কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপত্তার প্রধান ভরসা হিসেবে দেখে এসেছে জর্ডান। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই এখন দেশটিকে নতুন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে জর্ডানের ভূমিকা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে ছোট্ট আরব দেশটি।
গত মাসের বেশির ভাগ সময়ই জর্ডানের দিকে প্রায় প্রতিদিন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে ইরান। জর্ডানের সামরিক বাহিনী বলেছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তারা প্রতিহত করেছে। যদিও এখন পর্যন্ত দেশটির বেসামরিক স্থাপনায় সরাসরি হামলার খবর নেই, একাধিক এলাকায় বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ দুটোই বাড়ছে।
অনেক জর্ডানীয় মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের দেশের সামরিক সম্পর্কই জর্ডানকে সংঘাতের সামনের সারিতে নিয়ে এসেছে। ৬৩ বছর বয়সী তাহানি খালাফের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রই জর্ডানকে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করেছে।
নিরাপত্তার ভরসাই এখন ঝুঁকির কারণ
তেলসম্পদহীন জর্ডান চারদিকে শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র দিয়ে ঘেরা। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দেশটি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা হিসেবে প্রায় ২০০ কোটি ডলার পর্যন্ত পায় জর্ডান।
এখন যুক্তরাষ্ট্রেরও জর্ডানকে আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে। ইরান থেকে তুলনামূলক দূরত্ব, কৌশলগত অবস্থান এবং পেন্টাগনকে নিজ ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ায় দেশটি ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কুয়েতসহ পারস্য উপসাগরীয় কয়েকটি মিত্র দেশ নিজেদের ভূমিকা কমিয়ে আনায় জর্ডানের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
কিন্তু এর বিনিময়ে দেশটিকে বড় মূল্যও দিতে হচ্ছে। জর্ডানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ায় দেশটি সংঘাতের আরও কাছে চলে এসেছে। যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাবোধও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
কঠিন অবস্থানে বাদশাহ আবদুল্লাহ
বিশ্লেষকদের মতে, জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব বাড়িয়ে দেশটির সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে চায় তেহরান। এই কৌশল বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহকে কঠিন এক অবস্থানে ফেলেছে।
একদিকে জর্ডান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের একটি এবং ওয়াশিংটনের সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে দেশটির সাধারণ মানুষের বড় অংশ, বিশেষ করে বিপুল ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থনের বিরোধিতা করে।
ইসরায়েলভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর জর্ডানের নির্ভরতা এতটাই বেশি যে, দেশটির ভূখণ্ড ব্যবহার করে সামরিক অভিযান চালানো হলে আম্মানের পক্ষে সহজে ‘না’ বলা সম্ভব নয়। তবে এমন অভিযান জর্ডানের ভঙ্গুর স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
মার্কিন সেনা সরানোর দাবি
ইরানি হামলা এবং বারবার সতর্কসংকেত বাজার ঘটনায় জর্ডানে বিরল ধরনের প্রকাশ্য প্রতিবাদ দেখা দিয়েছে। দেশটির সাবেক সংসদ সদস্য, উপজাতীয় নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ তিন শতাধিক ব্যক্তি একটি চিঠিতে জর্ডান থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, জর্ডান এই যুদ্ধের পক্ষ নয়। তাই এমন কোনো নীতির পরিণতি দেশটির জনগণকে বহন করতে দেওয়া উচিত নয়, যা জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে না। তাঁরা ২০২১ সালের সেই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বাতিলের দাবিও তুলেছেন, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জর্ডানের ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের ব্যাপক সুযোগ পেয়েছে।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য আমজাদ মাজালি বলেছেন, এই অবস্থান জর্ডানের বিপুলসংখ্যক মানুষের মনোভাবের প্রতিফলন। দেশের প্রতি তাঁদের সমর্থন রয়েছে, কিন্তু সরকারের সব সিদ্ধান্তের প্রতি নয়।
গোপন রাখা যাচ্ছে না সামরিক সহযোগিতা
জর্ডান বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার বিষয়টি প্রকাশ্যে কম গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্ক আর আড়াল করা সহজ হচ্ছে না।
দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় মরুভূমিতে অবস্থিত মুওয়াফ্ফাক সালতি বিমানঘাঁটিসহ আরও কয়েকটি স্থাপনায় মার্কিন যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে।
তবে জর্ডানের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি বলেছেন, জর্ডানে কোনো ‘মার্কিন ঘাঁটি’ নেই; দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে সেখানে শুধু কিছু মার্কিন সেনা অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে জর্ডান সরকার ইরানের হামলাকে দেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছে এবং আকাশসীমা ও জনগণকে রক্ষার অঙ্গীকার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ, তবে ইরানের প্রতিও আস্থা নেই
১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছে জর্ডান। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত শুরু হলে দেশটি ধীরে ধীরে তাতে জড়িয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে যেমন জর্ডান ইরানের হামলার শিকার হচ্ছে, তেমনি ইসরায়েলের দিকে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার কারণেও দেশের ভেতরে সরকারের সমালোচনা বেড়েছে।
তবে ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি জর্ডানীয়দের ক্ষোভকে ইরানের প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জর্ডানের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ সুন্নি মুসলিম এবং শিয়াপন্থী ইরানের নেতৃত্বের প্রতিও তাদের গভীর অবিশ্বাস রয়েছে।
একজন স্থানীয় নাপিত হামাদা কারাদা পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, সাধারণ মানুষ চায় সংঘাতের সব পক্ষ জর্ডান থেকে দূরে থাকুক। তাঁর কথায়, অত্যাচারীরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করুক—কিন্তু জর্ডানকে যেন সেই লড়াইয়ের মূল্য দিতে না হয়।

