ইসরায়েলের একটি আদালত জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের কেৎসিওত কারাগারের চারপাশে কুমিরভর্তি পরিখা তৈরির পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন। প্রাণিকল্যাণ সংক্রান্ত একটি মামলার পর রোববার আদালত এই আদেশ দেন। সূত্র: আরব নিউজ
তবে আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর ফিলিস্তিনি বন্দিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণ নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাণিকল্যাণ সংস্থা ‘লেট দ্য এনিম্যালস লিভ’ আদালতে আবেদন করে কুমির রাখার পরিকল্পনা বন্ধের দাবি জানায়। ওই আবেদনের পর জেরুজালেম জেলা আদালত কেৎসিওত কারাগারের নিরাপত্তা এলাকায় কুমির স্থানান্তরের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
কেৎসিওত ইসরায়েলের একটি মরুভূমি এলাকার কারাগার, যেখানে বহু ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন।
আবেদনকারী সংস্থার দাবি, কুমির একটি সংরক্ষিত প্রাণী। তাই নিরাপত্তার কাজে এগুলো ব্যবহার করার আইনগত ক্ষমতা সরকারের নেই।
যদিও আদালত প্রাণিকল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই আদেশ দিয়েছেন, তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, ফিলিস্তিনি বন্দিদের নিরাপত্তার চেয়ে কুমিরের সুরক্ষাই কি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে?
বৈরুতভিত্তিক নীতিবিশেষজ্ঞ হুসেইন শোকর বলেন, ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী কিছু নেতা মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ, বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের এমন একটি হুমকি হিসেবে দেখেন, যাদের যেকোনো উপায়ে দমন করা উচিত। তার মতে, কুমির ব্যবহারের এই পরিকল্পনা মধ্যযুগীয় নিষ্ঠুরতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
আরব নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শোকর বলেন, উদ্বেগের বিষয় শুধু বেন-গভিরের পরিকল্পনা নয়, আদালতের সিদ্ধান্তও। তার দাবি, আদালত পরিকল্পনাটি স্থগিত করেছে কুমিরকে সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করে, মানবিক কারণে নয়।
মানবাধিকার সংস্থা কেইজ ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক মোয়াজ্জাম বেগও এই পরিকল্পনার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে কুমিরকে নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহার করার চিন্তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেন-গভিরের এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আটক কেন্দ্র ‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’ থেকে অনুপ্রাণিত।
অমানবিক পরিবেশ ও পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগে করা মামলার পর কেন্দ্রটি গত জুনে বন্ধ হয়ে যায়।
মোয়াজ্জাম বেগ সতর্ক করে বলেন, এমন মডেল অনুসরণ করলে নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তার ভাষায়, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে ফিলিস্তিনিদের প্রতি চলমান দুর্ব্যবহারের এটি আরেকটি উদ্বেগজনক উদাহরণ।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কেৎসিওত কারাগার নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সাবেক বন্দি ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, সেখানে নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, অনাহার এবং চিকিৎসাসেবায় অবহেলার ঘটনা ঘটেছে।
বি’ৎসেলেম, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা ইসরায়েলের কারাগার ব্যবস্থায় নির্যাতন ও বন্দিদের প্রতি দুর্ব্যবহারের অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে।
সমালোচকদের মতে, কারাগারের চারপাশে কুমির ব্যবহারের প্রস্তাব ফিলিস্তিনিদের প্রতি অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আরেকটি উদাহরণ। তারা উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে তৎকালীন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট ফিলিস্তিনিদের ‘মানুষরূপী পশু’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ২৪ হাজার ৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে। এ ছাড়া গাজা থেকেও হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে।
হুসেইন শোকরের ভাষায়, “ফিলিস্তিনিদের এমন মানুষ হিসেবে দেখা হয়, যাদের কোনো অধিকার নেই এবং যাদের সঙ্গে যেকোনো আচরণ করা যায়। এটি উপনিবেশবাদী মানসিকতার প্রকাশ।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু ফিলিস্তিনি নয়, সুযোগ পেলে এই অঞ্চলের অন্য জনগণের প্রতিও একই ধরনের আচরণ করা হতে পারে। এই ধরনের ব্যবস্থার চোখে আমরা পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বিবেচিত হই না।”

