যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে পারে ইরান। এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন তেহরানের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা। ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ ২০২৯ সালের ২০ জানুয়ারি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সূত্র: পিবিএস ও রয়টার্স
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) জেনারেল মোহাম্মদ রেজা নাকদি এ কথা জানিয়েছেন।
রেজা নাকদির বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের কৌশলের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে বোঝানো হচ্ছে যে ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কড়া মাশুল’ দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচারমাধ্যম পিবিএসকে দেওয়া এক বিরল সাক্ষাৎকারে ইরানি এই জেনারেল বলেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে ততই ইরানের অভিজ্ঞতা বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কীভাবে যুদ্ধ করতে হয়, সে বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ এর আগে ইরানের হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, গত পাঁচ মাসে ইরান এ ধরনের যুদ্ধের কৌশল ভালোভাবেই শিখে নিয়েছে।
চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আইআরজিসির এই জেনারেল সতর্ক করে বলেন, এমন পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘মস্ত বড় ভুল’ হয়ে উঠতে পারে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ওই হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিহত হন। এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনা এবং অন্যান্য সম্পদের ওপর পাল্টা হামলা শুরু করে।
ট্রাম্প ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই ইরানের একমাত্র লক্ষ্য কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জেনারেল নাকদি বলেন, ভবিষ্যতে যেন কোনো শত্রু ইরানের ওপর হামলা চালানোর সাহস না পায় এবং ইরান সম্পূর্ণ নিরাপদে বসবাস করতে পারে, সে জন্য একটি প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এর একটি উপায় হলো আগামী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং শত্রুকে ক্ষয়িষ্ণু করে ফেলা। এতে ভবিষ্যতে কেউ ইরানের ওপর হামলার কথা ভাবলে তার সম্ভাব্য মাশুল সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমার হুমকি নিয়েও কড়া বক্তব্য দিয়েছেন জেনারেল নাকদি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করে, তাহলে এর পরদিন সকালেই বিশ্বজুড়ে দেশটির সামরিক ঘাঁটিগুলো দখল করে নেওয়া হবে।
জেনারেল নাকদির ভাষায়, ‘তারা পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করার ঠিক পরদিন সকালেই বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যত সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তার সব কটি দখল করে নেওয়া হবে। আজকের পরিস্থিতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো নয়। বর্তমান বিশ্বের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। পৃথিবীর কোনো মানুষই এমন জঘন্য অপরাধ মেনে নেবে না। কারণ, তারা জানে, পরবর্তী সময়ে এ একই ঘটনার শিকার তারাও হতে পারে।’
ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো পরিকল্পনা করছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এই জেনারেল জানান, এর কোনো ‘প্রয়োজনই নেই’।
নিজ দেশের শক্তির উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে খামেনির এই সহযোগী বলেন, ‘আমাদের আসল পারমাণবিক বোমা হলো, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়; যা আমরা জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয় করেছি। তাই আমাদের পারমাণবিক বোমার কোনো প্রয়োজন নেই। কোনো ধরনের গণহত্যারও প্রয়োজন আমাদের নেই।’
ইরানিদের বহুল ব্যবহৃত ‘যুক্তরাষ্ট্র নিপাত যাক’ বা ‘ডেথ টু আমেরিকা’ স্লোগান নিয়েও বক্তব্য দেন জেনারেল নাকদি। মার্কিন রাজনীতিকদের এই স্লোগানের তীব্র সমালোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের সঙ্গে ইরানের কোনো শত্রুতা নেই।
তাঁর দাবি, ‘যুক্তরাষ্ট্র নিপাত যাক’ বলতে মূলত মার্কিন নেতৃত্ব বা প্রশাসনের ধ্বংস বোঝানো হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ‘কুখ্যাত নেতৃত্ব’ পরাশক্তি হওয়ার পর থেকে বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে বা আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করেছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়েও কথা বলেন জেনারেল নাকদি। তিনি জানান, ইরান শুধু দেশটিতে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ওপর নির্ভরশীল নয়। নিজেদের সামরিক শক্তির দর্শন ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ইরান শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হলে তা হবে তাদের বিশ্বাসের শক্তির কারণে। তাঁর দাবি, মার্কিন ও ‘জায়নবাদীরা’ অর্থাৎ ইসরায়েলিরা সব সময় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা গণনা নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
ইরানি এই জেনারেল আরও দাবি করেন, তেহরান প্রতিদিন যত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে, তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় প্রতিদিন নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে।
ইরান কোথায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিভিন্ন উপায়ে এসব তৈরি করা হয়। অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের একাধিক গোপন পদ্ধতি ইরানের জানা আছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, যুদ্ধ বছরের পর বছর চললেও শেষ দিন পর্যন্ত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুর দিকে ছুটে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রকে আরও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জেনারেল নাকদি বলেন, ‘যদি কখনো এমন দিন আসে, যখন ইরানের কাছে আর একটিও ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট থাকবে না, ঠিক তখন আমরা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক ও মারাত্মক হয়ে উঠব।’
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের বিষয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনাও সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত জুনে সম্মত হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করা এবং সেটি কার্যকর করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
গত ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ১৪ দফার একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই চুক্তির মূল শর্ত ছিল লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে সব ধরনের সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করা এবং ৬০ দিনের মধ্যে উভয় দেশকে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো।
তবে উদ্যোগটি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গত ৮ জুলাই ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ ঘোষণা দেন, ওই চুক্তি ‘ভেঙে গেছে’। এর এক সপ্তাহ পর তেহরানও সমঝোতা স্মারকটি স্থগিত করে। এরপর ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ‘সব ধরনের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তোলে ইরান।
বর্তমানে ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি তেহরান দিয়েছিল, তা পালনে ইরান ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটনই নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে পুরোপুরি সরে গেছে। এর মধ্যে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের অবরুদ্ধ ব্যাংক সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ছিল বলে দাবি করেছে তেহরান।

