চীন যদি চারদিক থেকে সমুদ্রপথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে দ্বীপটিতে জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি পণ্য পৌঁছাবে কীভাবে? বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখা যাবে কত দিন? বিদেশি সহায়তাবাহী জাহাজ নিরাপদে বন্দরে পৌঁছাতে পারবে তো?
এমন সম্ভাব্য সংকট মাথায় রেখে এখন নীরবে কিন্তু জোরেশোরে প্রস্তুতি নিচ্ছে তাইওয়ান। দেশটির কর্মকর্তারা বিভিন্ন মহড়া ও পরিস্থিতিভিত্তিক অনুশীলনের মাধ্যমে যাচাই করছেন—চীনের নৌ অবরোধের মুখে দ্বীপটি কতটা টিকে থাকতে পারবে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনটি লিখেছেন ক্রিস বাকলি ও অ্যামি চ্যাং চিয়েন।
তাইওয়ান ঘিরে বাড়ছে চীনা টহল
তাইওয়ানের চারপাশে চীনের সশস্ত্র জাহাজের উপস্থিতি বাড়ছে। বিশেষ করে দ্বীপটির পূর্ব উপকূলে চীনা কোস্ট গার্ডের নিয়মিত টহল তাইপের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি নৌবাহিনীর জাহাজ ও সামরিক বিমান ব্যবহার করে এমন মহড়া চালিয়েছে, যার মাধ্যমে তাইওয়ানের সঙ্গে বাইরের বিশ্বের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার অনুশীলন করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অবরোধ শুরু হলে দ্বীপটিতে প্রয়োজনীয় সরবরাহ কীভাবে সচল রাখা যাবে? কর্মকর্তারা জাহাজকে নিরাপদে বন্দরে নিয়ে আসা, প্রয়োজনে যাত্রাপথ পরিবর্তন করা এবং পৌঁছানো পণ্য সারা দেশে সংরক্ষণ ও বিতরণের পরিকল্পনা পরীক্ষা করছেন। সম্ভাব্য অবরোধ মোকাবিলায় তাঁরা ‘টেবিলটপ এক্সারসাইজ’ বা যুদ্ধ পরিস্থিতির কাগুজে মহড়াও চালিয়েছেন।
জ্বালানিই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা
তাইওয়ানের জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখা। দ্বীপটি প্রয়োজনীয় জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে। দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে।
অর্থাৎ সমুদ্রপথ বন্ধ হয়ে গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সরবরাহ সংকটে পড়তে পারে।
তাইওয়ানের হাতে কমপক্ষে ১১ দিনের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকে। সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ব্যবহার করলে প্রায় ২০ দিনের গ্যাস সংরক্ষণ করা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের ক্ষেত্রে এই মজুত যথেষ্ট হবে না।
তাইওয়ানের জ্বালানি প্রশাসনের উপপরিচালক চেন চুং-সিয়েন বলেন, তাঁরা জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত মহড়া চালান। পরিকল্পনা তৈরির সময় সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সমুদ্রে ভাসমান গ্যাস টার্মিনালের চিন্তা
জরুরি পরিস্থিতিতে গ্যাস গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করার জন্য বিশেষ জাহাজ কেনার সম্ভাবনা যাচাই করছে তাইওয়ান। এসব জাহাজ সমুদ্রের ওপর ভাসমান গ্যাস সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে।
সরকারদলীয় আইনপ্রণেতা চেন কুয়ান-তিংয়ের মতে, এমন জাহাজ থাকলে অবরোধের সময় গ্যাস কোথায় গ্রহণ করা হবে এবং কীভাবে তা সরবরাহ করা হবে, সে বিষয়ে তাইওয়ানের হাতে বেশি বিকল্প থাকবে।
তবে নিরাপদ স্থান খুঁজে বের করা সহজ নয়। তাইওয়ানের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস গ্রহণ ও সংরক্ষণের তিনটি টার্মিনালই দ্বীপটির পশ্চিম উপকূলে। চীনের সবচেয়ে কাছাকাছি হওয়ায় সংঘাতের সময় এসব স্থাপনা আক্রমণ বা হয়রানির সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, পূর্ব উপকূল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে হলেও সেখানেও সমস্যা রয়েছে। অঞ্চলটি পাহাড়ি, সড়ক সরু এবং বন্দরগুলো ছোট। বড় গ্যাসবাহী জাহাজ গ্রহণ করা কিংবা সেখান থেকে গ্যাস নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ করার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও নেই।
তাই কর্মকর্তারা মনে করছেন, পশ্চিম উপকূলে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছাকাছি একটি ভাসমান টার্মিনাল তৈরি করা হয়তো বেশি বাস্তবসম্মত হবে।
আবার কি পারমাণবিক বিদ্যুতে ফিরবে তাইওয়ান?
স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বন্ধ হয়ে যাওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আবার চালু করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে তাইওয়ান সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট শুরু হওয়ার আগেই দেশটির জ্বালানির উৎস এবং জ্বালানি পৌঁছানোর পথ—দুটিই বহুমুখী করতে হবে। কারণ শুধু কয়েকটি আমদানিকারক দেশ বা কয়েকটি বন্দরনির্ভর ব্যবস্থা অবরোধের সময় দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের চীনবিষয়ক কর্মকর্তা ক্রেইগ সিঙ্গেলটন জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান গত বছর তাইওয়ানের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়িক নেতাদের নিয়ে একটি সম্ভাব্য ‘জ্বালানি অবরোধের’ মহড়া চালিয়েছিল। সেই অনুশীলনে স্পষ্ট হয়, সংকট শুরুর আগেই তাইওয়ানকে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস ও পথ তৈরি করতে হবে।
সরাসরি যুদ্ধ নয়, চাপ তৈরির নতুন কৌশল
তাইওয়ানের আশঙ্কা শুধু পূর্ণমাত্রার সামরিক আক্রমণ নিয়ে নয়। দেশটির কর্মকর্তারা এমন এক ধরনের চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন, যেখানে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হবে না—কিন্তু চীনা জাহাজ তাইওয়ানমুখী বাণিজ্যিক জাহাজকে সতর্ক করবে, থামাবে, তল্লাশি করবে কিংবা ফিরে যেতে বাধ্য করবে।
এ ধরনের পদক্ষেপকে ‘গ্রে জোন’ বা ধূসর অঞ্চলের কৌশল বলা হয়। অর্থাৎ এটি সরাসরি যুদ্ধ নয়, কিন্তু প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার জন্য শক্তি প্রয়োগের কাছাকাছি একটি ব্যবস্থা।
চীন তাইওয়ানের পূর্বদিকের সমুদ্রসীমায় নিজেদের কর্তৃত্ব রয়েছে বলে দাবি করে, যদিও তাইওয়ান তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সম্প্রতি ওই এলাকায় থাকা একটি চীনা সরকারি জাহাজ তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজের সঙ্গে রেডিওতে যোগাযোগ করে তাদের যাত্রা ও নাবিকদের বিষয়ে তথ্য চেয়েছিল।
তাইপেভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রসপেক্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি লাই আই-চুংয়ের মতে, ঘটনাটি ছিল সম্ভাব্য সামুদ্রিক ‘কোয়ারেন্টিন’ বা নিয়ন্ত্রিত অবরোধের প্রাথমিক অনুশীলন। এর মাধ্যমে জাহাজ তল্লাশি করা এবং প্রয়োজনে সমুদ্র থেকেই ফিরিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি পরীক্ষা করা হতে পারে।
কোস্ট গার্ডকে সামনে রাখছে বেইজিং
তাইওয়ানের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের হিসাবে, চীনের নৌবাহিনী নিয়মিত সাত থেকে আটটি যুদ্ধজাহাজ দ্বীপটির চারপাশে মোতায়েন করে। এখন সেই উপস্থিতির সঙ্গে চীনা কোস্ট গার্ডের বড় ও ভারী অস্ত্রসজ্জিত জাহাজও যুক্ত হচ্ছে।
কোস্ট গার্ডকে ব্যবহার করলে চীন সামরিক যুদ্ধ ঘোষণা না করেই তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়ানোর আরও সুযোগ পাবে। কারণ এসব জাহাজকে বেসামরিক আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর অংশ হিসেবে দেখানো হলেও সেগুলো চীনের সামরিক কমান্ডের অধীনে কাজ করে এবং সামরিক মহড়ায় ক্রমেই বেশি যুক্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি এক মহড়ায় তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে এবং তাঁর শীর্ষ কর্মকর্তারা এমন একটি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন, যেখানে চীন দাবি করছে—তাইওয়ানের দিকে আসা সব জাহাজকে আগে বেইজিংয়ের অনুমতি নিতে হবে। মহড়ায় চীনা কোস্ট গার্ড জাহাজে উঠে তল্লাশি চালানো এবং জাহাজ জব্দ করার পরিস্থিতিও বিবেচনা করা হয়।
২০২৪ সালে চীনের একটি কোস্ট গার্ড টহলদল অল্প সময়ের জন্য তাইওয়ানের একটি ফেরিতে উঠেছিল। ফলে এমন পরিস্থিতি একেবারেই কল্পনানির্ভর নয়।
বিদেশি সহায়তা গ্রহণের মহড়াও হবে
তাইওয়ানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পূর্ব উপকূলে দুর্যোগ মোকাবিলার মহড়া আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে। সেখানে আন্তর্জাতিক চিকিৎসক দল ও বিদেশি সরবরাহ গ্রহণের সক্ষমতা পরীক্ষা করা হবে।
অন্য মহড়াগুলোতে স্বরাষ্ট্র, অর্থনীতি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একসঙ্গে কাজ করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে পারে। তাঁদের কাজ হবে বন্দরে পৌঁছানো পণ্য দ্রুত দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো। আর সমুদ্রপথে জাহাজকে নিরাপদে নিয়ে আসার দায়িত্ব থাকবে তাইওয়ানের নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের ওপর।
মাত্র দুই মাসে ৮৫ বার চীনা জাহাজ
তাইওয়ান কোস্ট গার্ডের হিসাবে, মে ও জুন মাসে চীনা কোস্ট গার্ড এবং অন্যান্য সরকারি জাহাজ তাইওয়ানের মূল দ্বীপের কাছে ৮৫ বার চলাচল করেছে। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪৫।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, তাইওয়ানের চারপাশে চীনা সরকারি জাহাজের তৎপরতা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব জাহাজ এখন অনেকাংশে প্রতীকী চাপ তৈরির কাজ করলেও ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপে ব্যবহার করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল ওয়ার কলেজের সহযোগী অধ্যাপক রায়ান ডি. মার্টিনসন বলেন, একবার চীনা জাহাজগুলো নিয়মিতভাবে ওই এলাকায় অবস্থান শুরু করলে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া বেইজিংয়ের জন্য সহজ হয়ে যাবে।
সামনে আরও বাড়তে পারে চাপ
তাইওয়ানের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ও পরে চীনের চাপ আরও বাড়তে পারে।
তামকাং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিং ইউয়ান-চৌ মনে করেন, যুদ্ধের সীমা অতিক্রম না করে চালানো চীনের এসব ‘গ্রে জোন’ তৎপরতা ধীরে ধীরে আরও তীব্র হবে।
তাঁর ভাষায়, চীন এখন তাইওয়ানকে একবারে দখল করার বদলে ধীরে ধীরে, টুকরো টুকরো করে চাপে রাখছে। কিন্তু এই ধীর চাপই ভবিষ্যতে আরও বড় পদক্ষেপের পথ তৈরি করতে পারে।
তাইওয়ানের প্রস্তুতি তাই শুধু সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য নয়। বরং যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই যদি জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা হয়, জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে অচল করার চেষ্টা চলে—সেই দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সংকট সামাল দেওয়ার সক্ষমতাই এখন পরীক্ষা করছে দ্বীপটি।

