মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দিনের তুলনামূলক শান্তি হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং নিজ উদ্যোগে আঘাত হেনে সংঘাত আবার শুরু করেছে ইরান। যুদ্ধের চলমান ধারায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ এত দিন তেহরানের বেশির ভাগ সামরিক পদক্ষেপকে প্রতিশোধমূলক হিসেবে তুলে ধরা হলেও এবার দেশটি আগাম উদ্যোগ নিয়ে পরিস্থিতির গতি নিজের মতো করে নির্ধারণের চেষ্টা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এই পদক্ষেপকে আকস্মিক হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে তেহরানের দৃষ্টিতে এটি শুধু সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের প্রভাব, আঞ্চলিক শক্তির অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় দর-কষাকষির ক্ষমতা ধরে রাখার একটি হিসাবি প্রচেষ্টা।
ইরান জানত, এ ধরনের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমানকে আবার আকাশে ফিরিয়ে আনতে পারে। তবু সেই ঝুঁকি নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যুক্তরাষ্ট্র যখন হামলা বন্ধ রেখেছিল, তখন ইরান কেন নিজেই আবার সংঘাত শুরু করল?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সামরিক ঘটনাপ্রবাহে পাওয়া যাবে না। এর পেছনে রয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের নিরাপত্তা ভাবনা, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতা এবং দুর্বলতার কোনো ধারণা তৈরি হতে না দেওয়ার চেষ্টা।
কয়েক দিনের বিরতি কতটা বাস্তব ছিল
গত সপ্তাহের হামলার বিরতিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইরান অনুরোধ করায় এবং আলোচনা করতে চাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে আক্রমণ বন্ধ রেখেছে।
তবে ইরান কখনো প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি দেয়নি। দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শুধু বলেছিলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই বক্তব্যকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি হিসেবে দেখার সুযোগ ছিল না। বরং এটি ছিল সাময়িক সংযমের ইঙ্গিত। অর্থাৎ দুই পক্ষই কিছু সময়ের জন্য হামলা কমালেও ভবিষ্যতে কী হবে, তা নিয়ে কোনো লিখিত বা স্থায়ী সমঝোতা ছিল না।
সেই কারণেই ইরানের নতুন হামলা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তেহরান প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সংযমের সঙ্গে তাল মেলানোর ইঙ্গিত দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইরানের কাছে সাময়িক শান্তি ধরে রাখার চেয়ে রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ বাড়ানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
ট্রাম্পের কঠোর হুমকি
ইরানের হামলার পর বুধবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর প্রতিক্রিয়া জানান। ফক্স নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে কঠিন আঘাত করবে এবং দেশটিকে এর মূল্য দিতে হবে।
তবে এমন প্রতিক্রিয়া তেহরানের কাছে অপ্রত্যাশিত হওয়ার কথা নয়। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার আগেই ইরানি নেতৃত্ব নিশ্চয়ই জানত, এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু করতে পারে।
অর্থাৎ এটি তাৎক্ষণিক আবেগে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং সম্ভাব্য মার্কিন প্রতিশোধের ঝুঁকি হিসাব করেই হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের ধারণা ছিল, এখন চাপ না বাড়ালে ভবিষ্যৎ আলোচনায় দেশটির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এই সিদ্ধান্ত যুদ্ধকে আবার বড় ধরনের উত্তেজনার দিকে নিয়ে গেছে। দুই পক্ষই যদি পিছু হটাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখে, তাহলে সীমিত হামলা দ্রুত দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
ইরানের সামরিক কৌশলে পরিবর্তন
জার্মানির আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক হামিদ রেজা আজিজির মতে, ইরানের আচরণে মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
আগে তেহরান সাধারণত প্রতিপক্ষের হামলার পর পাল্টা আঘাত করত। কিন্তু এবার ইরান সম্ভবত মনে করেছে, আসন্ন হুমকি ঠেকাতে নিজে আগে হামলা চালানোই একমাত্র কার্যকর পথ।
এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অর্থ হলো, ইরান এখন শুধু আক্রমণের জবাব দেওয়ার নীতিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। তেহরান যদি মনে করে কোনো হামলা আসন্ন অথবা তার কৌশলগত স্বার্থ হুমকির মুখে পড়েছে, তাহলে আগে থেকেই সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
এটি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। প্রতিপক্ষ কী করবে, তা নিশ্চিতভাবে জানার আগেই যদি কোনো দেশ হামলা শুরু করে, তাহলে ভুল হিসাবের আশঙ্কা বেড়ে যায়। সামান্য একটি গোয়েন্দা তথ্য বা রাজনৈতিক বৈঠকও বড় সামরিক পদক্ষেপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফরের পর হামলা
ইরানের হামলাটি এমন এক সময়ে ঘটে, যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক শেষ করেছেন।
নেতানিয়াহু বৈঠকটিকে দুজনের মধ্যে হওয়া অন্যতম সেরা আলোচনা হিসেবে বর্ণনা করেন। এর আগে দুই নেতার মধ্যে কিছু বিষয়ে মতবিরোধের খবর পাওয়া গেলেও বৈঠকের পর তাদের সম্পর্ক আবার ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছিলেন, ইসরায়েল ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে চেয়েছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের থামিয়ে দিয়েছিল।
ইরান হয়তো এই বৈঠক এবং ইসরায়েলের বক্তব্যকে নতুন হুমকির সংকেত হিসেবে দেখেছে। তেহরানের ধারণা হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংযম সাময়িক এবং ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার পর নতুন হামলার পরিকল্পনা তৈরি হতে পারে।
হামিদ রেজা আজিজির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের হামলাটি নেতানিয়াহুর হোয়াইট হাউস সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বার্তা হতে পারে। অর্থাৎ তেহরান বোঝাতে চেয়েছে, তার বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পরিকল্পনা তৈরি হলে ইরান অপেক্ষা করে থাকবে না।
জর্ডানে হামলার পর ইরাকেও আঘাত
জর্ডানে হামলার অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী যৌথভাবে ইরাকে ইরানসমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড অবশ্য এই অভিযানকে জর্ডানের হামলার সরাসরি প্রতিশোধ হিসেবে তুলে ধরেনি। তাদের দাবি, আগের ৭২ ঘণ্টায় মার্কিন বাহিনী এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার জবাবে ইরাকে অভিযান চালানো হয়েছে।
তবে ঘটনার সময় এবং ধারাবাহিকতা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা স্পষ্ট করে। একটি দেশে হামলার পর আরেকটি দেশে পাল্টা আঘাত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী।
ফলে যুদ্ধটি আর শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইরাক, জর্ডান, ইয়েমেন এবং সৌদি আরবও ক্রমে সংঘাতের অংশ হয়ে উঠছে।
সৌদি আরব তিন দিক থেকে চাপে
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। দেশটি নিজের জ্বালানি অবকাঠামো, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব তিনটি দিক থেকে হুমকির মুখে পড়ছে।
প্রথমত, ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী সৌদি নেতৃত্বাধীন অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি করছে। দ্বিতীয়ত, ইরাকে সক্রিয় ইরানসমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সৌদি স্বার্থ ও জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তৃতীয়ত, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ছে।
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ হামলায় অংশ নিয়ে সৌদি আরব এখন সংঘাতের আরও ভেতরে প্রবেশ করেছে। এতে দেশটির ওপর পাল্টা হামলার আশঙ্কাও বাড়তে পারে।
২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এটি ছিল ২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার পর তাঁর প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। সেই সফরের পর যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি সম্পর্কের নতুন ঘনিষ্ঠতা বর্তমান সামরিক সহযোগিতায়ও প্রতিফলিত হচ্ছে।
কেউই মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসতে প্রস্তুত নয়
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং দেশটির সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় অংশীদারদের প্রধান সমস্যা হলো—ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা নিজেদের মূল কৌশলগত লক্ষ্য থেকে পিছু হটতে রাজি নয়।
ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের প্রভাব বজায় রাখতে চায়। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী জানিয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা তাদের অভিযান বন্ধ করবে না।
এই অবস্থায় সাময়িক হামলা বন্ধ হলেও মূল বিরোধের সমাধান হচ্ছে না। কারণ দুই পক্ষের লক্ষ্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকা নয়; ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক ব্যবস্থায় নিজের প্রভাব নিশ্চিত করা।
যুক্তরাষ্ট্র চায় হরমুজে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন থাকুক। ইরান চায় এই জলপথে তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হোক। এই দুই অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি কেন ইরানের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জর্ডানে হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তেহরানের অবস্থান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ইরান সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ করেছিল। তবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করা হলে তেহরান আবার সামরিক পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।
ইরানের কাছে হরমুজ এখন শুধু একটি বাণিজ্যিক জলপথ নয়। এটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় অংশ এবং প্রতিরক্ষার একটি হাতিয়ার।
ইরানি নেতৃত্ব মনে করে, যুদ্ধের পর হরমুজ যদি আগের অবস্থায় ফিরে যায় এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে ইরানের কোনো বিশেষ প্রভাব না থাকে, তাহলে তেহরান নিজেকে বিজয়ী দাবি করতে পারবে না।
অর্থাৎ ইরানের লক্ষ্য শুধু হামলা বন্ধ করা নয়। দেশটি এমন একটি নতুন ব্যবস্থা চায়, যেখানে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও চলাচলের নিয়ম নির্ধারণে তার প্রভাব দৃশ্যমান থাকবে।
বিকল্প নৌপথ নিয়ে ইরানের আপত্তি
ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির মধ্যে একটি বিকল্প জাহাজ চলাচলের পথ তৈরির চেষ্টা করছে বলে ইরানের অভিযোগ। তেহরান এই উদ্যোগকে নিজের জন্য একটি স্পষ্ট সীমারেখা হিসেবে দেখছে।
ইরানের আশঙ্কা, বিকল্প পথটি কার্যকর হলে হরমুজে তার নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব কমে যাবে। আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো ইরানের পর্যবেক্ষণ বা অনুমতি ছাড়াই চলাচল করতে পারলে তেহরানের সার্বভৌমত্বের দাবি শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
গারিবাবাদির বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান এমন কোনো ব্যবস্থা মেনে নেবে না, যেখানে জলপথটি তার ভৌগোলিক সীমার মধ্যে থাকলেও বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ অন্য শক্তির হাতে চলে যায়।
এই কারণেই বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সিদ্ধান্তকে তেহরান বৃহত্তর নিরাপত্তা প্রশ্নের অংশ হিসেবে দেখছে।
তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পেছনের হিসাব
সাধারণভাবে দেখলে প্রশ্ন উঠতে পারে—শুধু উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থা বন্ধ করার কারণে ইরান কেন তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি নিল?
ইরানের যুক্তি হলো, বিষয়টি শুধু জাহাজের অবস্থানসংক্রান্ত সংকেত বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তেহরান মনে করেছে, এর আড়ালে হরমুজে এমন একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে ইরানের নিরাপত্তা ও কর্তৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ইরানের কাছে স্বল্পমেয়াদি শান্তির চেয়ে ভবিষ্যতের হরমুজ ব্যবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তেহরান যদি এখন কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখাত, তাহলে বিকল্প নৌপথ ধীরে ধীরে স্থায়ী রূপ নিতে পারত।
সেই বিবেচনায় তিনটি জাহাজে হামলা ছিল একটি সতর্কবার্তা। এর মাধ্যমে ইরান বোঝাতে চেয়েছে, হরমুজের চলাচলব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা বিনা প্রতিক্রিয়ায় ছেড়ে দেওয়া হবে না।
দুর্বলতা নাকি সংযম
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, দুই পক্ষ একই ঘটনাকে ভিন্নভাবে দেখছে।
যুক্তরাষ্ট্র তার হামলার বিরতিকে সংযম এবং আলোচনার সুযোগ হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু তেহরান সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
ইরান যদি মনে করে চাপ বাড়ালে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটবে, তাহলে তেহরান আরও হামলা চালাতে উৎসাহিত হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের আক্রমণের জবাব না দেয়, তাহলে ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিপক্ষ দাবি করতে পারে।
ফলে দুই পক্ষই এমন একটি চক্রে প্রবেশ করছে, যেখানে কেউ পিছু হটতে চাইছে না। প্রতিটি হামলার পর পাল্টা আঘাতের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। কারণ নীরব থাকলে সেটি দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতে পারে।
এই মনোভাব দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে।
৭ এপ্রিল ২০২৬-এর হামলার স্মৃতি
এই সংঘাতের মানবিক মূল্যও ক্রমে বাড়ছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল ভোরে তেহরানে ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় রাফি-নিয়া উপাসনালয় এবং আশপাশের আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সেই দিনটি ছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের ৩৯তম দিন। হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকা এক বাসিন্দার ছবি যুদ্ধের বেসামরিক প্রভাবকে সামনে এনেছিল।
এ ধরনের হামলা ইরানের জনমতেও প্রতিশোধের চাপ তৈরি করতে পারে। যখন ধর্মীয় স্থাপনা ও আবাসিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ইরানি নেতৃত্বের পক্ষে সম্পূর্ণ সংযম দেখানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে।
সুতরাং সামরিক হিসাবের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও তেহরানের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
ইরান আসলে কী অর্জন করতে চায়
ইরানের নতুন হামলার পেছনে কয়েকটি লক্ষ্য স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
প্রথমত, তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের প্রভাব হারাতে চায় না। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বোঝাতে চায় যে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার প্রস্তুতি নিলে আগাম আঘাত আসতে পারে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরির জন্য সামরিক চাপ বজায় রাখতে চায়।
এর সঙ্গে আরেকটি বার্তাও রয়েছে। ইরান দেখাতে চাইছে, যুদ্ধ কখন শুরু হবে বা কখন থামবে, সেই সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্র নেবে না। তেহরানও সংঘাতের সময় ও ধরন নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।
এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল। কারণ চাপ বাড়িয়ে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হলেও একই সঙ্গে বড় ধরনের মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা ডেকে আনার আশঙ্কাও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের সামনে দুটি কঠিন পথ রয়েছে।
একটি পথ হলো, ইরানের কিছু দাবি মেনে নিয়ে হরমুজে এমন একটি সমঝোতা তৈরি করা, যেখানে তেহরানের নিরাপত্তা উদ্বেগের কিছু স্বীকৃতি থাকবে।
অন্য পথ হলো, ইরানের দাবি প্রত্যাখ্যান করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি গ্রহণ করা। সে ক্ষেত্রে জাহাজ, জ্বালানি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে হামলা আরও বাড়তে পারে।
প্রথম পথটি বেছে নিলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা মনে করতে পারে, সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরান সুবিধা আদায় করেছে। দ্বিতীয় পথটি বেছে নিলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য অনেক বেড়ে যেতে পারে।
এই দ্বিধাই ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কী ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে
হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে। জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিমা খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানির দাম বাড়তে পারে।
বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সংখ্যা বাড়লে অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হবে। এতে পণ্য পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হবে।
সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বাড়লে তেল সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ইরাক ও ইয়েমেনে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ একসঙ্গে ঝুঁকিতে পড়বে।
তাই ইরানের নতুন হামলাকে শুধু একটি সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বিশ্ববাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও বড় সতর্কবার্তা।
শেষ পর্যন্ত ইরান কেন আবার হামলা করল
ইরান নতুন করে হামলা চালিয়েছে, কারণ তেহরানের কাছে কয়েক দিনের শান্তির চেয়ে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ধরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দেশটি মনে করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধ থাকা অবস্থায় ওমান ও ওয়াশিংটনের উদ্যোগে বিকল্প জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে ইরানের সার্বভৌমত্বের দাবি দুর্বল হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর হোয়াইট হাউস সফর এবং ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় সম্ভাব্য হামলার আলোচনা তেহরানের কাছে আসন্ন বিপদের সংকেত হিসেবে ধরা পড়ে থাকতে পারে।
ফলে ইরান অপেক্ষা না করে আগে আঘাত করার পথ বেছে নেয়। এটি তেহরানের সামরিক নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
তবে এই কৌশলের বড় ঝুঁকিও রয়েছে। ইরান চাপ বাড়িয়ে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, আর যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শক্তি দেখিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে চাইছে। দুই পক্ষের কেউই পিছিয়ে যেতে প্রস্তুত না হলে মধ্যপ্রাচ্য এমন এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে এগোতে পারে, যেখানে জাহাজ, জ্বালানি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ বারবার হামলার লক্ষ্য হবে।
কয়েক দিনের বিরতি তাই শান্তির শুরু ছিল না। সেটি সম্ভবত ছিল আরও বড় সংঘাতের আগে একটি সাময়িক নীরবতা।

