মাত্র কয়েক দশক আগেও বিশ্বের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির হিসাব ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো মানেই ছিল দ্রুত পরাজয়ের ঝুঁকি। দেশটির প্রযুক্তি, অর্থনীতি, সামরিক জোট এবং দূরপাল্লার আক্রমণক্ষমতার সামনে অধিকাংশ রাষ্ট্র নিজেদের অসহায় মনে করত।
কিন্তু হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত সেই পুরোনো ধারণায় বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচলিত যুদ্ধে পরাজিত করেছে, এমন দাবি করা হচ্ছে না। বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তুলনামূলকভাবে দুর্বল একটি রাষ্ট্র সস্তা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, বাণিজ্যিক প্রযুক্তি এবং ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে একটি পরাশক্তির রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।
যুদ্ধের নতুন বাস্তবতায় প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি হারিয়ে দেওয়া আর সব সময় জরুরি নয়। কখনো কখনো শুধু অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা, বাণিজ্যের খরচ বাড়ানো, জনমনে ভয় ছড়ানো এবং দীর্ঘ সময় ধরে চাপ বজায় রাখাই যথেষ্ট। এখানেই ইরানকে কেন্দ্র করে বিশ্বশক্তির নতুন নিয়ম দৃশ্যমান হচ্ছে।
১৭ জানুয়ারি ১৯৯১: যে রাত বদলে দিয়েছিল বিশ্বের ধারণা
১৭ জানুয়ারি ১৯৯১ রাতে বাগদাদের আকাশে বিমানবিধ্বংসী গোলার আলো দেখা যাচ্ছিল। একই সময়ে মার্কিন নির্ভুল নির্দেশিত বোমা ইরাকের জানালা, বায়ু চলাচলের পথ এবং সামরিক নির্দেশনা কেন্দ্রে আঘাত করছিল। বিশ্বের মানুষ প্রথমবারের মতো সরাসরি সম্প্রচারে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের চেহারা দেখেছিল।
যুদ্ধের আগে ইরাককে দুর্বল রাষ্ট্র মনে করা হয়নি। সাদ্দাম হোসেনের অধীনে প্রায় ১০ লাখ সশস্ত্র সদস্য ছিল। দেশটির সেনাবাহিনী ইরানের সঙ্গে ৮ বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পার করে এসেছিল। ইরাকের হাতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ট্যাংকবাহিনীও ছিল। কুয়েত দখলের পর আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, ইরাকি বাহিনী সৌদি আরবের দিকে অগ্রসর হতে পারে এবং বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-চতুর্থাংশ সাদ্দাম হোসেনের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও সহজ জয়ের নিশ্চয়তা ছিল না। ভিয়েতনাম যুদ্ধের স্মৃতি তখনো দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে তাড়া করছিল। সম্ভাব্য বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কায় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মৃতদেহ বহনের ব্যাগ পাঠিয়েছিল।
কিন্তু যুদ্ধের ফল সবাইকে বিস্মিত করে। ৫ সপ্তাহের বিমান হামলার পর জোটবাহিনী প্রায় ১০০ ঘণ্টার স্থল অভিযানে কুয়েত মুক্ত করে। কুয়েতে অবস্থানরত ৩ লাখের বেশি ইরাকি সেনা পরাজিত হয়, বন্দী হয় অথবা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। বিপরীতে মার্কিন যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪৭। কয়েক মাস আগেও যে ইরাকি বাহিনীকে অত্যন্ত শক্তিশালী মনে হচ্ছিল, সেটি অল্প সময়ের মধ্যে ভেঙে পড়ে।
এই বিজয়ের প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন ভাঙনের পথে। ফলে সামরিক, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ কোনো শক্তি ছিল না। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ বিশ্বের সামনে এই বার্তা দেয় যে, মার্কিন সামরিক শক্তিকে প্রতিরোধ করা শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব।
সামরিক শক্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল বিশ্বাস
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা শুধু মার্কিন বোমা, যুদ্ধবিমান বা নৌবহরের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। এর সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি ছিল বিশ্বাস।
রাষ্ট্রগুলো বিশ্বাস করত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো বড় সামরিক হুমকি দ্রুত মোকাবিলা করতে পারবে। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করতেন, আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে না। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধরে নিয়েছিল, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ খোলা থাকবে। আর ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলো মনে করত, ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে।
এই বিশ্বাসের কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয় কমাতে শুরু করে। ১৯৯২ সালে মাস্ট্রিখট চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ইউরোপের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংহতি আরও গভীর হয়। ১৯৯১ সালে উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটের সদস্য ছিল ১৬টি দেশ। পরে পূর্ব ইউরোপের বহু সাবেক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এতে যোগ দেয়। একসময় যে দেশগুলো এই জোটকে ভয় পেত, তারাই মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার সুরক্ষা চাইতে শুরু করে।
চীনও ১৯৯১ সালের যুদ্ধ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল। ইরাকি বাহিনীর দ্রুত পতন দেখে চীনা সামরিক নেতৃত্ব বুঝতে পারে, বিপুলসংখ্যক সেনা নিয়ে গঠিত পুরোনো ধরনের বাহিনী নির্ভুল প্রযুক্তিনির্ভর আক্রমণের সামনে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এরপর চীন তার সেনাসদস্যের সংখ্যা ১৯৯০ সালের প্রায় ৩৫ লাখ থেকে এক দশকের মধ্যে ২০ লাখে নামিয়ে আনে। একই সঙ্গে দেশটি ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আধুনিক নির্দেশনা ব্যবস্থায় বড় বিনিয়োগ করে। আজ পূর্ব এশিয়ায় যে চীনা সামরিক সক্ষমতা মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, তার একটি অংশের উৎপত্তি হয়েছিল ১৯৯১ সালে ইরাকের পরাজয় থেকে নেওয়া শিক্ষায়।
নিরাপত্তার বিশ্বাসে বিস্তৃত হয়েছিল বিশ্ববাণিজ্য
মার্কিন শক্তির প্রতি আস্থা বিশ্ব অর্থনীতিকেও গভীরভাবে বদলে দেয়। পণ্য, পুঁজি, জ্বালানি ও তথ্য দ্রুতগতিতে সীমান্ত অতিক্রম করতে থাকে। বৈশ্বিক উৎপাদনের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অংশ ১৯৯০ সালের প্রায় ৩৮ শতাংশ থেকে দুই দশক পর প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছে যায়।
প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন মহাদেশে উৎপাদন ছড়িয়ে দেয়। একটি পণ্যের যন্ত্রাংশ এক দেশে তৈরি, অন্য দেশে সংযোজন এবং তৃতীয় দেশে বিক্রি হতে থাকে। গুদামে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিপুল পণ্য জমা না রেখে প্রয়োজনমতো দ্রুত সরবরাহের ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়।
এই পুরো কাঠামোর পেছনে একটি অলিখিত ধারণা কাজ করছিল। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা কম এবং কোনো সমুদ্রপথে সমস্যা হলেও তা অল্প সময়ের মধ্যে সমাধান হবে।
১৯৯৮ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাডেলিন অলব্রাইট যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের অপরিহার্য রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কথাটি সেই সময়ের আন্তর্জাতিক মানসিকতারই প্রতিফলন ছিল। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পরও বৈশ্বিক বাজার দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের মুখে পড়েনি। বিশ্বের মানুষ তাই ভাবতে শিখেছিল, সংকট আসবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
১৯৯১ সালের পর পৃথিবী পুরোপুরি শান্ত হয়ে যায়নি। তবে পৃথিবীকে অনেক বেশি অনুমানযোগ্য মনে হয়েছিল।
বিশ্বায়নের সাফল্যই তৈরি করেছে নতুন দুর্বলতা
এখানেই ইতিহাসের বড় পরিহাস। যে বিশ্বায়ন মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছিল, সেই বিশ্বায়নই ধীরে ধীরে এমন প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেয়, যা দুর্বল রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীকেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়।
১৯৯১ সালে নির্ভুল বোমা, উপগ্রহভিত্তিক দিকনির্দেশনা, সুরক্ষিত যোগাযোগ, অবলোহিত সংবেদক এবং উন্নত গণনাযন্ত্র ছিল অল্প কয়েকটি ধনী রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। এসব প্রযুক্তি তৈরি ও পরিচালনার জন্য বিশাল শিল্পভিত্তি এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতো।
পরবর্তী ৩ দশকে পরিস্থিতি বদলে যায়। বেসামরিক বাজারে স্মার্টফোন, উপগ্রহ যোগাযোগ, ছোট আকারের সংবেদক, শক্তিশালী বৈদ্যুতিক কোষ এবং উন্নত অর্ধপরিবাহী যন্ত্রাংশ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্ধপরিবাহী শিল্পের আয় ৭৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং তা বছরে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের দিকে এগোচ্ছিল। এর বড় অংশের চাহিদা তৈরি হয়েছিল স্মার্টফোন, দূরবর্তী তথ্য সংরক্ষণব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে।
একটি আধুনিক স্মার্টফোনে ১৯৯১ সালের বহু সামরিক যন্ত্রের তুলনায় বেশি গণনাশক্তি রয়েছে। যে ধরনের উচ্চমানের আলোকচিত্র গ্রহণব্যবস্থা একসময় শুধু গোয়েন্দা উপগ্রহে থাকত, তার কাছাকাছি ক্ষমতার যন্ত্র এখন সাধারণ বাজারেও পাওয়া যায়।
বাণিজ্যিক উপগ্রহ থেকে উচ্চমানের ছবি কেনা যায়। কৃষিকাজ, চালকবিহীন যান এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত তাপমাত্রা শনাক্তকারী যন্ত্র, দূরত্ব পরিমাপক ও দিকনির্দেশক যন্ত্রাংশ সামরিক কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে বেসামরিক ও সামরিক প্রযুক্তির মধ্যকার পুরোনো বিভাজন অনেকটাই মুছে গেছে।
২০২৫ সালে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট অর্ধপরিবাহী খাতের আয় ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়। যে সক্ষমতার জন্য একসময় শতকোটি ডলারের সরকারি সামরিক প্রকল্প দরকার হতো, তার একটি অংশ এখন সাধারণ বাজারের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করেই তৈরি করা যায়।
শাহেদ-১৩৬: সাধারণ প্রযুক্তির অসাধারণ সামরিক প্রভাব
ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন এই পরিবর্তনের অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ। এটি অত্যন্ত জটিল বা দুর্লভ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। বাণিজ্যিক বাজারে পাওয়া দিকনির্দেশক যন্ত্রাংশ, উপগ্রহ সংকেত গ্রহণকারী যন্ত্র, যোগাযোগ উপাদান, গণনাযন্ত্র, সফটওয়্যার, সাধারণ কাঠামো ও ইঞ্জিন একত্র করে এটি তৈরি করা হয়।
এর গুরুত্ব প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে নয়, বরং কম খরচে ব্যাপকভাবে উৎপাদনের সুযোগে। স্মার্টফোন সস্তা হওয়া, বৈদ্যুতিক কোষের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র গণনাযন্ত্র শক্তিশালী হওয়ার প্রতিটি ধাপ দুর্বল রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক ক্ষমতাও বাড়িয়েছে।
নথির বর্ণনা অনুযায়ী, জুন মাসে ইরান একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করে। সেখানে ২০,০০০ মার্কিন ডলার দামের একটি শাহেদ ড্রোনের বিপরীতে ধ্বংস হওয়া উন্নত সামরিক সম্পদের দাম ছিল ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই তুলনা আধুনিক যুদ্ধের গভীর আর্থিক অসাম্য তুলে ধরে।
আক্রমণের অস্ত্র যদি অত্যন্ত সস্তা হয়, অথচ সেটিকে ঠেকাতে ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয় বহু গুণ ব্যয়বহুল, তাহলে শক্তিশালী পক্ষ প্রতিটি আক্রমণ প্রতিহত করেও দীর্ঘমেয়াদে চাপের মুখে পড়তে পারে।
দুর্বল পক্ষকে সব আক্রমণে সফল হতে হয় না। শত শত ড্রোনের মধ্যে অল্প কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছালেও প্রতিপক্ষকে প্রতিবার সতর্কতা, নজরদারি, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, ব্যয়ের এই ব্যবধান তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
হরমুজে লক্ষ্য জয় নয়, অনিশ্চয়তা তৈরি করা
ইরানের প্রধান উদ্দেশ্য মার্কিন নৌবাহিনীকে প্রচলিত নৌযুদ্ধে সম্পূর্ণ পরাজিত করা নয়। বরং জাহাজমালিক, বীমা প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি ব্যবসায়ী এবং আন্তর্জাতিক বাজারকে বোঝানো যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আর শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না।
এই কৌশলে সমুদ্রপথ পুরোপুরি বন্ধ করতে হয় না। কয়েকটি সফল হামলা, ড্রোনের উপস্থিতি অথবা ভবিষ্যৎ হামলার আশঙ্কাই যথেষ্ট হতে পারে।
সংঘাত শুরু হওয়ার পরও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। কিন্তু যুদ্ধঝুঁকির বীমা খরচ বেড়েছে এবং অনিশ্চয়তার কারণে জাহাজ চলাচল কমেছে। আধুনিক অর্থনীতি শুধু তেল পেলেই চলে না। নির্দিষ্ট সময়ে, পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং অনুমানযোগ্য খরচে তেল পৌঁছানোও জরুরি।
বিশ্বাস হারিয়ে গেলে একটি সমুদ্রপথ ভৌতভাবে খোলা থেকেও কৌশলগতভাবে অনির্ভরযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দক্ষিণ ইরানের রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, ড্রোন ঘাঁটি ও উৎক্ষেপণ এলাকায় হামলা চালিয়ে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে বলে নথিটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ইরান তার ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণব্যবস্থা ছড়িয়ে রাখতে, লুকিয়ে ফেলতে এবং দ্রুত নতুন ব্যবস্থা স্থাপন করতে পেরেছে।
একটি শক্তিশালী বাহিনী অল্প কয়েকটি উৎক্ষেপণযন্ত্র ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার বর্গমাইল এলাকা সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন। এখানেই সামুদ্রিক সংকট ধীরে ধীরে স্থলভাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যায় পরিণত হয়।
ইরানের প্রভাব বিজয়ের বদলে বিঘ্নের ওপর দাঁড়াচ্ছে
ইরানের কৌশল শুধু হরমুজ প্রণালিতে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনে হুতি বাহিনীর কার্যক্রমকে বৃহত্তর একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলে একাধিক হামলা চালায়। তারা প্রচলিত যুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারাতে পারেনি। কিন্তু তাদের হামলার কারণে বড় জাহাজ পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে চলাচল করতে হয়েছে। এতে যাত্রার সময়, জ্বালানি ব্যয় এবং বীমার খরচ বেড়েছে।
ইরানের অর্থনীতি এখনো দুর্বল। প্রচলিত সামরিক শক্তিতে দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সমকক্ষ নয়। অনেক আরব সরকারও তেহরানকে বিশ্বাস করার চেয়ে বেশি ভয় করে।
তবে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য সব ক্ষেত্রে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রয়োজন হয় না। উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার, জ্বালানি ব্যবসায়ী, জাহাজ প্রতিষ্ঠান ও বাইরের শক্তিগুলো যদি ইরানের প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করতে বাধ্য হয়, তাহলে সামরিক বিঘ্ন সৃষ্টির ক্ষমতা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রভাবে রূপ নিতে পারে।
ক্ষমতার বাস্তব পরিবর্তনের আগেই মানুষের প্রত্যাশা বদলে যায়। পরে সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজার, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তিত হয়।
হরমুজের পরবর্তী প্রতিচ্ছবি কি তাইওয়ান প্রণালি?
হরমুজে যে কৌশল দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে তার আরও বড় রূপ পূর্ব এশিয়ায় দেখা যেতে পারে।
তাইওয়ানকে ঘিরে প্রচলিত যুদ্ধচিত্রে সাধারণত ধরে নেওয়া হয়, চীন দ্বীপটিকে অবরোধ করবে এবং তাইওয়ান দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়বে। কিন্তু আধুনিক ড্রোন, ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র, বাণিজ্যিক সংবেদক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তাইওয়ান প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। চীনের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সেই বাণিজ্যের বড় অংশ সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়।
তাইওয়ানের হাতে যদি ৭৫০ মাইল পর্যন্ত পাল্লার হাজার হাজার ড্রোন থাকে, তাহলে সাংহাই, নিংবো-ঝৌশান এবং শেনচেনসহ চীনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তাইওয়ানকে অসংখ্য ক্ষুদ্র আক্রমণ পরিচালনার জন্য একটি ডুবিয়ে দেওয়া যায় না এমন বিশাল উৎক্ষেপণস্থল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
বড় ধরনের ক্ষতি করতে বহু জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ারও প্রয়োজন হবে না। কয়েকটি সফল হামলা অথবা হামলার বিশ্বাসযোগ্য আশঙ্কা তৈরি হলে বীমার খরচ বেড়ে যেতে পারে, জাহাজ পরিচালনাকারীরা ঝুঁকি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে এবং চলাচল কমে যেতে পারে।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশ চীনা পণ্য ও যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে চীনের সমুদ্রবাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হলে কয়েক মাসের মধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতি সংকোচনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। জ্বালানি আমদানি, শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা, রপ্তানি, জাহাজ অর্থায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ একই সঙ্গে চাপে পড়বে।
চীন ১৯৮০-এর দশকে বড় অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করার পর এমন সংকট দেশটির জন্য সবচেয়ে গুরুতর বহিরাগত অর্থনৈতিক আঘাত হয়ে উঠতে পারে। তাই ইরান সংঘাতে মার্কিন সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ করে বেইজিং তাইওয়ানে সামরিক অভিযান চালানোর ঝুঁকি নতুন করে বিবেচনা করতে পারে।
বিশ্বশক্তির নতুন নিয়ম কী?
নতুন বাস্তবতায় প্রথম নিয়ম হলো, ধ্বংস করার ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ফল নির্ধারণের ক্ষমতা এক বিষয় নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্র। দেশটি বিপুলসংখ্যক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু শত্রুর অস্ত্র ধ্বংস করা আর তাকে নিজের রাজনৈতিক শর্ত মানতে বাধ্য করা এক নয়।
দ্বিতীয় নিয়ম হলো, সংঘাত যত বড় হবে, শক্তিশালী পক্ষই সব সময় তত বেশি সুবিধা পাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সস্তা নির্ভুল অস্ত্র, দুর্গম ভূগোল এবং ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সশস্ত্র দল দুর্বল পক্ষকে দীর্ঘ সময় প্রতিরোধের সুযোগ দেয়।
তৃতীয় নিয়ম হলো, দুর্বল পক্ষকে যুদ্ধে প্রচলিত অর্থে জিততে হবে না। তাকে শুধু শক্তিশালী প্রতিপক্ষের খরচ বাড়াতে হবে, বাজারের আস্থা কমাতে হবে এবং নিজের দ্রুত পরাজয় সম্পর্কে তৈরি প্রত্যাশাকে ভুল প্রমাণ করতে হবে।
চতুর্থ নিয়ম হলো, ভবিষ্যতের বড় সংঘাতগুলো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংকীর্ণ পথকে কেন্দ্র করে ঘটতে পারে। তাইওয়ান প্রণালি, দক্ষিণ চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালি, লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালি শুধু জলপথ নয়। এগুলো বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ শিরা।
এসব অঞ্চলে অনিশ্চয়তা বাড়লে বীমা ব্যয়, পরিবহন খরচ, কৌশলগত মজুত এবং দেশীয় উৎপাদনের রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই পণ্যের জন্য একাধিক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গত কয়েক দশকে বিশ্বায়ন যে দূরত্ব কমিয়েছিল, নিরাপত্তাহীনতা সেই দূরত্ব আবার বাড়িয়ে দিতে পারে।
সামনে কেমন বিশ্ব অপেক্ষা করছে?
পরাশক্তির যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে, এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা এখনো অতুলনীয়। সব দুর্বল রাষ্ট্রও ইরানের মতো সুবিধা কাজে লাগাতে পারবে না। একটি দেশের ভূগোল, প্রযুক্তি পাওয়ার সুযোগ, রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
তবে শক্তির সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে।
আগে শক্তিশালী রাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পদকে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বে এবং সেই শ্রেষ্ঠত্বকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রূপান্তর করত। এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে প্রযুক্তি দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। সেই প্রযুক্তি দুর্বল পক্ষকেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের ওপর এমন ব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, যা অতীতে সম্ভব ছিল না।
ফলে একটি পরাশক্তির প্রকৃত ক্ষমতা শুধু কতটি যুদ্ধবিমান, জাহাজ বা ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। তার নেতৃত্বে থাকা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি অন্যরা কতটা আস্থা রাখছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালি হয়তো এই নতুন যুগের সূচনামাত্র। একই কৌশল যদি তাইওয়ান প্রণালি বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে দেখা দেয়, তাহলে আগামী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বিশ্বায়নের সম্প্রসারণ দিয়ে নয়, বরং বিশ্বায়নকে রক্ষা করার ক্রমবর্ধমান খরচ দিয়ে চিহ্নিত হবে।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের নতুন প্রশ্নটি আর শুধু কে বেশি শক্তিশালী, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কে দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তা সহ্য করতে পারবে, কে কম খরচে প্রতিপক্ষের ব্যয় বাড়াতে পারবে এবং কে বিশ্ববাজারের বিশ্বাস নিজের পক্ষে পরিচালিত করতে পারবে। হরমুজের সংঘাত দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতের শক্তির লড়াই শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বীমার হিসাব, জাহাজের গতিপথ, বাজারের আস্থা এবং মানুষের প্রত্যাশার মধ্যেও নির্ধারিত হবে।

