বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের আধিপত্য ভবিষ্যতে কতটা টিকে থাকবে—এ নিয়ে নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের বিতর্ক চলছে বহুদিন ধরে। কিন্তু সেই বিতর্কের আড়ালেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কোম্পানি, ক্লাউড সেবা প্রদানকারী এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কগুলো হয়তো বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থার পরবর্তী অধ্যায় লিখতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তনকে প্রভাবিত করতে আগ্রহী দেশগুলো এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতের এই নতুন ব্যবস্থায় তারা পিছিয়ে পড়তে পারে।
পেট্রোডলারের পর কি আসছে ‘এআই ডলার’?
কোনো এআই কোম্পানি যখন ২০ বছরের জন্য একটি ডেটা সেন্টার ভাড়া নেয়, তখন সেটিকে সাধারণত মুদ্রা বা অর্থব্যবস্থার ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না। একইভাবে, এআই খাতের সঙ্গে যুক্ত কোনো ডলার-নির্ভর স্টেবলকয়েন চালু হলেও অনেকে এটিকে কেবল প্রযুক্তি বা ডিজিটাল অর্থনীতির ঘটনা হিসেবেই বিবেচনা করেন।
তবে এমন ঘটনাগুলো এখন দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে, যেখানে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—কম্পিউটিং ক্ষমতা—ডলারে মূল্য নির্ধারিত হবে, ডলারেই পরিশোধ করা হবে এবং সেই অর্থ আবার মার্কিন ডলারভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগ হবে।
এই ধারণা পুরোপুরি নতুন নয়। ১৯৭০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রধানত মার্কিন ডলারে নির্ধারিত হয়ে আসছে। এতে বিশ্বজুড়ে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর হাতে জমা হওয়া ডলারের একটি বড় অংশ আবার যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজারে ফিরে গেছে। এভাবেই তৈরি হয়েছে তথাকথিত ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা।
এআই অর্থনীতিতেও একই ধরনের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। বর্তমানে এআই নিয়ে আলোচনায় মূল প্রশ্ন থাকে—কোন কোম্পানি সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল তৈরি করবে? কিন্তু আসল পরিবর্তন শুরু হবে তখন, যখন বিভিন্ন মডেলের সক্ষমতা কাছাকাছি চলে আসবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এআইকে স্থায়ীভাবে যুক্ত করবে। তখন আমরা যেমন এখন প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ডলারে হিসাব করি, ভবিষ্যতে তেমনি প্রতি ইউনিট কম্পিউটিং ক্ষমতার দামও ডলারে হিসাব করতে পারি।
এআইয়ের মূল চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ ও ডেটা সেন্টার
এআই কোনো ওজনহীন প্রযুক্তি নয়। এর পেছনে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ, জমি, সার্ভার, চিপ এবং ডেটা সেন্টার অবকাঠামো প্রয়োজন। ডেটা সেন্টার বিদ্যুৎকে ব্যবহারযোগ্য ও বিক্রয়যোগ্য কম্পিউটিং ক্ষমতায় রূপান্তর করে।
এ কারণেই এআই কোম্পানিগুলো বহু বছর আগেই ডেটা সেন্টারের ক্ষমতা নিশ্চিত করছে। উদাহরণ হিসেবে, কোনো এআই প্রতিষ্ঠান যখন অবকাঠামো সরবরাহকারী কোম্পানির সঙ্গে ২০ বছরের চুক্তি করে, সেটি অনেকটা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা সংরক্ষণের মতো। এর মাধ্যমে তারা ধরে নিচ্ছে যে ভবিষ্যতেও কম্পিউটিং ক্ষমতার চাহিদা অব্যাহত থাকবে।
বর্তমানে বহু প্রতিষ্ঠান এআই নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও খুব কম প্রতিষ্ঠানই তাদের পুরো কার্যক্রম এআইকে কেন্দ্র করে পুনর্গঠন করেছে। তবে এআই প্রকৌশলীদের সরাসরি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যুক্ত করে কাজের প্রক্রিয়ায় এআই সংযোজনের উদ্যোগ বাড়ছে। একবার এসব ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে চালু হলে কম্পিউটিং ব্যয় প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত পরিচালন ব্যয়ের অংশ হয়ে যাবে।
ডলারের আধিপত্য বাড়তে পারে যেভাবে
ডলারের প্রভাব শক্তিশালী হওয়ার প্রথম পথটি তৈরি হবে এআই সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে।
যদি এআই চিপ, ক্লাউড সেবা, ডেটা সেন্টার এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির বড় অংশ মার্কিন কোম্পানি বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং এসব সেবার মূল্য ডলারে নির্ধারিত হয়, তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানকে এআই ব্যবহারের জন্য ডলার সংগ্রহ করতে হবে।
এর ফলে বৈশ্বিক ডিজিটাল উৎপাদন যত বাড়বে, ডলারের চাহিদাও তত বাড়বে। এই অর্থ আবার ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যেই জমা হবে। তেলের ক্ষেত্রে রপ্তানি আয় প্রথমে উৎপাদনকারী দেশে জমা হয়ে পরে মার্কিন বাজারে ফিরত। কিন্তু এআই সেবার ক্ষেত্রে অর্থ অনেক সময় শুরু থেকেই ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার ভেতরে থেকে যাবে।
এআই এজেন্ট ও স্বয়ংক্রিয় লেনদেন
ডলারের আধিপত্য বাড়ার দ্বিতীয় পথটি তৈরি হতে পারে নতুন ধরনের ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর মাধ্যমে।
ভবিষ্যতে এআই এজেন্ট মানুষের সামান্য নির্দেশনায় বিভিন্ন সেবা কিনতে, পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতে এবং প্রতিষ্ঠানের মজুত শেষ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন অর্ডার দিতে পারে। এমন একটি ব্যবস্থায় প্রতিটি লেনদেন মানুষের হাতে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। পেমেন্টকে হতে হবে স্বয়ংক্রিয়, প্রোগ্রামযোগ্য এবং যন্ত্রের উপযোগী।
এখানেই ডলারের সঙ্গে যুক্ত স্টেবলকয়েন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ডলার-নির্ভর স্টেবলকয়েন ব্যবহার করে এআই এজেন্ট দ্রুত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ পরিশোধ করতে পারবে। ‘ওপেন ইউএসডি’র মতো উদ্যোগ—যার পেছনে বহু পেমেন্ট, আর্থিক ও ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান রয়েছে—দেখায় যে এ ধরনের ভবিষ্যতের জন্য ডলারভিত্তিক ডিজিটাল টোকেন ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভরতা থেকে মুদ্রানির্ভরতা
একসময় এআই কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল পেমেন্টের এই দুটি পথ একত্রিত হতে পারে। অর্থাৎ, যে ডলারভিত্তিক স্টেবলকয়েন নেটওয়ার্ক এআই এজেন্টের কেনাকাটা ও বাণিজ্যিক লেনদেন সম্পন্ন করবে, সেই একই ব্যবস্থায় ক্লাউড ও কম্পিউটিং সেবার মূল্যও পরিশোধ করা হতে পারে।
তখন এআই সেবার মূল্য ডলারে নির্ধারণের পাশাপাশি অর্থ পরিশোধও হবে ডলারভিত্তিক স্টেবলকয়েনে। এর ফলে প্রযুক্তিগত নির্ভরতা ধীরে ধীরে মুদ্রাগত নির্ভরতায় পরিণত হতে পারে।
অবশ্য টোকেনাইজড ব্যাংক আমানত বা বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত ডিজিটাল মুদ্রাও একই কাজ করতে পারে। কিন্তু পেমেন্ট ব্যবস্থায় যারা আগে বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে, তারা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পায়। তাই প্রশ্নটি এই নয় যে ডলার স্টেবলকয়েনই একমাত্র সমাধান কি না। বরং প্রশ্ন হলো—এগুলো কি অন্যদের আগে বড় পরিসরে কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে?
স্টেবলকয়েনের অর্থ ফিরে যাচ্ছে মার্কিন ট্রেজারিতে
ডলার-নির্ভর স্টেবলকয়েনের চাহিদা বাড়লে এর বিপরীতে নিরাপদ সম্পদ সংরক্ষণের প্রয়োজনও বাড়বে। এসব স্টেবলকয়েনের রিজার্ভ হিসেবে সাধারণত মার্কিন ট্রেজারি বিলের মতো নিরাপদ সম্পদ রাখা হয়।
এআই এজেন্টনির্ভর বাণিজ্য এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে মার্কিন ট্রেজারি বিলের উল্লেখযোগ্য ক্রেতায় পরিণত হয়েছে।
ফলে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘এনার্জি–কম্পিউট–ডলার চক্র’ তৈরি হতে পারে। বিদ্যুৎ ডেটা সেন্টার চালাবে, ডেটা সেন্টার কম্পিউটিং ক্ষমতা তৈরি করবে, সেই কম্পিউটিং ক্ষমতা ব্যবসা ও পেমেন্টকে স্বয়ংক্রিয় করবে, আর ডলারভিত্তিক স্টেবলকয়েনের রিজার্ভ আবার মার্কিন ট্রেজারিতে বিনিয়োগ হবে।
এই চক্র যত বিস্তৃত হবে, এআই অবকাঠামো, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং মার্কিন আর্থিক বাজারের মধ্যে সম্পর্ক তত শক্তিশালী হবে।
কোনো সরকারের পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে উঠছে নতুন ব্যবস্থা
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়া কোনো একক সরকারের পরিকল্পনায় পরিচালিত হচ্ছে না।
পেট্রোডলার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন সরকারি চুক্তি ও কূটনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে। কিন্তু সম্ভাব্য এআই-নির্ভর ডলার ব্যবস্থা মূলত বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে।
ক্লাউড কোম্পানিগুলো জমি ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করছে। এআই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মডেলকে বাণিজ্যিক সেবায় রূপ দিচ্ছে। পেমেন্ট কোম্পানিগুলো স্টেবলকয়েন লেনদেনের অবকাঠামো তৈরি করছে। আর স্টেবলকয়েন প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন ট্রেজারি কিনছে।
প্রতিটি সিদ্ধান্ত আলাদাভাবে ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে যৌক্তিক। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত একসঙ্গে মিলিয়ে নীরবে ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য আরও শক্তিশালী করছে।
ডলারনির্ভরতা কমাতে অন্য দেশগুলোর করণীয়
এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা—বিশেষ করে যেসব দেশ বহু বছর ধরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে।
আসিয়ান+৩ দেশগুলো স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি, জাতীয় পেমেন্ট ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সংযোগ এবং ডলারের সংকট মোকাবিলায় যৌথ রিজার্ভ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এআই ও ডিজিটাল পেমেন্টের নতুন ব্যবস্থা তৈরি হলে এসব দেশ আবার নতুন ধরনের ডলারনির্ভরতার মুখে পড়তে পারে।
এই চক্র পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও নির্ভরতা সীমিত করা যায়। এজন্য জ্বালানি, এআই এবং পেমেন্টকে আলাদা খাত হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সাশ্রয়ী ও ক্রমশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানিচালিত আঞ্চলিক ডেটা সেন্টার তৈরি করা গেলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে কম্পিউটিং সেবা পাবে। পাশাপাশি এআই এজেন্টের লেনদেনের জন্য স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক টোকেনাইজড পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে ডলারনির্ভরতা কমবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও লেনদেন পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।
অন্য দেশগুলোর লক্ষ্য সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা হওয়া উচিত নয়, কারণ নিকট ভবিষ্যতে সেটি বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত—বৈশ্বিক ডিজিটাল উৎপাদনে অংশ নেওয়া, কিন্তু তার বিনিময়ে ডলারের ওপর নতুন ধরনের নির্ভরতা মেনে না নেওয়া।
কারণ পেট্রোডলার ব্যবস্থা অন্তত বিভিন্ন দেশের সরকারি আলোচনার মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এআইভিত্তিক উদীয়মান ব্যবস্থায় অন্য দেশগুলোর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার টেবিলও নাও থাকতে পারে। তাই যারা এই নতুন আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে চায়, তাদের এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে—নইলে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ইতিহাসে তাদের ভূমিকা অন্যরা নির্ধারণ করে দেবে।

