রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা আবারও জোরালো হয়েছে। তবে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা চললেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না মস্কো। এবার ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ।
বৃহস্পতিবার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোটের বৈঠকের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন লাভরভ। বৈঠকে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ইউক্রেনের কাছে পশ্চিমা অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এবং রাশিয়ার দৃষ্টিতে এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে লাভরভ যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন এবং ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানোর নীতির সমালোচনা করেন। একইসঙ্গে তিনি জানান, মস্কো এখনো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পথকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আলাস্কায় অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী সমঝোতাগুলোর প্রতি রাশিয়ার অঙ্গীকারও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
রুশ সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৫ মিনিট ধরে চলা এই বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগেই অনুষ্ঠিত হয়। শুধু ইউক্রেন যুদ্ধ নয়, দুই দেশের কূটনৈতিক মিশনের কার্যক্রম স্বাভাবিক করা, পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যু নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
মস্কোর ভাষ্য অনুযায়ী, উভয় দেশ ভবিষ্যতেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। যদিও আলোচনায় বড় কোনো অগ্রগতির ঘোষণা আসেনি, তবুও সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষের আগ্রহকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরও বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনায় মূল গুরুত্ব পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের প্রয়োজনীয়তা। তবে বৈঠকের বিস্তারিত বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।
বৈঠক শুরুর আগে সাংবাদিকদের সামনে একই টেবিলে বসেন মার্কো রুবিও ও সের্গেই লাভরভ। তবে কেউই আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি। এ সময় এক সাংবাদিক রুবিওকে প্রশ্ন করেন, ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে রাশিয়া কোনো ধরনের সহায়তা করছে কি না, সে বিষয়ে তিনি লাভরভের কাছে জানতে চাইবেন কিনা। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি।
ম্যানিলা সফরের আগের দিন রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতার সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে। তবে তিনি মনে করেন, এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সহযোগিতার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একইসঙ্গে তিনি যুদ্ধের দ্রুত অবসানের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
অন্যদিকে বৈঠকের আগে লাভরভ বলেন, দুই দেশের মধ্যে যেকোনো সংলাপই ইতিবাচক। কারণ আলোচনার মাধ্যমে প্রশ্ন তোলা এবং উত্তর খোঁজার সুযোগ তৈরি হয়, যা কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক মাস ধরে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মনোযোগও অনেকাংশে সেই অঞ্চলে সরে গেছে। ফলে ইউক্রেন ইস্যুতে দ্রুত কোনো সমাধানের সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে রাশিয়া এখনো যুদ্ধ বন্ধের অন্যতম শর্ত হিসেবে ইউক্রেনকে কিছু ভূখণ্ড ছাড়ার দাবি থেকে সরে আসেনি। কিয়েভ সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান এখনো রয়ে গেছে।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নতুন করে সক্রিয় করতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। যদিও সেই আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবুও কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
ম্যানিলার আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগে মঙ্গলবার এক নৈশভোজে রুবিও ও লাভরভের সংক্ষিপ্ত কথোপকথনও হয়েছিল। পরে বৃহস্পতিবার সকালে তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ক আরেকটি বৈঠকেও অংশ নেন।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত এসব হামলা যুদ্ধের অবসান ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং সমুদ্রপথে পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে। এর ফলে রাশিয়ার কয়েকটি অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে জুনের শেষ দিকে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে অন্তত ৩০ জন নিহত হন। এরপর থেকে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্র হয়েছে।
ম্যানিলার বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় উঠে আসে। বিশেষ করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিনিময় হয়। রাশিয়া এর আগেই ওই হামলার সমালোচনা করে একে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করেছিল।
সব মিলিয়ে ম্যানিলার এই বৈঠক তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ বন্ধের কোনো নতুন সমাধান সামনে আনতে না পারলেও, দুই পরাশক্তির মধ্যে সংলাপের পথ এখনো খোলা রয়েছে—এমন বার্তাই দিয়েছে। তবে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ, যুদ্ধবিরতির শর্ত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান এখনো স্পষ্টভাবে বিপরীতমুখী। ফলে নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না বলেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

