রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। প্রস্তাবটি আইনে পরিণত হলে শুধু রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান বা কর্মকর্তারাই নয়, মস্কোর কাছ থেকে তেল, গ্যাস, সামরিক সরঞ্জাম কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য কেনা দেশগুলোকেও কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশেষ করে ভারত, চীন ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে। কারণ তারা বর্তমানে রাশিয়ার জ্বালানির বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনের আওতায় এসব দেশের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ থাকবে।
অর্থাৎ ভারত বা চীনের কোনো পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশমূল্য যদি ১০০ টাকা হয়, তাহলে শুধু শুল্ক হিসেবেই আরও ১০০ টাকা যোগ হতে পারে। ফলে সেই পণ্য মার্কিন বাজারে দ্বিগুণ দামে পৌঁছাতে পারে। এতে ক্রেতা কমে যাওয়া, রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়া এবং উৎপাদন খাতে চাপ তৈরির আশঙ্কা থাকবে।
তবে প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত আইন হয়নি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার করেছে মাত্র। সামনে প্রতিনিধি পরিষদের আলোচনা, সম্ভাব্য সংশোধন, রাজনৈতিক দরকষাকষি এবং প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের মতো আরও কয়েকটি ধাপ রয়েছে।
সিনেটে কী ঘটেছে
“লিন্ডসে ও গ্রাহাম রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা আইন ২০২৬” নামে প্রস্তাবটি চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে ৮৬–১২ ভোটে এগিয়ে গেছে। বিপুল সমর্থনের কারণে এটি এখন প্রতিনিধি পরিষদে পাঠানো যাবে।
প্রস্তাবটির নামকরণ করা হয়েছে প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে। ইউক্রেনের শক্ত সমর্থক হিসেবে পরিচিত গ্রাহাম চলতি মাসে আকস্মিকভাবে মারা যান। সপ্তাহের শুরুতে অনুষ্ঠিত তাঁর শেষকৃত্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ বিভিন্ন দেশের নেতা উপস্থিত ছিলেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও গ্রাহামের শেষকৃত্যে অংশ নিতে ওয়াশিংটনে যান। ২৮ জুলাই ২০২৬ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা ভবনে প্রস্তাবটির দুই দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সিনেটে ভোট গণনার সময় তিনি দর্শকসারিতে উপস্থিত ছিলেন।
ভোটের পর জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, ৮৬ জন সিনেটরের সমর্থন পাওয়া প্রস্তাবটি লিন্ডসে গ্রাহামের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ। তিনি এটিকে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সম্ভাব্য কার্যকর উপায় হিসেবেও উল্লেখ করেন।
সিনেটে অনুমোদিত হলেও প্রস্তাবটি এখনই প্রতিনিধি পরিষদে ভোটে উঠছে না। প্রতিনিধি পরিষদ গ্রীষ্মকালীন বিরতিতে থাকায় পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে কিছুটা সময় লাগবে।
ইরানকে যুক্ত করায় নতুন জটিলতা
চলতি সপ্তাহের বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইনপ্রণেতাদের প্রস্তাবটিতে পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেন। তাঁর দাবি, শুধু রাশিয়া নয়, ইরানের কাছ থেকে জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপরও একই ধরনের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা আইনে রাখতে হবে।
এই নতুন দাবি প্রস্তাবটির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে তুলনামূলক ঐকমত্য থাকলেও ইরানকে ঘিরে একই ধরনের ঐকমত্য নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের তেল ক্রেতাদের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের বিষয়টি যুক্ত হলে অনেক বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন। কারণ ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের অন্যতম চীন। ফলে এই ক্ষমতা সরাসরি চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সংঘাতকে আরও তীব্র করতে পারে।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্র অধ্যয়নকেন্দ্রের সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড স্মিথের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অনেক আইনপ্রণেতা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করলেও প্রেসিডেন্টকে ব্যাপক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে পারেন।
তাঁর ধারণা, বিরোধী দলের অনেক সদস্য চাইবেন আইনটি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। তারা এমন কোনো ব্যবস্থা সমর্থন নাও করতে পারেন, যা প্রেসিডেন্টকে চীনসহ বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর হঠাৎ উচ্চ শুল্ক আরোপের সুযোগ দেয়।
তবে ইরানের বিষয়টি না থাকলে প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবটির পাস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল বলে স্মিথ মনে করেন। ইউক্রেনের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান দুর্বল হয়ে যেতে পারে—এমন উদ্বেগ বিরোধী দলের অনেক আইনপ্রণেতার মধ্যে রয়েছে। তাই রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আনা প্রস্তাবটির পক্ষে তাদের একটি বড় অংশ ভোট দিতে পারে।
আইনে কী কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে
প্রস্তাবিত আইনের প্রধান লক্ষ্য হলো রাশিয়ার অর্থনৈতিক আয় কমিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দুর্বল করা। এ জন্য নিষেধাজ্ঞা, আমদানি শুল্ক এবং তৃতীয় দেশের ওপর বাণিজ্যিক চাপ—তিন ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আইনটি কার্যকর হলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যাবে। একই সঙ্গে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ২০টির বেশি শীর্ষ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
প্রস্তাবটিতে রাশিয়ার তথাকথিত গোপন তেলবাহী জাহাজ বহরকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রুশ তেল পরিবহনে যেসব পুরোনো, অস্বচ্ছ মালিকানার বা বিভিন্ন দেশের পতাকা ব্যবহারকারী জাহাজ কাজ করছে, সেগুলোকে এই বহরের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রাশিয়া এই জাহাজব্যবস্থা ব্যবহার করে তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব অনেকাংশে কমিয়েছে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ। নতুন আইনে জাহাজের মালিক, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, বিমাকারী, অর্থদাতা এবং মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রস্তাবটি প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের অধীনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুমতি দেবে। এই ক্ষমতা ব্যবহার করে রাশিয়ার জ্বালানি বা সামরিক সরঞ্জামের সবচেয়ে বড় পাঁচ ক্রেতার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা যাবে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করে—এমন দেশও একই ব্যবস্থার আওতায় পড়তে পারে। অর্থাৎ শুধু রুশ তেল কেনাই নয়, অর্থ লেনদেন, জাহাজ নিবন্ধন, পণ্য পুনরায় রপ্তানি বা বাণিজ্যের তথ্য গোপন করার অভিযোগেও কোনো দেশকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া রাশিয়া থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে ৩৮০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল। মোট মার্কিন আমদানির তুলনায় এই পরিমাণ খুব বড় না হলেও ৫০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে রাশিয়ার অবশিষ্ট রপ্তানিও কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
কেন ভারত, চীন ও তুরস্ক সবচেয়ে ঝুঁকিতে
জ্বালানি ও পরিষ্কার বায়ু গবেষণাকেন্দ্রের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার জ্বালানির বৃহত্তম ক্রেতাদের মধ্যে চীন, ভারত ও তুরস্ক রয়েছে। এ কারণে আইনটি কার্যকর হলে এই তিন দেশের ওপর প্রথম দিকেই চাপ আসতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপের অনেক দেশ রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা কমিয়ে দেয়। এর ফলে মস্কো এশিয়ার বাজারে কম দামে জ্বালানি বিক্রি শুরু করে। ভারত ও চীন সেই সুযোগ নিয়ে রুশ তেলের আমদানি বাড়ায়।
এই বাণিজ্য দুই দেশের জন্যই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ছিল। কম দামে তেল পাওয়ায় জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমেছে, পরিশোধনাগারগুলো বেশি লাভ করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে রুশ তেল পরিশোধন করে অন্য দেশে জ্বালানি পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে।
কিন্তু নতুন মার্কিন আইন এই হিসাব বদলে দিতে পারে। রুশ তেল থেকে পাওয়া সাশ্রয় যদি যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর শতভাগ শুল্কের কারণে হারিয়ে যায়, তাহলে ভারত ও চীনকে নতুনভাবে লাভ–ক্ষতির হিসাব করতে হবে।
চীনের জন্য কতটা বড় হুমকি
চীন বিশ্বের অন্যতম বড় রুশ তেল ও গ্যাস ক্রেতা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি চীনের জন্য শুধু জ্বালানি নয়, সামগ্রিক রপ্তানি অর্থনীতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চীন অতীতে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কের জবাবে মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। নতুন শুল্ক কার্যকর হলেও বেইজিং একই পথ নিতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সঙ্গে সঙ্গে চীনের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করবে না। বেইজিংভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ট্রিভিয়াম চায়নার পরিচালক ইভেন পের মতে, চলতি বছরের শেষ দিকে ট্রাম্পের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেই বৈঠকের আগে ওয়াশিংটন নতুন শুল্কের ক্ষমতাকে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত ট্রাম্পের আরোপ করা অনেক শুল্ক বাতিল করে দেওয়ার পর নতুন আইনি ক্ষমতার প্রয়োজন আরও বেড়েছে। প্রস্তাবটি আইনে পরিণত হলে আইনসভার সরাসরি অনুমোদন নিয়ে চীনের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের সুযোগ পাবেন ট্রাম্প।
তবে আইনটি পাস ও স্বাক্ষরিত হওয়া এখনো নিশ্চিত নয়। প্রতিনিধি পরিষদে বিরোধিতা, ইরানসংক্রান্ত সংশোধন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর চাপ প্রস্তাবটির পথ কঠিন করে তুলতে পারে।
ভারতের সামনে জ্বালানি ও রপ্তানির দ্বন্দ্ব
ভারতের অবস্থা চীনের চেয়েও কিছু ক্ষেত্রে বেশি জটিল। দেশটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভর। কম দামে রুশ তেল কেনা ভারতের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। সেখানে চলাচল ব্যাহত হলে ভারত সহজে রুশ তেলের বিকল্প সংগ্রহ করতে পারবে না।
আটলান্টিক কাউন্সিলের অর্থনৈতিক রাষ্ট্রনীতি উদ্যোগের উপপরিচালক মাইয়া নিকোলাদজের মতে, এই পরিস্থিতিতে ভারতকে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মার্কিন শুল্কের ঝুঁকির মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
হরমুজ প্রণালির সমস্যার কারণে ভারত অস্থায়ীভাবে রুশ তেল কেনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ছাড় চেয়েছিল এবং তা পেয়েছে। ভবিষ্যতেও দেশটি একই ধরনের ছাড় বা বিশেষ অনুমতি চাইতে পারে।
ভারতের সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে—রুশ তেলের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমানো, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ছাড় আদায় করা, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রুশ তেলের লেনদেনকে সীমিত সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় হিসেবে তুলে ধরা।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে এর প্রভাব শুধু তেল বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তৈরি পোশাক, ওষুধ, প্রকৌশল পণ্য, রাসায়নিক দ্রব্য, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং অন্যান্য রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শুল্কের কারণে ভারতীয় পণ্য মার্কিন বাজারে ব্যয়বহুল হয়ে পড়লে আমদানিকারকেরা ভিয়েতনাম, মেক্সিকো, বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশ থেকে বিকল্প পণ্য কিনতে পারে। ফলে ভারতের উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে চাপ তৈরি হতে পারে।
তুরস্কের অবস্থান কেন আলাদা
তুরস্ক রাশিয়ার জ্বালানির বড় ক্রেতা হলেও দেশটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জোটের সদস্য। এ কারণে তার বিরুদ্ধে কঠোর শুল্ক আরোপ কূটনৈতিকভাবে জটিল হবে।
তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রেখেছে, আবার ইউক্রেনকে কিছু সামরিক সহায়তাও দিয়েছে। একই সঙ্গে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকার চেষ্টা করেছে।
নতুন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তুরস্ককে লক্ষ্য করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জোটের ভেতরে উত্তেজনা বাড়তে পারে। তাই ওয়াশিংটন হয়তো সরাসরি সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপের বদলে আলোচনার মাধ্যমে রুশ তেল কেনা কমানোর চাপ দিতে পারে।
মিত্র দেশও ছাড় পাবে না
প্রস্তাবটির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো, এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, ঘনিষ্ঠ মিত্র ও অংশীদাররাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মিত্র। ব্রাজিলকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অজোট সামরিক সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সিঙ্গাপুরও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সহযোগী। কিন্তু জ্বালানি ও পরিষ্কার বায়ু গবেষণাকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল ও সিঙ্গাপুর রুশ তেলজাত পণ্য কেনে।
আইনের ভাষা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলে রাজনৈতিক সম্পর্ক বিবেচনা না করে এসব দেশকেও শুল্কের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রজোটে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।
সমালোচকেরা কী বলছেন
সিনেটর ম্যাগি হাসানসহ কয়েকজন সমালোচক মনে করেন, প্রস্তাবটি প্রেসিডেন্টকে অতিরিক্ত শুল্ক ক্ষমতা দেবে। তাদের আশঙ্কা, এই ক্ষমতা রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা ও সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি ব্যয় চাপাতে পারে।
আমদানির ওপর শুল্ক বিদেশি সরকার সরাসরি পরিশোধ করে না। সাধারণত আমদানিকারক মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথমে শুল্ক দেয়। পরে তারা সেই ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করে ক্রেতাদের কাছ থেকে আদায় করে।
তাই কোনো পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে তার বড় অংশ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তাদের বহন করতে হতে পারে। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে, বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে বা আমদানি কমাতে বাধ্য হতে পারে।
ম্যাগি হাসান জানিয়েছেন, তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করেন। তবে তাঁর মতে, মার্কিন ব্যবসা ও ক্রেতাদের বহন করা শুল্ক ইউক্রেনকে যুদ্ধে জিততে সাহায্য করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সমিতিও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে। সংগঠনটির দাবি, আগের শুল্কগুলোর মতো নতুন ব্যবস্থার প্রকৃত ব্যয়ও শেষ পর্যন্ত মার্কিন ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।
আগের শুল্কের তুলনায় এটি কেন বেশি টেকসই হতে পারে
ট্রাম্পের আরোপ করা আগের অনেক শুল্ক সর্বোচ্চ আদালতে বাতিল হয়েছে। কারণ সেগুলোর কিছু পুরোনো আইনের বিস্তৃত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে আরোপ করা হয়েছিল।
নতুন রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাবের আইনি ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্ত হতে পারে। কারণ আইনসভা নতুন করে নির্দিষ্ট ভাষায় প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।
ডেভিড স্মিথের মতে, আগে ট্রাম্প পুরোনো আইনের ক্ষমতা এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন, যা আগে শুল্ক আরোপের জন্য ব্যবহৃত হয়নি। আদালত পরে সেই প্রয়োগকে কম বৈধ বলে মনে করেছে।
কিন্তু নতুন প্রস্তাবটি যদি আইন হিসেবে পাস হয়, তাহলে এটি প্রেসিডেন্টের শুল্ক ক্ষমতা সরাসরি ও আইনসম্মতভাবে বাড়াবে। ফলে আদালতে এটি বাতিল করা আগের তুলনায় কঠিন হতে পারে।
সত্যিই কি ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে
আইনে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্কের সুযোগ থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে না। প্রেসিডেন্টকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন দেশকে, কোন পণ্যে এবং কত হারে শুল্ক দেওয়া হবে।
আইনটি মূলত একটি শক্তিশালী চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে বলতে পারে—রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা কমাও, না হলে তোমাদের রপ্তানিতে উচ্চ শুল্ক দেওয়া হবে।
এই হুমকির মুখে কিছু দেশ রুশ তেল কেনা কমিয়ে দিতে পারে। অন্যরা ছাড়, সময়সীমা বা নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য অব্যাহতি চাইতে পারে।
ভারতের মতো দেশ জ্বালানি নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরে ছাড় চাইতে পারে। চীন পাল্টা শুল্ক আরোপ বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তুরস্ক সামরিক জোটের সম্পর্ক ব্যবহার করে সমঝোতার চেষ্টা করতে পারে।
ফলে আইনের সবচেয়ে বড় প্রভাব হয়তো সব সময় শুল্ক আরোপে দেখা যাবে না। শুল্কের ভয় দেখিয়ে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক ছাড় আদায় করাও এর একটি প্রধান উদ্দেশ্য হতে পারে।
রাশিয়ার ওপর প্রভাব কতটা পড়বে
প্রস্তাবটি কার্যকর হলে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির বাজার সংকুচিত হতে পারে। বড় ক্রেতারা তেল কেনা কমিয়ে দিলে মস্কোকে আরও বেশি ছাড়ে জ্বালানি বিক্রি করতে হবে।
এতে রাশিয়ার আয় কমে যেতে পারে। জ্বালানি খাতের আয় দেশটির সরকারি বাজেট এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয় বহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে রাশিয়া পুরোপুরি বাজার হারাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। দেশটি বিকল্প মুদ্রা, মধ্যস্থতাকারী, গোপন জাহাজ বহর এবং তৃতীয় দেশের মাধ্যমে বাণিজ্য অব্যাহত রাখার চেষ্টা করতে পারে।
শুল্ক এড়াতে পণ্যের উৎস গোপন করা, অন্য দেশে পরিশোধন করে রপ্তানি করা কিংবা মালিকানা বদলে জাহাজ পরিচালনার মতো পদ্ধতিও বাড়তে পারে। তাই আইনটির সাফল্য নির্ভর করবে নজরদারি, তথ্য বিনিময় এবং মিত্রদেশগুলোর সহযোগিতার ওপর।
বিশ্ববাণিজ্যে বড় বিভাজনের আশঙ্কা
আইনটি কার্যকর হলে বিশ্ববাণিজ্য আরও স্পষ্টভাবে দুই বা একাধিক বলয়ে ভাগ হয়ে যেতে পারে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ অংশীদার, অন্যদিকে রাশিয়া, চীন এবং পশ্চিমা চাপের বিরোধী দেশগুলো নিজেদের বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারে।
ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, পশ্চিমা বিমাব্যবস্থার বিকল্প তৈরি, নতুন বন্দর ও পরিবহনপথ ব্যবহার এবং আঞ্চলিক জ্বালানি চুক্তি বাড়তে পারে।
এতে স্বল্প মেয়াদে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর বাণিজ্যব্যবস্থার বাইরে নতুন কাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অন্যদিকে ভারত ও তুরস্কের মতো দেশগুলো কোনো একটি পক্ষকে পুরোপুরি বেছে নেওয়ার বদলে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করবে। তারা রাশিয়া থেকে জ্বালানি কিনতে চাইবে, আবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও নিরাপত্তা সম্পর্কও হারাতে চাইবে না।
সামনে কী হতে পারে
প্রতিনিধি পরিষদের গ্রীষ্মকালীন বিরতি শেষ হওয়ার পর প্রস্তাবটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে। সেখানে ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করা, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা, মিত্রদেশের জন্য ছাড় এবং শুল্কের সর্বোচ্চ হার নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদ যদি সিনেটের ভাষায় কোনো পরিবর্তন আনে, তাহলে দুই কক্ষকে একটি অভিন্ন সংস্করণে একমত হতে হবে। এরপর সেটি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হবে।
আইনটি পাস হলে ভারত ও চীন সঙ্গে সঙ্গে রুশ তেল কেনা বন্ধ করবে—এমন সম্ভাবনা কম। বরং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা, ছাড় আদায়, বিকল্প বাজার তৈরি এবং পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আইন নিষেধাজ্ঞাকে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশগুলোকেও সরাসরি মূল্য দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এতে মস্কোর জ্বালানি আয় কমতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত, চীন, তুরস্ক, ব্রাজিল ও সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রস্তাবিত আইনটি শুধু রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরেক দফা নিষেধাজ্ঞা নয়। এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, বিশ্ববাণিজ্য, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং প্রেসিডেন্টের শুল্ক ক্ষমতাকে একসঙ্গে যুক্ত করা একটি বড় রাজনৈতিক অস্ত্র।
আইনটি শেষ পর্যন্ত পাস হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে ৮৬–১২ ভোটের ফল দেখিয়ে দিয়েছে, রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই চাপ মস্কোকে কতটা দুর্বল করবে এবং তার বিনিময়ে ভারত, চীনসহ বাকি বিশ্বকে কত বড় অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে।

