ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্বে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সেনাপ্রধান ওলেকসান্দর সিরস্কিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর জায়গায় ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে মিখাইলো দ্রাপাতিকে।
সামরিক নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনায় দীর্ঘদিনের সমস্যা এবং সেনা সংগ্রহব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জেলেনস্কি নতুন নিয়োগকে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে একটি প্রয়োজনীয় “পুনর্গঠন” হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে সিরস্কির অপসারণকে শুধু একজন সেনাপ্রধানের বিদায় হিসেবে দেখলে বর্তমান পরিস্থিতির পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব পরিবর্তন, সামরিক সংস্কার নিয়ে মতবিরোধ, কিয়েভে টানা বিক্ষোভ এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে ইউক্রেনের ওপর বাড়তে থাকা রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ।
কে ছিলেন ওলেকসান্দর সিরস্কি
ওলেকসান্দর সিরস্কির বয়স ৬০ বছর। তিনি ১৯৬৫ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সামরিক জীবনের শুরু সোভিয়েত আমলে। তিনি মস্কোর একটি রেড আর্মি সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন।
১৯৮০-এর দশকে তাঁকে ইউক্রেনে মোতায়েন করা হয়। সে সময় ইউক্রেন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ইউক্রেন স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হলে সিরস্কি সেখানেই থেকে যান এবং নবগঠিত ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
নিজের সামরিক দক্ষতা বাড়াতে তিনি কিয়েভের ইউক্রেন জাতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করেন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের একজন হয়ে ওঠেন।
২০১৪ সালে পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলে মস্কো-সমর্থিত সশস্ত্র বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় বাহিনীর অভিযানে নেতৃত্ব দেন সিরস্কি। ওই সময় থেকেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সামরিক প্রতিরোধে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০১৯ সালে তাঁকে ইউক্রেনের স্থলবাহিনীর প্রধান করা হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করলে সিরস্কি যুদ্ধ পরিচালনার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিদের একজন হিসেবে সামনে আসেন।
কিয়েভ রক্ষায় সিরস্কির ভূমিকা
রুশ বাহিনী ইউক্রেনে প্রবেশের পর যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে রাজধানী কিয়েভের পতনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ইউক্রেনীয় বাহিনী রাজধানীর চারপাশে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই প্রতিরোধ পরিকল্পনা ও পরিচালনার সঙ্গে সিরস্কি সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
কিয়েভ রক্ষায় তাঁর ভূমিকার জন্য যুদ্ধের শুরুর দিকেই তাঁকে ইউক্রেনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান “ইউক্রেনের বীর” উপাধি দেওয়া হয়।
কেবল রাজধানী রক্ষাই নয়, ২০২২ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খারকিভ অঞ্চলে ইউক্রেনের পাল্টা অভিযানের পরিকল্পনাতেও সিরস্কিকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওই অভিযানে ইউক্রেনীয় বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয়ে কুপিয়ানস্ক ও ইজিয়ুমের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর পুনর্দখল করে।
খারকিভের পাল্টা অভিযানকে যুদ্ধের প্রথম দিকের সবচেয়ে বড় ইউক্রেনীয় সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। ফলে সেনা কর্মকর্তা হিসেবে সিরস্কির খ্যাতি আরও বৃদ্ধি পায়।
এত সাফল্যের পরও কেন সরানো হলো
সিরস্কির সামরিক জীবনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে ইউক্রেনের অভ্যন্তরে সমালোচনা বাড়ছিল। দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধে সেনাসংকট, যুদ্ধক্ষেত্রে ক্লান্তি, সেনাদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং নতুন সেনা সংগ্রহ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের মধ্যে সংস্কার নিয়ে মতপার্থক্যও প্রকট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সদ্য অপসারিত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের সঙ্গে সিরস্কির সম্পর্ক ভালো ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফেদোরভ অভিযোগ করেছিলেন, সামরিক বাহিনীকে আধুনিক করা এবং যুদ্ধ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগে সিরস্কি বাধা সৃষ্টি করছেন। তাঁদের মধ্যকার মতবিরোধ ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে চলে আসে।
ফেদোরভকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর কিয়েভে টানা ছয় দিন বিক্ষোভ হয়। ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় তাঁকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখতেন অনেক নাগরিক। ফলে তাঁর আকস্মিক অপসারণ জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সিরস্কিকে সরানোর সিদ্ধান্ত আসে। ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জেলেনস্কির সিদ্ধান্তটি যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যর্থতা বা সাফল্যের হিসাবের পাশাপাশি সরকারের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
নতুন সেনাপ্রধান মিখাইলো দ্রাপাতি
সিরস্কির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মিখাইলো দ্রাপাতি। তাঁকে এমন এক সময়ে দায়িত্ব দেওয়া হলো, যখন ইউক্রেনকে একই সঙ্গে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
একদিকে রুশ বাহিনীর আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীতে জনবলসংকট ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ক্লান্তি বাড়ছে। সামরিক সহায়তার জন্য বিদেশি মিত্রদের ওপর নির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অসন্তোষও সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, সিরস্কি এবং ইউক্রেনের সব যোদ্ধার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, ইউক্রেনের সম্মুখসারির শক্তিশালী অবস্থানের জন্য সিরস্কির অবদান রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন সেনাপ্রধান দ্রাপাতিও দেশের বিজয়ের লক্ষ্য এবং রাশিয়াকে শান্তির দিকে বাধ্য করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একই অবস্থান ধারণ করেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জেলেনস্কির বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সামরিক লক্ষ্য পুরোপুরি বদলে যাচ্ছে না। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি, নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
তিনি সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ দূর করা, সেনা সংগ্রহব্যবস্থার সমস্যা সমাধান করা এবং সম্মুখসারির ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ইউক্রেনে কতজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পদ হারিয়েছেন
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনে ১০ জনের বেশি জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা ও সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি দায়িত্ব হারিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব কর্মকর্তার অপসারণ একই কারণে হয়নি। কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য সমালোচিত হয়েছেন, আবার কারও সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক বা কৌশলগত মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কয়েকটি ঘটনা হলো—
ওলেকসি রেজনিকভের অপসারণ
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওলেকসি রেজনিকভকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন জেলেনস্কি।
তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অপরাধ প্রমাণিত না হলেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে ঘিরে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর জন্য খাদ্য ও বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনায় অতিরিক্ত মূল্য দেখানোর অভিযোগ সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মধ্যে বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ইউক্রেনের জন্য দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কারণ পশ্চিমা মিত্রদের আস্থা ধরে রাখতে আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সামরিক সহায়তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
ভ্যালেরি জালুঝনির বিদায়
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের তৎকালীন সেনাপ্রধান ভ্যালেরি জালুঝনিকে অপসারণ করেন জেলেনস্কি। যুদ্ধের শুরুর দিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কারণে তিনি ইউক্রেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের একজন হয়ে উঠেছিলেন।
তবে যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল, সেনা সংগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে জেলেনস্কি ও জালুঝনির মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
জালুঝনির জায়গাতেই সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন সিরস্কি। এখন প্রায় আড়াই বছর পর সিরস্কিকেও সরিয়ে দেওয়া হলো। এটি দেখায়, দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনের শীর্ষ সামরিক পদটি কতটা চাপপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
ইউরি সোদোলের পরিবর্তে আন্দ্রি হানাতভ
২০২৪ সালের জুন মাসে ইউক্রেনের যৌথ বাহিনী কমান্ডের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়। ইউরি সোদোলকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় আন্দ্রি হানাতভকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সোদোলের নেতৃত্ব ও যুদ্ধক্ষেত্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইউক্রেনীয় সেনাদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও উঠেছিল যে, ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সেনাদের অপ্রয়োজনীয় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের অর্থ কী
যুদ্ধের সময় সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেলে নতুন কৌশল, নতুন নেতৃত্ব এবং ভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে ইউক্রেনের ক্ষেত্রে বারবার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুটি বিপরীত বার্তা দেয়।
একদিকে এটি প্রমাণ করতে পারে যে, সরকার সামরিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন সামরিক বাহিনীর ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষ করে একজন সেনাপ্রধানকে সরিয়ে নতুন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিলে শুধু নাম পরিবর্তন হয় না। তাঁর সঙ্গে বদলে যেতে পারে যুদ্ধ পরিচালনার অগ্রাধিকার, কমান্ড কাঠামো, সেনা মোতায়েনের ধরন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক।
সিরস্কির বিদায় তাই ইউক্রেনের সামরিক কৌশলে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে নতুন নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সম্মুখসারির বাস্তব পরিস্থিতি, সেনাদের মনোবল এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও জনবল সরবরাহের ওপর।
রাশিয়াতেও হয়েছে একাধিক বড় পরিবর্তন
শুধু ইউক্রেন নয়, চার বছরের যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্বেও একাধিকবার রদবদল হয়েছে।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে অনেক কর্মকর্তাকে সরানো হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থতা, সামরিক সরঞ্জাম হারানো, নেতৃত্বের সমালোচনা এবং রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে সন্দেহের কারণে।
ইগর ওসিপভ
২০২২ সালের আগস্টে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল ইগর ওসিপভকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়।
এর আগে ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের প্রধান যুদ্ধজাহাজ মস্কভা ডুবে যায়। এই ঘটনাকে রাশিয়ার জন্য বড় সামরিক ও প্রতীকী ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়েছিল।
জাহাজটি ডুবে যাওয়ার পর ওসিপভকে প্রথমে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁকে পুরোপুরি অপসারণ করা হয়।
ইভান পপভ
২০২৩ সালের জুলাই মাসে রাশিয়ার ৫৮তম সম্মিলিত বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল ইভান পপভকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
তাঁর বাহিনী দক্ষিণ ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধাঞ্চলে মোতায়েন ছিল। পপভ অভিযোগ করেছিলেন, রুশ সেনারা পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়াই দীর্ঘ সময় যুদ্ধ করছে এবং যুদ্ধ পরিচালনার কৌশলে গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে।
তিনি শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের সমালোচনা করার পরই তাঁকে সরানো হয়। ঘটনাটি রুশ সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
পপভের ঘটনা দেখায়, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব সমস্যা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা রাশিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সের্গেই সুরোভিকিন
২০২৩ সালের আগস্টে রাশিয়ার মহাকাশ ও বিমানবাহিনীর প্রধানের পদ থেকে সের্গেই সুরোভিকিনকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কঠোর সামরিক কৌশলের কারণে তিনি “জেনারেল আরমাগেডন” নামে পরিচিত ছিলেন।
সুরোভিকিনকে রাশিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধাদের সংগঠন ওয়াগনারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হতো। ২০২৩ সালের জুন মাসে ওয়াগনারের স্বল্পস্থায়ী বিদ্রোহের প্রায় দুই মাস পর তাঁকে পদচ্যুত করা হয়।
ওয়াগনার বিদ্রোহ রাশিয়ার সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছিল। সে কারণে বিদ্রোহের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দুই দেশের পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য
ইউক্রেন ও রাশিয়া—দুই দেশেই সামরিক কর্মকর্তাদের সরানো হলেও সিদ্ধান্তগুলোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়।
ইউক্রেনে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্নীতি, সামরিক সংস্কার, জনমত, সেনা সংগ্রহ এবং যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনার কার্যকারিতা যুক্ত রয়েছে। দেশটির সরকারকে একই সঙ্গে জনগণ এবং বিদেশি মিত্রদের কাছেও এসব সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে হয়।
অন্যদিকে রাশিয়ায় সামরিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থতার পাশাপাশি রাজনৈতিক আনুগত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীর্ষ নেতৃত্বের প্রকাশ্য সমালোচনা বা বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কর্মকর্তাদের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
তবে উভয় দেশের ক্ষেত্রেই একটি বিষয় পরিষ্কার—দীর্ঘ যুদ্ধ শুধু সম্মুখসারির সেনাদের নয়, শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকেও প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রেখেছে।
দীর্ঘ যুদ্ধের চাপ
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এখন চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই দুই দেশের সামনে নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
প্রথমদিকে দ্রুত বিজয়ের জন্য যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে তা সব সময় কার্যকর থাকে না। সামরিক বাহিনীর জনবল, গোলাবারুদ, অর্থনীতি, জনসমর্থন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অবস্থাও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।
এই কারণে দীর্ঘ যুদ্ধে সামরিক নেতৃত্বের ওপর রাজনৈতিক চাপ বেড়ে যায়। প্রত্যাশিত সাফল্য না এলে সরকার নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করে।
কিন্তু শুধু একজন সেনাপ্রধান বদলালেই যুদ্ধের গতিপথ বদলে যায় না। নতুন নেতৃত্বের কার্যকারিতা নির্ভর করে তিনি কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, সেনাবাহিনীর সমস্যাগুলো কত দ্রুত সমাধান করতে পারবেন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাঁর ওপর কতটা আস্থা রাখবে তার ওপর।
জেলেনস্কির জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি
সিরস্কিকে সরানোর সিদ্ধান্ত জেলেনস্কির জন্যও ঝুঁকিমুক্ত নয়। সামরিক বাহিনীতে পরিবর্তন এনে তিনি যদি যুদ্ধক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেন, তবে সিদ্ধান্তটি সফল বলে বিবেচিত হবে।
কিন্তু নতুন নেতৃত্বের অধীনেও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সরকারের ওপর সমালোচনা আরও বাড়তে পারে। তখন প্রশ্ন উঠবে, সমস্যাটি কি শুধু সামরিক কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে, নাকি যুদ্ধ পরিচালনার সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিকল্পনায়।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফেদোরভকে সরানোর পর ছয় দিন ধরে কিয়েভে বিক্ষোভ হওয়ায় বোঝা যায়, ইউক্রেনের মানুষ এখন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
যুদ্ধের শুরুতে জাতীয় ঐক্যের যে পরিবেশ ছিল, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং সেনা সংগ্রহ নিয়ে অসন্তোষের কারণে সেই ঐক্য এখন আরও জটিল পরীক্ষার মুখে পড়ছে।
দ্রাপাতির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ
নতুন সেনাপ্রধান মিখাইলো দ্রাপাতিকে প্রথমেই সামরিক নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ বিরোধ কমাতে হবে। রাজনৈতিক সরকার, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সম্মুখসারির কমান্ডারদের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হবে।
একই সঙ্গে সেনাদের ক্লান্তি, নতুন সদস্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন যুদ্ধাঞ্চলে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল মোতায়েনের সমস্যা সমাধান করতে হবে।
যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু আক্রমণ বা প্রতিরক্ষার পরিকল্পনা করলেই হবে না। গোলাবারুদ সরবরাহ, আকাশ প্রতিরক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং আহত সেনাদের চিকিৎসাসহ পুরো সামরিক কাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তাঁকে এমন একটি সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রেও কার্যকর।
শেষ পর্যন্ত কী বদলাতে পারে
সিরস্কির অপসারণ ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনবে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে সিদ্ধান্তটি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, জেলেনস্কি বর্তমান সামরিক ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট নন।
দ্রাপাতির নিয়োগের মাধ্যমে তিনি নতুন উদ্যম, ভালো সমন্বয় এবং যুদ্ধ পরিচালনায় আরও কার্যকর কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।
রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্বেও একাধিক পরিবর্তন হয়েছে। তাই দুই দেশের ক্ষেত্রেই শীর্ষ কর্মকর্তাদের অপসারণকে যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী চাপ এবং প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়।
ওলেকসান্দর সিরস্কি কিয়েভ রক্ষা এবং খারকিভের পাল্টা অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও শেষ পর্যন্ত সামরিক নেতৃত্বের বিরোধ, সংস্কার নিয়ে মতপার্থক্য এবং সম্মুখসারির ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ তাঁর বিদায়ের পথ তৈরি করেছে।
এখন নজর থাকবে মিখাইলো দ্রাপাতির দিকে। তিনি কি ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারবেন, নাকি চলমান যুদ্ধের চাপ তাঁকেও দ্রুত বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসবে—সেই উত্তর পাওয়া যাবে আগামী দিনের যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি ও ইউক্রেন সরকারের সিদ্ধান্তে।

