মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি নিয়ে প্রস্তাবিত একটি চুক্তি অনুমোদনের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠিয়েছেন। তবে চুক্তিটি কার্যকর করতে রিয়াদকে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত জুড়ে দিয়েছেন তিনি। সূত্র: রয়টার্স
মঙ্গলবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, গত জুলাইয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে সমঝোতা হওয়া চুক্তিটি সোমবার অনুমোদনের জন্য কংগ্রেসে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলো সৌদি আরবে বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি রপ্তানির সুযোগ পাবে। তবে এ বিষয়ে ওয়াশিংটনে অবস্থিত সৌদি দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা ইমেইলে জানান, ‘প্রেসিডেন্টের অবস্থান একদম স্পষ্ট। সৌদি আরব ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’ যোগ না দেওয়া পর্যন্ত এই চুক্তি কার্যকর হবে না।’
২০২০ ও ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান যে সমঝোতায় সই করেছিল, সেটিই ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা আব্রাহাম চুক্তি নামে পরিচিত।
জুলাইয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে একমত হওয়ার পরপরই ট্রাম্প শর্ত দেন, চুক্তিটি কার্যকর করতে হলে রিয়াদকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হবে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও তার মেয়াদে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
২০২৩ সালে রিয়াদ ও তেল আবিবের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি অনেকটা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তবে ওই বছরের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
সৌদি আরব শুরু থেকেই বলে আসছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার পদক্ষেপ ছাড়া তারা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না।
প্রস্তাবিত পারমাণবিক চুক্তিটির মেয়াদ ৩০ বছর। এর আওতায় সৌদি আরবে ‘এপি১০০০’ রিয়্যাক্টর নির্মাণের কথা রয়েছে। এটি কয়েক হাজার কোটি ডলারের একটি বিশাল প্রকল্প, যার মাধ্যমে পারমাণবিক সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউজও বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা পাবে।
কংগ্রেস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি ইতোমধ্যে কংগ্রেসের নেতাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। বুধবার এটি সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। ৯০ অধিবেশন দিবসের মধ্যে মার্কিন কংগ্রেস চুক্তিটির বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক আপত্তি না তুললে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে।
অন্যদিকে কংগ্রেস চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করলেও ট্রাম্প তাতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। সেই ভেটো বাতিল করতে হলে কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হবে।
তবে প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধবিষয়ক বিশ্লেষকদের অনেকে তীব্র সমালোচনা করছেন। তাদের অভিযোগ, চুক্তিটিতে সৌদি আরবের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কিংবা পারমাণবিক বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর কোনো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়নি। তাদের আশঙ্কা, এসব সুযোগ ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের পথ তৈরি করে দিতে পারে।
২০০৯ সালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি করার সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করার কঠোর শর্ত মেনে নিয়েছিল। পারমাণবিক ক্ষেত্রে এই শর্ত ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তাদের প্রস্তাবিত চুক্তিতে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে নন-প্রলিফারেশন পলিসি এডুকেশন সেন্টারের প্রধান হেনরি সোকোলস্কি বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে ট্রাম্প মূলত এমন একটি সুযোগ তৈরি করেছেন, যাতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কিংবা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা ছাড়াই কংগ্রেস চুক্তিটি অনুমোদন করতে পারে।
সোকোলস্কির ভাষায়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং ইসরায়েলকে স্বীকৃতির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই কঠোর হতে চাইত, তাহলে এভাবে বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া মোটেও সঠিক কৌশল নয়।

