার গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত কমে যাওয়ার মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ১০০ ডলারের ওপরে গেলে যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনও বড় বিষয়
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
হরমুজে নতুন বিধিনিষেধ দেওয়া হলে তেল ও গ্যাসের দাম আরও বাড়বে বলে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা সতর্ক করেছেন। জ্বালানির দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে এবং রিপাবলিকানদের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে।
তাই ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কঠিন সমীকরণ রয়েছে। দুর্বল অবস্থান দেখালে রাজনৈতিক সমালোচনা হতে পারে, আবার বড় যুদ্ধ শুরু করলে প্রাণহানি, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির দায়ও বহন করতে হবে।
সামনে কী হতে পারে?
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে পুরোপুরি সর্বাত্মক যুদ্ধ বা স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান—কোনোটিই হয়তো দেখা যাবে না।
এর পরিবর্তে হামলা, পাল্টা হামলা এবং কিছুদিনের তুলনামূলক শান্তির একটি অনিশ্চিত চক্র চলতে পারে। একই সময়ে মধ্যস্থতাকারীরা নতুনভাবে আলোচনার পথ তৈরির চেষ্টা করবেন।
এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর। তিনি সামরিক চাপ বাড়াবেন, নাকি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনা করে আলোচনায় ফিরবেন—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা একটি অনিয়ন্ত্রিত হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে।
ইরান মনে করছে, হরমুজ প্রণালি ও আঞ্চলিক হামলার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব। অন্যদিকে ওয়াশিংটন মনে করছে, সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।
কিন্তু এই শক্তির লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে সাধারণ মানুষ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা।
কূটনৈতিক যোগাযোগ দ্রুত পুনরায় শুরু না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের একজন কূটনীতিকের মূল্যায়নের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার যথেষ্ট মিল রয়েছে—পরিস্থিতি ভালো হওয়ার আগে হয়তো আরও খারাপ হবে।

