দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং সামরিক নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ঘিরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার বড় অংশ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই সময় এখন দ্রুত পেছনে চলে যাচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতা আর একটি দেশের হাতে সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের একক নেতৃত্বের জায়গায় সামনে এসেছে একাধিক শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা। তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে চীন। একই সঙ্গে রাশিয়া, ভারত এবং বিভিন্ন উদীয়মান অর্থনীতিও নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এই পরিবর্তন শুধু রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার হিসাব বদলাচ্ছে না। এটি আন্তর্জাতিক নিয়ম, জোট, নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য ব্যবস্থাকেও নতুন করে সাজাচ্ছে। ফলে বিশ্ব আগের তুলনায় অনেক বেশি অস্থির, প্রতিযোগিতামূলক এবং সংঘাতপ্রবণ হয়ে উঠেছে।
পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি নড়বড়ে
একসময় বিশ্বের প্রধান শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর জোটই আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। সাত বা আটটি শক্তিশালী দেশের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করত।
কিন্তু এখন সেই একক কেন্দ্র আর নেই। চীনের নেতৃত্বে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, রাশিয়ার নেতৃত্বে ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন এবং ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সম্প্রসারিত জোট ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই সম্প্রসারিত জোটে মূল পাঁচ দেশের পাশাপাশি আরও প্রায় ছয়টি সদস্য এবং দশটি অংশীদার দেশ যুক্ত হয়েছে। এসব দেশের অধিকাংশই উন্নয়নশীল কিংবা দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি। ফলে বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্ব কেবল পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
নতুন এই জোটগুলো পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর বিকল্প তৈরি করতে চাইছে। তাদের লক্ষ্য শুধু বাণিজ্য বাড়ানো নয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি বাজার, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা।
নিয়মের বদলে শক্তির প্রতিযোগিতা
পুরোনো বিশ্বব্যবস্থায় অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু স্থির নিয়ম, চুক্তি এবং প্রতিষ্ঠান কার্যকর ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই নিয়মগুলোর প্রভাব দুর্বল হচ্ছে। বড় শক্তিগুলো অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামরিক সামর্থ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির ব্যবহার এবং পাল্টা শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা বাড়ছে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসও গভীর হচ্ছে। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি আগের চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কোনো বিরোধ দ্রুত আঞ্চলিক সীমা অতিক্রম করে বড় শক্তিগুলোর মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নিতে পারে। একটি দেশের সামরিক পদক্ষেপ অন্য দেশের নিরাপত্তা কৌশল বদলে দিতে পারে। আবার একটি অঞ্চলের যুদ্ধ বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্য এবং সারের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
যুদ্ধ ও অস্থিরতায় বিপর্যস্ত বিশ্ব অর্থনীতি
ইউক্রেনের যুদ্ধ, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত এবং মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ নতুন বিশ্বব্যবস্থার অস্থিরতার স্পষ্ট উদাহরণ। মিয়ানমারে যুদ্ধ চললেও সেটি বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ খুব কম দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত এবং কোরীয় উপদ্বীপে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কাও দূর হয়নি। এসব অঞ্চলে সামান্য ভুল হিসাব কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ সিদ্ধান্ত বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষের জন্ম দিতে পারে।
ইউক্রেন ও পারস্য উপসাগরের দুটি প্রকাশ্য যুদ্ধ এবং ইরানের হরমুজ প্রণালী অবরোধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ইতিমধ্যে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। তেল, গ্যাস, সার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই পথ বাধাগ্রস্ত হলে শুধু পশ্চিমা দেশ নয়, এশিয়া, আফ্রিকা এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি এবং শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।
এসব সংঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। তাই বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সামরিক নিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
আঞ্চলিক যুদ্ধের পেছনে বড় শক্তির লড়াই
ইউক্রেন এবং ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্বনেতাদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ পাচ্ছে। তবে এসব যুদ্ধকে শুধু স্থানীয় বা আঞ্চলিক বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না।
সংঘাতগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার প্রতিযোগিতাও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে চীন দ্রুত এগিয়ে আসা সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
চীন অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে তুলনামূলক নীরব অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক, অবকাঠামো বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রভাব বাড়াচ্ছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সময়ে একাধিক অঞ্চলে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ সামলাতে হচ্ছে।
পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ততা এবং পুরোনো মিত্রদের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন চীনের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। চীন সরাসরি বড় কোনো যুদ্ধের ব্যয় বহন না করেও প্রতিদ্বন্দ্বীর দুর্বলতা পর্যবেক্ষণ এবং নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ পাচ্ছে।
মুখোমুখি দুই ভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থা
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা শুধু দুটি দেশের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়। এটি দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যকার লড়াইও।
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতির দেশ এবং বিশ্বের প্রাচীনতম কার্যকর গণতন্ত্রগুলোর একটি। ব্যক্তিমালিকানা, স্বাধীন ব্যবসা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং উদ্ভাবনের সুযোগ দেশটির শক্তির প্রধান ভিত্তি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে অল্প কয়েকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অত্যন্ত ধনী প্রযুক্তি ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে মুক্তবাজার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে চীনে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র এবং একক রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। দলটি অর্থনীতি, সামরিক বাহিনী এবং সমাজের ওপর ব্যাপক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা নির্বাচনী চাপের মুখে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বারবার কৌশল বদলাতে হয় না।
এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চীন উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে।
এক প্রজন্মে চীনের বিস্ময়কর পরিবর্তন
মাত্র এক প্রজন্মের মধ্যে চীন গভীর দারিদ্র্য ও অনুন্নয়নের অবস্থা থেকে উঠে এসে বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতার বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক, এই পরিবর্তনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
মাও সেতুংয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিশৃঙ্খল সময়ের পর চীনের নেতৃত্ব অর্থনৈতিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। দেং শিয়াওপিং রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং দলের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রেখে বেসরকারি খাতকে বিকাশের সুযোগ দেন।
রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির ভেতরে বেসরকারি ব্যবসা, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বাজার প্রতিযোগিতার জায়গা তৈরি করা হয়। এই অস্বাভাবিক সমন্বয় ধীরে ধীরে চীনকে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর একটিতে পরিণত করে।
কিছু শিল্পে চীনের উৎপাদন সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে যায়। বিপুল অভ্যন্তরীণ বাজার দেশটির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বৃহৎ পরিসরে পণ্য উৎপাদনের সুযোগ দেয়। বেশি উৎপাদনের কারণে ব্যয় কমে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা পণ্য প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে।
এই ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে অত্যন্ত শক্তিশালী পুঁজিবাদী কর্মকাণ্ডের এক বিরল সমন্বয় বলা যায়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পথ অনুসরণ করেনি চীন
চীনের উত্থান বোঝার জন্য সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তুলনা গুরুত্বপূর্ণ। সোভিয়েত ব্যবস্থা শুরু থেকেই পুঁজিবাদবিরোধী এবং আদর্শনির্ভর ছিল। রাষ্ট্রের বাইরে স্বাধীন ব্যবসা ও বাজার প্রতিযোগিতার সুযোগ সেখানে অত্যন্ত সীমিত ছিল।
চীন ভিন্ন পথ বেছে নেয়। দেশটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক শিকড় ধরে রাখলেও বিশ্বের সফল পুঁজিবাদী অর্থনীতিগুলোর উৎপাদন, বাজার এবং বাণিজ্য কৌশল অনুসরণ করে।
অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, মুনাফা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী এই ব্যবস্থা চীনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ফল দিয়েছে।
তবে এই সাফল্য শুধু কম মজুরির শ্রমিক বা বিদেশি বিনিয়োগের কারণে আসেনি। এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, দক্ষ অবকাঠামো এবং নির্দিষ্ট কৌশলগত লক্ষ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চীনের সাফল্যের প্রধান ভিত্তি
চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি। একই পণ্য বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে বিক্রি করা সম্ভব হওয়ায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় আকারে উৎপাদন করতে পারে।
দেশটি সড়ক, রেলপথ, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, নগর অবকাঠামো এবং শিল্পাঞ্চল নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। দ্রুত নগরায়ণ এবং নির্মাণ খাতের বিস্তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত নতুন পণ্য তৈরি, ব্যয় কমানো এবং প্রযুক্তি উন্নত করার চেষ্টা করতে হয়।
গবেষণা ও উন্নয়ন খাতেও রাষ্ট্র বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জনকে চীন কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছে।
একই সঙ্গে দেশটি তার সামরিক বাহিনীকে আধুনিক করছে। নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং তথ্যভিত্তিক যুদ্ধক্ষমতা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে চীন শুধু অর্থনৈতিক নয়, পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কি ভেতরেই?
সোভিয়েত ইউনিয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়েছিল। কিন্তু চীনের চ্যালেঞ্জ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সোভিয়েত অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বন্ধ ও অদক্ষ ছিল। চীনের অর্থনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং বহু শিল্পে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক।
যুক্তরাষ্ট্র চীনের উত্থান ঠেকাতে পারবে কি না, তা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না। দেশটি নিজের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল শক্তি ধরে রাখতে পারছে কি না, সেটিও নির্ধারক হবে।
যদি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি কিছু ধনী ব্যক্তি, বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে দেশটির গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হবে।
স্বজনপ্রীতি, ব্যবসায়িক একচেটিয়া আধিপত্য এবং কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বাড়লে তা চীনের জন্য একটি কৌশলগত উপহার হয়ে উঠতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে যে উন্মুক্ত সমাজ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে নিজের শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে, সেই ভিত্তিই তখন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
চীনের ভবিষ্যৎ অবস্থান অনেকাংশে নির্ভর করবে তাইওয়ান প্রশ্নে দেশটির নেতৃত্ব কী সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর। সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রলোভন চীনের কয়েক দশকের অর্থনৈতিক সাফল্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
তাইওয়ানকে ঘিরে যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তিধর দেশ এতে জড়িয়ে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সমুদ্রপথ এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিপণ্যের সরবরাহও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
চীন যদি বর্তমান অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং কূটনৈতিক কৌশল বজায় রাখে, তবে শান্তিপূর্ণ উপায়েই তার বহু দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু চীনা নেতৃত্বকে এমন ধারণা থেকেও সতর্ক থাকতে হবে যে ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে এবং সেই নিয়ম কেবল তারাই সঠিকভাবে বোঝে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভুল হিসাব, অহংকার এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনা যেকোনো পরিকল্পনা ভেঙে দিতে পারে।
ভ্লাদিমির পুতিন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বড় শক্তির নেতারাও ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং সেই ভুলের মূল্য একটি দেশ ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বকে দিতে হতে পারে।
ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের জন্য নতুন বাস্তবতা
বিশ্ব যদি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় আরও গভীরভাবে বিভক্ত হয়, তাহলে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য পরিস্থিতি একই সঙ্গে সুযোগ এবং ঝুঁকি তৈরি করবে।
একদিকে তারা একাধিক শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলে বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপ তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থায় শুধু সামরিক জোট নয়, বন্দর, জ্বালানি, ঋণ, প্রযুক্তি, তথ্য, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলও ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠছে।
তাই উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে কেবল তাৎক্ষণিক বিনিয়োগের সুবিধা দেখে সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না। জাতীয় নিরাপত্তা, ঋণের স্থায়িত্ব, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ভারসাম্যও বিবেচনায় রাখতে হবে।
শেষ পর্যন্ত শীর্ষে বসবে কে?
বর্তমান অবস্থায় নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে যুক্তরাষ্ট্র তার শীর্ষস্থান ধরে রাখবে, নাকি চীন শেষ পর্যন্ত তাকে ছাড়িয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনো বিশাল সামরিক শক্তি, শক্তিশালী মিত্রজোট, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রভাব রয়েছে।
অন্যদিকে চীনের শক্তি হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিশাল বাজার, দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।
সম্ভবত ভবিষ্যৎ বিশ্ব পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীনের একক নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। বরং একাধিক শক্তির প্রতিযোগিতা, সাময়িক সহযোগিতা এবং ঘন ঘন বিরোধের মধ্য দিয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
এই ব্যবস্থায় স্থায়ী নিয়মের চেয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। আর সেই ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থতা বিশ্বকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিশ্বের শীর্ষ আসনে শেষ পর্যন্ত কে বসবে, তার উত্তর এখনো অজানা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—পুরোনো একক আধিপত্যের যুগ শেষ হয়ে গেছে, আর নতুন বিশ্বব্যবস্থার লড়াই ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

