শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন আলোচনা বাড়ছে, তখন ইউরোপে এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করল ফ্রান্স। দেশটির আইনপ্রণেতারা ২২ জুলাই ২০২৬ মঙ্গলবার এমন একটি আইন অনুমোদন করেছেন, যার মাধ্যমে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম দেশ হিসেবে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নির্দিষ্ট বয়সসীমা আরোপ করল।
দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দীর্ঘদিন ধরেই শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। সংসদে আইনটি পাস হওয়ার পর তিনি জানান, নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার সময় থেকেই ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, শিশু ও কিশোরদের মস্তিষ্ক এবং আবেগকে ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয়।
কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল ফ্রান্স?
বর্তমানে বিশ্বের কোটি কোটি শিশু ও কিশোর প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, মনোযোগ, ঘুম এবং সামাজিক আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আর্কম জানিয়েছে, দেশটির ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোররা শুধু টিকটকেই প্রতিদিন গড়ে ১ ঘণ্টা ২১ মিনিট সময় কাটায়।
সংস্থাটির মতে, টিকটকের সুপারিশ ব্যবস্থা বা অ্যালগরিদম অনেক সময় ব্যবহারকারীদের এমন সব ভিডিও দেখায়, যেগুলো অত্যন্ত উত্তেজক, উদ্বেগ তৈরি করতে পারে অথবা মানসিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।
বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে এই ধরনের ধারাবাহিক কনটেন্ট তাদের আবেগ ও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
ফ্রান্সের নতুন আইনে কী থাকবে?
নতুন আইন অনুযায়ী, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বাধা দিতে হবে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কীভাবে ব্যবহারকারীর বয়স নিশ্চিত করা হবে?
কারণ অনলাইনে বয়স যাচাই করা প্রযুক্তিগতভাবে একটি কঠিন বিষয়। অনেক শিশু ভুল তথ্য দিয়ে সহজেই বয়স গোপন করে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ায় গত বছর ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পর প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুদের অ্যাকাউন্ট খোলা বা চালু রাখা ঠেকাতে “যৌক্তিক পদক্ষেপ” নিতে বলা হয়েছিল।
ফ্রান্সও একই ধরনের বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে।
নতুন আইনটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দেশটির অডিওভিজ্যুয়াল ও ডিজিটাল যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আর্কমকে। এটি বড় সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
শুধু ফ্রান্স নয়, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ
শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ এখন শুধু ফ্রান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
গত বছরের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়া ইতিহাস সৃষ্টি করে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এছাড়া যুক্তরাজ্য গত মাসে একই ধরনের বিধিনিষেধ ঘোষণার কথা জানিয়েছে, যা আগামী বছর কার্যকর হওয়ার কথা।
স্পেন, গ্রিস এবং ডেনমার্কও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য ন্যূনতম বয়সসীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে।
এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন সরকার শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তাকে এখন বড় নীতিগত বিষয় হিসেবে দেখছে।
অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে সমর্থন
ফ্রান্সে অনেক অভিভাবক সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
ছয় সন্তানের মা জেরালদিন দেলাক্রোয়া বলেন, তিনি এই সিদ্ধান্তকে ভালো উদ্যোগ মনে করেন। তবে বাস্তবে এটি কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তিনি বলেন, অনেক অভিভাবক আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু শিশুরা অনেক সময় সেসব এড়িয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজে নেয়।
একজন শিশু চিকিৎসক হিসেবে তিনি গত এক দশকে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে পরিবারগুলোর উদ্বেগ বাড়তে দেখেছেন।
তার ভাষায়, মানুষের মধ্যে স্মার্টফোন নিয়ে এক ধরনের পরিবর্তিত মনোভাব তৈরি হয়েছে।
কিশোরদের মতামতও ভিন্ন
তবে সবাই এই নিষেধাজ্ঞাকে পুরোপুরি সমর্থন করছেন না।
কিছু কিশোর মনে করছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, এটি শেখা, যোগাযোগ এবং তথ্য পাওয়ারও একটি মাধ্যম।
১৩ বছর বয়সী নেলিয়া উয়ালি বলেন, এই আইন শিক্ষামূলক ভিডিও এবং প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে।
তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিনোদন এবং নতুন বিষয় জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
অন্যদিকে আরিয়ান নামের এক কিশোরী মনে করেন, শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব বেশি ইতিবাচক দিক নেই।
তিনি বলেন, মানুষ অনেক সময় কয়েক মিনিটের জন্য ফোন হাতে নেয়, কিন্তু আকর্ষণীয় ও আসক্তিকর কনটেন্টের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যবহার করতে থাকে।
সমালোচকদের প্রশ্ন: শুধু নিষেধাজ্ঞাই কি যথেষ্ট?
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, শুধু বয়সসীমা নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে বলেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে হবে না; শিশুদের ডিজিটাল শিক্ষা দিতে হবে এবং বিকল্প সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ফ্রান্সের কাটিয়া রু বলেন, ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একমাত্র সমাধান নয়।
তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কাঠামো পরিবর্তন করা প্রয়োজন, কারণ অনেক প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখে।
তিনি বিশেষভাবে প্ল্যাটফর্মগুলোর আসক্তি তৈরি করা এবং ব্যবহারকারীর আচরণ প্রভাবিত করার বৈশিষ্ট্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ইউরোপের বার্তা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো খেলনা নয়
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো খেলনা নয়।
তিনি বয়স উপযোগী ব্যবহারের বিধিনিষেধের পক্ষে মত দেন।
তার বক্তব্য ছিল, যেকোনো পণ্য তৈরি হলে সেটির নিরাপত্তার দায়িত্ব নির্মাতার ওপর থাকে। যেমন গাড়ি কোম্পানিগুলোকে নিরাপদ গাড়ি তৈরি করতে হয়, তেমনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকেও ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তার মতে, বিষয়টি শুধু শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে কি না—এমন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কখন এবং কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের কাছে পৌঁছাবে।
বিরোধীদের উদ্বেগ
ফ্রান্সের কিছু বিরোধী রাজনীতিক শুরু থেকেই এই আইনের সমালোচনা করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শিক্ষামূলক অনলাইন কনটেন্ট পাওয়ার সুযোগ সীমিত করতে পারে।
কিছু সংসদ সদস্য নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করার তালিকা তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছিলেন।তবে শেষ পর্যন্ত সরকার বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নিয়েছে।
শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় এটি ফ্রান্সের প্রথম বড় পদক্ষেপ নয়।এর আগে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অনলাইন পর্নোগ্রাফি প্রবেশ সীমিত করার আইনও কার্যকর হয়েছে। দীর্ঘ আইনি চ্যালেঞ্জের পর ২০২৫ সালে এই আইন চালু হয়। সেখানে ব্যবহারকারীদের বয়স প্রমাণ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
ফ্রান্সের নতুন আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হবে বয়স যাচাই ব্যবস্থা কার্যকর করা। কারণ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যাতে শিশুদের গোপনীয়তা রক্ষা হয়, আবার একই সঙ্গে বয়স সম্পর্কিত তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপদ রাখতে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি দেশের আইন পরিবর্তন নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের জন্য জ্ঞান, যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করলেও এর অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
এখন দেখার বিষয়, ফ্রান্সের এই নতুন আইন বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলো একই পথে এগিয়ে যায় কি না।
ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো নিষেধাজ্ঞা নয়—বরং কীভাবে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ তৈরি করা যায়।

