দ্বৈত ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভেনেজুয়েলা পুনর্গঠনের জন্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা ৩১ টন স্বর্ণ ফেরত চাইছে। তবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিরোধের কারণে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই সম্পদ এখনও দেশটির নাগালের বাইরে।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা বর্তমানে এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি। দেশের পুনর্গঠনের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও বিদেশে সংরক্ষিত নিজেদের স্বর্ণ মজুদ ব্যবহার করতে পারছে না তারা। লন্ডনের ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা প্রায় ৩১ টন স্বর্ণ, যার বর্তমান আনুমানিক মূল্য ৪ বিলিয়ন ডলার, দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতার কারণে আটকে রয়েছে।
সম্প্রতি দেশটিতে সংঘটিত ভয়াবহ দ্বৈত ভূমিকম্পে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশের সমান। এমন পরিস্থিতিতে সরকার দ্রুত পুনর্গঠন কার্যক্রমে অর্থায়নের জন্য নিজেদের স্বর্ণ মজুদ ফেরত চাইলেও এখনো তা হাতে পায়নি।
বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ স্বর্ণ ভল্ট পরিচালনা করে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। বহু দেশ তাদের বৈদেশিক স্বর্ণ রিজার্ভ সেখানে সংরক্ষণ করে থাকে। ভেনেজুয়েলাও ২০০৮ সালে তাদের স্বর্ণের একটি অংশ সেখানে জমা রাখে। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে সেই সম্পদের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ হারায় দেশটি।
এই সংকটের সূত্রপাত ২০১৮ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর। সে সময় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক পশ্চিমা দেশ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এর পর থেকেই ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ভেনেজুয়েলার স্বর্ণ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত রাখে। বিষয়টি পরে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে রূপ নেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতিতে নতুন মোড় এসেছে। জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে মাদুরো আটক হওয়ার পর তার সাবেক সহযোগী ডেলসি রদ্রিগেজ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। এরপর থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, তেল খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন উদ্যোগে সহযোগিতার মতো পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে তার প্রশাসন।
এখন রদ্রিগেজের লক্ষ্য যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কের অচলাবস্থা দূর করে স্বর্ণ মজুদ ফেরত আনা। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, এই স্বর্ণ ভেনেজুয়েলার জনগণের সম্পদ এবং ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজেই এটি ব্যবহার করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার নিজস্ব সম্পদ রয়েছে এবং সেই সম্পদ কাজে লাগাতে পারলে দেশ আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
রদ্রিগেজ বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছেও চিঠি পাঠিয়েছেন। তবে যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী রাজা সরাসরি রাজনৈতিক বা সরকারি সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেন না। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে যুক্তরাজ্য সরকার এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক কর্তৃপক্ষের অবস্থানের ওপর।
এর আগে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার নতুন সরকারকে তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিলেও যুক্তরাজ্যের নীতির মূল লক্ষ্য গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
এদিকে যুক্তরাজ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নতুন প্রশাসন এ বিষয়ে কী অবস্থান নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে। দীর্ঘ সাত বছর পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ায় ভেনেজুয়েলা সম্প্রতি নিজেদের সংরক্ষিত তহবিল থেকে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলার ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে, যা ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে।
তবে সেই অর্থ দেশের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বিশ্লেষকদের মতে, যদি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে আটকে থাকা ৪ বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ ফেরত পাওয়া যায়, তাহলে পুনর্গঠন কার্যক্রম অনেক দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার মোট স্বর্ণ রিজার্ভের পরিমাণ নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন তথ্য রয়েছে। দুই দশক আগে দেশটির কাছে প্রায় ৩০০ টন স্বর্ণ ছিল বলে জানা গেলেও বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী সেই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে দেশটির স্বর্ণ মজুদ ১৬১ টন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যুক্তরাজ্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই স্বর্ণ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে কি না। কারণ এই স্বর্ণ শুধু একটি আর্থিক সম্পদ নয়; দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত লাখো মানুষের পুনর্বাসন ও দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গেও এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে ভেনেজুয়েলা।

