মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, অঞ্চলটির পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো বুঝি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ইরান ও ইসরায়েল আর গোপন সংঘাতে সীমাবদ্ধ নেই; তারা সরাসরি একে অপরের ভূখণ্ডে আঘাত করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে যুদ্ধ করেছে। গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, লেবানন আবার সংঘাতে জড়িয়েছে, সিরিয়ায় প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ক্ষমতায় থাকা আসাদ শাসনের পতন ঘটেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনা, বিমানবন্দর ও আবাসিক স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে।
এত পরিবর্তনের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এটি কি সত্যিই নতুন এক মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম?
উত্তরটি আশাব্যঞ্জক নয়। কারণ দৃশ্যপট বদলালেও সংঘাতের মূল কারণগুলো প্রায় আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে। দুর্বল আরব রাষ্ট্রগুলোর ভেতরে বাইরের শক্তির প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। ইরান ও ইসরায়েলের বিরোধ আরও গভীর হয়েছে। ফিলিস্তিন প্রশ্নের কোনো সমাধান হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটি ছেড়ে যাওয়ার অবস্থায় নেই, আবার স্থায়ী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মতো রাজনৈতিক ইচ্ছা বা সামর্থ্যও দেখাতে পারছে না।
অর্থাৎ যুদ্ধ অনেক কিছু ধ্বংস করেছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মৌলিক ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে পারেনি।
ইরানকে দুর্বল করার যুদ্ধ কি উল্টো ফল দিয়েছে?
২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইরান একের পর এক বড় আঘাতের মুখে পড়ে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির পারমাণবিক অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়। ইরানের ভেতরে অভিযান চালিয়ে সামরিক কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যা করা হয়। তেহরানে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াও নিহত হন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন ইরানের জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা ছিল। এর ফলে লেবাননের সঙ্গে দেশটির স্থল যোগাযোগ দুর্বল হয়ে যায়। একই সময়ে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো ইরানঘনিষ্ঠ শক্তিগুলোও ইসরায়েলি অভিযানে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে।
দেশের ভেতরেও ইরানের পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল না। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অসন্তোষের মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। মানবাধিকার কর্মীদের সংবাদ সংস্থার হিসাবে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৭,০০০ বিক্ষোভকারী নিহত হন। অন্য কিছু সংগঠন নিহতের সংখ্যা কয়েক দশক হাজার বলে দাবি করে।
এসব ঘটনায় ইরানকে অনেকের কাছে দুর্বল ও ভঙ্গুর মনে হচ্ছিল। এই ধারণা থেকেই সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেছিলেন, আরও বড় সামরিক আঘাতের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়া সম্ভব হবে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে হামলা শুরুর সময় তিনি ইরানের জনগণকে নিজেদের সরকার দখলে নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন।
কিন্তু পরবর্তী পরিস্থিতি দেখিয়েছে, সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান নিজের কৌশলগত গুরুত্ব হারায়নি। বরং হরমুজ প্রণালীর ওপর প্রভাব ব্যবহার করে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা দেখিয়েছে। আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ও প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালিয়ে তেহরান প্রমাণ করেছে, তাকে সহজে পাশ কাটিয়ে কোনো নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়।
২০২৬ সালের জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে যায়। এর ওপর বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের প্রভাব আরও বেড়েছে। ইসরায়েলের বিরোধিতা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিরোধ এবং দুর্বল আরব রাষ্ট্রগুলোর রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ—ইরানের বহু পুরোনো এই তিনটি নীতিতেও মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।
বরং ভবিষ্যতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা ঠেকাতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা আরও জোরদার করতে পারে। সামরিক অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইরানের শক্তি কমানো; অথচ সেই অভিযান তেহরানকে নিজের নিরাপত্তা আরও কঠোর করার রাজনৈতিক যুক্তি দিয়েছে।
গাজায় ব্যাপক ধ্বংস, কিন্তু রাজনৈতিক সংকট আগের মতোই
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ গাজাকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছেন, বসতবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। কিন্তু এত বড় সামরিক অভিযানের পরও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
হামাস সামরিকভাবে দুর্বল হয়েছে, কিন্তু নিশ্চিহ্ন হয়নি। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি, গাজার ভবিষ্যৎ শাসন এবং পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি আগের মতোই অমীমাংসিত রয়ে গেছে। কিছু ইসরায়েলি নেতা ফিলিস্তিনিদের পুরোপুরি উচ্ছেদ ও তাদের ভূখণ্ড দখলের পক্ষে থাকলেও তা এখনো সম্পন্ন হয়নি। আবার সমঝোতাভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক পথেও ইসরায়েল এগোয়নি।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় সহিংসতা থামেনি। যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ১,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনায় গাজার নিরাপত্তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের কথা থাকলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।
পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের একটি কমিটির মাধ্যমে গাজার প্রশাসন পরিচালনার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ইসরায়েল ওই কমিটির সদস্যদের গাজায় ঢুকতে দেয়নি। অন্যদিকে হামাস ২০২৫ সালের অক্টোবরের সমঝোতায় অস্ত্র ত্যাগে সম্মত হলেও তা করেনি। ইসরায়েলি বাহিনী এখনো গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
তাই গাজার যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী শান্তি না বলে সংঘাতের মাঝখানে একটি সাময়িক বিরতি বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
পশ্চিম তীরে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে রাজনৈতিক সমাধানের পথ
গাজার পাশাপাশি পশ্চিম তীরেও সংঘাত ও দখল সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০২৫ সালে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে পশ্চিম তীরে ২৪০ ফিলিস্তিনি নিহত হন। একই বছরে ইসরায়েল ৫৪টি নতুন বসতি অনুমোদন করে, যা ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির পর এক বছরে সর্বোচ্চ।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এমন একটি আইন গ্রহণ করা হয়, যার ফলে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের জমি কেনা সহজ হয়ে যায়। ফিলিস্তিনিরা এটিকে অসলো চুক্তির লঙ্ঘন এবং ভূখণ্ড দখলের গতি বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
এখানে বড় সংকট হলো, গাজা ও পশ্চিম তীরের ভবিষ্যৎ শাসনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ফিলিস্তিনি অংশীদার প্রয়োজন। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষই সেই ভূমিকার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দাবিদার। কিন্তু ইসরায়েল তাদের শক্তিশালী করার বদলে পশ্চিম তীরে তাদের প্রশাসনিক সক্ষমতা দুর্বল করছে।
ফলে একদিকে হামাসের বিকল্প হিসেবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে সেই কর্তৃপক্ষকেই কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
দুর্বল রাষ্ট্রগুলোই সংঘাতের সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার একটি বড় কারণ হলো দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার। ইরাক, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনের সরকার নিজেদের পুরো ভূখণ্ড, সীমান্ত এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে সশস্ত্র সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের পাশাপাশি স্বাধীন সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে।
একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে, নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয় এবং কোনো গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া যুদ্ধ শুরু করতে দেয় না। কিন্তু দুর্বল রাষ্ট্রে স্থানীয় সশস্ত্র শক্তি এবং বিদেশি রাষ্ট্র—দুই পক্ষই নিজেদের স্বার্থে প্রবেশের সুযোগ পায়।
এ কারণেই শুধু কোনো সশস্ত্র সংগঠনকে দুর্বল করলেই স্থায়ী শান্তি আসে না। সংগঠনটি যে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার ভেতর থেকে জন্ম নেয়, সেই দুর্বলতা দূর না করলে তার জায়গায় নতুন শক্তি তৈরি হয়। শক্তিশালী ও কার্যকর রাষ্ট্র ছাড়া টেকসই শান্তি সম্ভব নয়।
ইরানের মিত্ররা দুর্বল, কিন্তু অকার্যকর নয়
ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের অনেকেই বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। তারপরও তারা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যায়নি।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ইরাকের নির্বাচনে ইরানঘনিষ্ঠ শিয়া দলগুলো ভালো ফল করে। ইরানসমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসে অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। নতুন প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সরকারেও ইরানের স্থানীয় মিত্ররা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছে।
এই ঘটনা দেখায়, সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করলেই রাজনৈতিক প্রভাব শেষ হয়ে যায় না। ইরানের শক্তি শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভর করে না; বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দল, সশস্ত্র গোষ্ঠী, ধর্মীয় পরিচয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেও সেই প্রভাব ছড়িয়ে আছে।
লেবাননে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু আবারও যুদ্ধ ফিরে এসেছে
২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়লে লেবাননের কেন্দ্রীয় সরকারের সামনে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগ তৈরি হয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লেবাননের পার্লামেন্ট সাবেক সেনাপ্রধান ও ম্যারোনাইট খ্রিস্টান জোসেফ আউনকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে তাঁর নির্বাচন আটকে রেখেছিল।
২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নেও কিছু অগ্রগতি হয়েছিল। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ হিজবুল্লাহ ইসরায়েল সীমান্তবর্তী লেবাননি এলাকা থেকে অনেকাংশে সরে যায়। মনে হচ্ছিল, রাষ্ট্রীয় বাহিনী ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে।
কিন্তু ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী অভিযানের জবাবে হিজবুল্লাহ হামলায় অংশ নেয়। এর পর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান এবং দেশজুড়ে বিমান হামলা শুরু করে। এতে ৪,২০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হতে পারে লেবাননের নতুন সরকার। কারণ তারা হিজবুল্লাহর হামলার নিন্দা করেছে এবং আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে, তবু নিজেদের ভূখণ্ডে আরেকটি বিপর্যয় ঠেকাতে পারেনি।
হিজবুল্লাহ ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যেও টিকে আছে। কিন্তু লেবাননের সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইয়েমেন ও লোহিত সাগরের অনিশ্চয়তা
ইয়েমেনে ইরানঘনিষ্ঠ হুতি গোষ্ঠী ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাব এল মান্দেব প্রণালীতে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলে বড় বাধা সৃষ্টি করে। তারা দাবি করেছিল, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ইরানের ওপর হামলা চললেও হুতিরা প্রথমে সরাসরি বড় সংঘাতে জড়ায়নি। এর পেছনে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের নতুন সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বজায় ছিল। এই সময়ে রিয়াদ ইয়েমেনের সরকারি কর্মচারীদের বেতনেও অর্থ সহায়তা দেয়, যাদের অনেকে হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কাজ করেন।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। এতে লোহিত সাগরের জ্বালানি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আবারও ঝুঁকিতে পড়েছে।
অর্থাৎ ইয়েমেনে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান না হলে সাময়িক যুদ্ধবিরতি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ধারণায় বড় পরিবর্তন
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত উপসাগরীয় আরব দেশগুলো আঞ্চলিক যুদ্ধের অনেকটাই বাইরে থাকার চেষ্টা করেছিল। ইসরায়েলের হাতে হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হওয়ায় তারা প্রকাশ্যে আনন্দ না দেখালেও তাতে খুব একটা অসন্তুষ্টও ছিল না।
তবে গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি আরব জনগণের মধ্যে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে আবারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য সহযোগিতা আরব শাসকদের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইসরায়েলের আঞ্চলিক সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারে অবস্থানরত হামাস কর্মকর্তাদের হত্যার উদ্দেশ্যে ইসরায়েল একটি আবাসিক ভবনে হামলা চালায়। ওই কর্মকর্তারা তখন যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য সেখানে ছিলেন। হামলা ব্যর্থ হলেও উপসাগরীয় শাসকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়।
উপসাগরীয় দেশগুলো পর্যটন, বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। যুদ্ধ তাদের এই পরিকল্পনার জন্য সরাসরি হুমকি। তাই ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময় তারা অনেকটাই নীরব ছিল এবং ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন যুদ্ধ ঠেকাতে ওয়াশিংটনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের পাল্টা হামলার বড় অংশ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর পড়ে। ফলে শুরুতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্ষুব্ধ হয়—কারণ ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত তাদের ইরানি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। পরে আবার অনেকে মনে করেন, ইরানকে প্রতিবেশীদের হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চালানো উচিত।
এই দ্বিধা দুর্বল মিত্র ও শক্তিশালী রক্ষকের সম্পর্কের পুরোনো সমস্যা। ছোট রাষ্ট্রগুলো একদিকে শক্তিশালী মিত্রের শুরু করা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভয় পায়, অন্যদিকে বিপদের সময় সেই মিত্র তাদের ছেড়ে দেবে কি না, সেটিও নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প এখনো নেই
ক্ষোভ ও হতাশা থাকলেও উপসাগরীয় দেশগুলো নিকট ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে যাবে—এমন সম্ভাবনা কম।
তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান প্রতিহত করার ক্ষেত্রে এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কার্যকরও প্রমাণিত হয়েছে।
চীন এখনো উপসাগরের সামরিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহ দেখায়নি এবং দূরবর্তী অঞ্চলে বড় শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনীয় সক্ষমতাও তার নেই। রাশিয়া ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং ইউক্রেনের যুদ্ধে ব্যস্ত। ইউরোপীয় দেশ, মিসর, পাকিস্তান বা তুরস্ক—কেউই যুদ্ধক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের সমতুল্য নয়।
তাই যুক্তরাষ্ট্রকে অপছন্দ করলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বাস্তবসম্মত বিকল্প নিরাপত্তা রক্ষক নেই।
ইসরায়েলের সঙ্গে আরব সম্পর্কের গতি থেমে গেছে
কয়েক বছর আগেও উপসাগরীয় দেশগুলোর একটি অংশ ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে দেখছিল। সৌদি আরবও সম্পর্ক উষ্ণ করার কথা বিবেচনা করছিল।
কিন্তু গাজা যুদ্ধ, কাতারে ইসরায়েলি হামলা এবং ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ সেই প্রবণতাকে উল্টে দিয়েছে। ২০২০ সালে কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে চুক্তিমালা শুরু হয়েছিল, তার সম্প্রসারণ এখন থমকে গেছে।
গাজায় ইসরায়েলের অভিযানের কারণে আরব শাসকদের জন্য প্রকাশ্যে তেল আবিবের সঙ্গে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কাতারে হামলা উপসাগরীয় নেতাদের মনে এমন সন্দেহ তৈরি করেছে যে ইসরায়েল তাদের নিরাপত্তাকে আদৌ গুরুত্ব দেয় কি না। একমাত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্পর্কটি আবারও জোরদার করেছে, কারণ দেশটির সঙ্গে ইসরায়েলের যোগাযোগ আগে থেকেই সবচেয়ে গভীর ছিল।
ইসরায়েলের সামরিক সাফল্য কেন রাজনৈতিক জয় নয়
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ইসরায়েল নিজেকে আঞ্চলিক যুদ্ধের বিজয়ী ভাবার যথেষ্ট কারণ পেয়েছিল। হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়েছে, ইরানের স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে এবং আসাদ সরকারের পতনে তেহরানের আঞ্চলিক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কিন্তু ইরানের শাসনব্যবস্থা পতনের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ২০২৬ সালের জুনের যুদ্ধবিরতিতে ইরান ক্ষমতায় থেকে যায় এবং বৃহত্তর অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের মতো সামরিক সক্ষমতাও ধরে রাখে। ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগে বাধ্য করার কোনো সুনির্দিষ্ট শর্তও তৈরি হয়নি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসরায়েল তার সামরিক সাফল্যকে কূটনৈতিক অগ্রগতিতে রূপান্তর করার আগ্রহ দেখায়নি। দেশটি যেন ধরে নিয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক আধিপত্য বজায় রাখাই নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট।
কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগেও ইসরায়েলের সামরিক শক্তি অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল। তারপরও হামাসের হামলা ঠেকানো সম্ভব হয়নি। ফলে শুধু শক্তির ওপর নির্ভর করে অনির্দিষ্টকাল নিরাপদ থাকার ধারণাটি প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রতিবেশীকে দুর্বল রাখার নীতি কতটা নিরাপদ?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মনে করেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো দুর্বল ও বিভক্ত থাকলে ইসরায়েল বেশি নিরাপদ থাকবে। কিন্তু এই ধারণার বিপরীত উদাহরণও রয়েছে।
মিসর ও জর্ডানের সঙ্গে ইসরায়েলের শান্তিচুক্তি কয়েক দশক ধরে দেশটির নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। দুই দেশের সরকার নিজ নিজ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং নিজেদের ভূখণ্ডে সহিংস অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর উত্থান ঠেকাতে সক্ষম।
অন্যদিকে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরোধী এবং ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী একটি সরকার গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল ২০২৬ সালে সেখানে আবার যুদ্ধ শুরু করেছে।
সিরিয়ায় ইসরায়েল তথাকথিত নিরাপত্তা অঞ্চল দখল করেছে, দ্রুজ জনগোষ্ঠীকে নতুন সরকারের বিরোধিতা করতে উৎসাহ দিয়েছে, দ্রুজ সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র দিয়েছে এবং দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরসহ সরকারি সামরিক অবস্থানে হামলা করেছে।
এসব পদক্ষেপে হিজবুল্লাহ বা ইরানের স্বল্পমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু লেবানন ও সিরিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদে নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী, নতুন গৃহযুদ্ধ এবং বাইরের শক্তির আরও হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হবে।
সিরিয়ায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন, কিন্তু ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত
গত কয়েক বছরের যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন।
নতুন সরকার আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি একসময় আল-কায়েদার সদস্য ছিলেন। দামেস্কের ক্ষমতা নেওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আরব বিশ্বের সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করেছেন।
আসাদ সরকার ১৯৮০-এর দশক থেকে ইরানের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল, নতুন সিরীয় নেতৃত্ব তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর ফলে লেবাননের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার এবং সিরিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইসরায়েলকে হুমকি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা কমেছে।
ক্ষমতায় আসার পর আল-শারা সহনশীল, পরামর্শভিত্তিক এবং ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক শাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে কথার বাইরে বাস্তবতা অনেক কঠিন।
দীর্ঘ ১৪ বছরের নৃশংস গৃহযুদ্ধ সিরিয়াকে গভীরভাবে বিভক্ত ও ক্ষতবিক্ষত করেছে। নতুন সরকারের মিত্রবাহিনী পশ্চিমাঞ্চলে আলাওয়ি, দক্ষিণে দ্রুজ এবং উত্তর-পূর্বে কুর্দিদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এখনো পুরো দেশের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
সিরিয়া দুর্বল থাকলে ইরান, ইসরায়েল, তুরস্ক ও উপসাগরীয় দেশগুলো আবারও সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়তে পারে। তাতে নতুন গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সামান্য সম্ভাবনাও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র কী করতে পারে?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রাষ্ট্র গড়ে দেওয়ার কাজে জড়াতে চায় না। আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এই অবস্থানের পেছনে যুক্তি রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রও বুঝতে পারছে, দুর্বল আরব রাষ্ট্রগুলো কার্যকর না হলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আসবে না। তাই সিরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং নতুন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র আল-তানফে বহু বছর ধরে ব্যবহৃত ঘাঁটিটি সিরীয় সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। এর মাধ্যমে ২০১৪ সাল থেকে সেখানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকেরা ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছেন। লেবানন সরকারকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আরও কঠোর হওয়ার জন্যও উৎসাহিত করা হয়েছে।
২০২৬ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এতে দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে ইসরায়েল সম্মত হয়।
তবে এসব উদ্যোগ সফল করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু ইরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর ওপর চাপ দিলেই চলবে না। ইসরায়েল যেন লেবানন ও সিরিয়ার রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা দুর্বল না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে চায় ওয়াশিংটন
ইরানের নতুন শক্তি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখতে হবে—এমন যুক্তিও সামনে এসেছে।
এর মধ্যে রয়েছে বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কাতারে আল উদেইদ বিমানঘাঁটি, কুয়েতে মোতায়েন থাকা ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ সেনা এবং ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ।
এই উপস্থিতি না থাকলে ইরান প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে সহজে সামরিক হুমকি দিতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
তবে শুধু সামরিক ঘাঁটি রেখে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনা সম্ভব নয়। সামরিক উপস্থিতি আক্রমণ ঠেকাতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করতে পারে না।
ইরানের সঙ্গে নতুন সমঝোতা কি সম্ভব?
অঞ্চলে উত্তেজনা কমাতে সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে ইরানের সঙ্গে একটি টেকসই রাজনৈতিক সমঝোতা।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযান শুরুর ঠিক আগে ইরানি কূটনীতিকেরা এমন একটি চুক্তির ধারণা দিয়েছিলেন, যার অধীনে তেহরান কখনো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত গড়ে তুলবে না।
যুদ্ধের পর ইরানের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় সেই প্রস্তাব এখন আরও কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তির জন্য ইরান এখনো মরিয়া। তাই নতুন পারমাণবিক আলোচনার ভিত্তি হিসেবে প্রস্তাবটি ব্যবহার করা সম্ভব।
যুদ্ধের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের কৌশল সফল হয়নি। ফলে আলোচনা কঠিন হলেও সেটিই তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত পথ।
হরমুজ প্রণালী শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক সংকট
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়। সেখানে অবাধ ও নিরাপদ নৌচলাচল বাধাগ্রস্ত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় দেশ, উপসাগরীয় রাষ্ট্র এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি বহুপক্ষীয় কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব এসেছে।
সুয়েজ খাল ও তুর্কি প্রণালীগুলোর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা এবং মালাক্কা প্রণালীর নৌনিরাপত্তা কাঠামো থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। মালাক্কায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছা অনুদান সংগ্রহ করে জলপথ জরিপ, নৌচলাচলের অবকাঠামো এবং ডুবে যাওয়া জাহাজ সরানোর কাজে অর্থ দেয়।
হরমুজ প্রণালীকে স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত ও শুল্কমুক্ত রাখতে ইরানের সঙ্গে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের একক আলোচনা যথেষ্ট নাও হতে পারে। বহুপক্ষীয় চাপ ও দায়িত্ব ভাগাভাগি প্রয়োজন।
ফিলিস্তিন প্রশ্ন এড়িয়ে স্থায়ী শান্তি অসম্ভব
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক সংকট এখনো ফিলিস্তিন প্রশ্ন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা আবারও দেখিয়েছে, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে অনির্দিষ্টকাল দমন করে রাখা যায় না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে মনে হলেও ক্ষোভ, বঞ্চনা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা যেকোনো সময় বড় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
একটি স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একই সঙ্গে দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে—ফিলিস্তিনিদের মৌলিক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা।
কিন্তু কোনো যুক্তরাষ্ট্র সরকারই এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধানে বাধ্য করার জন্য ইসরায়েলের ওপর নিজের প্রভাব যথেষ্ট দৃঢ়ভাবে ব্যবহার করেনি। সেই ইচ্ছা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার আশা বাস্তবতার চেয়ে কল্পনাই বেশি।
নতুন মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরোনো দ্বন্দ্বের নতুন অধ্যায়
গত কয়েক বছরের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের শহর, অর্থনীতি, সমাজ ও মানুষের জীবন ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। কিন্তু ক্ষমতার মূল খেলোয়াড় ও তাদের স্বার্থ খুব বেশি বদলায়নি।
ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়ে ফিরে এসেছে। তার মিত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়েছে, কিন্তু বিলীন হয়নি। ইসরায়েল সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থেকেও রাজনৈতিক সমঝোতার বদলে প্রায় স্থায়ী যুদ্ধের অবস্থাকে গ্রহণ করেছে। ফিলিস্তিন প্রশ্ন অমীমাংসিত। সিরিয়া, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা অব্যাহত। যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটি ছাড়তে পারছে না, আবার এককভাবে শান্তিও প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।
যুদ্ধবিরতি হয়েছে, কিন্তু বিরোধের কারণগুলো থেকে গেছে। তাই একটি যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী সংঘাতের ভিত্তি তৈরি হয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের জন্য প্রকৃত পরিবর্তন মানে শুধু কোনো সরকার পতন, কোনো সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস বা কোনো সশস্ত্র সংগঠন দুর্বল হওয়া নয়। প্রকৃত পরিবর্তন আসবে তখনই, যখন দুর্বল রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, বিদেশি শক্তি সশস্ত্র গোষ্ঠী ব্যবহার বন্ধ করবে, ইরানের সঙ্গে কার্যকর সমঝোতা হবে এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার স্বীকৃতি পাবে।
তা না হলে সাম্প্রতিক সব যুদ্ধ, ধ্বংস ও প্রাণহানির পরও অঞ্চলটি আবার পুরোনো পথেই হাঁটবে। চরিত্রগুলো একই থাকবে, শুধু সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। পরবর্তী বড় যুদ্ধের মঞ্চ ইতিমধ্যেই প্রস্তুত হয়ে আছে।

