ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শিক্ষা সংস্কার এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। শুরুতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি থাকলেও বর্তমানে এতে যুক্ত হয়েছে দেশের একাধিক বিরোধী রাজনৈতিক দল। ফলে আন্দোলনটি এখন শুধু শিক্ষাবিষয়ক দাবি নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
গত ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অনিয়মের বিচার এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জানানো হচ্ছে। আন্দোলনের অন্যতম মুখ শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের অনশন এবং পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে কংগ্রেস নেতাদের অবস্থান
মঙ্গলবার আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হয় প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে আকস্মিক অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা অবস্থানের পর পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। এ সময় রাহুল গান্ধীর সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবসহ বিরোধী জোটের বেশ কয়েকজন নেতা।
পুলিশ তাদের বাসে তুলে নিয়ে যায়। এই সময় ধস্তাধস্তির ঘটনায় রাহুল গান্ধীর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়। পরে প্রায় দুই ঘণ্টা পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কংগ্রেসের এই কর্মসূচি আন্দোলনে নতুন রাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। তবে বিরোধীদের মধ্যেও এ নিয়ে ভিন্ন মত দেখা গেছে। আম আদমি পার্টির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে কর্মসূচি মূল আন্দোলনের গুরুত্বকে কিছুটা আড়াল করেছে।
পুলিশের অভিযানের পরও কমেনি আন্দোলনের গতি
এর আগে সোমবার দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি অভিযানের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। নিরাপত্তা বাহিনী আন্দোলনকারীদের তাঁবু এবং মূল মঞ্চের একটি অংশ সরিয়ে দেয়।
পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে অন্তত ৬০ জন আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, সংঘর্ষে তাদের ১১৮ জন সদস্য আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৭০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে।
তবে পুলিশি অভিযানের পরও আন্দোলন থেমে যায়নি। মঙ্গলবার বৃষ্টির মধ্যেও হাজারো মানুষ আবার যন্তর মন্তরে জড়ো হন। অনেক নতুন তরুণ-তরুণীও আন্দোলনে অংশ নেন।
পুলিশের আগের অভিযানের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকে নিরাপত্তার জন্য সাঁতারের চশমা, মুখোশ, ভেজা তোয়ালে ও হেলমেট নিয়ে আন্দোলনস্থলে উপস্থিত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পরামর্শ অনুসরণ করেই তারা এসব প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে জানান।
বিরোধীদের একের পর এক সমর্থন
পুলিশি অভিযানের প্রতিবাদ জানাতে মঙ্গলবার যন্তর মন্তরে যান বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতারা।
জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টির নেতা শরদ পাওয়ার, আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র, শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত ও অরবিন্দ সাওয়ান্ত, কংগ্রেস নেতা শশী থারুর এবং বামপন্থী দলগুলোর সংসদ সদস্যরা আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ান।
শরদ পাওয়ার বলেন, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য ও স্বচ্ছ পরীক্ষাব্যবস্থার দাবি শক্তি প্রয়োগ করে দমন করা সম্ভব নয়। তিনি জানান, তার দল সংসদের ভেতরে ও বাইরে এই দাবির পাশে থাকবে।
অরবিন্দ কেজরিওয়াল পরে হাসপাতালে গিয়ে আহত আন্দোলনকারীদের খোঁজ নেন। তিনি জানান, আহতদের মধ্যে একজন তরুণীর অবস্থা গুরুতর এবং তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত বলেন, যন্তর মন্তরের আন্দোলনের আগুন সহজে থামবে না। প্রয়োজন হলে তারাও আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হওয়ার কথা জানান।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকার কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
সরকারের পাল্টা অভিযোগ
আন্দোলন নিয়ে বিরোধীদের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
তিনি অভিযোগ করেন, কংগ্রেস শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে এবং সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনকে অচল করার চেষ্টা করছে। তার দাবি, সরকার আলোচনার জন্য সব ধরনের সুযোগ রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, শুরুতে আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা, কিন্তু বর্তমানে রাহুল গান্ধী এটিকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছেন।
তবে আন্দোলনের উদ্যোক্তা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ জানিয়েছেন, তাদের পক্ষ থেকে শুধু যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েতের আহ্বান জানানো হয়েছে। দিল্লির অন্য কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলার সঙ্গে তাদের সংগঠনের সম্পর্ক নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
সোনম ওয়াংচুকের অনশন ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ সোনম ওয়াংচুক বর্তমানে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৮ জুলাই পুলিশের হস্তক্ষেপের পর তাকে সফদারজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
পরে দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশে মঙ্গলবার তাকে গুরগাঁওয়ের মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে হাসপাতালেও তিনি অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
তার নেতৃত্বাধীন শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন এখন শিক্ষার্থী, নাগরিক সমাজ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন পাচ্ছে।
জাতীয় রাজনীতিতে নতুন চাপ
আন্দোলনের প্রভাব দিল্লির বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। হিমাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিং সুখু শিমলায় কংগ্রেস নেতাদের আটকের প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেন।
এ ছাড়া দিল্লির ছত্রসাল স্টেডিয়ামে আটক বিরোধী সংসদ সদস্য হিবি ইডেন পুলিশের আচরণকে কঠোর ও উসকানিমূলক বলে অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, ধস্তাধস্তির সময় নারী সংসদ সদস্যরাও আহত হয়েছেন।
শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, পরীক্ষার অনিয়ম বন্ধ করতে কার্যকর আইন এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সরকার বলছে, সমস্যার সমাধানে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। সেই অসন্তোষের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি। ফলে দিল্লির এই আন্দোলন আগামী দিনে ভারতের শিক্ষা নীতি ও রাজনীতিতে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

