ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন সচিব হিসেবে মোহসেন রেজাইয়ের নিয়োগকে শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। দেশটি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে অনিশ্চিত আলোচনার মধ্যে রয়েছে, ঠিক তখনই সাবেক সামরিক কমান্ডার রেজাইকে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আনা হয়েছে।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সাবেক সর্বাধিনায়ক মোহসেন রেজাইকে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব করা হয়েছে। এই পরিষদ দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।
এই নিয়োগের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা চলছে, আর গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে তেহরান এই জলপথকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে।
তাই প্রশ্ন উঠছে—রেজাইয়ের নিয়োগ কি ইরানের আরও কঠোর নিরাপত্তা অবস্থানের ইঙ্গিত? নাকি এমন একজন প্রভাবশালী সামরিক ব্যক্তিকে সামনে আনা হয়েছে, যিনি প্রয়োজনে ভবিষ্যৎ কোনো সমঝোতাকে দেশের শক্তিশালী রক্ষণশীল ও নিরাপত্তা মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবেন?
এই দুটি ব্যাখ্যাই এখন পাশাপাশি আলোচিত হচ্ছে।
কে এই মোহসেন রেজাই
মোহসেন রেজাইয়ের বয়স ৭১ বছর।
তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্বের সময়ের মধ্যেই আশির দশকের দীর্ঘ ইরান-ইরাক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইরানে সেই যুদ্ধকে প্রায়ই ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে রেজাই ইরানের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ নির্ধারণী পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এই প্রতিষ্ঠান সংসদ ও অভিভাবক পরিষদের মধ্যে আইন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তা সমাধানে ভূমিকা রাখে।
ফলে রেজাই শুধু একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা নন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ইরানের সামরিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এ কারণেই তার নিয়োগকে অনেক পর্যবেক্ষক গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে রেজাইয়ের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ
রেজাই বরাবরই হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
জুলাইয়ে রেজাই বলেছিলেন, এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ‘কয়েক ডজন পারমাণবিক বোমার চেয়েও মূল্যবান’।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ অব্যাহত থাকলে ওয়াশিংটনকে ‘গুরুতর ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির’ মুখে পড়তে হবে।
ইরান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের জবাবে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ দিয়েছে।
ফলে রেজাইয়ের নিয়োগ শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সামরিক ভারসাম্য।
কীভাবে এল এই নিয়োগ
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের যোগাযোগ দপ্তর রোববার সন্ধ্যায় রেজাইয়ের নিয়োগের ঘোষণা দেয়।
একই দিন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি একটি নির্দেশনায় রেজাইকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে নিজের প্রতিনিধি হিসেবেও নিয়োগ দেন।
সেই নির্দেশনায় রেজাইয়ের অভিজ্ঞতা এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা যুগের অগ্রদূতদের একজন’ হিসেবে তার ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
এই ভাষা থেকেই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, তার সামরিক অতীতকে সামনে রেখেই এই নিয়োগের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তৈরি হচ্ছে।
রেজাই মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। জোলঘাদরকে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে।
এর আগে এই পদে ছিলেন আলি লারিজানি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিহত হন।
কেন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবের পদ এত গুরুত্বপূর্ণ
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রেসিডেন্টের দপ্তর, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সামরিক বাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কৌশলগত অবস্থান একসঙ্গে এসে মিলিত হয়।
তাই পরিষদের সচিব শুধু বৈঠক পরিচালনা করেন না। তার ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় রাষ্ট্রের সামগ্রিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে যখন—
দেশ যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে,
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে,
আর হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধ চলছে।
এমন পরিস্থিতিতে পরিষদের নেতৃত্বে কে রয়েছেন, সেটি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রেজাইয়ের বড় শক্তি—বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ
তেহরানভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য কৌশলগত গবেষণা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ গবেষক আবাস আসলানি মনে করেন, রেজাইয়ের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাকে এই দায়িত্বে আলাদা সুবিধা দিতে পারে।
তার মতে, ইরানের এখন এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও ক্ষমতাকেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় করতে পারবেন।
রাজনৈতিকভাবে রেজাই তার পূর্বসূরির তুলনায় নিরাপত্তা বিষয়ে খুব ভিন্ন অবস্থানে নাও থাকতে পারেন। কিন্তু দেশের ভেতরের বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য তৈরিতে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রশ্নে এই ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ রেজাই একদিকে সাবেক বিপ্লবী গার্ড প্রধান, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ নির্ধারণী পরিষদের সদস্য হিসেবে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন।
ফলে তিনি শুধু সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন।
রেজাই কঠোরপন্থী, তবে সব কঠোরপন্থীর সঙ্গে একই অবস্থানে নন
রেজাইয়ের নিয়োগ বোঝার জন্য ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ।
সে সময় তিনি মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে সমর্থন করেছিলেন।
এই অবস্থান তাকে রাজনৈতিকভাবে বর্তমান সংসদ স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় প্রধান আলোচক গালিবাফের নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল অংশের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
অন্যদিকে তিনি সাঈদ জালিলির নেতৃত্বাধীন আরও কঠোর অংশের সঙ্গে পুরোপুরি এক অবস্থানে ছিলেন না। জালিলি পেজেশকিয়ানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দ্বিতীয় হয়েছিলেন।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে রেজাই মধ্যপন্থী।
বরং তার রাজনৈতিক অবস্থান এমন একটি জায়গায়, যেখান থেকে তিনি একাধিক পক্ষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
একদিকে পেজেশকিয়ানের সরকার, যারা আলোচনার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ভাষা ব্যবহার করে।
অন্যদিকে গালিবাফের সঙ্গে যুক্ত রক্ষণশীল অংশ।
আর তৃতীয়ত সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান, যাদের সঙ্গে রেজাইয়ের সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরোনো।
এই তিন পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষমতাই তার বড় রাজনৈতিক সম্পদ হতে পারে।
কঠোর সামরিক মুখ কেন আলোচনার জন্যও সুবিধাজনক হতে পারে
রেজাইয়ের নিয়োগ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে দুটি প্রধান ব্যাখ্যা রয়েছে।
প্রথম ব্যাখ্যা হলো, ইরান এখন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এই ব্যাখ্যায় রেজাইয়ের নিয়োগ মানে তেহরান আরও কঠোর অবস্থানের দিকে যাচ্ছে।
কিন্তু দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি অনেক বেশি সূক্ষ্ম।
সাবেক বিপ্লবী গার্ড প্রধানের মতো শক্তিশালী সামরিক পরিচয়ের একজন ব্যক্তি যদি কোনো সমঝোতা সমর্থন করেন, তাহলে দেশের ভেতরে কঠোরপন্থীদের কাছে সেই সমঝোতা গ্রহণযোগ্য করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
এই দিকটি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ কোনো সমঝোতা শুধু বিদেশি পক্ষের সঙ্গে স্বাক্ষর করলেই শেষ হয় না। দেশের ভেতরের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান, সামরিক কাঠামো এবং কঠোরপন্থী রাজনৈতিক ঘাঁটির সমর্থনও প্রয়োজন।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে সিদ্ধান্ত মানানোই বড় চ্যালেঞ্জ
ইরানি সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাশাল্লাহ শামসোলভায়েজিনের ব্যাখ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।
তার মতে, ইরানে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়।
বরং সেই সিদ্ধান্তকে ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্র এবং কঠোরপন্থী সমর্থকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করাও বড় পরীক্ষা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সময় এর বিরোধিতায় স্লোগান হয়েছে। আলোচনার সমর্থকদের দুর্বল বলেও আক্রমণ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কোনো সমঝোতা যদি শুধু তুলনামূলক নমনীয় রাজনীতিকদের মাধ্যমে আসে, তাহলে কঠোরপন্থীরা সেটিকে সহজেই দুর্বলতা বা ছাড় হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
কিন্তু একই সিদ্ধান্তে যদি মোহসেন রেজাইয়ের মতো একজন সাবেক বিপ্লবী গার্ড প্রধান যুক্ত থাকেন, তাহলে তাকে ইরানের নিরাপত্তা স্বার্থ বিসর্জনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা অনেক কঠিন হবে।
এখানেই রেজাইয়ের সামরিক পরিচয় আলোচনার বিরোধী শক্তিকে সামাল দেওয়ার উপায় হয়ে উঠতে পারে।
বাইরে থেকে নিয়োগের দুটি বিপরীত অর্থ
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও রেজাইয়ের নিয়োগের দুটি বিপরীত ব্যাখ্যা রয়েছে।প্রথমটি হলো, এটি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের জবাবে ইরানের কঠোর বার্তা।
তেহরান হয়তো বোঝাতে চাইছে—নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ ও সামরিক চাপ বাড়ালে ইরানও পাল্টা আরও কঠোর নিরাপত্তা অবস্থান নেবে।
অর্থাৎ ওয়াশিংটন যদি পূর্ববর্তী বোঝাপড়ার বাইরে নতুন দাবি তোলে, তাহলে তেহরান আলোচনার টেবিলে আরও কঠোর অবস্থানের প্রতিনিধিদের সামনে আনতে পারে।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা একেবারে উল্টো।বড় কোনো সমঝোতা সব সময় নমনীয় রাজনীতিকদের মাধ্যমেই আসে না।
অনেক সময় রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রের ভেতর থেকে আসা কঠোর পরিচয়ের একজন ব্যক্তিই বড় সমঝোতা বাস্তবায়নে বেশি সক্ষম হন।
কারণ তিনি ছাড় দেওয়ার অভিযোগ থেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকেন।এই হিসেবে রেজাই ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাকে এগিয়ে নিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
তাহলে আসল প্রশ্ন রেজাই কঠোর না নমনীয়—সেটি নয়
রেজাইকে শুধু কঠোরপন্থী বা নমনীয়—এই দুই পরিচয়ের একটিতে ফেললে তার নিয়োগের গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না।
বরং বড় প্রশ্ন হলো—
তিনি কি এমন সিদ্ধান্তকে বাস্তব নীতিতে রূপ দিতে পারবেন, যেটি দেশের বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র মেনে নেবে?তার সামরিক ইতিহাস, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে সেই সুযোগ দিতে পারে।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হোক কিংবা কোনো সমঝোতা—দুই ক্ষেত্রেই এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন হতে পারে, যিনি সিদ্ধান্তের পক্ষে অভ্যন্তরীণ সমর্থন তৈরি করতে পারবেন।
নিরাপত্তা মতবাদে পরিবর্তনের ইঙ্গিত?
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক মোহসেন ফারখানি রেজাইয়ের নিয়োগকে আরও কঠোরভাবে দেখছেন।
তার মতে, এটি শুধু আলোচনার জন্য অভ্যন্তরীণ সমর্থন তৈরির চেষ্টা নয়।
বরং ইরানের নিরাপত্তা মতবাদের পরিবর্তনের প্রতিফলনও হতে পারে।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জুনের সমঝোতা স্মারক বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং কূটনীতির মাধ্যমে যুদ্ধ ও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পর রেজাইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তেহরান অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন ওই সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করেছে।
ফারখানির মতে, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নেতৃত্ব এবং আট বছরের যুদ্ধের সময় বাহিনী সংগঠনের অভিজ্ঞতা রেজাইকে এমন একটি নিরাপত্তা ধারণার সঙ্গে মানানসই করে, যেখানে শুধু প্রতিরক্ষা নয়, পাল্টা শাস্তিমূলক প্রতিরোধের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের প্রস্তুতি?
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইরান এমন এক নিরাপত্তা কৌশলের দিকে যেতে পারে যেখানে শত্রুপক্ষকে শুধু তাৎক্ষণিকভাবে ঠেকানো নয়, দীর্ঘ সময় ধরে ক্রমাগত ক্ষতি করার সক্ষমতাও গুরুত্ব পাবে।
অর্থাৎ প্রচলিত যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি অসম যুদ্ধের কৌশলও বজায় থাকবে।
এর লক্ষ্য হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চচাপের সংঘাতে প্রতিপক্ষকে ধারাবাহিক ক্ষতির মুখে রাখা।
ফারখানি মনে করেন, এই প্রবণতা সত্য হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনায় এবং হরমুজ প্রণালির সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তেহরান আরও কম নমনীয় অবস্থান নিতে পারে।
তবে রেজাই একাই সব সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারবেন না
রেজাইয়ের নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাকে ইরানের সব সিদ্ধান্তের একক নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে কাজ করে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বর্তমান নেতৃত্ব এবং সর্বোচ্চ নেতার নিজস্ব সিদ্ধান্ত—সবগুলোই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই রেজাই এককভাবে ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতি বদলে দেবেন, এমন ধারণা অতিরঞ্জিত হবে।
তবে তার উপস্থিতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সময় সামরিক ও নিরাপত্তা বিবেচনার ওজন বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে যখন রাজনৈতিক সমঝোতা ও যুদ্ধের ঝুঁকি পাশাপাশি বিবেচনা করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ: যুদ্ধের প্রস্তুতি, নাকি আলোচনার জন্য শক্ত অবস্থান
রেজাইয়ের নিয়োগের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—একই ঘটনা থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত দুটি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
একদিকে এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে তেহরান আরও কঠোর নিরাপত্তা নীতির দিকে যাচ্ছে।
সামরিক অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নিরাপত্তা পরিষদের শীর্ষে আনা, হরমুজে কঠোর অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অবিশ্বাস—সবকিছু মিলিয়ে সংঘাতের প্রস্তুতির ছবিও তৈরি হয়।
অন্যদিকে ঠিক একই সামরিক পরিচয় ভবিষ্যৎ কোনো সমঝোতার জন্য রাজনৈতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করতে পারে।
একজন নমনীয় রাজনীতিক যদি ছাড় দেন, কঠোরপন্থীরা তাকে দুর্বল বলতে পারে।
কিন্তু একজন সাবেক বিপ্লবী গার্ড প্রধান যদি একই সমঝোতাকে জাতীয় স্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তোলা অনেক কঠিন।
এই দ্বৈত সম্ভাবনাই রেজাইয়ের নিয়োগকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করেছে।
হরমুজ প্রণালি থাকবে কেন্দ্রীয় ইস্যু
আগামী দিনে রেজাইয়ের ভূমিকা বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হতে পারে হরমুজ প্রণালি।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়।
ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা উপসাগরীয় দেশগুলোর বিষয় নয়। এর প্রভাব বিশ্ববাজারেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
রেজাই অতীতে যেভাবে এই জলপথের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, তাতে ধারণা করা যায় তিনি হরমুজ প্রশ্নে খুব সহজে ছাড় দেওয়ার পক্ষে থাকবেন না।
তবে একই সঙ্গে আলোচনায় এই জলপথকে দর-কষাকষির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হতে পারে।
অর্থাৎ হরমুজ শুধু সামরিক সংঘাতের জায়গা নয়, ভবিষ্যৎ সমঝোতার মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রও হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত নিয়োগটি কী বার্তা দেয়
মোহসেন রেজাইয়ের নিয়োগ থেকে এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন যে ইরান সংঘাতের পথে যাচ্ছে, নাকি আলোচনার নতুন প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বরং সম্ভবত তেহরান এমন একজন ব্যক্তিকে সামনে এনেছে, যিনি দুই পরিস্থিতিতেই কার্যকর হতে পারেন।
যদি সংঘাত বাড়ে, তার সামরিক অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হবে।
যদি আলোচনা এগোয়, তার কঠোর নিরাপত্তা পরিচয় সম্ভাব্য সমঝোতাকে দেশের ভেতরে গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে।
তাই রেজাইয়ের নিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়তো তার মতাদর্শ নয়।
বরং তার গ্রহণযোগ্যতা।
তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি সামরিক বাহিনী, রক্ষণশীল রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং আলোচনামুখী সরকারের মধ্যে যোগাযোগের একটি সেতু হয়ে উঠতে পারেন।
একই সঙ্গে তার উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, ইরান এখন নিরাপত্তা প্রশ্নে সামরিক হিসাবকে আগের তুলনায় আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের সামনে সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে দুটি বিপরীত লক্ষ্য একসঙ্গে সামলানো।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের সামনে দুর্বলতার কোনো বার্তা দিতে চায় না ইরান।
অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, অবরোধ এবং অর্থনৈতিক চাপও দেশটির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এই কারণে এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন হতে পারে, যিনি প্রয়োজনে কঠোর অবস্থান নেবেন, কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার সিদ্ধান্তও দেশের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবেন।
রেজাই সেই ভূমিকায় কতটা সফল হন, সেটিই আগামী সময়ের বড় প্রশ্ন।
তার নিয়োগ যদি মূলত সামরিক কঠোরতার প্রতীক হয়, তাহলে হরমুজ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তেহরানের অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে।
আর যদি এটি ভবিষ্যৎ সমঝোতার জন্য অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির অংশ হয়, তাহলে রেজাইয়ের সামরিক পরিচয়ই হতে পারে এমন একটি রাজনৈতিক ঢাল, যার আড়ালে তেহরান কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

