চলতি বছরের ২২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও সৌদি আরবের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে একটি চুক্তি সই হয়েছে। সৌদি আরবকে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়াই এই সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য। তবে চুক্তিটি সই হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল জ্বালানি খাতের উন্নয়নসংক্রান্ত একটি চুক্তি নয়; বরং এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক পারমাণবিক অ-প্রসারণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের ওপরও পড়তে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে সৌদি আরবকে ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিয়ে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হবে। ফলে চুক্তিটি এখনই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তবে এর প্রাথমিক সমঝোতাই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চুক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি উন্নয়নের উদ্যোগ মনে হলেও এর কয়েকটি ধারা পারমাণবিক নিরাপত্তা ও অ-প্রসারণ নীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—সৌদি আরব এমন কিছু সুবিধা পেতে পারে, যা অতীতে অন্য কোনো অ-পারমাণবিক রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে ভবিষ্যতে যদি দেশটি নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ পায়, তাহলে সেই প্রযুক্তির সামরিক ব্যবহার নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের সুযোগ ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা ত্বরান্বিত করতে পারে। একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক পারমাণবিক অ-প্রসারণ নীতির জন্য একটি নতুন নজির হয়ে উঠতে পারে বলেও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন।
চুক্তির পটভূমি
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা ৩০ বছর মেয়াদি হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরব দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বাড়াতে চায়। এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক কৌশল। বিদ্যুৎ উৎপাদনে অভ্যন্তরীণ তেলের ব্যবহার কমিয়ে সেই তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে আয় বাড়ানো সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।
মার্কিন দৈনিক দ্য হিল জানিয়েছে, এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের পারমাণবিক অবকাঠামো নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পের জন্য নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব সীমিত রাখার কৌশলগত সুযোগও পাবে ওয়াশিংটন।
তবে অর্থনৈতিক লাভের বাইরে এই উদ্যোগের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশলও জড়িত বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। বহু বছর ধরেই দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বিস্তৃত পারমাণবিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে।
দ্য হিল-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানো, যাতে তারা নিজেদের ভূখণ্ডেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বৈধ সুযোগ পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আগ্রহের পেছনে রয়েছে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। অতীতে সৌদি আরবের নীতিনির্ধারকেরা একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরান যদি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তাহলে সৌদি আরবও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে একই ধরনের সক্ষমতা অর্জনের বিষয়টি বিবেচনা করবে।
দ্য গার্ডিয়ান আরও জানিয়েছে, চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যদিও এখনই সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হয়নি, তবে এ বিষয়ে দুই বছরের একটি যৌথ যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ওই সমীক্ষায় যদি সিদ্ধান্ত হয় যে সৌদি আরবের নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ সুবিধা প্রয়োজন, তাহলে ভবিষ্যতে সে বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
অর্থাৎ, সৌদি আরব নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পাবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বর্তমান প্রশাসনের পরিবর্তে ভবিষ্যতের কোনো মার্কিন প্রশাসনের সময়ও নেওয়া হতে পারে।

কেন উদ্বেগ বাড়ছে
এই চুক্তিকে ঘিরে উদ্বেগের মূল কারণ পারমাণবিক প্রযুক্তির সামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনা নয়, বরং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সহযোগিতার দীর্ঘদিনের নীতিমালায় সম্ভাব্য পরিবর্তন। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, যদি সৌদি আরবের জন্য ব্যতিক্রমী কোনো শর্ত অনুমোদন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর পক্ষ থেকেও একই ধরনের সুবিধা চাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক সহযোগিতা নীতির বিষয়টি সামনে আনছেন। তাদের মতে, এই নীতিতে পরিবর্তন এলে বৈশ্বিক পারমাণবিক অ-প্রসারণ ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ নিয়ে বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর কিছু শর্ত অনুসরণ করা হয়ে আসছে। এই নীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা স্বর্ণমানের ধারণা।
যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সহযোগিতা আইনের ১২৩ ধারা অনুযায়ী, অন্য কোনো দেশের সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তি ভাগাভাগি করতে হলে বেশ কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়।
২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল, সেখানে আবুধাবি একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত মেনে নিয়েছিল। শর্ত অনুযায়ী, তারা নিজেদের ভূখণ্ডে কখনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করবে না এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতও করবে না।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, এই স্বেচ্ছায় নেওয়া বাধ্যবাধকতাকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারমাণবিক অ-প্রসারণ নীতির ক্ষেত্রে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বর্তমান চুক্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি রাখা হয়নি। এর পরিবর্তে ভবিষ্যতে সৌদি আরবের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে একটি নতুন ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সৌদি আরব যদি এমন সুবিধা পায়, তাহলে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য দেশও ভবিষ্যতে নিজেদের পারমাণবিক চুক্তির শর্ত পরিবর্তনের দাবি তুলতে পারে। একই সঙ্গে নতুন দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তুলনামূলক শিথিল শর্তে পারমাণবিক প্রযুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগতভাবে অস্থিতিশীল একটি অঞ্চল। সেখানে সৌদি আরব যদি ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রথমত, এর প্রভাব পড়তে পারে ইরানের ওপর। আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত রাখার চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু সৌদি আরব যদি যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা গড়ে তোলে, তাহলে তেহরানও তার অবস্থান আরও কঠোর করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তিগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা হিসাব নতুন করে মূল্যায়ন করতে পারে। ইসরায়েলও এই চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটির নিজস্ব পারমাণবিক সক্ষমতা রয়েছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে ধারণা করা হয়, যদিও ইসরায়েল এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্বীকৃতি দেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান নিরাপত্তা ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন আনতে পারে।

আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থার প্রশ্ন
কোনো দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আইএইএর একটি বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘অতিরিক্ত প্রোটোকল’। এই ব্যবস্থার আওতায় সংস্থাটি কোনো দেশের পারমাণবিক স্থাপনায় আরও বিস্তৃত ও আকস্মিক পরিদর্শনের সুযোগ পায়, যাতে গোপনে পারমাণবিক প্রযুক্তি সামরিক কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা কমানো যায়।
বিশ্বের ১৪৪টি দেশ এই অতিরিক্ত প্রোটোকলে স্বাক্ষর করেছে।
তবে বর্তমান সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তিতে এই অতিরিক্ত প্রোটোকল বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি রাখা হয়নি বলে উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় তদারকি ব্যবস্থা থাকলেও তা আইএইএর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মতো ব্যাপক ও গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থার পরিবর্তে কেবল দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে পারমাণবিক নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ
সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তির পেছনে শুধু জ্বালানি বা প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, রয়েছে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক হিসাবও। এই সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং চীন ও রাশিয়ার মতো বৈশ্বিক শক্তিগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই চুক্তির অন্যতম সুবিধা হলো অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখা।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি সফল হলে আগামী ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবকে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব বলয়ে চলে যাওয়া থেকে দূরে রাখার একটি কৌশল হিসেবেও এটিকে দেখছে ওয়াশিংটন।
তবে এই চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় রাজনৈতিক শর্ত—সৌদি আরবের ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ।
ট্রাম্পের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস শর্ত
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি সই হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন একটি শর্ত সামনে আনেন। তার দাবি, সৌদি আরবকে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি কার্যকর করতে হলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে এবং ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে হবে।
ট্রাম্পের এই শর্ত সৌদি আরবকে একটি জটিল কূটনৈতিক অবস্থানে ফেলেছে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে একটি নীতি অনুসরণ করে আসছে। তা হলো—ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি করতে হবে।
কিন্তু ইসরায়েলের বর্তমান সরকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা, লেবানন ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় সৌদি আরবের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য হিল-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিন ইস্যুতে অগ্রগতি ছাড়া শুধু যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা সৌদি রাজপরিবারের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সৌদি আরব একটি গুরুত্বপূর্ণ আরব ও ইসলামি দেশ হওয়ায় ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের অবস্থানের আঞ্চলিক গুরুত্বও রয়েছে। এ কারণে রিয়াদ ট্রাম্পের শর্ত এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এই অবস্থান থেকে সরে আসবে।
আরব আমিরাতের অভিজ্ঞতা ও সৌদির সতর্কতা
সৌদি আরবের বর্তমান অবস্থানের পেছনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভিজ্ঞতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে সই করা প্রথম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। ওই চুক্তির পর দেশটির সঙ্গে ইসরায়েলের বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়।
যেমন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসরায়েল সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আয়রন ডোম প্রযুক্তি সরবরাহ করেছিল।
তবে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে আমিরাতের সাধারণ মানুষের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আবুধাবির ইহুদি উপাসনালয় (সিনাগগ) নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং সেখানকার ধর্মীয় অনুষ্ঠানও সীমিত পরিসরে পালন করা হচ্ছে।
এই অভিজ্ঞতা আরব দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে বলে বিশ্লেষকদের মত। তাদের মতে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এখন আর শুধু কূটনৈতিক সহযোগিতার উদাহরণ নয়, বরং এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ জনমত ও আঞ্চলিক রাজনীতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগ
বিশ্বের বিভিন্ন পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তির কয়েকটি দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক পারমাণবিক অ-প্রসারণ কাঠামো বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই চুক্তি মার্কিন কংগ্রেসে অনুমোদিত হলে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আরও শিথিলতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তাদের বক্তব্য, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সীমিত রাখার জন্য চাপ দিয়ে আসছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের জন্য একই ধরনের সক্ষমতার সুযোগ তৈরি হলে তা আন্তর্জাতিক নীতির মধ্যে বৈপরীত্য তৈরি করতে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ বলেছে, গাজা যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়। ফিলিস্তিন ইস্যুতে জনমতের চাপের কারণে এই সিদ্ধান্ত সৌদি রাজপরিবারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার শর্ত যুক্ত করার পেছনে রাজনৈতিক হিসাব থাকতে পারে। তাদের মতে, ট্রাম্প হয়তো আলোচনায় নিজের দরকষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করতেই এই শর্ত সামনে এনেছেন।
তবে ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের অবস্থান এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে অচলাবস্থার কারণে সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা কঠিন বলেও মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়
সৌদি আরবের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনায় পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির সামরিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির আগে ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি গভীর সামরিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি করে সৌদি আরব।
পাকিস্তানের কাছে ১৭০টিরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং দেশটি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অ-প্রসারণ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী নয়।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সামরিক চুক্তি নিয়ে কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, এর মাধ্যমে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা ভবিষ্যতে সৌদি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে। তারা এটিকে একটি অনানুষ্ঠানিক বা দ্বিপক্ষীয় ‘পারমাণবিক ছাতা’ হিসেবে দেখছেন।
তবে এ বিষয়ে সৌদি আরব বা পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন
সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি চুক্তি এখন মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
একদিকে সৌদি আরবের লক্ষ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বাড়ানো, তেলের ওপর অভ্যন্তরীণ নির্ভরতা কমানো এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য রয়েছে নিজস্ব পারমাণবিক শিল্পের জন্য নতুন বাজার তৈরি করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখা।
তবে চুক্তির সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হলো—সৌদি আরব ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা পাবে কি না এবং সেই প্রক্রিয়া কতটা আন্তর্জাতিক নজরদারির আওতায় থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবকে যদি বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে অন্য দেশগুলোও একই ধরনের সুযোগ দাবি করতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অ-প্রসারণ ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিশেষ করে সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক, এই চুক্তির প্রভাবকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক সহযোগিতা তাই শুধু একটি জ্বালানি বা প্রযুক্তি চুক্তি নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান এবং বৈশ্বিক পারমাণবিক নীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (CFR), দ্য গার্ডিয়ান, দ্য হিল, নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।

