বিশ্ব প্রযুক্তির নেতৃত্ব পাওয়ার লড়াইয়ে চীন এখন এমন একটি পথ বেছে নিয়েছে, যেখানে শক্তি ও দুর্বলতা পাশাপাশি হাঁটছে। একদিকে দেশটি নিজস্ব চিপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল সেবা তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। অন্যদিকে বিদেশি প্রযুক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সহযোগিতার ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে চীন নিজের উদ্ভাবনের পথই সংকুচিত করে ফেলছে কি না, সেই প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এনভিডিয়ার চিপ নিয়ে অদ্ভুত অবস্থান
গত বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, চীনে উন্নত চিপ রপ্তানির ওপর আরোপিত কিছু নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হবে। এর ফলে অনুমোদিত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এনভিডিয়া তাদের এইচ২০০ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ বিক্রি করার সুযোগ পায়।
এই সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের একদল আইনপ্রণেতা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাদের মতে, চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি বাণিজ্য সমঝোতা করতে গিয়ে ট্রাম্প হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দেশটির প্রযুক্তিগত সুবিধা ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এনভিডিয়ার উন্নত চিপ কিনতে আগ্রহী হলেও বেইজিং নিজেই এইচ২০০ চিপের নতুন ক্রয়াদেশে বাধা দেয়। পরে কিছু প্রতিষ্ঠানকে সীমিতভাবে এসব চিপ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকে।
এর কারণ স্পষ্ট। চীনা কর্তৃপক্ষ চায়, দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি চিপের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে তৈরি চিপ ব্যবহার করুক। এমনকি সেই চিপের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম হলেও বেইজিং দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
এখানেই চীনের প্রযুক্তি নীতির মূল দ্বন্দ্বটি সামনে আসে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সবচেয়ে উন্নত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা দরকার। কিন্তু রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে চীন নিজেই অনেক প্রতিষ্ঠানকে সেই উন্নত প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখছে।
আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য, বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি
চীনের নেতৃত্ব বহু বছর ধরে এমন একটি প্রযুক্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে গবেষণা হবে চীনা পরীক্ষাগারে, পণ্য তৈরি হবে চীনা কারখানায় এবং সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকবে চীনের নিয়ন্ত্রণে।
এই পরিকল্পনার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। বেইজিং মনে করে, বিদেশি প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো শক্তি নিষেধাজ্ঞা দিলে যেন চীনের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প থেমে না যায়, সে জন্য দেশটি নিজস্ব বিকল্প তৈরি করতে চাইছে।
এই কৌশল যে পুরোপুরি ব্যর্থ, তা বলা যাবে না। ইউরোপের রাস্তায় এখন বিপুলসংখ্যক চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি চলছে। ডিপসিক ও জেড ডট এআইয়ের মতো চীনা প্রতিষ্ঠানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সতর্ক করে দিয়েছে।
কিন্তু সাফল্যের এই দৃশ্যের আড়ালে একটি বড় বিপদ রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি কোনো একটি দেশের সীমানার মধ্যে তৈরি হয় না। গবেষণা, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, মেধা, সফটওয়্যার ও উৎপাদন—সবকিছু মিলিয়ে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কাজ করে। সেই ব্যবস্থা থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করলে চীন হয়তো নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বিশ্বের সেরা প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত করবে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অর্ধপরিবাহী চিপের মতো খাতে এই বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘমেয়াদে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।
একসময় বিদেশি প্রযুক্তিই বদলে দিয়েছিল চীনকে
চীনের বর্তমান প্রযুক্তিগত শক্তির পেছনে শুধু সরকারি অর্থ বা দেশীয় গবেষণা কাজ করেনি। দেশটির অতীতের উন্মুক্ত নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
১৯৮০-এর দশকে চীন যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অর্থনীতির দরজা খুলতে শুরু করে, তখন দেশটির অধিকাংশ শিল্প ছিল পুরোনো এবং তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। আধুনিক কারখানা পরিচালনা, উন্নত যন্ত্রপাতি তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনের অভিজ্ঞতা চীনের হাতে খুব বেশি ছিল না।
সেই সময় চীন বিদেশি প্রযুক্তি, উৎপাদনপদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা কৌশল দ্রুত গ্রহণ করে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো চীনে কারখানা স্থাপন করে। চীনা শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা নতুন দক্ষতা অর্জন করেন। বিদেশি পণ্য ও প্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে দেশীয় বিকল্প তৈরির পথও খুলে যায়।
এরপর বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকেরা নির্দিষ্ট কিছু শিল্পকে রক্ষা ও এগিয়ে নিতে ভর্তুকি, ঋণ, অবকাঠামো এবং সরকারি সহায়তা দেন। এই সমন্বিত কৌশল চীনকে টেলিযোগাযোগ, দ্রুতগতির রেল এবং বিভিন্ন উৎপাদনশিল্পে শীর্ষ অবস্থানে নিয়ে যায়।
অর্থাৎ চীনের উত্থানের ইতিহাস বলছে, বিদেশি জ্ঞান গ্রহণ এবং দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করার মধ্যে ভারসাম্যই ছিল সাফল্যের একটি বড় কারণ। বর্তমান নীতিতে সেই ভারসাম্য দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
মহাপ্রাচীরের ভেতরে আলাদা ডিজিটাল জগৎ
ইন্টারনেটের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বেইজিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। সরকার মনে করে, উন্মুক্ত ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে এমন রাজনৈতিক ধারণা, তথ্য ও মতামত চীনা নাগরিকদের কাছে পৌঁছাতে পারে, যা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এই আশঙ্কা থেকেই চীন একটি কঠোর ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলে, যা সাধারণভাবে চীনের মহা অগ্নিপ্রাচীর নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে ফেসবুক, গুগল এবং এক্সের মতো বৈশ্বিক সেবা চীনের বাজার থেকে কার্যত বাদ পড়ে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুপস্থিতিতে বাইদু, টেনসেন্ট এবং উইচ্যাটের মতো চীনা প্রতিষ্ঠান দ্রুত বড় হয়ে ওঠে। চীনের বিশাল জনসংখ্যা তাদের জন্য প্রায় সুরক্ষিত বাজার তৈরি করে দেয়। প্রতিবেদনের হিসাবে, এসব প্রতিষ্ঠান প্রায় ১.১ বিলিয়ন গ্রাহকের একটি বাজার অনেকটাই নিজেদের মধ্যে ধরে রাখতে পেরেছিল।
কিন্তু বিশাল দেশীয় বাজার থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাপী মেটা বা অ্যালফাবেটের মতো গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তারা মূলত চীনা বাজার, চীনা ভাষা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে উঠেছে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবহারকারীদের চাহিদা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম টিকটক। চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্স এটি প্রতিষ্ঠা করলেও টিকটক নিজেই চীনের ভেতরে পরিচালিত হয় না। চীনা ব্যবহারকারীদের জন্য রয়েছে আলাদা সেবা দৌইন।
চীনে গেলে এই আলাদা ডিজিটাল বাস্তবতা সহজেই চোখে পড়ে। মানুষ হোয়াটসঅ্যাপ বা সিগন্যালের বদলে উইচ্যাটে বার্তা পাঠায়। ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের বদলে ব্যবহার করে ওয়েইবো, রেডনোট ও দৌইন।
এই ব্যবস্থা চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশীয় বাজারে বড় করেছে, কিন্তু বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার জন্য যে উন্মুক্ততা ও বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা দরকার, তা সবসময় নিশ্চিত করতে পারেনি।
শি জিনপিংয়ের সময়ে নীতি আরও কঠোর
প্রায় এক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে শুরু করলে শি জিনপিং প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরতার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেন।
চীনের নেতৃত্ব বুঝতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা একটি জাতীয় নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতা। একই সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব না পেলে চীনের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাও একসময় থেমে যেতে পারে।
এ কারণে সরকার দেশীয় গবেষণা, উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থা সম্প্রসারণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে শুরু করে। নিজস্ব অর্ধপরিবাহী চিপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য উদীয়মান শিল্পে শত শত বিলিয়ন ডলার সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত শিল্পগুলোর সমপর্যায়ে পৌঁছানো এবং সম্ভব হলে তাদের ছাড়িয়ে যাওয়া।
বৈদ্যুতিক গাড়িতে সাফল্য, চিপে কঠিন পরীক্ষা
কিছু ক্ষেত্রে চীনের পরিকল্পনা উল্লেখযোগ্যভাবে সফল হয়েছে। দেশটি বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রায় সম্পূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে। গাড়ির ব্যাটারি, যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার ও উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে।
কিন্তু বৈদ্যুতিক গাড়িতে যা সম্ভব হয়েছে, অর্ধপরিবাহী চিপে তা করা অনেক বেশি কঠিন।
উন্নত চিপ তৈরির প্রক্রিয়ায় অসংখ্য দেশের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকে। কোথাও চিপের নকশা তৈরি হয়, কোথাও উৎপাদনের যন্ত্র বানানো হয়, কোথাও বিশেষ রাসায়নিক ও কাঁচামাল প্রস্তুত হয়, আবার অন্য কোনো দেশে চিপ তৈরি ও পরীক্ষা করা হয়।
প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ২০২২ সালে চীনের কাছে উন্নত মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ এবং চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার পর বেইজিং নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা আরও জোরদার করে।
তবে কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্কট কেনেডির মতে, এত জটিল বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে একটি দেশের মধ্যে নতুন করে তৈরি করা কার্যত অসম্ভব। তাঁর মূল্যায়নে, এমন প্রচেষ্টা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতীও হয়ে উঠতে পারে।
চীন তবু নিজস্ব চিপশিল্প তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাবে। কারণ বেইজিংয়ের কাছে বিষয়টি শুধু ব্যবসায়িক নয়, জাতীয় ক্ষমতা ও নিরাপত্তার অংশ।
একই প্রযুক্তি নতুন করে তৈরির খরচ
আত্মনির্ভরতার এই প্রচেষ্টায় চীনকে এমন অনেক প্রযুক্তি নতুন করে তৈরি করতে হচ্ছে, যা বিশ্বের অন্য অংশে ইতিমধ্যেই রয়েছে।
এর ফলে একই ধরনের গবেষণায় বিপুল অর্থ, জনবল এবং সময় ব্যয় হচ্ছে। চীনা চিপশিল্প অগ্রগতি অর্জন করলেও উন্নত পশ্চিমা চিপের তুলনায় এখনো পিছিয়ে রয়েছে। এই ব্যবধান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলছে।
সবচেয়ে উন্নত মডেল তৈরি ও প্রশিক্ষণের জন্য উচ্চক্ষমতার চিপ দরকার। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন তুলনামূলকভাবে দুর্বল চিপ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, তখন তাদের গবেষণার গতি ও সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ পল ট্রায়োলোর মতে, সীমান্ত পেরিয়ে প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়ের মধ্য দিয়েই অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন ঘটে। অর্ধপরিবাহী শিল্পে এই সহযোগিতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে এখন দুটি বিচ্ছিন্ন প্রযুক্তি ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। এই বিভাজনের ফলে এমন অনেক আবিষ্কার ও উন্নয়ন হয়তো আর ঘটবে না, যা দুই পক্ষের প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও প্রকৌশলীদের পারস্পরিক সহযোগিতায় সম্ভব হতে পারত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য সুরক্ষিত বাজার
চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোও দেশটির ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানের মতো একটি সুরক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত বাজারে বেড়ে উঠছে।
চীনা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবহারকারীদের ডিপসিক, আলিবাবা, মুনশট এবং অন্যান্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি মডেল ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি বা অ্যানথ্রপিকের ক্লডের মতো বিদেশি সেবা সহজে ব্যবহার করা যায় না।
এর ফলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিশাল বাজার পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ব্যবহারকারীরা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত কিছু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমন এক সময়ে এটি ঘটছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা, ব্যবসা, গবেষণা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক যোগাযোগে দ্রুত পরিবর্তন আনছে।
সুরক্ষিত বাজার স্বল্প মেয়াদে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু কঠিন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থাকলে তাদের সক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা হয় না। দীর্ঘ মেয়াদে এটি মান, নিরাপত্তা এবং উদ্ভাবনের গতি কমিয়ে দিতে পারে।
মানুস অধিগ্রহণে বেইজিংয়ের হস্তক্ষেপ
এপ্রিল মাসে চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো একটি অস্বাভাবিক পদক্ষেপ নেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা মেটাকে সিঙ্গাপুরভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান মানুস অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে নির্দেশ দেয়।
মানুস চীনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং বিস্তারিত গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য পরিচিত। মেটার প্রস্তাবিত অধিগ্রহণের মূল্য ছিল ২ বিলিয়ন ডলার।
চীনা কর্তৃপক্ষ জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে লেনদেনটির বিরোধিতা করে। এই পদক্ষেপ চীনা প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের কাছে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছে দেয়—বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গভীর সহযোগিতা সরকারের চোখে সন্দেহজনক হয়ে উঠতে পারে।
এ ধরনের নীতি উদ্যোক্তাদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করে। একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক অংশীদার, বিনিয়োগকারী বা ক্রেতা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হলে তার বিকাশের পথও সংকুচিত হয়।
উন্মুক্ত মডেলের সাফল্যও ঝুঁকিতে
চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হওয়ার একটি কারণ হলো, তাদের অনেকগুলো উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করা যায়। বিভিন্ন দেশের গবেষক ও প্রতিষ্ঠান এসব মডেল গ্রহণ, পরিবর্তন ও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারে।
এই উন্মুক্ততার কারণে চীনা প্রযুক্তি দ্রুত আন্তর্জাতিক ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছেছে। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা নিয়ন্ত্রকেরা এখন উন্নত মডেলে বিদেশি প্রবেশাধিকার সীমিত করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
তাদের আশঙ্কা, বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীরা চীনা গবেষণা ও দক্ষতা ব্যবহার করে নিজেদের শক্তিশালী করতে পারে।
কিন্তু এমন বিধিনিষেধ কার্যকর হলে ফল উল্টোও হতে পারে। বিদেশি ব্যবহারকারীরা যদি সহজে চীনা মডেল পরীক্ষা বা পরিবর্তন করতে না পারে, তাহলে এসব মডেলের আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা কমে যেতে পারে। যে উন্মুক্ততা চীনকে বিশ্ববাজারে পরিচিত করেছে, সেই সুবিধাই দুর্বল হয়ে পড়বে।
মডেল থেকে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে—এমন ধারণার পক্ষে আরেকটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ করছে, কিছু চীনা প্রতিদ্বন্দ্বী উন্নত মার্কিন মডেলের সক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেদের মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই প্রক্রিয়াকে মডেল থেকে জ্ঞান নিষ্কাশন হিসেবে বর্ণনা করা যায়।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দুই সিনেটরের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে অ্যানথ্রপিক অভিযোগ করে, আলিবাবা তাদের ক্লড মডেলের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত জানা সবচেয়ে বড় জ্ঞান নিষ্কাশন অভিযান চালিয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের দাবি অনুযায়ী, আলিবাবার কুয়েন মডেলের জন্য প্রায় ২৫,০০০ ভুয়া হিসাব ব্যবহার করে ক্লডের মূল্যবান সক্ষমতা সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে এটি অ্যানথ্রপিকের অভিযোগ। আলিবাবার একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
অ্যানথ্রপিক পরে ক্লডের নিরাপত্তা শক্তিশালী করেছে এবং অননুমোদিতভাবে মডেল ব্যবহার করা চীনা হিসাব শনাক্ত করার চেষ্টা বাড়িয়েছে। এর ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উন্নত মার্কিন মডেলে প্রবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই ঘটনাও প্রযুক্তি জগতের বিভক্তিকে আরও গভীর করছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে সহযোগী হিসেবে না দেখে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি ও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করছে।
দুটি আলাদা প্রযুক্তি বিশ্ব কি তৈরি হচ্ছে?
পল ট্রায়োলোর ধারণা, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগৎ দুটি আলাদা অংশে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। একটি অংশের কেন্দ্রে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যটির কেন্দ্রে থাকবে চীন।
দুই ব্যবস্থার নিজস্ব চিপ, সফটওয়্যার, তথ্যভান্ডার, নিয়ম এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থাকবে। তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা হবে খুবই সীমিত।
এমন পরিস্থিতিতে চীন হয়তো নিজস্ব একটি বড় প্রযুক্তি অঞ্চল গড়ে তুলতে পারবে। দেশটির বিশাল বাজার, সরকারি সহায়তা এবং উৎপাদনক্ষমতা তাকে টিকে থাকার সুযোগ দেবে।
কিন্তু টিকে থাকা আর নেতৃত্ব দেওয়া এক বিষয় নয়।
বিশ্বের সেরা গবেষণা, প্রতিভা, যন্ত্রপাতি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছাড়া চীন নিজের প্রযুক্তি ব্যবস্থার মধ্যে বন্দী হয়ে যেতে পারে। তখন দেশীয় পণ্য ব্যবহারকারী পাওয়া গেলেও সেগুলো আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণ করতে পারবে কি না, তা অনিশ্চিত।
আত্মনির্ভরতা ও উন্মুক্ততার ভারসাম্যই আসল
চীনের উদ্বেগ পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছে, বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা রাজনৈতিক চাপ তৈরির অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। কোনো দেশই চাইবে না, তার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের ভবিষ্যৎ অন্য দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করুক।
তাই নিজস্ব চিপ, সফটওয়্যার ও গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানো চীনের জন্য যৌক্তিক।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন আত্মনির্ভরতার অর্থ হয়ে দাঁড়ায় বিদেশি প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা। নিজের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিশ্বের সেরা জ্ঞান গ্রহণ—এই দুটি লক্ষ্য একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। চীনের অতীত সাফল্যও সেই কথাই প্রমাণ করে।
অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে সাময়িক সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু প্রতিযোগিতার চাপ থেকে দূরে রাখে। বিদেশি প্রযুক্তি বন্ধ করলে স্থানীয় বিকল্পের বাজার তৈরি হয়, কিন্তু সেই বিকল্প সত্যিই উন্নত কি না, তা যাচাই করার সুযোগ কমে যায়।
একটি প্রতিষ্ঠানের পণ্য যদি কেবল সরকারি নীতি ও বিদেশি প্রতিযোগীর অনুপস্থিতির কারণে জনপ্রিয় হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত নয়।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
চীন কি নিজস্ব পথে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমান শক্তিশালী একটি বিকল্প প্রযুক্তি বিশ্ব তৈরি করতে পারবে?
নাকি চারদিকে কঠোর দেয়াল তুলে দেশটি নিজের উদ্ভাবনী শক্তিকেই সীমিত করবে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই সম্ভাবনাই রয়েছে। চীনের হাতে বিপুল অর্থ, দক্ষ প্রকৌশলী, বিশাল বাজার এবং শক্তিশালী উৎপাদনব্যবস্থা আছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি শিল্পে দেশটি দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা দিয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জন করা সম্ভব।
তবে অর্ধপরিবাহী চিপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও বেশি আন্তর্জাতিক, জটিল এবং জ্ঞাননির্ভর ক্ষেত্র। এখানে শুধু অর্থ ব্যয় করলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। বিশ্বের সেরা প্রতিভা, গবেষণা, যন্ত্রপাতি ও ধারণার সঙ্গে সংযোগও প্রয়োজন।
চীন যদি নিরাপত্তার নামে সেই সংযোগ ক্রমাগত সীমিত করতে থাকে, তাহলে দেশটি একটি শক্তিশালী কিন্তু তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রযুক্তি ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।
প্রযুক্তির চারপাশে দুর্ভেদ্য দুর্গ নির্মাণ করে চীন হয়তো বাইরের চাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাবে। কিন্তু সেই দুর্গের দেয়াল যদি নতুন ধারণা, উন্নত যন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকেও আটকে দেয়, তাহলে প্রযুক্তি নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় দেশটির প্রথম হওয়ার স্বপ্ন আরও দূরে সরে যেতে পারে।

