মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ১০০ জন মার্কিন সেনা আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর। সোমবার (২০ জুলাই) পেন্টাগনের এই স্বীকারোক্তি এমন এক সময় সামনে এসেছে, যখন যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয়, হতাহতের সংখ্যা এবং দেশের অভ্যন্তরে জনমত নিয়ে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ জুলাই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ১০০ জন মার্কিন সেনা সদস্য আহত হয়েছেন। তিনি জানান, আহতদের মধ্যে প্রায় ৯৬ শতাংশ ইতোমধ্যেই চিকিৎসা শেষে নিজ নিজ দায়িত্বে ফিরে গেছেন। আহতদের বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে মাথায় আঘাত বা কনকশনের মতো সমস্যা দেখা গেছে, যদিও অধিকাংশের আঘাত গুরুতর ছিল না।
এর আগে যুদ্ধক্ষেত্রে হতাহত সংক্রান্ত তথ্য যথাসময়ে প্রকাশ না করার অভিযোগ উঠেছিল পেন্টাগনের বিরুদ্ধে। সেই সমালোচনার প্রেক্ষাপটেই এবার আনুষ্ঠানিকভাবে আহত সেনাদের সংখ্যা জানানো হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অন্যদিকে, ইরানি হামলায় নিহত মার্কিন সেনাদের পরিচয়ও প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন হাওয়াইয়ের ২৫ বছর বয়সী টাইলার জেমস ফিহান এবং টেক্সাসের ১৯ বছর বয়সী ইসাবেলা গঞ্জালেস। একই হামলায় নিহত হওয়া আরও এক সেনার মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, উত্তর ইরাকেও আরও একজন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।
সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে, যার প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ৪ ডলার অতিক্রম করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সামরিক তৎপরতা আরও জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের সম্ভাব্য বাধা দেওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে আনতেই ধারাবাহিক বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক কমান্ড ইতোমধ্যে তাদের দশম দফার বিমান অভিযান সম্পন্ন করেছে।
অন্যদিকে, ইরান-সমর্থিত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, বাহরাইনে অবস্থিত ডারখোভিন পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার জবাবে তারা বাহরাইনের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং একটি তথ্যকেন্দ্রকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। যদিও এসব দাবির সবগুলোর স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
সংঘাতের প্রভাব সমুদ্রপথেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওমান উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে আরও দুটি জাহাজে আগুন লাগার ঘটনায় সেগুলো অচল হয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে দুর্বল করা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াইট হাউসের বক্তব্যে অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার জানান, বর্তমানে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের হামলা বা বাধা প্রতিরোধ করাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই এর সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ছে। একদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে হতাহত ও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু দুই দেশের সামরিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুই এখন এই সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে নজর থাকবে পুরো বিশ্বের।

