বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি আবারও স্বাভাবিকভাবে চালু করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চলমান আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে এবং ৬ আগস্ট ২০২৬ অথবা তার পরের দিনই এ বিষয়ে একটি সমঝোতা হতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং খুব শিগগিরই ইতিবাচক ঘোষণা আসতে পারে। তার এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৭৮ দশমিক ৪৩ ডলারে নেমে আসে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও ওমানের মধ্যস্থতায় এমন একটি কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবারও স্বাভাবিক করা হবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পারস্য উপসাগরে প্রবেশের জন্য একটি ইরান-নিয়ন্ত্রিত পথ এবং বের হওয়ার জন্য একটি ওমান-নিয়ন্ত্রিত পথ ব্যবহারের কথা রয়েছে। একই সঙ্গে নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সেবামূল্য নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
তবে এই সেবামূল্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেই জানিয়েছিলেন, কোনো পক্ষ যদি অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। ফলে অর্থ আদায়ের বিষয়টি এখনো আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।
আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য চূড়ান্ত সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বন্দরসংক্রান্ত অবরোধ শিথিল করার বিষয়ের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। অর্থাৎ শুধু নৌপথ চালু করাই নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবেও বিষয়টি বিবেচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আলোচনায় অগ্রগতির বিষয়টি স্বীকার করলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন, এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। একইভাবে দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, অল্প সময়ের মধ্যেই একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নৌবাণিজ্যকে আবার স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনবে।
অন্যদিকে ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে—এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, সব ধরনের আলোচনা ওমানের মধ্যস্থতায় পরিচালিত হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার মূল লক্ষ্য নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্বার্থ রক্ষা করা।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই পথ দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালিতে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বা চলাচলে বাধা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
এ কারণেই সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে বাজার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তবে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চূড়ান্ত হওয়া বাকি রয়েছে। ফলে সমঝোতা বাস্তবে কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববাজারের নজর থাকবে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার দিকেই।

