বিশ্বের পরমাণু শক্তি খাতে নতুন এক প্রতিযোগিতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্র এখন কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি, অর্থায়ন, নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক জোট গঠনের হিসাব। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল বিদ্যুৎবাজারকে ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
মার্চে পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চালুর পর চীন জুনের শেষ নাগাদ পরিবেশ ও নতুন ধরনের জ্বালানিব্যবস্থা নিয়ে একাধিক খাতভিত্তিক পরিকল্পনা প্রকাশ করে। এসব পরিকল্পনায় দেশের অভ্যন্তরে পরমাণু বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শাসন ও চুল্লি রপ্তানিতে নেতৃত্ব দেওয়ার লক্ষ্যও উঠে এসেছে।
প্রায় একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তৃতীয় দেশগুলোতে ছোট আকারের মডুলার পরমাণু চুল্লি স্থাপনের গতি বাড়াতে নতুন সহযোগিতা স্মারক ঘোষণা করে। ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ঘোষিত এই উদ্যোগের প্রাথমিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলে। ফলে বোঝা যাচ্ছে, পরমাণু চুল্লি রপ্তানি এখন বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কেন বাড়ছে পরমাণু শক্তির গুরুত্ব
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরেই বড় দুর্বলতা। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথে সংকট দেখা দিলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি দ্রুত চাপে পড়ে। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ ওই প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়।
সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বিভিন্ন দেশ স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি ব্যবহার কমানোর পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নগরায়ণ ও শিল্প সম্প্রসারণের কারণে দীর্ঘ সময় বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে রাখা সম্ভব নয়।
২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্যুতের চাহিদা ১০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টার বেশি বাড়তে পারে। তথ্যভান্ডার পরিচালনাকেন্দ্র, বৈদ্যুতিক যানবাহন, নতুন শিল্পাঞ্চল এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ এই বাড়তি চাহিদার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ অবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে অনেক দেশ পরমাণু শক্তির দিকে নজর দিচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম ২০৩৫ সালের আগেই নিজেদের প্রথম পরমাণু চুল্লি চালুর জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডও তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় পরমাণু শক্তি যুক্ত করার সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে।
এসব দেশের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে তুলনামূলক ছোট আকারের মডুলার চুল্লি। প্রচলিত বৃহৎ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় এগুলো ছোট, পর্যায়ক্রমে স্থাপনযোগ্য এবং সীমিত বিদ্যুৎব্যবস্থার দেশগুলোর জন্য তুলনামূলকভাবে উপযোগী বলে বিবেচিত হচ্ছে।
পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুধু একটি প্রকল্প নয়
পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সমস্যা হলো শুরুতেই বিপুল অর্থের প্রয়োজন এবং দীর্ঘ নির্মাণকাল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন পরমাণু চুল্লি নির্মাণের সংখ্যা কমে গেছে। দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়া, নির্মাণদক্ষতার ঘাটতি এবং সরবরাহব্যবস্থার জটিলতার কারণে অনেক প্রকল্পের সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে।
এর বিপরীতে নতুন নির্মিত চুল্লিগুলোর একটি বড় অংশ এখন এশিয়ায় তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা দেখিয়েছে। এ কারণেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কাছে তাদের প্রস্তাব বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে কোনো দেশ প্রথমবার পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে চাইলে শুধু একটি চুল্লি কিনলেই কাজ শেষ হয় না। প্রয়োজন হয় স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, দক্ষ জনবল, নিরাপত্তা সংস্কৃতি, জরুরি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য সংরক্ষণ, আইনগত কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণব্যবস্থা।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার হিসাবে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে একটি নতুন দেশকে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগতে পারে।
বর্তমানে একটি চুল্লির কার্যকর আয়ু প্রায় ৬০ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর নিরাপদে চুল্লি বন্ধ ও অপসারণ করতেও আরও ১০ থেকে ২৫ বছর প্রয়োজন হয়। ফলে বিদেশ থেকে একটি চুল্লি কেনা বাস্তবে প্রায় ১০০ বছরের রাজনৈতিক, কারিগরি, শিক্ষাগত, আইনগত ও সরবরাহগত সম্পর্কের সূচনা করতে পারে।
এখানেই পরমাণু শক্তির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট। একটি দেশ কার প্রযুক্তি বেছে নিচ্ছে, সেই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের কয়েক প্রজন্ম ধরে তার পররাষ্ট্রনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
রাশিয়ার পুরোনো প্রভাব, কিন্তু বাড়ছে বাধা
বিশ্বের প্রধান পরমাণু চুল্লি রপ্তানিকারকদের মধ্যে রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটম এখনো রপ্তানি করা চুল্লির সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে।
রোসাটমের বড় সুবিধা হলো প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি প্রস্তুত, চুল্লি নির্মাণ, পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট সেবাসহ প্রায় পুরো পরমাণু জ্বালানিচক্র পরিচালনা করতে পারে। নির্মাণ, মালিকানা ও পরিচালনার সমন্বিত ব্যবস্থা নতুন পরমাণু শক্তি গ্রহণকারী দেশগুলোর কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থায়ন ও সরবরাহ সক্ষমতায় বড় চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার পরিচালিত প্রকল্পে বিলম্বের ঝুঁকি বেড়েছে।
অর্থাৎ রাশিয়ার প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
চীনের শক্তি কম ব্যয় ও দ্রুত নির্মাণ
চীনও মূলত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরমাণু চুল্লি রপ্তানির চেষ্টা করছে। চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার করপোরেশন এবং চায়না জেনারেল নিউক্লিয়ার পাওয়ার গ্রুপ এই খাতে প্রধান ভূমিকা পালন করছে।
একসময় চীন ২০৩০ সালের মধ্যে অঞ্চল ও পথ উদ্যোগের অংশীদার দেশগুলোতে ৩০টি চুল্লি নির্মাণের লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাকিস্তানেই চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে চুল্লি নির্মাণ করেছে।
পাকিস্তানের চুল্লিগুলোর মালিকানা ও পরিচালনা সরাসরি চীনের হাতে না থাকলেও সেগুলোর জ্বালানি সরবরাহে চীনের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। এই নির্ভরতা দেখায়, পরমাণু প্রকল্পে প্রযুক্তির পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের উপায় হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কাছে চীনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো তুলনামূলক কম ব্যয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণ শেষ করার সক্ষমতা। যেসব দেশ ২০৩৫ সালের আগেই চুল্লি চালু করতে চায়, তাদের জন্য সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে চীনের প্রকল্পে তথ্যের স্বচ্ছতা, নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য প্রকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি জবাবদিহি নিয়ে কিছু দেশের উদ্বেগও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো
যুক্তরাষ্ট্রে পরমাণু চুল্লি রপ্তানির নেতৃত্ব মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। তবে সরকার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, অর্থায়ন ও কূটনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের সহায়তা করে।
যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু নিরাপত্তা, অপ্রসারণ নীতি, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং জনবল তৈরির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছে। নতুন পরমাণু শক্তি গ্রহণকারী দেশগুলোকে দায়িত্বশীলভাবে ছোট মডুলার চুল্লি ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচিও পরিচালনা করা হচ্ছে।
উচ্চ প্রাথমিক ব্যয়ের চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি-আমদানি ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থার মাধ্যমে ঋণ, নিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে সরবরাহ করা চুল্লির ব্যবহৃত জ্বালানি সাধারণত ফেরত নেয় না। ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ নিয়ে দেশটিতে নীতিগত আলোচনা বাড়লেও বিষয়টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব, নিরাপত্তা সংস্কৃতি এবং নিয়ন্ত্রক মানকে মূল্য দেয়। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পরমাণু সহযোগিতার জন্য পরিচিত ১২৩ চুক্তি করেছে। মালয়েশিয়াও এ ধরনের চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরুর জন্য একটি সমঝোতা স্মারক সম্পন্ন করেছে।
এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে অঞ্চলটির পরমাণু আইন, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব তৈরি করেছে।
চীনের লিংলং ওয়ান ঘিরে আশা ও সংশয়
চীন ২০১৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটের সঙ্গে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা শুরু করে। রাষ্ট্রীয় পরমাণু প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে আঞ্চলিক জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা তৈরিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
চীনের লিংলং ওয়ান বিশ্বের প্রথম স্থলভিত্তিক ছোট মডুলার চুল্লি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে। এটি চীনের জন্য বড় প্রযুক্তিগত অর্জন এবং অঞ্চল ও পথ উদ্যোগের অংশীদার দেশগুলোর কাছে সম্ভাব্য রপ্তানি পণ্য।
তবে চীনের প্রথম লিংলং ওয়ানের বাণিজ্যিক কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে শুরু হয়নি। প্রকল্প সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় এটি সফলভাবে চালু করা যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরীক্ষিত প্রযুক্তি এবং প্রথমবার ব্যবহৃত প্রযুক্তির ঝুঁকি এক নয়। কোনো নতুন নকশা বেছে নেওয়ার আগে নিরাপত্তা, নির্মাণব্যয়, জ্বালানি সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার বাস্তব প্রমাণ প্রয়োজন।
ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতি
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিয়ন্ত্রক সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু প্রতিষ্ঠান থরকন ইন্টারন্যাশনাল ইন্দোনেশিয়ার পরমাণু নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাপেতেনের কাছ থেকে গলিত লবণভিত্তিক চুল্লির জন্য প্রথম পর্যায়ের অনুমোদন পায়।
এটি সরাসরি চুল্লি নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমতি নয়। তবে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়ার আগ্রহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সহযোগিতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ম্যানিলা ইলেকট্রিক কোম্পানিকে যুক্তরাষ্ট্রের ছোট মডুলার চুল্লি বিদ্যুৎব্যবস্থায় যুক্ত করার সম্ভাবনা যাচাইয়ে সহায়তা করেছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলোর সঙ্গে মার্কিন পরমাণু শিল্পের যোগাযোগ বাড়াতে একটি বিশেষ রপ্তানি কর্মদল গঠন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ দেখায়, যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তে একটি সমন্বিত রপ্তানি কৌশল তৈরির চেষ্টা করছে।
তবে বড় সমস্যা হলো নির্মাণ সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব বাজারেই সাম্প্রতিক সময়ে নতুন পরমাণু প্রকল্প সময়মতো শেষ করার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা গেছে। শুধু উন্নত নকশা ও কঠোর নিরাপত্তাবিধি দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার জয় করা কঠিন হবে, যদি প্রকল্প দ্রুত ও নির্ধারিত ব্যয়ে শেষ করা না যায়।
দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের কৌশলগত ভূমিকা
যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাণসংক্রান্ত দুর্বলতা পূরণে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোরিয়া হাইড্রো অ্যান্ড নিউক্লিয়ার পাওয়ার সংযুক্ত আরব আমিরাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চারটি বড় চুল্লি নির্মাণ করেছে। এই সাফল্যের পর প্রতিষ্ঠানটি মিসর ও চেকিয়ায় নতুন কাজ পেয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইনের ম্যানিলা ইলেকট্রিক কোম্পানি এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে ছোট মডুলার চুল্লি সহযোগিতার সমঝোতা স্মারকও করেছে।
অন্যদিকে জাপান পরমাণু শিল্পের ভারী যন্ত্রাংশ সরবরাহে বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। জাপান স্টিল ওয়ার্কস বিশ্বের বড় পরমাণু চুল্লির জন্য প্রয়োজনীয় বৃহৎ জালাই করা ধাতব যন্ত্রাংশের প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে।
২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্র-জাপান বাণিজ্য সমঝোতায় জাপানের শিল্প সক্ষমতা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু শক্তি খাত পুনর্গঠনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সম্মিলিত উদ্যোগ শুধু রাজনৈতিক জোট নয়। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রক মান, দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাণ অভিজ্ঞতা এবং জাপানের শিল্প সরবরাহ সক্ষমতাকে একত্র করার চেষ্টা রয়েছে।
নতুন অংশীদারিত্বে চীনের পাল্টা প্রস্তুতি
চীনও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রকাশের পর চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার করপোরেশন চায়না এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, টিবিইএ এবং ব্যাংক অব চায়নার সঙ্গে নতুন সহযোগিতা চুক্তি করেছে।
চায়না এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন বিশ্বের ১৪০টি দেশ ও অঞ্চলে জ্বালানি প্রকল্প পরিচালনা করে। টিবিইএ নবায়নযোগ্য শক্তি ও বিদ্যুৎ সঞ্চালনের পূর্ণাঙ্গ সমাধান দেয়। আর ব্যাংক অব চায়না বড় প্রকল্পে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এই অংশীদারিত্ব থেকে বোঝা যায়, চীন সরাসরি পরমাণু চুল্লি বিক্রির আগে কোনো দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চাইছে। প্রথমে সঞ্চালন, নবায়নযোগ্য শক্তি, নির্মাণ ও অর্থায়নে প্রবেশ করে পরে পরমাণু প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।
এটি দীর্ঘমেয়াদি বাজার তৈরির কৌশল। একটি দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে চীনা প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে ভবিষ্যতে চীনা পরমাণু প্রযুক্তি গ্রহণ করা তুলনামূলক সহজ হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অন্যদিকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে।
পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রেও তারা একই ধরনের ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইছে। কিন্তু একটি পরমাণু চুল্লির সঙ্গে শতবর্ষব্যাপী প্রযুক্তি, জ্বালানি, প্রশিক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সম্পর্ক জড়িয়ে থাকায় এই ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে না।
শুধু কম দাম দেখে চীনের প্রযুক্তি গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে জ্বালানি ও কারিগরি সহায়তার ওপর নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি বেছে নিলে উচ্চ ব্যয়, দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং নির্মাণ বিলম্বের ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাণদক্ষতা ও জাপানের শিল্প সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে শক্তিশালী করতে পারে। একইভাবে চীনের রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা তার অবস্থানকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে অন্তত পাঁচটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে—নিরাপত্তা, নির্মাণব্যয়, সময়, জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবহৃত জ্বালানি ও বর্জ্যের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা।
পরমাণু শক্তি কি উন্নয়নের পথ, নাকি নতুন নির্ভরতা
পরমাণু শক্তি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে নিরবচ্ছিন্ন ও কম কার্বননির্ভর বিদ্যুৎ দিতে পারে। শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং বৈদ্যুতিক পরিবহন সম্প্রসারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো সাধারণ বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়। ভুল প্রযুক্তি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ বা অস্বচ্ছ অর্থায়ন একটি দেশকে কয়েক দশক ধরে আর্থিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া নয়, বরং নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে উন্নত প্রযুক্তি, ভালো অর্থায়ন, শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক চুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
পরমাণু চুল্লি রপ্তানির বর্তমান প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত শুধু বিদ্যুৎ বিক্রির লড়াই নয়। এটি আগামী এক শতাব্দীতে কোন দেশ প্রযুক্তি, জ্বালানি ও কৌশলগত প্রভাবের কেন্দ্র হবে, সেই প্রশ্নেরও অংশ।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট, দ্রুত বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদা এবং বড় শক্তিগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামনে এখন একদিকে বড় সুযোগ, অন্যদিকে গভীর ঝুঁকি। ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে পরমাণু শক্তি তাদের স্বাধীনতা শক্তিশালী করবে, নাকি নতুন ধরনের দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা তৈরি করবে।

