ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা যুদ্ধবিমানের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রায় অদৃশ্য ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে মহাকাশ। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক এই যুদ্ধে কৃত্রিম উপগ্রহ, মহাকাশভিত্তিক নজরদারি, নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তিই ক্রমশ ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ কারণে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার পরোক্ষ মহাকাশ প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন।
সম্প্রতি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র জর্ডান থেকে তাদের ট্রাইটন নজরদারি ড্রোন ইতালিতে সরিয়ে নেয়। উচ্চ উচ্চতায় সমুদ্র ও সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত এসব ড্রোন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে, গত বছরের স্বল্পস্থায়ী সংঘাতের তুলনায় এবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অনেক বেশি নির্ভুলভাবে জর্ডান, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশের কৌশলগত স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। এসব লক্ষ্যবস্তু অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সাধারণ নজরদারিতে শনাক্ত করা কঠিন। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, উন্নত মহাকাশভিত্তিক নজরদারি ও নেভিগেশন প্রযুক্তির সহায়তায় এসব হামলার কার্যকারিতা বেড়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুধু বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন থাকলেই যুদ্ধের ফল বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, আকাশপথে নির্ভুলভাবে পরিচালনা, শত্রুপক্ষের সিগন্যাল জ্যামিং এড়িয়ে যাওয়া এবং বিভ্রান্তিকর সংকেত তৈরি—সবকিছুতেই মহাকাশ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তা ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক নেভিগেশন স্যাটেলাইট ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং মহাকাশভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র আধিপত্য ধরে রাখলেও গত কয়েক বছরে চীনের দ্রুত অগ্রগতি সেই ভারসাম্য বদলে দিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ২০২০ সালে চীনের নিজস্ব বেইদৌ নেভিগেশন ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হওয়ার পর মহাকাশ প্রযুক্তিতে বেইজিংয়ের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি চীনের মহাকাশ প্রযুক্তিই যুদ্ধক্ষেত্রে বড় পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে। ফলে বর্তমান সংঘাতকে ইতিহাসের প্রথম প্রক্সি বা পরোক্ষ মহাকাশ যুদ্ধ বলেও অভিহিত করা হচ্ছে, যেখানে সরাসরি মুখোমুখি না হয়েও বিশ্বের দুই প্রধান মহাকাশ শক্তি নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরীক্ষা দিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের মহাকাশ শক্তি হয়ে ওঠার পেছনে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র জিপিএস, গোয়েন্দা উপগ্রহ, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অল্প সময়ের মধ্যে ইরাকি বাহিনীকে পরাজিত করে। ওই অভিজ্ঞতার পরই চীনের নেতৃত্ব আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক শক্তি গড়ে তোলার পরিকল্পনা জোরদার করে।
সেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ফল এখন ইরানের যুদ্ধক্ষেত্রে দৃশ্যমান বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চীনের মহাকাশ প্রযুক্তির সহায়তায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধকে ব্যয়বহুল ও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র দিয়েও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব—এ বাস্তবতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে তাইওয়ান প্রশ্ন, দক্ষিণ চীন সাগর এবং মালাক্কা প্রণালিকে ঘিরে চীনের সামরিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ চীনের জ্বালানি আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ এসব নৌপথের ওপর নির্ভরশীল।
একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকেও নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চীন ইতোমধ্যে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য জাহাজ নির্মাণ শিল্প সম্প্রসারণ করেছে, যা বাণিজ্যিক ও সামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই কাজে লাগানো সম্ভব। এর জবাবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সামুদ্রিক আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু স্থল, আকাশ বা সমুদ্রে সীমাবদ্ধ নেই; মহাকাশ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নৌপথও এখন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে পরিণত হয়েছে।

