মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক উত্তেজনা, ইরানকে ঘিরে উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্যে এবার নতুন করে সামনে এসেছে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার আশঙ্কা। এই উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে ঘোষিত একটি দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি। চুক্তিটি সৌদি আরবের জ্বালানি খাতের উন্নয়ন ও বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি এমন একটি পথও খুলে দিতে পারে, যার মাধ্যমে রিয়াদ নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা অর্জন করবে।
২২ জুলাই ঘোষিত ৩০ বছরের এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সৌদি আরবের পারমাণবিক অবকাঠামো নির্মাণে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে চুক্তিটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্রের এত দিনের কঠোর নীতিমালা দুর্বল হয়ে পড়বে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও একই সুবিধা দাবি করতে পারে।
ঘোষণার পরই তৈরি হয়েছে অস্পষ্টতা
চুক্তি ঘোষণার এক দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিলেই কেবল এই সমঝোতা কার্যকর হবে। তিনি আরও দাবি করেন, সৌদি আরবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কোনো সুযোগ থাকবে না।
সমস্যা হলো, এই দুটি শর্তের কোনোটিই মূল ঘোষণায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি চুক্তির সঙ্গে কিছু গোপন চিঠি বা অতিরিক্ত সমঝোতা থাকার খবরও সামনে এসেছে। সেসব নথির বিষয়বস্তু প্রকাশ না হওয়ায় চুক্তিটি আসলে সৌদি আরবকে কতটুকু পারমাণবিক স্বাধীনতা দেবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে প্রকাশ্যে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য এবং চুক্তির সম্ভাব্য বাস্তব শর্তের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।
এই অস্পষ্টতাই পুরো বিষয়টিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি ছোট নীতিগত ছাড়ও দীর্ঘ মেয়াদে বড় নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে যখন সংশ্লিষ্ট দেশটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি নয়, পারমাণবিক জ্বালানি তৈরির মূল ধাপটির ওপরও নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ চাইছে।
সৌদি আরবের পারমাণবিক যাত্রা থেমে নেই
এখন মূল প্রশ্ন আর এটি নয় যে সৌদি আরব পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেবে কি না। বরং প্রশ্ন হলো, সেই কর্মসূচিকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে এবং কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে যে এটি মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা করবে না।
সৌদি আরব ইতোমধ্যে আর্জেন্টিনার নকশায় তৈরি একটি স্বল্পক্ষমতার গবেষণা চুল্লি নির্মাণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি দেশটি দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার কারণে এসব প্রস্তাবের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হলেও সৌদি কর্মকর্তারা যত দ্রুত সম্ভব পারমাণবিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে আগ্রহী।
এর অর্থ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি না হলেও রিয়াদের সামনে বিকল্প অংশীদার রয়েছে। চীন বা রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে কাজ করলে সৌদি আরব হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম রাজনৈতিক শর্তে প্রযুক্তি পেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা মান এবং স্বচ্ছতা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাই সৌদি কর্মসূচি বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। বরং ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হচ্ছে, কর্মসূচিটিকে এমন একটি কাঠামোর মধ্যে রাখা, যেখানে তার রাজনৈতিক প্রভাব ও পর্যবেক্ষণ বজায় থাকবে।
ইরানকে ঘিরে সৌদির নিরাপত্তা ভাবনা
সৌদি আরবের পারমাণবিক আগ্রহকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এর পেছনে রয়েছে ইরানকে ঘিরে রিয়াদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগ।
২০১৮ সালে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্যে সতর্ক করেছিলেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে সৌদি আরবও একই পথে যাবে। এরপর সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। চুক্তিতে পারমাণবিক অস্ত্রের কথা সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও এটি দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্ককে ঘিরে কৌশলগত অস্পষ্টতা আরও বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে এই সম্পর্কের মাধ্যমে রিয়াদ একটি বার্তা দিতে চায়—যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর আস্থা কমে গেলে সৌদি আরবের সামনে অন্য পথও রয়েছে। অর্থাৎ পারমাণবিক কর্মসূচি সৌদি আরবের কাছে শুধু জ্বালানি প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার একটি বিকল্প ব্যবস্থা এবং ইরানের বিপরীতে কৌশলগত ভারসাম্য তৈরির উপায়।
ধীরে ধীরে নরম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
একসময় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল খুবই কঠোর। ওয়াশিংটন চাইত, সৌদি আরব স্থায়ীভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ত্যাগ করুক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চাইলে রিয়াদকে বিদেশ থেকে তৈরি জ্বালানি নিতে হবে এবং নিজ দেশে স্পর্শকাতর জ্বালানি কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।
তবে পরবর্তী সময়ে এই নীতিতে পরিবর্তনের আভাস দেখা যায়। জো বাইডেনের প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বৃহত্তর সমঝোতার অংশ হিসেবে সৌদি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানা ও পরিচালনায় একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরির বিষয় বিবেচনা করেছিল। কিন্তু ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধের কারণে সেই আলোচনা ব্যাহত হয় এবং কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন আগের সেই অবস্থানের চেয়েও বেশি ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জুলাইয়ের চুক্তিতে সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার অতিরিক্ত পরিদর্শন বিধান গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়নি। এই বিধান গ্রহণ করলে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকেরা ঘোষিত স্থাপনার বাইরেও সন্দেহজনক কার্যক্রম যাচাই করার বিস্তৃত ক্ষমতা পান।
সৌদি আরবের পারমাণবিক কার্যক্রমে আগে থেকেই স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। তাই নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরি হলে কোনো সংকটের সময় সেটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিদ্যুতের চেয়েও বড় প্রশ্ন সার্বভৌমত্ব
নভেম্বর ২০২৫-এ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওয়াশিংটন সফরের পর যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছিলেন, আলোচনাটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে নয়। কিন্তু জুলাই ২০২৬-এর কাঠামো ভবিষ্যতে সৌদি আরবের নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
এই পরস্পরবিরোধী বার্তা দেখায়, চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই এখনো পরিষ্কার নয়। সৌদি আরব কি শুধু বিদেশি জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, নাকি নিজস্বভাবে সেই জ্বালানি তৈরি করার প্রযুক্তিও পাবে—এই প্রশ্নের উত্তরই আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
রিয়াদের কাছে পারমাণবিক শক্তি ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ কিংবা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়মাত্র নয়। এটি জাতীয় মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত স্বাধীনতারও প্রতীক।
সৌদি আরব চায় না তার পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থা কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকুক। দেশটির দাবি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ জ্বালানি চক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো জাতীয় সক্ষমতা হিসেবে সৌদি নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। এর মাধ্যমে রিয়াদ ভবিষ্যতে নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ ধরে রাখতে চায়।
ওয়াশিংটনের সামনে দুই দিকের সংকট
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন কঠিন এক সমীকরণ। সৌদি আরবকে নিজস্ব সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দিলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও একই অধিকার চাইতে পারে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা আগের অঙ্গীকার আর মানতে বাধ্য নয়—এমন অবস্থান নিতে পারে।
মিশর ও তুরস্কও নিজেদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন তুলে স্বাধীন পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এভাবে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির নামে একাধিক দেশ জ্বালানি তৈরির পূর্ণ প্রযুক্তি অর্জন করলে ভবিষ্যতে অস্ত্র নির্মাণের সময় ও বাধা দুটিই কমে যাবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি পারমাণবিক খাতে চীনের প্রবেশ ঠেকাতে চায়। সৌদি আরব যদি চীনা প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত খাতে ওয়াশিংটনের প্রভাব কমে যাবে।
তাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য শুধু পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার ঠেকানো নয়। একই সঙ্গে সৌদি আরবকে নিজের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা এবং চীনের প্রভাব সীমিত করাও তার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এই দ্বৈত স্বার্থই ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলেছে।
আঞ্চলিক জ্বালানি ভান্ডার কি সমাধান হতে পারে
এই সংকটের একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে সৌদি আরবের মাটিতে আঞ্চলিক পারমাণবিক জ্বালানি ভান্ডার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সামনে এসেছে। এর নেতৃত্ব দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, তবে মালিকানা ও পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার হাতে।
এই ভান্ডার থেকে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির সদস্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বেসামরিক চুল্লির জন্য স্বল্পমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাবে। এমনকি ইরানও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে এই ব্যবস্থার সুবিধা নিতে পারবে। কাজাখস্তানে আন্তর্জাতিক সংস্থার নিয়ন্ত্রণে এমন একটি জ্বালানি ভান্ডার ইতোমধ্যে কার্যকর রয়েছে।
সৌদি আরবের জন্য এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে আন্তর্জাতিক মর্যাদা। জ্বালানি ভান্ডারটি নিজ ভূখণ্ডে স্থাপিত হলে রিয়াদ মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে। তবে জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে থাকায় সৌদি আরব এককভাবে সামরিক কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবে না।
একই সঙ্গে মিশর, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরির প্রয়োজনীয়তাও কম অনুভব করবে। কারণ তারা নির্ভরযোগ্যভাবে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাবে। এতে সৌদি কর্মসূচির বিরোধিতাও কমতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক জাতীয় সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি গড়ে ওঠার ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
নজরদারি বাড়বে, গোপন কার্যক্রম কঠিন হবে
আন্তর্জাতিক মালিকানা ও তত্ত্বাবধানে জ্বালানি ভান্ডার প্রতিষ্ঠিত হলে সৌদি আরবের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার নজরদারি বাড়বে। স্থাপনাটির নির্মাণ ও পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলে ওয়াশিংটন সৌদি পারমাণবিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য পাবে।
এতে কোনো গোপন স্থাপনা, উপকরণ সরিয়ে নেওয়া কিংবা ঘোষিত কার্যক্রমের আড়ালে সামরিক সক্ষমতা তৈরির প্রচেষ্টা চালানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সৌদি কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য সম্পর্কে অন্য দেশগুলোর আস্থা বাড়াতে পারে।
এই ব্যবস্থা ইরানের পারমাণবিক হুমকি দূর করবে না। ইরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে সৌদি আরবের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা তৈরির আগ্রহও পুরোপুরি শেষ হবে না। তবে নিশ্চয়তাপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ থাকলে বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অজুহাতে জাতীয় সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরির যুক্তি অনেকটাই দুর্বল হয়ে যাবে।
দীর্ঘ মেয়াদে একই ব্যবস্থা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও নতুন কূটনৈতিক পথ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে চুল্লির জ্বালানি নিশ্চিত করার বিনিময়ে ইরানকে নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সীমিত করার প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে।
প্রস্তাবটির ঝুঁকিও রয়েছে
আঞ্চলিক জ্বালানি ভান্ডার কোনো নিখুঁত সমাধান নয়। সহজে জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে এমন কিছু দেশও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি শুরু করতে আগ্রহী হতে পারে, যারা আগে এই পথে যাওয়ার কথা ভাবেনি।
তবে সৌদি আরবকে সম্পূর্ণ স্বাধীন জ্বালানি চক্র ও জাতীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা দেওয়ার তুলনায় এই ঝুঁকি অনেক কম। কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় জ্বালানির পরিমাণ, ব্যবহার এবং পরিবহন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যে বেসামরিক পর্যায়ে এক ধরনের নিম্নমাত্রার পারমাণবিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তাই বাস্তব প্রশ্নটি সমৃদ্ধকরণ হবে কি হবে না—এমন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সমৃদ্ধকরণ কি একেকটি দেশের জাতীয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নাকি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে আঞ্চলিক ব্যবস্থার অংশ হবে।
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কও বড় বাধা
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত শর্ত অনুযায়ী সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। কিন্তু এই শর্তই শেষ পর্যন্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা বড় ধরনের কৌশলগত লাভ ছাড়া সৌদি আরবকে স্পর্শকাতর পারমাণবিক সক্ষমতা দিতে আগ্রহী নন। অন্যদিকে রিয়াদ বলে আসছে, ফিলিস্তিন সংকটে অর্থবহ অগ্রগতি ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কঠিন।
ফলে পারমাণবিক সহযোগিতা, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ককে একই চুক্তির মধ্যে যুক্ত করলে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যেতে পারে। কংগ্রেসও সমৃদ্ধকরণের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক সংস্থার অতিরিক্ত পরিদর্শন এবং আরও কঠোর নিরাপত্তা শর্ত দাবি করতে পারে। সৌদি আরব এসব শর্তকে তার সার্বভৌম অধিকারের সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখে প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কোন স্বার্থটি বড়
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে কোনো একক দেশের জাতীয় অধিকার হিসেবে না দেখে একটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত সেবা হিসেবে গড়ে তোলা। এতে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা পাবে, কিন্তু তার বিনিময়ে স্বচ্ছতা, সংযম এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সৌদি আরব যদি নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার পরিবর্তে আঞ্চলিক জ্বালানি ভান্ডার গ্রহণ করে, তবে সেই ব্যবস্থা অবিলম্বে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্তের সঙ্গে যুক্ত না করলেও চলে। পরিবর্তে ধাপে ধাপে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
বৃহত্তর কৌশলগত বাস্তবতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি কূটনৈতিক চুক্তি ভবিষ্যতে পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু একবার কয়েকটি দেশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পূর্ণ প্রযুক্তি অর্জন করলে সেই সক্ষমতা আর সহজে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।
সৌদি আরবের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা এখন আর উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। এটিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করলে রিয়াদ চীন, রাশিয়া বা অন্য অংশীদারের দিকে ঝুঁকতে পারে। আবার পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ছাড়া অনুমতি দিলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পারমাণবিক প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
এই দুই বিপদের মাঝখানে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো সৌদি আরবকে বেসামরিক পারমাণবিক শক্তির সুযোগ দেওয়া, কিন্তু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং জ্বালানি সরবরাহকে কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা। অন্যথায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে শুরু হওয়া একটি কর্মসূচি ভবিষ্যতে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

