ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পুরোনো হিসাব নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়েছে, বিভিন্ন উপসাগরীয় রাষ্ট্র ইরানি হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভূমিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর অসন্তোষ। তবে এই সংকট শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ বাড়ায়নি; একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক নিয়েও বাস্তবসম্মত মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরের অনেক দেশ মনে করেছিল, অর্থনৈতিক স্বার্থ যত গভীর হবে, চীন তত বেশি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় যুক্ত হবে। তাদের ধারণা ছিল, ইরানের ওপর চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ফলে সংকটের সময় বেইজিং তেহরানকে সংযত রাখতে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের সময় চীনের অপেক্ষাকৃত নিষ্ক্রিয় অবস্থান সেই প্রত্যাশায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
২১ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত মূল বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কাছে চীন এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হলেও দেশটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায় গ্রহণ করতে আগ্রহী নয়। অর্থাৎ বেইজিং ব্যবসা, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতে প্রস্তুত, কিন্তু সংঘাত নিয়ন্ত্রণ বা মিত্রদের সামরিকভাবে রক্ষা করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ঝুঁকি নিতে চায় না।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকেই জন্ম নিয়েছিল নিরাপত্তার প্রত্যাশা
চীন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্পর্কের মূল ভিত্তি জ্বালানি। ২০২৩ সালে চীনের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৩৬ শতাংশ এসেছিল উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য ছয়টি দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান ও বাহরাইন থেকে।
২০২৪ সালে চীনের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছে যায়। এই পরিমাণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত বাণিজ্যের চেয়েও বেশি ছিল। এমন গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণে উপসাগরের শাসকেরা ধরে নিয়েছিলেন, অঞ্চলটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে চীনের স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বেইজিং শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সক্রিয় হবে।
ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলো প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল চীনে পাঠাচ্ছিল। একই সময়ে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সম্পদ তহবিল চীনে বিপুল বিনিয়োগ করছিল। বেইজিং, হংকং ও সাংহাইয়ে এসব তহবিলের কার্যালয়ও খোলা হয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মহাকাশ প্রযুক্তি, নির্মাণ, খনিজ সম্পদ এবং আধুনিক কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা চুক্তি হয়। আরব উপদ্বীপে বসবাসরত চীনা নাগরিকের সংখ্যাও পাঁচ লাখের বেশি হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে চীনকে শুধু ক্রেতা বা বিনিয়োগকারী নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও দেখা শুরু হয়েছিল।
ইরানের ওপর চীনের প্রভাব নিয়ে আশাবাদ
দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে চীনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ২০২১ সালে চীন ও ইরান ২৫ বছর মেয়াদি একটি বিস্তৃত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে ইরানে চীনা বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের ইঙ্গিত ছিল।
এই সম্পর্কের কারণেই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ভেবেছিল, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক আচরণ করলে চীন তাকে সংযত করতে পারবে। বিশেষ করে সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে বেইজিংয়ের ভূমিকা এই প্রত্যাশাকে আরও শক্তিশালী করেছিল।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তি হয়। সৌদি আরব চীনকে ওই সমঝোতার নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এরপর চীন, ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে তিনটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সর্বশেষ বৈঠকটি হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তেহরানে।
সংঘাতপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যে এসব বৈঠককে বিরল কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, কোনো সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী হওয়া এবং সেই সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া এক বিষয় নয়।
কূটনৈতিক বার্তায় বেড়েছিল প্রত্যাশা
২০২২ সালে চীনের নেতা শি চিনপিং রিয়াদে অনুষ্ঠিত প্রথম চীন–আরব রাষ্ট্র সম্মেলন এবং চীন–উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানে স্বাক্ষরিত যৌথ বিবৃতিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিরোধপূর্ণ তিনটি দ্বীপের ওপর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দাবির বিষয়টি স্বীকার করা হয়।
এটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা ছিল। তাদের মনে হয়েছিল, চীন শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থ নয়, আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিরোধ নিয়েও অবস্থান নিতে শুরু করেছে।
২০২৩ সালের মার্চে সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর চীনা বিশ্লেষক ও কর্মকর্তারা একে নতুন ধরনের আঞ্চলিক সমঝোতার সূচনা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। বলা হচ্ছিল, দীর্ঘদিনের সংঘাত, স্থবিরতা ও অস্থিরতার পরিবর্তে মধ্যপ্রাচ্যে আপস ও সহযোগিতার নতুন ধারা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু কূটনৈতিক সাফল্যকে স্থায়ী নিরাপত্তা কাঠামোয় রূপ দিতে হলে রাজনৈতিক ঝুঁকি গ্রহণ, প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং প্রয়োজনে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া দরকার। চীন সেই পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত ছিল না।
চীনকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও সুবিধা চেয়েছিল উপসাগর
উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর আরেকটি হিসাব ছিল, চীনের উপস্থিতি বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রও অঞ্চলটিকে ধরে রাখতে আরও আগ্রহী হবে। ফলে দুই বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে তারা অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা সুবিধা আদায় করতে পারবে।
চীনা টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের দুবাই ও রিয়াদে বড় কার্যক্রম রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে হুয়াওয়ের প্রযুক্তি থেকে দূরে সরাতে চাইলেও গ্রহণযোগ্য বিকল্পের অভাবে সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা উপসাগরের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে। ২০২৫ সালের মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপসাগর সফর করার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার কাছ থেকে উন্নত গণনাযন্ত্রের বিশেষ অংশ সংগ্রহের জন্য বড় চুক্তি করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার পরিকল্পনায় এসব চুক্তি অপরিহার্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
উপসাগরের রাষ্ট্রগুলো তখন মনে করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের আগ্রহ তাদের বিকল্প বাড়াবে। কিন্তু নিরাপত্তা সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুই শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও সামরিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা এক নয়।
অক্টোবর ২০২৩-এর পর পরিষ্কার হতে থাকে চীনের সীমা
২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় চীন নিজেকে শান্তির পক্ষে একটি শক্তি হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে সংঘাতের গতিপথ বদলাতে পারেনি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বেইজিং বিভিন্ন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করে। কিন্তু এই উদ্যোগ মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। আলোচনার আয়োজন করা হলেও সংঘাত বন্ধ, স্থায়ী সমঝোতা অথবা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো ফল দেখা যায়নি।
২০২৩ সালের শেষদিকে হুতিরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে আক্রমণ শুরু করলে চীন ইরানের ওপর প্রকাশ্য চাপ সৃষ্টি করেনি। অথচ হুতিদের ওপর তেহরানের প্রভাব রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়।
চীন বরং নিজেদের পতাকাবাহী জাহাজ নিরাপদ রাখার জন্য হুতিদের সঙ্গে আলাদা সমঝোতার পথে যায়। এই পদক্ষেপ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে—বেইজিং সামগ্রিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থকে আলাদাভাবে রক্ষা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
ইরান যুদ্ধ ভেঙে দিল শেষ আশাটুকু
চলতি বছরের ইরান যুদ্ধে চীন তার প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে উপসাগরীয় অংশীদারদের ওপর হামলা থেকে বিরত রাখতে পারেনি বা চেষ্টা করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে হতাশাজনক। কারণ ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তিতে চীন নিশ্চয়তাদাতার ভূমিকা পালন করেছিল।
চীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে ইরানকে প্রকাশ্যে বড় ধরনের সামরিক সহায়তা দেয়নি। তবুও উপসাগরের কয়েকটি দেশে ধারণা তৈরি হয়েছে, বেইজিংয়ের কিছু সিদ্ধান্ত পরোক্ষভাবে তেহরানকে সুবিধা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল রক্ষায় আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যে প্রস্তাব আনা হয়েছিল, চীন তাতে বাধা দেয়। পাশাপাশি কিছু চীনা প্রতিষ্ঠান ইরানকে ভৌগোলিক অবস্থানভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে আরও নির্ভুল হামলা চালাতে সহায়তা করেছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক উপলব্ধিতে এর প্রভাব গভীর। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আস্থা শুধু প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে না; সংকটের সময় একটি দেশ কী করে বা কী করে না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
চীন কেন দায়িত্ব নিতে চায় না
চীনের নিষ্ক্রিয়তার পেছনে শুধু স্বার্থপরতা নয়, কৌশলগত দ্বিধাও রয়েছে। ২০১০–১১ সালের আরব বসন্ত এবং পরবর্তী সময়ে ইসলামিক স্টেটের বিস্তারের পর থেকে চীনা নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে বিতর্ক চলছে।
একটি পক্ষ মনে করে, বৃহৎ শক্তি হিসেবে চীনকে নিজের স্বার্থ রক্ষা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য আরও সক্রিয় হতে হবে। কিন্তু সক্রিয় ভূমিকা বলতে ঠিক কী বোঝাবে, কখন সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হবে, কার পক্ষে অবস্থান নেওয়া হবে এবং কোনো একটি দেশের সঙ্গে গভীর অংশীদারত্বের রাজনৈতিক মূল্য কী হবে—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর তারা দিতে পারেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের ইতিহাস দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তি এখানে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে জড়িয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। চীনা নেতৃত্ব সম্ভবত মনে করে, সরাসরি দায়িত্ব না নিয়ে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া তুলনামূলক নিরাপদ।
২০২৪ সালে সিরিয়ায় বাশার আল–আসাদের পতন এবং ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধ বেইজিংয়ের উদ্বেগ আরও বাড়ায়। অঞ্চলটি দ্রুত নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাতের দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বোমা হামলা শুরু করার সময় চীনের কাছে নিজের অর্থনৈতিক সম্পদ রক্ষা এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়ানোর কোনো স্পষ্ট বিকল্প পরিকল্পনা ছিল না।
ফলে বেইজিংয়ের সিদ্ধান্তহীনতা শেষ পর্যন্ত উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগকে পাশ কাটিয়ে যায় এবং তাদের ইরানি হামলার মুখে আরও অনিরাপদ করে তোলে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক থামবে না
চীনের নিরাপত্তা ভূমিকা নিয়ে হতাশা থাকলেও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে না। কারণ উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক প্রয়োজন বাস্তব এবং দীর্ঘমেয়াদি।
স্বল্পমেয়াদে উপসাগরীয় দেশগুলো চীনে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখবে। দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বিদ্যুৎনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোলে সবুজ প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতি উপসাগরের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেরাও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে চায়। এই পরিবর্তনে সৌরশক্তি, বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক যান এবং উন্নত শিল্পপ্রযুক্তিতে চীনের দক্ষতা তাদের কাজে লাগবে।
উপসাগরীয় সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলো চীনের বাজারে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে পারে। অন্যদিকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো উপসাগরে খনি, নির্মাণ ও অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। চালকবিহীন উড়ন্ত যান, পানিনির্ভর কৃষি, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র এবং শিল্প সরবরাহব্যবস্থায় চীনের অর্থ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উপসাগরীয় দেশগুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
সমস্যা হলো, অর্থনৈতিক নির্ভরতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় রূপ নেয় না। ইরান যুদ্ধ সেই পার্থক্য স্পষ্ট করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া উপায় নেই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রও ঝুঁকির উৎস
উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সামনে এখন একটি কঠিন বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষা করার মতো সামরিক ক্ষমতা বর্তমানে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তই আবার অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হতে পারে।
চীন বিকল্প নিরাপত্তাদাতা হতে রাজি না হওয়ায় উপসাগরের দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন পথ বেছে নিচ্ছে। সৌদি আরব ও ওমান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অনুসরণের চেষ্টা করছে।
জুনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওমানকে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছিলেন বলে মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পর ওমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের পক্ষে আরও জোরালো অবস্থান নেয়।
১৩ জুলাই ফরাসি সংবাদপত্র ল্য মঁদে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়িদ বদর আল–বুসাইদি যুক্তরাষ্ট্র-পরবর্তী একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ার আহ্বান জানান। সেই কাঠামোয় উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো, ইরান ও ইরাককে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়।
অন্যদিকে বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের আরও কাছাকাছি যাচ্ছে। বিকল্প কোনো শক্তিশালী নিরাপত্তা রক্ষক না থাকায় এবং ইরানি হামলার চাপের মুখে এসব দেশ ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে থাকাকেই তুলনামূলক নিরাপদ মনে করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোও শুধু একটি শক্তির ওপর ভরসা করছে না। তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, উত্তেজনা কমাতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালু রাখছে এবং তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশের সঙ্গে অতিরিক্ত নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু প্রত্যাশা বদলে যাবে
চীন–উপসাগর সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বিচ্ছেদে নয়, বরং প্রত্যাশার পরিবর্তনে নির্ধারিত হবে। আগে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ভাবত, অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা একসময় চীনকে নিরাপত্তার দায় নিতে বাধ্য করবে। এখন তারা বুঝতে পারছে, বেইজিং অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করেও সামরিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে দূরে থাকতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অন্য পথ খুঁজতে থাকলে চীনের সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ার প্রয়োজন আরও কমে যাবে। বেইজিং তখন কম ঝুঁকিতে তেল, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নির্মাণকেন্দ্রিক সম্পর্ক চালিয়ে যেতে পারবে।
এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে চীন–ইরান সম্পর্কের মতো একটি বাস্তববাদী কাঠামোর দিকে যাচ্ছে। সেখানে উচ্চ প্রত্যাশার বদলে পারস্পরিক প্রয়োজনই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে। তবে ইরানের তুলনায় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বিনিয়োগের সামর্থ্য এবং চীনের জন্য জ্বালানি গুরুত্ব অনেক বেশি।
সুতরাং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কিন্তু সেই সুবিধা মূলত অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে। নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের এখনো যুক্তরাষ্ট্র, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে একটি কঠিন সত্য বুঝিয়েছে—চীন তাদের উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে, কিন্তু বিপদের সময় রক্ষক হওয়ার প্রতিশ্রুতি এখনো দেয়নি।

