মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও জটিল আকার ধারণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সেনা হতাহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন সেনা নিহত হলে তার জবাবে ইরানকে “বহুগুণ মূল্য” দিতে হবে।
সোমবার (২০ জুলাই) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন বাহিনীর ওপর প্রাণঘাতী হামলা হলে তার জবাব হবে আরও কঠোর এবং ব্যাপক।
এই অবস্থানের অংশ হিসেবে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যানিয়েল কেইন এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার কথাও জানান। যদিও কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি।
যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কয়েকটি দেশ। পাকিস্তান ও কাতার যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে, যার লক্ষ্য দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ আবারও উন্মুক্ত করা।
প্রস্তাবে উভয় পক্ষকে ৯ জুলাইয়ের আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালী আবারও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। পাশাপাশি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে স্থগিত কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু করারও প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য আলোচনার স্থান হিসেবে ইসলামাবাদ অথবা দোহার নাম আলোচনায় রয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তাঁর দেশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। তিনি দেশবাসীকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই পরিস্থিতির স্বাভাবিক পরিণতি মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ১৪টি ধারার কোনোটিতেই ইরান তার জাতীয় স্বার্থ, নীতি কিংবা বিপ্লবী মূল্যবোধ থেকে সরে আসেনি। বরং তাঁর মতে, চুক্তির উল্লেখযোগ্য অংশই ইরানের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেন, একদিকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো হচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হচ্ছে। তাঁর মতে, বক্তব্য ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে উত্তেজনা কমানো কঠিন হবে।
এদিকে পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার জর্ডানে ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন ২৫ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান এবং ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেস। তাঁরা ইসলামিক স্টেটবিরোধী অভিযানে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জর্ডানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার সময় এই দুই সেনা প্রাণ হারান। সর্বশেষ এই ঘটনার পর চলমান সংঘাতে নিহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা বেড়ে ১৭ জনে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সেনারা সরাসরি ইরানের ভেতরে অবস্থান না করলেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে তাদের উপস্থিতি সংঘাতের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে জর্ডান, ইরাক, সিরিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী এখন সম্ভাব্য হামলার অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই সময়ে সামরিক হুমকি, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় এখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে। যদি আলোচনা দ্রুত শুরু না হয়, তাহলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

