একসময় বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে মনে করা হতো আমেরিকান রাজনীতি বোঝার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সবচেয়ে দক্ষ নেতা। আমেরিকার সাধারণ মানুষ, রাজনীতিবিদ এবং গণমাধ্যমের সামনে কীভাবে ইসরায়েলের অবস্থান তুলে ধরতে হয়, সে বিষয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল প্রবল। কিন্তু চার দশকের রাজনৈতিক যাত্রার শেষে এসে সেই নেতার আমলেই আমেরিকায় ইসরায়েলের অবস্থান গভীর সংকটে পড়েছে।
ফ্র্যাঙ্কলিন ফোয়ারের বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধটি ২৭ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত হয়। সেখানে মূল প্রশ্নটি হলো—আমেরিকাকে সবচেয়ে ভালো বোঝেন বলে দাবি করা নেতানিয়াহুর সময়েই কেন দেশটিতে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এত দ্রুত ক্ষয় হলো?
এর উত্তর শুধু গাজা যুদ্ধ, ফিলিস্তিন প্রশ্ন কিংবা আমেরিকার রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের দলীয় পক্ষপাত, ব্যক্তিগত ক্ষমতা রক্ষার কৌশল, মার্কিন নেতাদের সঙ্গে সংঘাত, উগ্র ডানপন্থীদের ওপর নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক জনমতকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা।
আলমারি বিক্রেতা থেকে ইসরায়েলের মুখপাত্র
১৯৮২ সালে নেতানিয়াহু জেরুজালেমের একটি আসবাব প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বিপণন পরিচালক ছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৩২ বছর। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত তাঁকে নিজের সহকারী হিসেবে নিয়ে যান। উদ্দেশ্য ছিল আসবাব বিক্রি নয়, আমেরিকার কাছে ইসরায়েলকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
যুক্তরাষ্ট্রে শৈশবের একটি অংশ কাটানোয় নেতানিয়াহু সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আমেরিকান টেলিভিশনে ইসরায়েলের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। দৃঢ় বক্তব্য, আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি এবং তর্ক করার দক্ষতার কারণে আমেরিকান দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পরবর্তী চার দশকে তিনি যে পদেই থাকুন না কেন, আমেরিকায় ইসরায়েলের অবস্থান রক্ষার দায়িত্ব নিজের হাতেই রাখেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, অন্য কারও চেয়ে তিনি আমেরিকাকে ভালো বোঝেন। অথচ নিবন্ধটির মূল মূল্যায়ন হলো—ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঠিক এই দায়িত্বেই তিনি সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।
যে সমর্থন একসময় প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ছিল
এক দশকের কিছু বেশি সময় আগেও আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরায়েলকে সমর্থন করা ছিল প্রায় সর্বদলীয় অবস্থান। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলের মূলধারার নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সামরিক সহায়তার প্রশ্নে বড় ধরনের বিভক্তি দেখা যেত না।
ডেমোক্র্যাটদের কঠোর সমালোচনাও সাধারণত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ অথবা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে বাধা দেওয়ার অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা অস্ত্র সহায়তা আটকে দেওয়ার অবস্থান তখনও দলের প্রান্তিক অংশেই ছিল।
কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই বছর আগে ডেমোক্র্যাট শিবিরের ১৯ জন সিনেটর ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ৪৭ জনের মধ্যে ৪০ জন একই অবস্থান নেন। তাঁদের মধ্যে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে আলোচিত বেশ কয়েকজন নেতাও ছিলেন।
এই পরিবর্তন শুধু কয়েকজন রাজনীতিকের সিদ্ধান্ত নয়। এটি ডেমোক্র্যাট দলের ভেতরে ইসরায়েলকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। আগে ইসরায়েলের সমালোচনা করে রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। এখন অনেক নেতা মনে করছেন, ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়ানোই তাঁদের নির্বাচনী অবস্থানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বিরোধ শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সীমিত নয়
ইসরায়েলের প্রতি অসন্তোষকে শুধু আমেরিকার বামপন্থী বা ডেমোক্র্যাটদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝা যাবে না। প্রবন্ধটি বলছে, পরিবর্তনটি ক্রমশ দুই দলের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ছে।
২০২৮ সালের সম্ভাব্য রিপাবলিকান রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, জো রোগানের অনুষ্ঠানে জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ছিল বলে একটি প্রমাণহীন তত্ত্বের কথা বলেন। তিনি ইরানের সঙ্গে নিজের কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যাহত করার জন্যও ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করেন।
এক দশক আগে রিপাবলিকান দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতা এ ধরনের বক্তব্য দিলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। কিন্তু এখন একই ধরনের অবস্থান রিপাবলিকান রাজনীতির ভেতরেও গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।
এর অর্থ হলো, ইসরায়েলের জন্য আমেরিকার সমর্থনের ভিত্তি শুধু দুর্বল হয়নি; সেই ভিত্তির চরিত্রও বদলে গেছে। বয়স্ক রিপাবলিকান ও ধর্মীয় রক্ষণশীলদের একটি অংশ এখনও শক্তভাবে ইসরায়েলের পাশে থাকলেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সেই সমর্থন আগের মতো নিশ্চিত নয়।
নেতানিয়াহুর পারিবারিক দর্শনের প্রভাব
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক চিন্তায় তাঁর বাবা বেনজিয়ন নেতানিয়াহুর প্রভাব গভীর। স্পেনের ধর্মীয় নিপীড়নের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা বেনজিয়ন বিশ্বাস করতেন, ইহুদিবিদ্বেষ কোনো সাময়িক সমস্যা নয়; এটি ইহুদি ইতিহাসের স্থায়ী বাস্তবতা।
তাঁর দৃষ্টিতে প্রবাসে বসবাসরত ইহুদিরা কখনো পুরোপুরি নিরাপদ হতে পারে না। নিজেদের রাষ্ট্র এবং সামরিক শক্তির সুরক্ষার মধ্যেই তাঁদের প্রকৃত নিরাপত্তা নিহিত। তরুণ নেতানিয়াহু এমন এক সময়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন, যখন বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন মনে হচ্ছিল।
ইসরায়েলের শিল্পী ও বিজ্ঞানীরা ইউরোপ ও আমেরিকায় সম্মান পাচ্ছিলেন। আমেরিকান রাজনীতিকেরা ইসরায়েলের প্রতি নিজেদের সমর্থন প্রকাশে প্রতিযোগিতা করতেন। প্রবাসী ইহুদিরাও তুলনামূলক নিরাপত্তার মধ্যে জীবনযাপন করছিলেন।
নেতানিয়াহুর প্রাথমিক সাফল্যও যেন প্রমাণ করেছিল, যুক্তি, যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে আমেরিকান জনমতকে প্রভাবিত করা সম্ভব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর রাজনীতিতে বাবার হতাশাবাদী ধারণাটিই বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি ক্রমে বিশ্বাস করতে শুরু করেন, সমালোচকদের বোঝানোর চেষ্টা করে লাভ নেই; কারণ ইসরায়েলবিরোধিতা পরিবর্তনযোগ্য রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং স্থায়ী ঘৃণার প্রকাশ।
এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি বড় সমস্যা হলো, এতে নীতি ও আচরণের সমালোচনাকেও সহজে বিদ্বেষ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা যায়। ফলে ভুল সংশোধন, জনমত বোঝা এবং কূটনৈতিক বার্তা পরিবর্তনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে।
আমেরিকার দলীয় বিভাজনে ইসরায়েলকে ঠেলে দেওয়া
নেতানিয়াহুর আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীরা বিভিন্ন সময়ে আমেরিকান রাষ্ট্রপতিদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন। জেরাল্ড ফোর্ড, রোনাল্ড রেগান ও জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের সময়েও দুই দেশের মধ্যে গুরুতর মতপার্থক্য দেখা গেছে।
তবে আগের ইসরায়েলি নেতারা চেষ্টা করতেন, এসব বিরোধকে দুই সরকারের নীতিগত মতপার্থক্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে। তাঁরা ইসরায়েলকে রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট—কোনো একটি দলের সম্পত্তিতে পরিণত করতে চাননি।
নেতানিয়াহু এই রীতি ভেঙে দেন। আমেরিকায় অবস্থানকালে তাঁর রাজনৈতিক ধারণার একটি অংশ গড়ে ওঠে ডেমোক্র্যাট দল ও উদারপন্থী আমেরিকান ইহুদিদের প্রতি অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে তিনি এই মনোভাব কিছুটা আড়াল করলেও ক্ষমতায় দীর্ঘ সময় থাকার পর আর তা গোপন রাখেননি।
এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ আসে ৩ মার্চ ২০১৫। সেদিন নেতানিয়াহু মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে বক্তব্য দিয়ে বারাক ওবামার ইরানবিষয়ক পরমাণু চুক্তির বিরোধিতা করেন। সফরটির ব্যবস্থা করেছিলেন রিপাবলিকান প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত। হোয়াইট হাউসকে না জানিয়েই একজন বিদেশি নেতাকে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতির নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
ওবামা ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিরোধী ছিলেন না। তাঁর প্রশাসন ইসরায়েলের জন্য আমেরিকার ইতিহাসের বৃহত্তম সামরিক সহায়তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। তা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু তাঁকে প্রায় শুরু থেকেই এমন একজন প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছেন, যাকে কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলা ও রাজনৈতিকভাবে অতিক্রম করতে হবে।
নেতানিয়াহুর এই অবস্থান ডেমোক্র্যাটদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়—ইসরায়েল আর সবার মিত্র নয়; বরং রিপাবলিকান শিবিরের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অংশীদার।
ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্য
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর নেতানিয়াহু তাঁকে ইসরায়েলের ইতিহাসে হোয়াইট হাউসের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারে দুজনের করমর্দনের ছবি ব্যবহার করা হয়। একটি বসতির নাম রাখা হয় ‘ট্রাম্প হাইটস’। পশ্চিম দেয়ালের কাছে একটি রেলস্টেশনের সঙ্গে ট্রাম্পের নাম যুক্ত করার ঘোষণাও আসে।
ট্রাম্প পাল্টা নেতানিয়াহুর বহু প্রত্যাশা পূরণ করেন। আমেরিকান দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেন, ওবামার ইরানবিষয়ক পরমাণু চুক্তি বাতিল করেন এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইসরায়েলকে বড় ধরনের চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
স্বল্পমেয়াদে এগুলো নেতানিয়াহুর বড় কূটনৈতিক সাফল্য বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ট্রাম্পকে যেসব আমেরিকান ঘৃণা বা অবিশ্বাস করতেন, তাঁদের অনেকেই ধীরে ধীরে নেতানিয়াহুর ইসরায়েলকেও একই রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
ইসরায়েলের পক্ষে থাকা ডেমোক্র্যাট ও গুরুত্বপূর্ণ ইহুদি নেতারা নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, আমেরিকার দলীয় রাজনীতিকে তিনি ভুলভাবে পড়ছেন। কিন্তু নেতানিয়াহু ধরে নিয়েছিলেন, প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ ডেমোক্র্যাটরা শেষ পর্যন্ত যেকোনো অবস্থাতেই ইসরায়েলের বিরোধিতা করবে। তাই তাঁদের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা তাঁর কাছে গুরুত্বহীন হয়ে ওঠে।
এই ধারণাই সম্ভবত তাঁর অন্যতম বড় রাজনৈতিক ভুল।
বাইডেনের সমর্থনের বদলে প্রকাশ্য আক্রমণ
৭ অক্টোবরের হামলার পর জো বাইডেন ইসরায়েল সফর করেন এবং দেশটির প্রতি সংহতি জানান। তাঁর প্রশাসন ইসরায়েলকে অস্ত্র ও কূটনৈতিক সহায়তা দেয়। এ কারণে নিজ দলের বামপন্থীদের কাছ থেকে বাইডেনকে গুরুতর রাজনৈতিক চাপ সহ্য করতে হয়েছিল।
তবে বাইডেন প্রশাসন একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, যুদ্ধের কৌশল এবং হামাসকে পুরোপুরি ধ্বংস করার লক্ষ্য বাস্তবসম্মত কি না—এসব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। নেতানিয়াহু প্রশাসনকে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা, মানবিক সহায়তা এবং সামরিক অভিযানের সীমা নিয়ে একাধিক পরামর্শ দেওয়া হয়।
কিন্তু নেতানিয়াহু সেসব পরামর্শের প্রায় সবই উপেক্ষা করেন। ২০২৪ সালের জুনে তিনি আমেরিকান দর্শকদের লক্ষ্য করে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অস্ত্র আটকে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন এবং দাবি করেন, বাইডেন তাঁকে যুদ্ধ জিততে বাধা দিচ্ছেন।
প্রবন্ধের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগটি ছিল ব্যাপকভাবে অতিরঞ্জিত। প্রশাসন শেষ পর্যন্ত শুধু এক ধরনের বোমার একটি চালান আটকে রেখেছিল। বাইডেন যখন নিজের দলের বাম অংশের আক্রমণ সহ্য করে ইসরায়েলকে সমর্থন করছিলেন, তখন নেতানিয়াহু তাঁকে ডান দিক থেকে আক্রমণ করেন।
এর রাজনৈতিক ফল দ্রুত দৃশ্যমান হয়। ২০২৪ সালের মিশিগান প্রাথমিক নির্বাচনে ১,০০,০০০-এর বেশি ডেমোক্র্যাট ভোটার ‘কোনো প্রার্থীকে নয়’ ধরনের প্রতিবাদী ভোট দেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল গাজায় মানুষের দুর্ভোগের জন্য বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকার বিরুদ্ধে অবস্থান জানানো।
প্রথমে যে ক্ষোভ বাইডেনের বিরুদ্ধে ছিল, তা পরে ডেমোক্র্যাট দলের ঐতিহাসিক ইসরায়েল-সমর্থনের বিরুদ্ধেই আন্দোলনে রূপ নেয়। মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটরাও উপলব্ধি করেন, ইসরায়েলের পক্ষে রাজনৈতিক ঝুঁকি নিলেও নেতানিয়াহুর কাছ থেকে বিশ্বস্ততা বা কৃতজ্ঞতা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
জনমতের লড়াইয়ে কৌশলহীনতা
ইরান ও তার মিত্রদের সামরিক হুমকির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের লড়াইকে অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হয় না। আন্তর্জাতিক জনমত, মিত্ররাষ্ট্রের জনগণের সমর্থন এবং নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নেতানিয়াহু সামরিক হুমকির মোকাবিলায় কঠোর ছিলেন। কিন্তু আমেরিকান জনমতের যে ক্ষেত্রটি তাঁকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছিল, সেই ক্ষেত্রেই তিনি ক্রমাগত পিছিয়ে পড়েছেন।
স্নায়ুযুদ্ধ, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা উদ্বেগের সময় আমেরিকার জনমত তুলনামূলকভাবে ইসরায়েলের অনুকূলে ছিল। নেতানিয়াহু সম্ভবত সেই অনুকূল পরিবেশকে নিজের ব্যক্তিগত যোগাযোগদক্ষতার ফল হিসেবে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করেছিলেন।
পরিবেশ বদলে যাওয়ার পরও তিনি বক্তব্য, কৌশল বা নীতির ভাষা পরিবর্তন করেননি। বরং নতুন সমালোচকদের বোঝানোর বদলে তাঁদের ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে।
নিঃসন্দেহে ইহুদিবিদ্বেষ বাস্তব এবং ৭ অক্টোবরের পর বিভিন্ন দেশে ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হুমকি বেড়েছে। তবে সব সমালোচনাকে বিদ্বেষ বলে প্রত্যাখ্যান করলে ইসরায়েলের নীতি, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, বসতি সম্প্রসারণ কিংবা মানবিক সহায়তা নিয়ে বৈধ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া হয় না।
উগ্র ডানপন্থীদের ওপর নির্ভরতার মূল্য
১৯৮৮ সালে মেইর কাহানের রাজনৈতিক দলকে ইসরায়েলে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আরব জনগোষ্ঠীকে গণহারে বহিষ্কার করার মতো অবস্থানের কারণে কাহানেকে তখন ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতি থেকেও বিচ্ছিন্ন মনে করা হতো।
কিন্তু ২০২২ সালে নেতানিয়াহু সরকার গঠনের সময় কাহানের অনুসারী ইতামার বেন-গভিরকে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী করেন। গাজায় খাদ্য ও মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে না দেওয়া, সাহায্যের গুদামে বোমা হামলা এবং গাজার বাসিন্দাদের তথাকথিত স্বেচ্ছা অভিবাসনের পক্ষে বেন-গভিরের বক্তব্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রবল সমালোচনার জন্ম দেয়।
নেতানিয়াহু তাঁকে কার্যকরভাবে নিন্দা করেননি বা মন্ত্রিসভা থেকে সরাননি। কারণ বেন-গভিরের দল ক্ষমতাসীন জোট টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই জোট ভেঙে গেলে নেতানিয়াহুর সরকার পড়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অভিযোগসংক্রান্ত বিচারিক ঝুঁকিও তাঁর জন্য আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
এখানেই ব্যক্তিগত ক্ষমতা এবং জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বেন-গভিরের বক্তব্য যে ইসরায়েল সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতি নয়, তা প্রমাণ করতে নেতানিয়াহু গাজায় ব্যাপকভাবে খাদ্য প্রবেশের সুযোগ দিতে পারতেন। কিন্তু পরিবর্তে জাতিসংঘের প্রধান ত্রাণ সংস্থাকে সরিয়ে দিয়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষের খাদ্য বিতরণের দায়িত্ব একটি অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হয়। এর বিতরণকেন্দ্রগুলোতে পরে বিশৃঙ্খলা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
গাজার জন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরবর্তী পরিকল্পনা নেই
যুদ্ধের অন্যতম বড় দুর্বলতা ছিল, নেতানিয়াহু গাজার ভবিষ্যৎ শাসন, পুনর্গঠন অথবা হামাসের বিকল্প ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে কোনো গুরুতর পরিকল্পনা উপস্থাপন করেননি।
বাইডেন প্রশাসন প্রস্তাব দিয়েছিল, দখল করা অঞ্চল একটি সংস্কার করা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা যেতে পারে এবং আরব শান্তিরক্ষীরা নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে। নেতানিয়াহু জবাব দেন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং গাজায় অজনপ্রিয়।
এই আপত্তিগুলোর বাস্তব ভিত্তি থাকলেও প্রবন্ধটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রত্যাখ্যানের প্রধান কারণ ছিল অন্যত্র। ফিলিস্তিনিদের কোনো বাস্তব স্বশাসন মেনে নিলে নেতানিয়াহুর জোটের উগ্র ডানপন্থী দলগুলো সরকার থেকে বেরিয়ে যেতে পারত। কারণ তাদের একটি অংশ গাজায় পুনরায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পক্ষে ছিল।
ফলে ইসরায়েল স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ছাড়াই যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। ধ্বংস যত বেড়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তত বেশি নিজস্বভাবে ইসরায়েলের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে শুরু করেছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক সুযোগও হাতছাড়া
যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলের সামনে আরেকটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ ছিল। সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। মক্কা ও মদিনার তত্ত্বাবধায়ক রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি স্বীকৃতি পেলে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তা ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনতে পারত।
সৌদি আরবকে অনুসরণ করে ইন্দোনেশিয়া, কাতার এবং আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশও ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ার কথা বিবেচনা করতে পারত। আমেরিকার বামপন্থীদের সমর্থন হারানোর পর মুসলিম বিশ্বের কিছু রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ইসরায়েলের ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারত।
কিন্তু সৌদি আরব অন্তত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি চেয়েছিল। নেতানিয়াহু সেই সামান্য প্রতিশ্রুতিও দিতে রাজি হননি। কারণ এতে তাঁর ডানপন্থী জোট ক্ষুব্ধ হতে পারত এবং সরকার ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতো। ফলে প্রায় আট দশক পর মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগও উপেক্ষিত থেকে যায়।
শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত ক্ষমতাই কি অগ্রাধিকার পেল?
নেতানিয়াহুর সামনে আন্তর্জাতিক অবস্থান উন্নত করার জন্য কয়েকটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট পথ ছিল। তিনি উগ্র বক্তব্য দেওয়া কোনো মন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে পারতেন। গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থার পরিকল্পনা দিতে পারতেন। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ না করে আলোচনার প্রতি ন্যূনতম আগ্রহ দেখাতে পারতেন। মানবিক সহায়তা সরবরাহে আরও কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা নিতে পারতেন।
কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপেই তাঁর ক্ষমতাসীন জোট ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সরকার হারালে তাঁকে আইনি ঝুঁকির মুখেও পড়তে হতো। প্রবন্ধটির কঠোর মূল্যায়ন হলো—যখনই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক টিকে থাকা এবং ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক স্বার্থের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে, নেতানিয়াহু নিজেকেই বেছে নিয়েছেন।
এটি শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; কৌশলগত প্রশ্নও। একজন নেতা স্বল্পমেয়াদে সরকার টিকিয়ে রাখতে পারেন, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় যদি দেশের প্রধান মিত্রের জনগণ, তরুণ ভোটার ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে দূরে ঠেলে দেন, তবে তার মূল্য বহু বছর ধরে দিতে হতে পারে।
পরিসংখ্যানে পরিবর্তনের গভীরতা
প্রবন্ধে উপস্থাপিত জনমতের চিত্র নেতানিয়াহুর জন্য উদ্বেগজনক। রাজনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি ইসরায়েলিদের তুলনায় বেশি হয়েছে। আমেরিকার প্রাপ্তবয়স্কদের ৬০ শতাংশ ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা প্রকাশ করেছেন।
৪৫ বছরের কম বয়সী রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ওবামা আমলের সামরিক সহায়তা চুক্তি নবায়নের বিরোধিতা করছে। তরুণ ধর্মপ্রচারক খ্রিষ্টানদের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন দ্রুত কমছে। একসময় এই গোষ্ঠীটিকেই আমেরিকায় ইসরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সামাজিক ভিত্তিগুলোর একটি মনে করা হতো।
এই পরিবর্তন আগামী নির্বাচনে তাৎক্ষণিকভাবে আমেরিকার ইসরায়েল নীতি পুরোপুরি বদলে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আমেরিকার কংগ্রেস, প্রতিরক্ষা কাঠামো এবং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পর্ক এখনও শক্তিশালী।
তবে জনমতের প্রজন্মগত পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। আজকের তরুণ ভোটাররাই ভবিষ্যতের সিনেটর, প্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও দলীয় নেতা। তাঁদের কাছে ইসরায়েল যদি একটি সর্বদলীয় মিত্রের বদলে বিতর্কিত বিদেশি শক্তি হিসেবে পরিচিত হয়, তাহলে পুরোনো সম্পর্ক ধরে রাখা কঠিন হবে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিল আমেরিকার কাছে ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার মধ্য দিয়ে। তাঁর উত্থানের ভিত্তিই ছিল যোগাযোগ, প্রভাব সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক জনমতকে নিজের পক্ষে আনার ক্ষমতা।
কিন্তু ক্ষমতায় দীর্ঘ সময় থাকার পর তিনি যেন সেই পুরোনো দক্ষতার ওপরই আস্থা হারিয়ে ফেলেন। সমালোচকদের সঙ্গে যুক্তিতর্কের পরিবর্তে তাঁদের শত্রু হিসেবে দেখা, ডেমোক্র্যাটদের গুরুত্বহীন মনে করা, ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলকে অতিরিক্তভাবে যুক্ত করা, বাইডেনের সমর্থনের জবাবে তাঁকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করা এবং উগ্র ডানপন্থীদের কারণে কূটনৈতিক সুযোগ প্রত্যাখ্যান করা—সব মিলিয়ে আমেরিকায় ইসরায়েলের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে।
ইসরায়েলের বিচ্ছিন্নতা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। গাজা যুদ্ধ, ইহুদিবিদ্বেষ, আমেরিকার প্রজন্মগত পরিবর্তন এবং ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ—সবকিছুই জনমত পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।
তবে ফ্র্যাঙ্কলিন ফোয়ারের বিশ্লেষণের শেষ বক্তব্যটি আরও কঠোর: বিচ্ছিন্নতা হয়তো পুরোপুরি এড়ানো যেত না, কিন্তু নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো—তিনি সেই পরিণতি ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট চেষ্টাই করেননি। তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে তাই সামরিক শক্তির পাশাপাশি একটি ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক একাকিত্বও থেকে যেতে পারে।

