ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের ধরন বদলে যাচ্ছে। সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি এবার অর্থনৈতিক চাপকে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ওয়াশিংটন। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। কারণ সরাসরি হামলার চেয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ দীর্ঘমেয়াদে দেশটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে নানা চাপের মুখে রয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে বাধা এবং তেল বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে দেশটির রাজস্ব প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতে অনিশ্চয়তা এবং অর্থের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের জনগণের প্রধান চাওয়া এখন অর্থনৈতিক স্বস্তি। তাদের কাছে যুদ্ধ বন্ধ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও বড় বিষয় হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
টানা ১৩ দিন বিমান হামলার পর গত সপ্তাহান্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলা স্থগিতের ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, একটি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করতে তেহরান থেকেই আগ্রহ দেখানো হয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বর্তমানে ওমান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথ খোঁজা হচ্ছে। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শুধু সামরিক উত্তেজনা কমানো নয়, বরং অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও।
আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা। প্রস্তাব রয়েছে, ইরান ও ওমানকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পরিচালনায় কিছু ভূমিকা ও আয়ের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এটি মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালিতে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার যৌথ ব্যবস্থাপনার মতো কাঠামোর কাছাকাছি হতে পারে। তবে ইরানের ভেতরেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ এতে আগ্রহ দেখালেও অনেকে এতে আপত্তি জানাচ্ছেন।
ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কয়েকটি বিষয়ে নিশ্চয়তা চাইছে। এর মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যতে নতুন হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা অর্থ ফেরত দেওয়া।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ কমাতে রাজি নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তেহরানের কাছে থাকা অবশিষ্ট পারমাণবিক উপাদান হস্তান্তরের দাবি জানাচ্ছেন। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে ছাড় না দেওয়ার অবস্থান নিয়েছে ওয়াশিংটন।
এক মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরান তাদের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের বেতন দিতে সমস্যায় পড়ছে। তার মতে, মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইরানের আর্থিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতির আওতায় ইরানের তেল বাণিজ্য, গোপন আর্থিক নেটওয়ার্ক এবং জাহাজ চলাচল ব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এ পর্যন্ত ১ হাজারের বেশি ব্যক্তি, জাহাজ ও বিমানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে ইরানের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ উত্তোলনের চাপ তৈরি হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা অনেক বেশি, তবুও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে। জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সামরিক কর্মকর্তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ কমে আসার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের এই সতর্কতার পর পরিস্থিতি নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হয়। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, দেশটির সামরিক মজুদ শেষ হয়ে যায়নি। বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে প্রেসিডেন্টকে জানানো সেনাবাহিনীর দায়িত্ব।
তবে প্রশ্ন উঠছে, সামরিক হামলা বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—কোনটি ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মানতে বাধ্য করতে পারবে?
অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজরস-এর বিশ্লেষক ব্রেট এরিকসন ভিন্ন মত দিয়েছেন। তার দাবি, চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইরান প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের তেল রাজস্ব আয় করেছে, যা দেশটির বাজেট অনুমানের চেয়েও বেশি। তার মতে, শুধু অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানকে দুর্বল করার কৌশল প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।
এটি দেখাচ্ছে যে নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করলেও দেশটির আয় করার সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধানকে গুরুত্ব দেন। তবে ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অনুযায়ী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়, তাহলে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ খোলা থাকবে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে দুটি বড় হাতিয়ার রয়েছে—একদিকে সামরিক শক্তি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। তবে দীর্ঘমেয়াদে কোন কৌশল বেশি কার্যকর হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ইরানের জন্য বর্তমান সংকট শুধু যুদ্ধের নয়, অর্থনৈতিক টিকে থাকারও লড়াই। আর যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, সরাসরি হামলার চেয়ে আর্থিক চাপই হয়তো তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে বেশি কার্যকর হতে পারে।

