গত জুনে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশটি। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এই দুর্যোগের প্রকৃত ভয়াবহতা। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১২৫ জনে। একই সঙ্গে আহত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ৬১ হাজার মানুষ।
সোমবার, ৩ আগস্ট দেশটির জাতীয় পরিষদের সভাপতি জর্জ রদ্রিগেজ এক বার্তায় হালনাগাদ হতাহতের তথ্য প্রকাশ করেন। তার এই ঘোষণার পর আবারও সামনে এসেছে দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি ও তৎপরতা নিয়ে নানা প্রশ্ন। অনেকের অভিযোগ, ভূমিকম্পের পরপরই উদ্ধারকাজ আরও দ্রুত ও সমন্বিতভাবে পরিচালিত হলে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতে পারত।
গত ২৪ জুন ভেনেজুয়েলায় পরপর ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্য এবং রাজধানী কারাকাস। বহু বহুতল ভবন ধসে পড়ে, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। হাজার হাজার পরিবার মুহূর্তেই বাসস্থান হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনে পড়ে।
ভূমিকম্পের পরপরই নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে সাধারণ মানুষ নিজ উদ্যোগে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক বাসিন্দার দাবি, সরকারি সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর উদ্ধার অভিযান প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অনেক মানুষ সময়মতো উদ্ধার ও জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কারণে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
সরকার জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের মাত্র ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম এখনো অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে দীর্ঘ সময় লাগবে এবং এর জন্য বিপুল অর্থ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার ভৌত অবকাঠামোর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যদিও বিভিন্ন দেশ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে সেই অর্থ কবে হাতে আসবে এবং কীভাবে ব্যয় করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে পুনর্গঠন কার্যক্রমের গতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ভেনেজুয়েলার পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশটিতে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এবং বহাল থাকা কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক সহায়তা কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলছে।
মানবাধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক মহলের একটি বড় অংশের মত, ভেনেজুয়েলায় মানবিক সংকট মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবশিষ্ট অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তাদের মতে, এতে আন্তর্জাতিক সহায়তা দ্রুত পৌঁছাবে এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমও গতি পাবে।
সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ধ্বংসস্তূপ সরানো নয়; বরং লাখো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করা। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে দেশের নিজস্ব সক্ষমতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

