ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও এমন একটি সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন, যেখানে কোনো পথই সহজ নয়। বরং সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, তাঁর সামনে থাকা বিকল্পগুলোর পরিসর ততই সংকুচিত হচ্ছে। সামরিক অভিযান বাড়ানো, অর্থনৈতিক অবরোধ কঠোর করা কিংবা নতুন করে আলোচনায় বসা—প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বড় ধরনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি।
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, টানা ১৩ রাত বিমান হামলার পর সাময়িকভাবে অভিযান বন্ধ রাখার উদ্দেশ্য হলো কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করা। হামলার বিরতি ইতোমধ্যে তৃতীয় রাতে গড়িয়েছে। তবে একই সঙ্গে হোয়াইট হাউস সতর্ক করেছে, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। প্রশাসনের ভাষায়, মার্কিন বাহিনী “সম্পূর্ণ প্রস্তুত” রয়েছে।
এই দ্বৈত বার্তাই ট্রাম্পের বর্তমান সমস্যার সবচেয়ে বড় প্রতিচ্ছবি। একদিকে তিনি ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চান, অন্যদিকে সামরিক শক্তির হুমকি দিয়ে তেহরানকে চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, কেবল সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানের মৌলিক অবস্থান পরিবর্তন করা যাচ্ছে না।
কূটনৈতিক তৎপরতা আছে, তবে সমাধানের লক্ষণ নেই
ইরান জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ওমানের মধ্যস্থতায় দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকটে ওমান অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। ফলে এই আলোচনাকে সম্ভাব্য কূটনৈতিক অগ্রগতির একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে ইরান তার প্রধান দাবি থেকে সরে আসতে প্রস্তুত। তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সেখান থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার দাবি করছে। এই দাবিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সর্বশেষ উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে একটি দেশের হাতে এই প্রণালির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার অর্থ হলো বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের ওপর সেই দেশের বড় ধরনের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা।
যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো ব্যবস্থা মেনে নিতে চাইছে না, যার মাধ্যমে ইরান আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর কর, ফি বা রাজনৈতিক শর্ত আরোপ করতে পারে। অন্যদিকে ইরান এই দাবিকে তার নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান এখনও অনেক বড়।
সামরিক চাপ কেন কাজ করছে না
ট্রাম্প শুরু থেকেই মনে করেছেন, ব্যাপক সামরিক চাপ ইরানকে দ্রুত ছাড় দিতে বাধ্য করবে। কিন্তু পাঁচ মাসের যুদ্ধের পরও সেই কৌশল প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো এবং বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানো হলেও দেশটির নেতৃত্ব তার মূল রাজনৈতিক দাবি থেকে সরে আসেনি।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সমস্যা হলো, সামরিকভাবে দুর্বল হওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণ করা একই বিষয় নয়। একটি দেশের বিমান প্রতিরক্ষা, সামরিক ঘাঁটি বা অস্ত্রভান্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কিন্তু তারপরও সেই দেশ বিকল্প কৌশলে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।
ইরান প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়। তবে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ-মাইন, ছোট আক্রমণকারী নৌযান এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে তেহরান অসম যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে। এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র আকাশপথে সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলেও ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ, তেলবাহী ট্যাংকার কিংবা আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সফল হামলার পরও ইরানের হাতে এমন কিছু উপায় থেকে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে তারা সংঘাতের বৈশ্বিক মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে। এই বাস্তবতাই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য দ্রুত বিজয় অর্জন কঠিন করে তুলেছে।
স্থলবাহিনী পাঠানো কি সমাধান হতে পারে?
ট্রাম্প চাইলে সামরিক অভিযান আরও বাড়িয়ে ইরানের বিরুদ্ধে স্থলবাহিনী মোতায়েন করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত, বিমান ও গোয়েন্দা সক্ষমতা বিবেচনায় এমন পদক্ষেপ ইরানের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বা অবকাঠামো সরাসরি নিয়ন্ত্রণেও নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু এটি হবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্পগুলোর একটি।
প্রথমত, ইরান বিশাল ভূখণ্ড, জটিল পাহাড়ি অঞ্চল এবং বড় জনসংখ্যার দেশ। সেখানে স্থলযুদ্ধ শুরু হলে তা দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব বা গেরিলা যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বড় অংশ ইতোমধ্যেই এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। ফলে স্থলবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেশে বড় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।
ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধকে ব্যয়বহুল এবং ব্যর্থ উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এখন ইরানে স্থলবাহিনী পাঠালে তাঁর নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে বড় ধরনের বিরোধ সৃষ্টি হবে।
তাই সামরিকভাবে সম্ভব হলেও রাজনৈতিকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন।
যুদ্ধ দীর্ঘ হচ্ছে, অথচ লক্ষ্য আরও অস্পষ্ট
ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফল দেবে। কিন্তু প্রায় পাঁচ মাস পরও যুদ্ধের পরিষ্কার সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কী—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই প্রধান উদ্দেশ্য। পরে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং দেশটির আঞ্চলিক প্রভাবও যুদ্ধের আলোচনায় যুক্ত হয়েছে।
যুদ্ধের লক্ষ্য যত বিস্তৃত হচ্ছে, বিজয়ের সংজ্ঞাও তত অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, সরকার পরিবর্তন করা, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত রাখা এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব শেষ করা—এসব লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে হতে পারে।
অন্যদিকে সীমিত সামরিক অভিযান চালিয়ে এসব লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা কম। ফলে ট্রাম্প এমন এক অবস্থায় পড়েছেন, যেখানে তিনি যুদ্ধ বাড়াতে চান না, কিন্তু বর্তমান মাত্রার যুদ্ধ দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না।
জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ছে
ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। গত সপ্তাহে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম আরও বাড়তে পারে—এমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও রবিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৫ শতাংশের বেশি কমেছিল, তবুও পরিস্থিতি স্থিতিশীল বলা যাচ্ছে না।
বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে আসছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ দ্রুত কমে যেতে পারে। এর ফলে শুধু জ্বালানির দাম নয়, পরিবহন, খাদ্য, উৎপাদন এবং ভোক্তা পণ্যের দামও বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষ জ্বালানির দামকে সরাসরি সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। পেট্রলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়বে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এই পরিস্থিতি রিপাবলিকান পার্টির জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এমনিতেই দলটি কঠিন নির্বাচনী লড়াইয়ের মুখোমুখি। এর মধ্যে যুদ্ধের ব্যয়, পেট্রলের দাম এবং প্রশাসনের অস্পষ্ট কৌশল ভোটারদের অসন্তোষ আরও বাড়াতে পারে।
বাব এল-মান্দেবেও নতুন হুমকি
হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালিও এখন ঝুঁকির মুখে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা এই পথে জাহাজ চলাচলে হামলার হুমকি দিয়েছে।
বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজগুলো লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের দিকে যাতায়াত করে। হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে কিছু তেল ও পণ্যবাহী জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু হুতি হামলার কারণে বিকল্প পথটিও নিরাপদ থাকছে না।
দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ একসঙ্গে ঝুঁকির মধ্যে পড়লে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতে পারে। এতে পরিবহন সময়, বীমা খরচ এবং পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
ইরান এভাবেই সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রচলিত যুদ্ধে না জড়িয়েও আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এটিই তেহরানের অসম যুদ্ধকৌশলের সবচেয়ে কার্যকর দিক।
আরও বড় হামলা চালানোর ঝুঁকি
ট্রাম্প চাইলে ইরানের পরিবহনব্যবস্থা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর এবং শিল্প অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারেন। এর মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে কার্যত অচল করার চেষ্টা করা হতে পারে।
কিন্তু এ ধরনের হামলার সবচেয়ে বড় শিকার হবে সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হলে হাসপাতাল, পানি সরবরাহ, খাদ্য সংরক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সাধারণ নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত হবে। পরিবহন অবকাঠামো আক্রান্ত হলে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তাঁর লড়াই ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে নয়; বরং দেশটির শাসকগোষ্ঠী ও পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে। কিন্তু বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা বাড়ালে সেই দাবি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।
এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও প্রশ্ন উঠেছে, আরও ব্যাপক বোমা হামলা আদৌ ইরানের নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবে কি না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন হোয়াইট হাউসের বৈঠকে যুদ্ধ বাড়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেইন বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের প্রভাব নিয়ে চিন্তিত।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ধরনের বোমা হামলা ইরানের আলোচনার অবস্থান বদলাতে সক্ষম হওয়ার সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ আরও বোমা হামলা চালানো হলে ধ্বংস ও প্রাণহানি বাড়তে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক ফল একই থেকে যেতে পারে।
অর্থনৈতিক অবরোধ: ধীর কিন্তু অনিশ্চিত পথ
আরেকটি বিকল্প হলো ইরানের জাহাজ, বন্দর এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ আরও কঠোর করা। এর উদ্দেশ্য হবে ইরান সরকারের রাজস্ব এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের অর্থায়ন কমিয়ে দেওয়া।
এই কৌশল সামরিক হামলার তুলনায় কম তাৎক্ষণিক প্রাণহানি ঘটাতে পারে। তবে কার্যকর ফল পেতে কয়েক সপ্তাহ নয়, কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। ততদিনে ইরান বিকল্প রপ্তানি নেটওয়ার্ক, চোরাচালান এবং মিত্র দেশগুলোর সহায়তা ব্যবহার করে অবরোধের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করবে।
এ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক অবরোধ বাস্তবায়ন করাও প্রায় যুদ্ধের সমতুল্য। কোনো ইরানি জাহাজকে থামানো বা আটকানোর সময় সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হতে পারে। ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলা চালাতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পের কাছে এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অনুসরণ করার মতো রাজনৈতিক সময় ও ধৈর্য আছে কি না। মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তিনি দ্রুত দৃশ্যমান ফল চাইবেন। কিন্তু অর্থনৈতিক অবরোধ সাধারণত ধীরে কাজ করে এবং ফলাফলও নিশ্চিত নয়।
পুরোনো সমঝোতা ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ভেঙে যাওয়া সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করতে পারে। সেই চুক্তি অল্প সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং আঞ্চলিক পুনর্গঠন তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতিও ছিল।
কিন্তু ইরান সম্ভবত নতুন করে সমঝোতায় ফিরতে চাইবে না, যদি হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও সেখান থেকে রাজস্ব পাওয়ার কোনো অধিকার না পায়। তেহরান মনে করে, আগের সমঝোতায় এই সুযোগের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র এমন দাবি মেনে নিলে তা ওয়াশিংটনের জন্য রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হতে পারে। কারণ যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। যুদ্ধের পর ইরানকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হলে প্রশ্ন উঠবে—যুদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী অর্জন করল?
বিদেশনীতি বিষয়ে কট্টরপন্থী রিপাবলিকান নেতারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুর্বলতার অভিযোগ তুলতে পারেন। তাঁরা বলতে পারেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও প্রেসিডেন্ট শেষ পর্যন্ত ইরানের দাবির কাছে নতি স্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে ইরানের দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করলে শান্তি আলোচনার পথও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে সমঝোতার পথও ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ নয়।
“ভিন্ন কিছু” দরকার, কিন্তু সেটি কী?
রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি বলেছেন, প্রেসিডেন্টের উচিত ইরান যুদ্ধ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু করা। তাঁর মতে, ট্রাম্পকে মার্কিন জনগণ ও কংগ্রেসের সামনে এসে পরিস্থিতি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তে কংগ্রেসকে যুক্ত করতে হবে।
ক্যাসিডির বক্তব্যের মূল কথা হলো—এমন একটি পথ খুঁজতে হবে, যাতে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ না পায় এবং যুক্তরাষ্ট্রকেও ফলহীন যুদ্ধে হাজার কোটি ডলার ব্যয় করতে না হয়।
তিনি বলেছেন, “আমাদের ভিন্ন কিছু প্রয়োজন।”
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সংকট এখানেই। সবাই একটি নতুন কৌশলের কথা বলছে, অথচ সেই নতুন কৌশলটি বাস্তবে কেমন হবে, তা কেউ স্পষ্টভাবে বলতে পারছে না।
সামরিক হামলা কাজ করছে না। স্থলযুদ্ধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থনৈতিক অবরোধ ধীর এবং অনিশ্চিত। আর কূটনৈতিক সমঝোতায় গেলে ইরানকে এমন কিছু ছাড় দিতে হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হবে।
প্রশাসনের শক্ত অবস্থানের দাবি
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজকে হোয়াইট হাউসের পরিবর্তনশীল কৌশল ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রবিবার একাধিক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সব বিকল্প এখনও খোলা রয়েছে।
তিনি সতর্ক করেন, ইরানি সরকারকে ট্রাম্পের সামরিক হুমকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি নিয়েও তিনি কথা বলেন।
ওয়াল্টজের দাবি, ইরান বর্তমানে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং সামরিকভাবে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তাঁর মতে, তেহরান আগে কখনো এত দুর্বল অবস্থায় ছিল না এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন শক্তিশালী অবস্থান থেকে আলোচনা করছে।
সামরিক হিসাবের দিক থেকে এই দাবি আংশিকভাবে সঠিক হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র আকাশ, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং দূরপাল্লার হামলার ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফল শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
ইরান যতক্ষণ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মধ্যে রাখতে পারবে, ততক্ষণ দেশটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। এর ফলে সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে বাধ্য করতে পারে।
খামেনির মৃত্যুর পরও সরকার টিকে থাকা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যুর পরও দেশটির শাসনব্যবস্থা টিকে গেছে। এটি তেহরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী শক্তি তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভেবেছিল, সর্বোচ্চ নেতৃত্বে বড় ধরনের আঘাত এলে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে অথবা দেশটির নেতৃত্ব দ্রুত সমঝোতায় যেতে বাধ্য হবে। কিন্তু সরকার টিকে থাকায় ইরান দাবি করতে পারছে যে তারা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির আক্রমণও সহ্য করেছে।
এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার যুদ্ধকে জাতীয় স্বাধীনতা ও বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের বিরোধীরাও বিদেশি হামলার মুখে জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিতে পারে।
ফলে সরকারকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সামরিক অভিযান কখনো কখনো উল্টো শাসকগোষ্ঠীর প্রতি জনসমর্থন বা অন্তত সাময়িক আনুগত্য বাড়িয়ে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে জনসমর্থনের সংকট
ইরান যুদ্ধ এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি নতুন জনমত জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছেন বলে মনে করেন।
এর অর্থ হলো, প্রশাসন কেন যুদ্ধ করছে, কী অর্জন করতে চাইছে এবং যুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনা কী—এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে।
মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণার চেয়েও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই ফলাফল প্রশাসনের যোগাযোগ ব্যর্থতার পাশাপাশি যুদ্ধের বাস্তব জটিলতাও তুলে ধরে। মানুষ যখন কোনো যুদ্ধের লক্ষ্য বুঝতে পারে না এবং দ্রুত সাফল্যও দেখতে পায় না, তখন সেই যুদ্ধের প্রতি সমর্থন দ্রুত কমতে থাকে।
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার লক্ষ্য ইতিহাসে সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু ভোটাররা সাধারণত ভবিষ্যতের ঐতিহাসিক মূল্যায়নের চেয়ে বর্তমানের জ্বালানির দাম, করের অর্থের ব্যবহার এবং সৈন্যদের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
ট্রাম্পের নিজস্ব সীমার মধ্যে কি এই যুদ্ধ জেতা সম্ভব?
ট্রাম্প এমন একটি বিজয় চান, যেখানে ইরান আত্মসমর্পণ করবে, হরমুজ প্রণালির ওপর দাবি ছেড়ে দেবে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করবে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের স্থলযুদ্ধে জড়াতে চান না।
কিন্তু বাস্তবতা দেখাচ্ছে, এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।
ইরানকে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভবত বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে হবে। এতে স্থলবাহিনী মোতায়েন, দীর্ঘমেয়াদি দখল, সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা এবং ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে যুদ্ধকে সীমিত রাখলে ইরানের সরকার টিকে থাকার এবং অসম পদ্ধতিতে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ নিজের সামরিক পদক্ষেপের সীমা নির্ধারণ করে রাখছে, ততক্ষণ ইরান সেই সীমার ভেতরে টিকে থাকার কৌশল খুঁজে নিতে পারছে।
এটি ট্রাম্পের কৌশলের মূল দুর্বলতা। তিনি এমনভাবে যুদ্ধ জিততে চাইছেন, যাতে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে না হয়। কিন্তু প্রতিপক্ষ জানে যে ট্রাম্প স্থলযুদ্ধ, বড় ধরনের মার্কিন প্রাণহানি এবং দীর্ঘমেয়াদি দখল এড়াতে চান। ফলে ইরান সময়ক্ষেপণ করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধৈর্য শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে পারে।
আরও উত্তেজনা বাড়ালে একই সমস্যায় ফিরে আসার আশঙ্কা
ট্রাম্প পরবর্তী ধাপে আরও বড় হামলার নির্দেশ দিতে পারেন। এতে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই হামলার পর কী হবে?
ইরান যদি তারপরও দাবি না ছাড়ে, তাহলে ট্রাম্প আবার একই সিদ্ধান্তের সামনে পড়বেন—আরও হামলা, স্থলযুদ্ধ নাকি সমঝোতা?
প্রতিটি ধাপে সামরিক অভিযান বাড়ালে পরবর্তী ধাপ আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে পিছু হটার রাজনৈতিক মূল্যও বাড়বে। কারণ যত বেশি অর্থ ব্যয় হবে এবং যত বেশি প্রাণহানি ঘটবে, ততই জনগণ জানতে চাইবে—এই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কী পেল?
যুদ্ধের একটি সাধারণ বিপদ হলো, নেতারা অনেক সময় আগের ক্ষয়ক্ষতিকে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করে নতুন ক্ষয়ক্ষতির পথে এগিয়ে যান। তাঁরা মনে করেন, এখন পিছিয়ে গেলে আগের সব ত্যাগ অর্থহীন হয়ে যাবে। কিন্তু এই চিন্তা সংঘাতকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে বিজয়ের সম্ভাবনার চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকে।
ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্প এখন সেই ঝুঁকির কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।
একটি প্রকৃত ‘নো-উইন’ পরিস্থিতি
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে কোনো স্পষ্ট বিজয়ের পথ নেই।
তিনি সামরিক অভিযান বাড়ালে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি, অস্ত্রের মজুত হ্রাস, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ বিস্তারের আশঙ্কা বাড়বে। স্থলবাহিনী পাঠালে যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি দীর্ঘ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে আটকে যেতে পারে।
অর্থনৈতিক অবরোধ কঠোর করলে ফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগবে এবং ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বাড়াতে পারে। কূটনৈতিক সমঝোতায় গেলে তেহরানকে এমন সুবিধা দিতে হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হবে।
আর বর্তমান সীমিত সামরিক অভিযান চালিয়ে গেলে যুদ্ধ চলতেই থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক সমাধান আসবে না।
ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত সামরিক শক্তির অভাব নয়; বরং একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমাপ্তির পরিকল্পনার অভাব। যুদ্ধ শুরু করার সময় তিনি মনে করেছিলেন, শক্তির প্রদর্শনই ইরানকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে। কিন্তু ইরান বুঝতে পেরেছে, সময় যত দীর্ঘ হবে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ তত বাড়বে।
তেহরানের জন্য টিকে থাকাই এখন এক ধরনের বিজয়। আর ওয়াশিংটনের জন্য শুধু সামরিকভাবে এগিয়ে থাকা যথেষ্ট নয়; তাকে এমন একটি সমাধান দেখাতে হবে, যা জনগণকে বোঝাতে পারে যে যুদ্ধের খরচ ও ঝুঁকি সার্থক ছিল।
এই মুহূর্তে তেমন কোনো সমাধান দৃশ্যমান নয়।
তাই ইরানকে ঘিরে ট্রাম্প যখনই নতুন কোনো মোড়ে পৌঁছাচ্ছেন, তাঁর সামনে থাকা পথগুলো আরও সংকীর্ণ, আরও ব্যয়বহুল এবং আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। যুদ্ধ বাড়ালে তিনি এমন সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারেন, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন। আবার সমঝোতার পথে গেলে তাঁকে এমন ছাড় দিতে হতে পারে, যা তাঁর ঘোষিত লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
সব মিলিয়ে এটি এমন একটি সংঘাত, যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি গ্রহণযোগ্য শর্তে যুদ্ধ শেষ করাও অত্যন্ত কঠিন। একে প্রকৃত অর্থেই এমন এক ‘নো-উইন’ বা জয়হীন পরিস্থিতি বলা যায়—যেখানে প্রতিটি নতুন সিদ্ধান্ত আগের চেয়েও খারাপ বিকল্পের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

