ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনামলে অন্যতম বড় তরুণ বিক্ষোভের মুখে পড়েছে তাঁর সরকার। দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনের পর এখন সরকার একদিকে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের সমর্থন ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে।
শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরিচালনা করে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি ছিল শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত ২৬ জুলাই ২০২৬ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এটি মোদি সরকারের জন্য একটি বিরল রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গ্রেপ্তার ও কঠোর পদক্ষেপের মুখে আন্দোলনকারীরা
আন্দোলন দমনে বিজেপি শাসিত কয়েকটি রাজ্যে শত শত তরুণ-তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই ১৮ বছরের কম বয়সী। পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে মামলা করা হয়।
তবে মঙ্গলবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আন্দোলনের সময় আটক সব অপ্রাপ্তবয়স্ককে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালতের এই সিদ্ধান্তের আগে থেকেই অনেক আটক শিক্ষার্থীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কারণ আন্দোলনের নেতারা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের কঠোর পদক্ষেপের সমালোচনা করেছিল।
পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, বিহার, আসাম এবং দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। পরে এসব রাজ্যের সরকার অনেক মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়।
আন্দোলনের সময় কয়েকটি স্থানে পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং গুলির মতো কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিহারের সিওয়ান জেলায় এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তিনি বিক্ষোভকারীদের দিকে একে-৪৭ তাক করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়েন। পরে ওই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
নজরদারি নিয়ে নতুন বিতর্ক
আন্দোলনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী ও তরুণ আন্দোলনকারী অভিযোগ করেছেন, সরকার সমালোচনামূলক মতামত প্রকাশের কারণে তাদের অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে এবং মামলা দিচ্ছে।
আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আইশে ঘোষ দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করে অভিযোগ করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি আদালতের কাছে এসব তথ্য ধ্বংস করার নির্দেশ চেয়েছেন।
এদিকে দিল্লি পুলিশ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা কিছু পোস্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে। পুলিশ অভিযোগ করেছে, এসব পোস্টে আপত্তিকর ও মানহানিকর বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে।
পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম থেকে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের তথ্য চেয়েছে। এর মধ্যে ব্যবহারকারীর পরিচয়, ঠিকানা এবং অনলাইন কার্যক্রমের তথ্যও রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিরোধী দল ও ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সরকার দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে সরকার বলছে, জনগণের স্বার্থ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ
আন্দোলনকারীদের ওপর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন করা হয়। এসব আবেদনে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়।
মঙ্গলবার শুনানিতে আদালত বিক্ষোভ চলাকালে ধারণ করা সব ধরনের ভিডিও সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে ড্রোন ফুটেজ, নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিও এবং পুলিশের ব্যবহৃত ক্যামেরার ফুটেজও রয়েছে।
আদালত আরও নির্দেশ দেয়, আন্দোলনকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য যেন প্রকাশ করা না হয়।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, যারা নিরীহ মানুষের ওপর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ বা নির্যাতন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এজন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
তিনি আরও বলেন, শুধু তদন্ত করলেই হবে না, ঘটনার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করাও জরুরি।
আন্দোলনকারীদের অবস্থান
আন্দোলনের নেতারা বলছেন, সরকার এখনো লিখিতভাবে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি যে সব মামলা প্রত্যাহার করা হবে এবং ভবিষ্যতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’র মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, সরকারের সঙ্গে আলোচনার সময় তাদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ দেখানো হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, আদালতের নির্দেশের ব্যাখ্যা দিয়ে সরকার বিষয়টি এখনো ঝুলিয়ে রেখেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের কারণে মামলা করার বিষয়েও আন্দোলনকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, একটি গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণ মানুষ সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার অধিকার রাখে।
তাদের মতে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় রাখা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার।
তরুণ ভোটারদের মন জয়ে বিজেপির নতুন প্রচেষ্টা
একদিকে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মকে আবার কাছে টানার উদ্যোগ নিয়েছে বিজেপি সরকার।
ভারতে ২৯ বছরের নিচের মানুষ, যার মধ্যে জেনারেশন জেড বা নতুন প্রজন্মের তরুণরা রয়েছে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বলে পিউ গবেষণার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রাখতে বিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ধরনের প্রচারণা শুরু করেছে।
দলটি তরুণদের ব্যবহৃত ভাষা, জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের বিষয় তুলে ধরে ভিডিও প্রকাশ করছে। এসব ভিডিওতে সহজ কথোপকথন, তরুণদের মতো উপস্থাপন এবং আধুনিক প্রচারণার কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, জিমে কয়েকজন তরুণের কথোপকথনের মাঝে একজন বয়স্ক প্রশিক্ষক এসে বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ শুধু যন্তর মন্তরের আন্দোলনের জয় নয়, বরং গণতন্ত্রের শক্তির উদাহরণ।
ভিডিওতে সরকার নিজেদের উন্নয়নমূলক কাজ তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে মেট্রো রেল, মহাসড়ক, বিমানবন্দর এবং সরকারি চিকিৎসা, প্রকৌশল ও ব্যবস্থাপনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ।
এর পাশাপাশি বিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ধরনের পোস্ট করছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তরুণদের কাছে পৌঁছাতে ইনস্টাগ্রামের মতো ছোট ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন।
বিশ্লেষণ: তরুণদের ক্ষোভ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণ ভোটারদের ভূমিকা দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা শুধু একটি পরীক্ষার সমস্যা নয়, বরং কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বছরের পর বছর প্রস্তুতির পর পরীক্ষা বাতিল হওয়া বা পুনরায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য হওয়া তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
মোদি সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যদিকে তরুণদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
কারণ ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে তরুণ প্রজন্মের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো এখন শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, বড় রাজনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে।

