মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আর শুধু ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধ যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ইরানের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক মিত্রবাহিনী। ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে সক্রিয় এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে ইরানের প্রতিপক্ষদের ওপর একযোগে চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রদত্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিনটি কঠিন বছরে দুর্বল হয়ে পড়ার পর ইরানের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আবারও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়তা বাড়িয়েছে। তাদের এই ফিরে আসা তেহরানের জন্য শুধু সামরিক সহায়তাই নয়, বরং কৌশলগত ও রাজনৈতিক সুবিধাও তৈরি করছে। নতুন নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে তারা ইরানের শত্রুদের মনোযোগ ও সামরিক সম্পদ বিভক্ত করছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, তেল স্থাপনা ও আঞ্চলিক বাণিজ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
বহু বছরের প্রতিরক্ষা কৌশলের ভিত্তি
ইরান কয়েক দশক ধরে এমন একটি প্রতিরক্ষা নীতি অনুসরণ করেছে, যেখানে নিজের সীমান্তের ভেতরে যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোতে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব গড়ে তোলা হয়েছে। এই কৌশলকে অনেক বিশ্লেষক ইরানের অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন।
লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী, ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী, সিরিয়ায় সক্রিয় ইরানঘনিষ্ঠ বাহিনী এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের কয়েকটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থার অংশ। একসঙ্গে এসব গোষ্ঠীকে সাধারণভাবে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বলা হয়ে থাকে।
এই জোটের মূল ভিত্তি ইসরায়েলবিরোধিতা, পশ্চিমা সামরিক প্রভাবের বিরোধিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কৌশলগত অবস্থান রক্ষা। তবে সব গোষ্ঠীর লক্ষ্য, সক্ষমতা এবং ইরানের ওপর নির্ভরতার মাত্রা এক নয়।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী সহসভাপতি ত্রিতা পারসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই জোট ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি বড় ধরনের হামলা ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। আঞ্চলিক মিত্ররা নিজ নিজ এলাকায় প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি ইরানের প্রতিপক্ষদের সামনে সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কা তৈরি করেছিল।
কিন্তু এসব গোষ্ঠী যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন ইরানের ওপর সরাসরি আক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পারসির মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে তেহরান সেই দুর্বলতার মূল্য দিয়েছে। ফলে ইরান তার পুরোনো প্রতিরক্ষা কৌশল ত্যাগ না করে বরং নতুন করে সেখানে বিনিয়োগ শুরু করে।
২০২৩ সালের পর বড় ধরনের ধাক্কা
২০২৩ সালের হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজা ও আশপাশের অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল ইরানঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব ও সামরিক কাঠামো দুর্বল করা।
এই ধারাবাহিক অভিযানে হামাস নেতা ইয়াহইয়া সিনওয়ার এবং হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহসহ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়াহইয়া সিনওয়ারকে ৭ অক্টোবরের হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অন্যদিকে হাসান নাসরাল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও ইসরায়েলবিরোধী আন্দোলনে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
ইরানঘনিষ্ঠ নেতৃত্বের ওপর এই আঘাত শুধু কয়েকজন নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয় ছিল না। এর লক্ষ্য ছিল এসব সংগঠনের যোগাযোগব্যবস্থা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো, সামরিক পরিকল্পনা এবং সদস্যদের মনোবল ভেঙে দেওয়া।
ইরাকের ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপরও হামলা বাড়ানো হয়। ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। সংঘাতের পরিধি ধীরে ধীরে গাজা থেকে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েল ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও লক্ষ্যবস্তু করে এবং সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে সরকার পরিবর্তনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। তবে সেই প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত সফল হয়নি।
২০২৫ সালের ৫ মে তেহরানের ইনকেলাব চত্বরে প্রয়াত কুদস ফোর্স commander কাসেম সোলাইমানি, হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া ও ইয়াহইয়া সিনওয়ার এবং হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর ছবি সংবলিত একটি বড় প্রচারফলক দেখা যায়। এমন প্রতীকী প্রচারণা থেকে বোঝা যায়, ইরান নিহত নেতাদের স্মৃতিকে আঞ্চলিক প্রতিরোধের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।
দুর্বলতা কাটিয়ে নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা
২০২৩ সালের পর কয়েক বছর ধরে ইরানের মিত্রবাহিনীগুলোকে অনেকেই প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে মনে করেছিলেন। বিশেষ করে হিজবুল্লাহ ও হামাসের নেতৃত্বের ওপর আঘাত, সিরিয়ায় পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং ইরাকে রাজনৈতিক চাপের কারণে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ ভেঙে পড়ছে—এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল।
তবে তিন বছর পর পরিস্থিতি আবার বদলাতে শুরু করেছে। ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা আগের কাঠামো পুরোপুরি ফিরিয়ে না এনে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। তারা সরাসরি বড় যুদ্ধের পরিবর্তে সীমিত হামলা, সমুদ্রপথে চাপ, তেল স্থাপনায় আঘাত এবং রাজনৈতিক দরকষাকষির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে।
ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় ইরানবিষয়ক বিভাগের সাবেক প্রধান ড্যানি সিত্রিনোভিচের মতে, প্রতিরোধের অক্ষ এখনো টিকে আছে। তবে এটি আগের মতো নেই; বরং পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে এর ধরনও বদলে যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিকেন্দ্রীকরণ। অতীতে প্রতিটি গোষ্ঠীর কার্যক্রমে ইরানের নির্দেশনার বিষয়টি বেশি আলোচিত হতো। বর্তমানে অনেক গোষ্ঠী নিজেদের স্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যদিও তাদের বৃহত্তর কৌশল প্রায়ই তেহরানের স্বার্থের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
তারা কি শুধু ইরানের প্রতিনিধি?
ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রায়ই সরাসরি তেহরানের প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বাস্তব সম্পর্কটি আরও জটিল বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
জেনেভা সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসি এবং মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট সুইজারল্যান্ডের গবেষক আলী আহমদির মতে, এসব সংগঠনের প্রত্যেকটির নিজস্ব পরিচয়, স্থানীয় সমর্থন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত হিসাব রয়েছে। একই সঙ্গে আদর্শিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণে তারা ইরানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
কোনো গোষ্ঠী সামরিক অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণের জন্য ইরানের ওপর বেশি নির্ভরশীল। আবার কোনো গোষ্ঠী নিজস্ব অর্থনৈতিক উৎস, স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
আহমদির মতে, বর্তমান সময়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সম্ভবত এই জোটের সবচেয়ে স্বাধীন অংশ। ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ইয়েমেনের নিজস্ব ক্ষমতার লড়াই, সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত এবং স্থানীয় রাজনৈতিক লক্ষ্য তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
নতুন সংঘাতের কেন্দ্র ইয়েমেন ও সৌদি আরব
সাম্প্রতিক সময়ে হুতি বিদ্রোহীরা ইরানকেন্দ্রিক যুদ্ধের আরেকটি ফ্রন্ট খুলেছে। তাদের লক্ষ্য এখন শুধু ইসরায়েল বা লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজ নয়; যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সৌদি আরবও নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে হুতিরা অভিযোগ করে, ইয়েমেনের হুতি নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানার বিমানবন্দরে সৌদি আরব হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যে অংশ নিয়ে ইরান থেকে ফেরার সময় হুতিদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বহনকারী বিমানকে অবতরণে বাধা দেওয়ার জন্য এই হামলা চালানো হয়েছিল।
তবে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, হামলাটি সৌদি বাহিনী নয়, তাদের নিজস্ব বাহিনী পরিচালনা করেছে।
এই বিমানযাত্রার রাজনৈতিক গুরুত্বও ছিল। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে প্রবেশ করার পর সানা থেকে তেহরানের সরাসরি বিমান যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। নতুন উদ্যোগটির মাধ্যমে হুতিরা বহু বছরের সেই বিধিনিষেধ ভেঙে আবার সরাসরি যোগাযোগ চালু করার চেষ্টা করছিল।
ফলে বিমানবন্দরের ঘটনাটি শুধু একটি সামরিক সংঘাত ছিল না। এর সঙ্গে ইয়েমেনের আকাশসীমা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং হুতিদের রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নও জড়িয়ে ছিল।
সৌদি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। উপগ্রহচিত্র ও অবস্থান শনাক্ত করা দৃশ্যবিশ্লেষণে ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি জাজান এলাকার একটি স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এর আগে হুতিরা লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। একই সময় তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজের বিরুদ্ধে অবরোধের ঘোষণা দেয়।
বাব আল-মান্দেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। এই পথ দিয়ে তেল, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অন্যান্য পণ্যবাহী বিপুলসংখ্যক জাহাজ চলাচল করে। এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে জাহাজগুলোকে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয়, বিমা খরচ ও পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ফলে হুতিদের হামলা সৌদি আরবের জন্য শুধু নিরাপত্তাজনিত হুমকি নয়। এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরির একটি কৌশলও হতে পারে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক নাদওয়া আল-দাওসারি ও আরমান মাহমুদিয়ানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংঘাতের সময় প্রতিরোধের অক্ষের সমন্বিত ব্যবহার ইরান ও তার মিত্রদের নতুন সুবিধা অর্জনের সুযোগ করে দিচ্ছে। তারা যুদ্ধের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বদলানো এবং আঞ্চলিক প্রভাব শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
এই পরিস্থিতিতে ইরান আবার হুতিদের আঞ্চলিক প্রভাব ব্যবহার করতে পারছে। অন্যদিকে হুতিরাও সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের আকাশসীমা ও যোগাযোগ নিষেধাজ্ঞা দুর্বল করার সুযোগ পাচ্ছে। অর্থাৎ উভয় পক্ষের স্বার্থ এক জায়গায় মিলেছে।
হিজবুল্লাহকে ঘিরে ইরানের কৌশল
ইরানের আঞ্চলিক নীতিতে লেবাননের হিজবুল্লাহ এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর একটি। দলটি সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দ্রুত পুনর্গঠিত হচ্ছে বলে কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করছেন।
ইসরায়েলের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনায় ইরান দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা হিজবুল্লাহর প্রতি তেহরানের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়।
ত্রিতা পারসির মতে, এসব গোষ্ঠী কখনো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি। বিশেষ করে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ধারণার তুলনায় অনেক দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
সপ্তাহান্তে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেমের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে সংগঠনটির প্রতি তেহরানের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। সেখানে হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অগ্রভাগে থাকা শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। একই সঙ্গে সংগঠনটিকে রক্ষা করা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ বলেও জানানো হয়।
এই বার্তাটি শুধু রাজনৈতিক সংহতি প্রকাশের জন্য নয়। এর মাধ্যমে ইরান দেখাতে চাইছে যে নেতৃত্বের পরিবর্তন কিংবা সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও হিজবুল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
ইরানের জন্য এই জোটের প্রকৃত মূল্য
ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের সবচেয়ে বড় মূল্য তাদের সম্মিলিত সামরিক শক্তিতে নয়, বরং একাধিক এলাকায় একই সময়ে চাপ তৈরির ক্ষমতায়।
ইসরায়েলকে যদি গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনের হুমকি একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে তার সামরিক পরিকল্পনা জটিল হয়ে ওঠে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরাকের ঘাঁটি, লোহিত সাগরের নৌপথ, সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা—সবকিছুতে সম্পদ ও মনোযোগ দিতে হয়।
ইরান এভাবেই নিজের ভূখণ্ড থেকে দূরে সংঘাতের পরিধি বিস্তৃত করে। এতে তেহরানের ওপর সরাসরি হামলার সম্ভাব্য মূল্য অনেক বেড়ে যায়। প্রতিপক্ষকে ভাবতে হয়, ইরানে আঘাত করলে মধ্যপ্রাচ্যের কতগুলো এলাকায় পাল্টা সংঘাত শুরু হতে পারে।
তবে এই ব্যবস্থার ঝুঁকিও রয়েছে। কোনো মিত্রগোষ্ঠী স্থানীয় স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা ইরানকে অনাকাঙ্ক্ষিত বড় যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে। আবার অতিরিক্ত হামলার কারণে আঞ্চলিক দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে আরও ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা জোট গড়ে তুলতে পারে।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা বা সমুদ্রপথে বড় ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। তখন ইরানের মিত্রদের কার্যক্রম তেহরানের কৌশলগত সম্পদ না হয়ে উল্টো কূটনৈতিক বোঝায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে।
পুরোনো জোট, কিন্তু নতুন যুদ্ধপদ্ধতি
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট, ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। বরং এটি নতুন রূপ নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনার পরিবর্তে স্থানীয় সিদ্ধান্ত, বড় যুদ্ধের পরিবর্তে সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা এবং শুধু সামরিক সংঘর্ষের পরিবর্তে অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক চাপ এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি এবং ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়। তবু তারা এমন এক বিস্তৃত চাপবলয় তৈরি করছে, যা ইরানকে সরাসরি যুদ্ধে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থান দেয়।
ইসরায়েল নেতৃত্ব ও অবকাঠামোয় বড় আঘাত করেও এই জোটকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারেনি। নিহত নেতাদের জায়গায় নতুন নেতৃত্ব এসেছে, ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা পুনর্গঠিত হয়েছে এবং গোষ্ঠীগুলো নিজেদের কার্যপদ্ধতি বদলেছে।
এ কারণেই ড্যানি সিত্রিনোভিচের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, এই অক্ষ বিলীন হচ্ছে না। বরং পরিবর্তিত যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের কাঠামো ও কৌশল বদলে নিচ্ছে।
সামনে কী হতে পারে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইরানের মিত্রগোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দেব, লোহিত সাগর, দক্ষিণ লেবানন এবং ইরাকের সামরিক ঘাঁটিগুলো ভবিষ্যৎ সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
ইরান সম্ভবত এমন একটি অবস্থান বজায় রাখতে চাইবে, যেখানে তার মিত্ররা প্রতিপক্ষের ওপর পর্যাপ্ত চাপ সৃষ্টি করবে, কিন্তু পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে না। অন্যদিকে হুতি, হিজবুল্লাহ ও ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে নিজেদের স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে।
এই পারস্পরিক নির্ভরতা ইরান এবং তার মিত্রদের জন্য আপাতত সুবিধাজনক। তবে সংঘাত যত বিস্তৃত হবে, ভুল হিসাবের ঝুঁকিও তত বাড়বে।
সব মিলিয়ে, ইরানের আঞ্চলিক জোটকে এখন আর শুধু তেহরানের নির্দেশে পরিচালিত কয়েকটি সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতির সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি স্থানীয় স্বার্থ, আদর্শিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক সুযোগ এবং যৌথ শত্রুতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি পরিবর্তনশীল জোট।
গত কয়েক বছরের বড় ধরনের সামরিক আঘাত এই নেটওয়ার্ককে দুর্বল করেছে, কিন্তু শেষ করে দিতে পারেনি। বরং নতুন নেতৃত্ব, নতুন কৌশল ও নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র ব্যবহার করে এটি আবার সক্রিয় হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধে তাই ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র, সেনাবাহিনী বা সামরিক প্রযুক্তি নয়। বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা এমন এক মিত্রব্যবস্থা, যা প্রয়োজনের সময় নতুন ফ্রন্ট খুলে যুদ্ধের হিসাব বদলে দিতে পারে।

