দীর্ঘদিন ধরেই উত্তর কোরিয়াকে চীনের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ও কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখা হয়। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধকালীন সহযোগিতার ইতিহাস, রাজনৈতিক আদর্শের মিল এবং কয়েক দশকের অর্থনৈতিক নির্ভরতা। কিন্তু পুরোনো সেই সম্পর্ক এখন আর আগের মতো সরল নয়। বরং উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান পরমাণু সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান তৈরির চেষ্টা বেইজিংয়ের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
সেখানে বোঝা যায়, বেইজিংয়ের উদ্বেগ এখন শুধু উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র নিয়ে নয়। বড় প্রশ্ন হচ্ছে—পিয়ংইয়ংকে চীন কতটা প্রভাবিত করতে পারছে এবং উত্তর কোরিয়ার কোনো সিদ্ধান্ত গোটা উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় এমন সংকট তৈরি করবে কি না, যা শেষ পর্যন্ত চীনের নিজস্ব নিরাপত্তাকেও বিপদের মুখে ফেলতে পারে।
উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় চীনের সবচেয়ে কঠিন নিরাপত্তা সংকট
চীন তার চারপাশের অঞ্চলকে যতটা সম্ভব স্থিতিশীল রাখতে চায়। কারণ সীমান্তবর্তী কোনো অঞ্চলে যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট, সামরিক উত্তেজনা বা বড় শক্তিগুলোর সংঘাত তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব চীনের ওপর পড়ে।
এই দিক থেকে উত্তর-পূর্ব এশিয়া বেইজিংয়ের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মধ্যে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা যত বাড়ছে, এই তিন দেশ নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার যুক্তি পাচ্ছে।
চীনের উদ্বেগ এখানেই।
পিয়ংইয়ং যদি বারবার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায় বা সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। এর ফলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিও বাড়তে পারে।
বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে এ ধরনের সামরিক প্রস্তুতি শুধু উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ভবিষ্যতে একই সামরিক অবকাঠামো ও সহযোগিতা চীনের বিরুদ্ধেও কৌশলগত চাপ তৈরিতে ব্যবহার করা হতে পারে।
ফলে উত্তর কোরিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চীনের কাছে শুধু পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক কার্যক্রম নয়; এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া কী করবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মিত্র হলেও উত্তর কোরিয়াকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না চীন
চীন উত্তর কোরিয়ার সরকার পতন চায় না। কারণ উত্তর কোরিয়ায় বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে চীনের সীমান্তে শরণার্থী সংকট সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে কোরীয় উপদ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
কিন্তু অন্যদিকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী এবং পরমাণু অস্ত্রে শক্তিশালী উত্তর কোরিয়াও চীনের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই বেইজিংয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
চীন এমন একটি উত্তর কোরিয়া চায়, যেটি টিকে থাকবে, অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর থাকবে এবং চীনের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করবে না। কিন্তু পিয়ংইয়ং এখন অনেক ক্ষেত্রেই নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
দশকের পর দশক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে সরাতে পারেনি। বরং দেশটির নেতৃত্বের কাছে পরমাণু অস্ত্র এখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান উপায় হয়ে উঠেছে।
এ কারণে আগের তুলনায় পিয়ংইয়ং অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
সম্পর্কের ইতিহাসে বন্ধুত্বের পাশাপাশি বিরোধও ছিল
চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক প্রায় আট দশকের পুরোনো। কোরীয় যুদ্ধের সময় দুই দেশ খুব কাছাকাছি আসে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বন্ধুত্ব, বিপ্লবী ইতিহাস এবং শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর এই সম্পর্ক দাঁড়িয়ে ছিল।
কিন্তু সম্পর্কটি কখনোই পুরোপুরি বিরোধহীন ছিল না।
২০১১ সালের শেষ দিকে কিম জং উন উত্তর কোরিয়ার নেতা হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন দেখা দেয়। বিশেষ করে পিয়ংইয়ংয়ের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে বেইজিংয়ের অসন্তোষ বাড়তে থাকে।
চীনের বিরক্তি আরও বেড়ে যায় ২০১৭ সালে।
সে বছর উত্তর কোরিয়া একটি পরমাণু পরীক্ষা এবং একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়। এতে দেশটির পরমাণু সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে—এমন ধারণা আরও জোরালো হয়।
চীনের জন্য ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবেও বিব্রতকর ছিল। কারণ উত্তর কোরিয়ার পরমাণু পরীক্ষা এমন সময় হয়েছিল, যখন চীন ব্রিকস নেতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন আয়োজন করছিল।
একই বছর উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও নজরদারি বাড়ানোর লক্ষ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় চীন।
এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকলেও বেইজিং সব সময় পিয়ংইয়ংয়ের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করতে প্রস্তুত নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতার সম্ভাবনাও চীনকে চিন্তায় ফেলেছিল
চীন শুধু উত্তর কোরিয়ার আক্রমণাত্মক আচরণ নিয়েই চিন্তিত নয়। পিয়ংইয়ং যদি হঠাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, সেটিও বেইজিংয়ের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
২০১৮ সালের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং কিম জং উনের মধ্যে সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে আলোচনা শুরু হলে চীন দ্রুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে।
বেইজিংয়ের আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া যদি সরাসরি কোনো বড় সমঝোতায় পৌঁছায়, তাহলে কোরীয় উপদ্বীপের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে চীনকে পাশ কাটানো হতে পারে।
ট্রাম্প ও কিমের বৈঠক শেষ পর্যন্ত জুন ২০১৮-তে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হয়। তার আগে কিম জং উন চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান। তিনি মার্চ, মে এবং জুন ২০১৮-তে চীন সফর করেন।
এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়েছিল—চীন চায় না, কোরীয় উপদ্বীপের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনুপস্থিতিতে কোনো বড় সিদ্ধান্ত হোক।অর্থাৎ উত্তর কোরিয়ার ওপর প্রভাব ধরে রাখাও বেইজিংয়ের জন্য একটি বড় কৌশলগত লক্ষ্য।
মহামারি আবার বদলে দেয় সম্পর্কের গতিপথ
পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ২০১৯ সালের গ্রীষ্মে সীমান্ত বাণিজ্য বাড়ে এবং সম্পর্কেও উন্নতি দেখা যায়।কিন্তু ২০২০ সালের শুরুতে করোনা মহামারি পরিস্থিতি আবার বদলে দেয়।
উত্তর কোরিয়া তার সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। চীনের সঙ্গে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিমান যোগাযোগও স্থগিত করা হয়।
ফলে দুই দেশের নিয়মিত বাণিজ্য ও যোগাযোগের প্রধান পথগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ে।একই সময়ে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার দিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে ঝুঁকতে শুরু করে।
চীনের জন্য এটি নতুন সতর্কবার্তা ছিল। কারণ পিয়ংইয়ং যদি বিকল্প অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদার তৈরি করতে পারে, তাহলে বেইজিংয়ের ওপর তার নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে যাবে।
অর্থনীতিতে এখনো চীনের বিকল্প নেই
রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই পরিবর্তিত হোক, উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব এখনো অত্যন্ত বড়।প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৭০ শতাংশের বেশি চীনের সঙ্গে হয়।
দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ খাদ্য আসে চীন থেকে।প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোগ্যপণ্যের উৎসও চীন।এ ছাড়া চীন প্রতি বছর উত্তর কোরিয়াকে প্রায় ৫২০,০০০ টন পেট্রোলিয়াম সরবরাহ করে।
পাশাপাশি বছরে প্রায় ৫০০,০০০ থেকে ৮০০,০০০ টন শস্য ও সার উত্তর কোরিয়ায় যায়। এসব সরবরাহ জাতিসংঘের অনুমোদিত ছাড়ের সীমার মধ্যেই রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির জন্য চীন এখনো অপরিহার্য।
কিন্তু পার্থক্য হলো—আগে পিয়ংইয়ংয়ের প্রায় সব প্রধান প্রয়োজনের জন্য চীনই ছিল একমাত্র বড় ভরসা। এখন সেই অবস্থান বদলাতে শুরু করেছে।
রাশিয়াই বদলে দিচ্ছে পুরোনো সমীকরণ
গত কয়েক বছরে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সম্পর্ক দ্রুত গভীর হয়েছে।জুন ২০২৪-এ দুই দেশ একটি সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে।এরপর উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কাছ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, সামরিক প্রযুক্তি, জ্বালানি, শ্রম রপ্তানির সুযোগ এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার ক্ষেত্রে সহায়তা পেয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে গোলাবারুদ দিয়েছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে লড়াইয়ের জন্য সৈন্য পাঠিয়েছে বলেও সেখানে বলা হয়েছে।বিষয়টি চীনের জন্য একই সঙ্গে সুবিধা ও সমস্যা—দুই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করছে।
সুবিধা হলো, উত্তর কোরিয়াকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সহায়তা দেওয়ার পুরো চাপ এখন আর শুধু বেইজিংকে বহন করতে হচ্ছে না।কিন্তু সমস্যাটি আরও গভীর।
রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার হয়ে ওঠায় পিয়ংইয়ং এখন চীনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
চীনের সমর্থন কমে গেলে উত্তর কোরিয়া এখন রাশিয়ার দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে পারে। ফলে আগের মতো শুধু অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করা চীনের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
তিন শক্তিকে তিনভাবে কাজে লাগাচ্ছে পিয়ংইয়ং
বর্তমান উত্তর কোরিয়ার কৌশলকে তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো একটি ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়।চীন থেকে দেশটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পাচ্ছে।রাশিয়া থেকে পাচ্ছে নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার বাড়তি সুযোগ।
আর যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে উত্তর কোরিয়া নিজের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি বজায় রাখার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে।এই কৌশল নতুন নয়।
স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও উত্তর কোরিয়া চীন ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে দুই পক্ষ থেকেই সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও অনেকটা একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পার্থক্য হলো, এবার পিয়ংইয়ংয়ের হাতে নিজস্ব পরমাণু অস্ত্রও রয়েছে। ফলে তার দর-কষাকষির ক্ষমতা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি।
রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া ঘনিষ্ঠতার সবচেয়ে বড় বিপদ কোথায়
চীনের দৃষ্টিতে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সম্পর্কের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক সম্ভবত দুই দেশের সরাসরি সম্পর্ক নয়।বড় সমস্যা হলো এর প্রতিক্রিয়া।
পিয়ংইয়ং ও মস্কোর সামরিক সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠ হবে, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তত বেশি নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতা শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।
তারা আরও বেশি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করতে পারে, যৌথ সামরিক মহড়া বাড়াতে পারে এবং অস্ত্রব্যবস্থার মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় তৈরি করতে পারে।একসময় এই সহযোগিতা স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক কাঠামোয় রূপ নিতে পারে।
তখন সেটির লক্ষ্য শুধু উত্তর কোরিয়া থাকবে না; চীনও ওই সামরিক ব্যবস্থার কৌশলগত হিসাবের অংশ হয়ে উঠতে পারে।বিশেষ করে তাইওয়ান প্রণালির মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এর প্রভাব পড়তে পারে বলে বেইজিং আশঙ্কা করছে।এ কারণেই উত্তর কোরিয়ার কোনো সামরিক উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত চীনের জন্যও কৌশলগত ক্ষতির কারণ হতে পারে।
পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের চেয়ে এখন সংকট ঠেকানো বেশি জরুরি
একসময় উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র ত্যাগে রাজি করানোই ছিল চীনের ঘোষিত প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি।সে লক্ষ্য পুরোপুরি বাদ যায়নি।কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বেইজিংকে আরও বাস্তবমুখী অবস্থান নিতে বাধ্য করছে। চীন এখন বুঝতে পারছে, অল্প সময়ের মধ্যে উত্তর কোরিয়াকে সম্পূর্ণ পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করা সম্ভব নয়।
আর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করতে গিয়ে যদি পিয়ংইয়ং আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে বা কোনো সংঘাত শুরু হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে।
ফলে বেইজিংয়ের অগ্রাধিকার ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সংঘাত ঠেকানো, উত্তর কোরিয়ার আচরণ কিছুটা অনুমানযোগ্য করা এবং কোনো বড় সামরিক ঘটনার আগে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা।অর্থাৎ চীনের সামনে প্রশ্নটি এখন আর শুধু—
উত্তর কোরিয়া কবে পরমাণু অস্ত্র ছাড়বে?
বরং প্রশ্ন হচ্ছে—উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র থাকা অবস্থায় কীভাবে বড় যুদ্ধ এড়ানো যাবে?
মূল বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, তাৎক্ষণিক পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ বা ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেই লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা বর্তমানে বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে না। বেইজিংয়ের কাছে সংকট প্রতিরোধ ও স্থিতিশীলতা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের বদলে নিয়মভিত্তিক সম্পর্ক
চীন আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করেছে।
শুধু ইতিহাস, রাজনৈতিক বন্ধুত্ব বা দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে উত্তর কোরিয়াকে সামলানো সম্ভব নয়।
কারণ পিয়ংইয়ং এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
তাই বেইজিং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে চাইছে।
এর মধ্যে থাকতে পারে জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা, নিয়মিত কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা আলোচনা, সীমান্তে কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত তথ্য বিনিময় এবং ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিষয়ে আগাম জানানো।
প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লেখাটি প্রকাশের আগের চার মাসে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক পরামর্শক সংস্থার প্রধান পিয়ংইয়ংয়ে কিম জং উনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এসব যোগাযোগ থেকে বোঝা যায়, দুই দেশের সম্পর্কে নতুন ধরনের নিয়মিত যোগাযোগ কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।
অর্থনীতিই এখনো চীনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার
উত্তর কোরিয়ার ওপর বেইজিংয়ের সবচেয়ে কার্যকর প্রভাব এখনো অর্থনৈতিক।
খাদ্য, জ্বালানি, সীমান্ত বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়া ব্যাপকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল।
চীন চাইলে এই নির্ভরতাকে আরও কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারে।
ধরা যাক, পিয়ংইয়ং আরও বেশি বাণিজ্য সুবিধা, জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক সহায়তা চায়।
বেইজিং তখন বলতে পারে—এই সুবিধা পেতে হলে উত্তর কোরিয়াকে এমন সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে হবে, যার কারণে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ওই অঞ্চলে নতুন অস্ত্র বা সেনা মোতায়েন করতে পারে।
এভাবে অর্থনৈতিক সহায়তার সঙ্গে সামরিক সংযমের শর্ত জুড়ে দেওয়া সম্ভব।
মানবিক সহায়তা, সীমান্ত বাণিজ্য, জ্বালানি এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতাকে পিয়ংইয়ংয়ের আচরণের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথাও বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, চীন শুধু অর্থ দিয়ে উত্তর কোরিয়াকে টিকিয়ে রাখতে চায় না; সেই অর্থনৈতিক প্রভাবের বিনিময়ে নির্দিষ্ট আচরণও প্রত্যাশা করতে পারে।
জুনের বৈঠক কি নতুন সম্পর্কের সূচনা
পিয়ংইয়ংয়ে জুনে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে এই নতুন নীতির শুরুর ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীন সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে এমন একটি নতুন বোঝাপড়া গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে সহযোগিতা একতরফা হবে না।
উত্তর কোরিয়া যদি আরও বেশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থন চায়, তাহলে তাকে সীমান্ত স্থিতিশীলতা, সংকটকালে যোগাযোগ এবং সামরিক সংযমের মতো বিষয়ে চীনের প্রত্যাশাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে চীন একটি স্থিতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন করতে প্রস্তুত।
বেইজিং এমন উত্তর কোরিয়া চায় না, যেটি ভেঙে পড়ে বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাবে।
আবার এমন উত্তর কোরিয়াও চায় না, যার সামরিক সিদ্ধান্ত চীনকে বড় শক্তিগুলোর সংঘাতের মধ্যে টেনে আনবে।
চীনের আসল ভয় কোথায়
উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে চীনের উদ্বেগকে শুধু পরমাণু অস্ত্রের ভয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না।বেইজিংয়ের সামনে অন্তত তিনটি বড় আশঙ্কা রয়েছে।
প্রথমত, উত্তর কোরিয়া এমন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে, যা বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দেবে।
দ্বিতীয়ত, উত্তর কোরিয়ার কর্মকাণ্ডকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের সামরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে পারে। সেই সামরিক কাঠামো ভবিষ্যতে চীনের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তৃতীয়ত, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক এতটাই গভীর হতে পারে যে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর চীনের দীর্ঘদিনের প্রভাব কমে যেতে পারে।এই তিনটি আশঙ্কা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
উত্তর কোরিয়া যত বেশি স্বাধীন হবে, চীন তত কম তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।আর পিয়ংইয়ং যত বেশি সামরিক উত্তেজনা তৈরি করবে, চীনের প্রতিদ্বন্দ্বীরা তত বেশি নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ পাবে।
বন্ধুত্বের জায়গায় আসছে বাস্তব স্বার্থের হিসাব
চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু পুরোনো বিপ্লবী বন্ধুত্বের স্মৃতি দিয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
একসময় দুই দেশের সম্পর্কের বড় ভিত্তি ছিল রাজনৈতিক আদর্শ, যুদ্ধকালীন সহযোগিতা এবং নেতৃত্বের ব্যক্তিগত যোগাযোগ।এখন সেই জায়গায় ধীরে ধীরে আসছে বাস্তব স্বার্থের হিসাব।
চীন উত্তর কোরিয়াকে প্রয়োজন মনে করে, কারণ কোরীয় উপদ্বীপে একটি স্থিতিশীল প্রতিবেশী বেইজিংয়ের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়াও চীনকে প্রয়োজন মনে করে, কারণ দেশটির অর্থনৈতিক অস্তিত্বের বড় অংশ এখনো চীনের সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু এই পারস্পরিক প্রয়োজন মানেই আগের মতো নিঃশর্ত বন্ধুত্ব নয়।বরং ভবিষ্যতের সম্পর্ক সম্ভবত হবে আরও হিসাবি, শর্তযুক্ত এবং নিয়মভিত্তিক।উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে চীনের বর্তমান অবস্থান এক ধরনের কঠিন ভারসাম্যের নীতি।একদিকে বেইজিং পিয়ংইয়ংকে দুর্বল বা অস্থিতিশীল হতে দিতে চায় না।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু সক্ষমতা, রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ঘনিষ্ঠতা এবং ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাস চীনের নিজের নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
ফলে চীনের লক্ষ্য সম্ভবত উত্তর কোরিয়াকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বর্তমান বাস্তবতায় সেটি হয়তো সম্ভবও নয়।
বরং বেইজিং চাইছে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে এমন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, যাতে বড় কোনো সিদ্ধান্তের আগে অন্তত কিছুটা পূর্বাভাস পাওয়া যায়, সংকটের সময় সরাসরি যোগাযোগ করা যায় এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে ব্যবহার করে উত্তর কোরিয়ার আচরণে কিছুটা সংযম আনা যায়।
এখানেই চীনের উত্তর কোরিয়া নীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে বেইজিংয়ের সামনে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে উঠছে সংঘাত ঠেকানো, সীমান্ত স্থিতিশীল রাখা এবং পিয়ংইয়ংয়ের ওপর নিজের প্রভাব হারিয়ে না ফেলা।
অর্থাৎ সম্পর্কের ভাষা এখন আর শুধু ‘বন্ধুত্ব’ নয়।এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি, দর-কষাকষি এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য।আর এই বাস্তবতাই আগামী দিনে চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তা নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

