ভারতের আসাম রাজ্যে বন্যা পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় রাজ্যজুড়ে মানবিক সংকট গভীর হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বন্যাজনিত বিভিন্ন ঘটনায় ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছরের বন্যায় মোট প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৩১ জনে পৌঁছেছে।
বুধবার (২২ জুলাই) প্রকাশিত আসাম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ বুলেটিনে জানানো হয়েছে, বর্তমানে রাজ্যের ১৬টি জেলা বন্যায় আক্রান্ত। এসব এলাকায় ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মাত্র একদিন আগেও এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৬৩ হাজারের কিছু বেশি, যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে শিবসাগর জেলায়, যেখানে একদিনেই ১৩ জন মারা গেছেন। এছাড়া চরাইদেও জেলায় ৫ জন, গোলাঘাটে ২ জন এবং জোরহাটে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, বন্যা পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনা এবং ত্রাণ কার্যক্রম তদারকির জন্য তিনি বুধবার থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো সফর শুরু করবেন। তিনি বলেন, উজানের মেঘভাঙা বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট এই বন্যায় হাজার হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গোলাঘাট, কামরূপ, হোজাই, ডিব্রুগড়, বিশ্বনাথ, ধেমাজি, সোনিতপুর, উদালগুড়ি, নগাঁও, চরাইদেও, কামরূপ (মেট্রো), জোরহাট, তিনসুকিয়া, কার্বি আংলং, লখিমপুর এবং শিবসাগর—এই ১৬টি জেলায় বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
বর্তমানে ৪৪টি রাজস্ব সার্কেলের আওতায় ৮৭২টি গ্রাম পানির নিচে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিবসাগর জেলা, যেখানে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩৫ জন বন্যাকবলিত। এছাড়া জোরহাটে ৮৭ হাজার ৬৬২ জন এবং চরাইদেওয়ে ৭২ হাজার ৬৪৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় সরকার ৭১টি ত্রাণশিবির চালু করেছে, যেখানে বর্তমানে ১২ হাজার ২৮৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় ২০২টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র থেকে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে।
বন্যার কারণে দিখৌ, দিসাং, ব্রহ্মপুত্র, বুড়িডিহিং এবং দক্ষিণ ধানসিরি নদীর বিভিন্ন স্থানে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রেললাইনে পানি উঠে যাওয়ায় টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে জানিয়েছে, শিমালুগুড়ি–নামতিয়ালি এবং শিমালুগুড়ি–সেলেংহাট রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি ট্রেন বাতিল, কিছু ট্রেনের রুট পরিবর্তন এবং যাত্রীসেবা বজায় রাখতে বিশেষ ট্রেন চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে ভারতের টেলিযোগাযোগ বিভাগ শিবসাগর, চরাইদেও ও জোরহাট জেলায় আগামী ২৪ জুলাই পর্যন্ত আন্তঃঅপারেটর রোমিং সুবিধা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে কোনো একটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়লেও গ্রাহকেরা অন্য অপারেটরের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে যোগাযোগ চালিয়ে যেতে পারবেন।

