কোনো বড় সামরিক জোটের ঘোষণা নেই, নেই প্রকাশ্য অস্ত্রচুক্তি কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে চীনা সেনার উপস্থিতি। তারপরও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতে নীরবে গুরুত্বপূর্ণ এক পক্ষ হয়ে উঠেছে চীন। ইরানে চীনের তৈরি শত শত কাঁধে বহনযোগ্য বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছানোর খবর সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এসব অস্ত্র আকারে ছোট, বহন করা সহজ এবং পরিচালনায় তুলনামূলক কম প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলোর প্রভাব ছোট নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের বিমান হামলায় ইরানের কেন্দ্রীয় বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার পর এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তেহরানের জন্য নতুন এক সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছে।
ইরান হয়তো এখনো আকাশে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। তবে চীনা ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে প্রতিপক্ষের বিমান, হেলিকপ্টার, নজরদারি যান, ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে আর আগের মতো নিশ্চিন্তে স্বল্প উচ্চতায় চলাচল করতে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দ্রুত আকাশ-আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে পরিকল্পনা ওয়াশিংটন করেছিল, তা এখন দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত এক অভিযানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
নীরবে যেভাবে ইরানে পৌঁছেছে অস্ত্র
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি কোনো বহুল প্রচারিত সরকারি সামরিক চুক্তির মাধ্যমে ইরানে পাঠানো হয়নি। পুরো ব্যবস্থাটি সম্পন্ন করেছে হংকংয়ে নিবন্ধিত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ঝংছিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট। প্রতিষ্ঠানটি বেইজিংভিত্তিক ঝংছিং বাওশাং গ্রুপের পক্ষে কাজ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অস্ত্র পরিবহনের পথও ছিল বহুস্তরবিশিষ্ট। পশ্চিম চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের উরুমকি থেকে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করে একটি সমন্বিত আকাশপথে চালান পাঠানো হয়। একই সঙ্গে মধ্য এশিয়া হয়ে রেলপথেও অতিরিক্ত সরঞ্জাম ইরানে পৌঁছেছে।
ইরানে পৌঁছানোর পর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের বিভিন্ন ইউনিটের হাতে দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ, এগুলো শুধু রাজধানী বা বড় সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তায় ব্যবহৃত হচ্ছে না; বরং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক, জ্বালানি ও সামরিক স্থাপনার চারপাশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এই ছড়িয়ে দেওয়া ব্যবস্থাটিই ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বড় রাডার বা স্থায়ী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি শত্রুর উপগ্রহ, নজরদারি বিমান ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজেই শনাক্ত করা যায়। কিন্তু কাঁধে বহনযোগ্য ছোট ক্ষেপণাস্ত্র কোন ভবনের আড়ালে, পাহাড়ি গিরিপথে কিংবা সামরিক বহরের সঙ্গে অবস্থান করছে, তা আগে থেকে জানা অনেক কঠিন।
প্রকাশ্যে অস্বীকার, আড়ালে কৌশল
চীন অবশ্য অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্ষেপণাস্ত্র হস্তান্তরের খবরকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ সমাধানের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বেইজিং।
তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রকাশ্য বক্তব্য এবং বাস্তব কৌশল সব সময় একই পথে চলে না। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহ চীনের জন্য তুলনামূলক কম ঝুঁকির একটি পথ।
বেইজিং এমন কোনো অস্ত্র দিতে চায় না, যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠতে পারে। একই সঙ্গে তারা এটাও চায় না যে ইরানের সামরিক কাঠামো পুরোপুরি ধসে পড়ুক বা বাইরের সামরিক চাপে তেহরানে সরকার পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হোক।
এই দুই উদ্দেশ্যের মাঝামাঝি সমাধান হিসেবে কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র কার্যকর। এগুলো ইরানকে আক্রমণ পরিচালনার বড় সক্ষমতা দেয় না, কিন্তু প্রতিপক্ষের বিমান অভিযানকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল করে তোলে। ফলে চীন সহজেই বলতে পারে, সরবরাহ করা অস্ত্র আক্রমণের জন্য নয়, আত্মরক্ষার জন্য।
সংকটের সময়ে নতুন অস্ত্র
চীনা অস্ত্র এমন সময়ে ইরানে পৌঁছেছে, যখন দেশটির প্রচলিত বিমান প্রতিরক্ষা কাঠামো ব্যাপক চাপে রয়েছে। কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করে ইরানের রাডার, বিমান প্রতিরক্ষা কেন্দ্র এবং ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থায় হামলা চালিয়েছে।
শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দমন করার বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে হামলাকারীরা প্রথমে রাডার, যোগাযোগব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ফলে ইরানের রাশিয়ার তৈরি এস-৩০০ এবং দেশীয় বাভার-৩৭৩ ব্যবস্থার কার্যক্ষমতা গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বড় বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সাধারণত কেন্দ্রীয় রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। রাডার ধ্বংস হয়ে গেলে বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেও সেগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানেই চীনা কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এগুলো ব্যবহারে বড় রাডার নেটওয়ার্কের প্রয়োজন নেই। ছোট সামরিক দল চোখে দেখে বা আলোকভিত্তিক লক্ষ্যনির্দেশক যন্ত্রের মাধ্যমে লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারে। এরপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা সম্ভব।
ফলে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরানের স্থানীয় ইউনিটগুলো আলাদাভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। একটি ইউনিট ধ্বংস হলে অন্য ইউনিটের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় না। এই বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরোধই ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।
কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ কেন বিপজ্জনক
ইরানে পৌঁছানো অস্ত্রের মধ্যে কিউডব্লিউ-১২ এবং এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্রের নাম বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এগুলো আগের প্রজন্মের কাঁধে বহনযোগ্য বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় প্রযুক্তিগতভাবে অনেক উন্নত।
পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত বিমানের ইঞ্জিন থেকে বের হওয়া তাপ অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যেত। বিমান থেকে ম্যাগনেশিয়ামভিত্তিক জ্বলন্ত বস্তু ছুড়ে দিলে ক্ষেপণাস্ত্র অনেক সময় মূল লক্ষ্য ছেড়ে সেই বেশি উত্তপ্ত বস্তুর দিকে চলে যেত। ফলে বিমান সহজে হামলা এড়িয়ে যেতে পারত।
কিউডব্লিউ-১২ ক্ষেপণাস্ত্রে মধ্য-ইনফ্রারেড দ্বৈত-ব্যান্ড ডিজিটাল ফিল্টারিং লক্ষ্যসন্ধানী ব্যবস্থা রয়েছে। এটি শুধু সবচেয়ে উজ্জ্বল তাপের উৎস অনুসরণ করে না; বরং লক্ষ্যবস্তুর গতিবিধি, তাপের ধরন এবং চলাচলের বৈশিষ্ট্যও বিশ্লেষণ করতে পারে।
অন্যদিকে এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্রে দ্বৈত-বর্ণের ইনফ্রারেড ও অতিবেগুনি রোসেট-স্ক্যান কোয়াসি-ইমেজিং লক্ষ্যসন্ধানী প্রযুক্তি রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা আকাশযানের প্রকৃত কাঠামো এবং বিভ্রান্তিকর তাপের উৎসের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম।
ফলে প্রতিপক্ষের বিমান থেকে ছোড়া তাপভিত্তিক বিভ্রান্তকারী বস্তু সব সময় এসব ক্ষেপণাস্ত্রকে ভুল পথে নিতে পারে না। ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুর গতি, আকার, তাপ এবং আলোকবৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে মূল বিমানের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
সরাসরি আঘাত না লাগলেও বিস্ফোরণ
কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এগুলোর উন্নত বিস্ফোরক ব্যবস্থা। উভয় ক্ষেপণাস্ত্রে লেজার ও রেডিওভিত্তিক নৈকট্য নির্ণায়ক ফিউজের পাশাপাশি সরাসরি আঘাতের বিস্ফোরক ব্যবস্থা রয়েছে।
এর অর্থ, লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করতে ক্ষেপণাস্ত্রের সব সময় সরাসরি বিমানের গায়ে আঘাত করার প্রয়োজন হয় না। কয়েক মিটারের মধ্যে পৌঁছালেও এটি বিস্ফোরিত হতে পারে। বিস্ফোরণের ধাতব টুকরা ও চাপের আঘাত বিমানের ইঞ্জিন, ডানা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কিংবা জ্বালানি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এই সক্ষমতা ছোট নজরদারি ড্রোন, দীর্ঘসময় আকাশে ঘুরে বেড়ানো বিস্ফোরক ড্রোন এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধেও কার্যকর হতে পারে। এসব লক্ষ্যবস্তু সাধারণ যুদ্ধবিমানের তুলনায় কম তাপ উৎপন্ন করে। ফলে পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে শনাক্ত ও আঘাত করা কঠিন হতো।
উন্নত লক্ষ্যসন্ধানী ব্যবস্থা ও নৈকট্য বিস্ফোরকের সমন্বয় চীনা ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে কম তাপ উৎপাদনকারী ছোট লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধেও কার্যকর করে তুলেছে।
অদৃশ্য হুমকির সবচেয়ে বড় সুবিধা
কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা হলো, এটি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় পদ্ধতিতে কাজ করতে পারে। লক্ষ্য খোঁজার সময় ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনাকারী দলকে রাডার চালু করতে হয় না।
রাডার চালু করলে তা থেকে তরঙ্গ নির্গত হয়। আকাশে থাকা গোয়েন্দা বিমান বা বিশেষ সেন্সর সেই তরঙ্গ শনাক্ত করে রাডারের অবস্থান বের করতে পারে। এরপর রাডার অনুসরণকারী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সেটি ধ্বংস করা সম্ভব।
কিন্তু কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র কোনো রাডার-তরঙ্গ পাঠায় না। ফলে কোথায় এটি মোতায়েন রয়েছে, তা আগে থেকে শনাক্ত করা কঠিন। একটি ছোট দল শহরের ভবনের আড়ালে, মরুভূমির উঁচু অংশে বা পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে থাকতে পারে।
কোনো বিমান বা ড্রোন নিচু দিয়ে উড়ে এলে দলটি চোখে দেখে লক্ষ্য শনাক্ত করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের আগে আক্রমণকারী বিমানের বৈদ্যুতিন সতর্কীকরণব্যবস্থা কোনো সংকেত নাও পেতে পারে।
এ কারণে প্রতিপক্ষকে প্রতিটি স্বল্প-উচ্চতার অভিযান অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হয়। বিমানকে বেশি উচ্চতায় উড়তে হতে পারে, অতিরিক্ত সুরক্ষা বিমান পাঠাতে হতে পারে অথবা আগে ড্রোন দিয়ে সম্ভাব্য অবস্থান পরীক্ষা করতে হতে পারে। প্রতিটি পদক্ষেপই সময়, অর্থ ও সামরিক সম্পদের ব্যবহার বাড়ায়।
ছোট অস্ত্র কীভাবে বড় যুদ্ধের হিসাব বদলায়
ম্যানপ্যাডস কোনো দেশের আকাশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এগুলোর পাল্লা সীমিত এবং খুব উঁচুতে উড়তে থাকা দ্রুতগতির যুদ্ধবিমানকে সব সময় আঘাত করা সম্ভব নয়। তবু এগুলোর উপস্থিতি আকাশযুদ্ধের পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকাশে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকলেও তাদের প্রতিটি অভিযানকে এখন নতুন ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার, নজরদারি বিমান, পরিবহনযান এবং নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া ড্রোন বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিটি বিমান ভূপাতিত করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু কোথা থেকে কখন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হবে, তা জানা না থাকাই প্রতিপক্ষের ওপর বড় মানসিক ও কৌশলগত চাপ তৈরি করে।
এটি মূলত শত্রুকে পুরোপুরি পরাজিত করার অস্ত্র নয়; বরং শত্রুর প্রতিটি অভিযানকে ধীর, জটিল ও ব্যয়বহুল করার অস্ত্র। ইরানের জন্য এটাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। তেহরানকে আকাশে জিততে হবে না; শুধু প্রতিপক্ষকে দ্রুত ও সহজ বিজয় অর্জন করতে না দিলেই হবে।
কেন ভারী ক্ষেপণাস্ত্র দেয়নি চীন
চীন চাইলে এইচকিউ-৯বির মতো দূরপাল্লার ভারী বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করতে পারত। কিন্তু বেইজিং সেই পথে যায়নি। এই সিদ্ধান্তের পেছনে সামরিক ও রাজনৈতিক—দুই ধরনের হিসাব রয়েছে।
ভারী ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা স্থানান্তরের জন্য বড় নৌযান বা পরিবহন বিমান প্রয়োজন হয়। বিশাল উৎক্ষেপণযান, রাডার, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ও সহায়ক সরঞ্জাম গোপনে এক দেশ থেকে অন্য দেশে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।
এ ধরনের চালান সহজেই যুক্তরাষ্ট্রের উপগ্রহ ও গোয়েন্দা নজরদারিতে ধরা পড়তে পারত। তখন চীনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারত। এমনকি অস্ত্রবাহী জাহাজ বা বিমান বাধা দেওয়ার চেষ্টাও হতে পারত।
ভারী বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পরিচালনার জন্য দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, বিশেষজ্ঞ কর্মী এবং একটি সমন্বিত রাডার নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিরক্ষা কাঠামোর মধ্যে দ্রুত এমন ব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন।
এর বিপরীতে কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছোট চালানে পাঠানো যায়। সাধারণ সামরিক সরঞ্জামের আড়ালেও এগুলো পরিবহন করা তুলনামূলক সহজ। পরিচালনার জন্য অল্প প্রশিক্ষণ প্রয়োজন এবং বড় রাডার বা স্থায়ী ঘাঁটি ছাড়াই দ্রুত মোতায়েন করা যায়।
এভাবে চীন ইরানকে কার্যকর সহায়তা দিয়েছে, কিন্তু নিজের সরাসরি জড়িত থাকার দৃশ্যমান প্রমাণ সীমিত রাখার চেষ্টা করেছে।
আদর্শ নয়, অর্থনৈতিক স্বার্থই বড়
ইরানকে চীনের সহায়তার পেছনে শুধু রাজনৈতিক বন্ধুত্ব বা পশ্চিমাবিরোধী অবস্থান কাজ করছে না। এর কেন্দ্রে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যপথ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য।
ইরান চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং ইউরোপের সঙ্গে চীনের স্থলভিত্তিক বাণিজ্য যোগাযোগে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে ইরান চীনের শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য অপরিশোধিত তেলের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। এই বাণিজ্যের বড় অংশ প্রচলিত পেট্রোডলার ব্যবস্থার বাইরেও পরিচালিত হতে পারে। ফলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক চীনকে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প পথ ধরে রাখতে সহায়তা করে।
যদি ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে। এতে চীনের তেল সরবরাহ, স্থলবাণিজ্য করিডর এবং মধ্য এশিয়ায় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঝুঁকিতে পড়বে।
তাই চীন সম্ভবত ইরানকে এমনভাবে শক্তিশালী রাখতে চায়, যাতে দেশটি টিকে থাকে; কিন্তু পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে না যায়, যেখানে বেইজিংকে সরাসরি যুদ্ধে নামতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত রাখার হিসাব
ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা সচল থাকলে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সামরিক সম্পদ ধরে রাখতে হবে। যুদ্ধবিমান, নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সম্পদ, নৌবহর এবং বিপুল অর্থ এই অঞ্চলে ব্যয় হবে।
এর ফলে ওয়াশিংটনের পক্ষে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পুরো সামরিক মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা কঠিন হবে। চীনের দৃষ্টিতে এটি একটি বড় কৌশলগত সুবিধা।
বেইজিংকে নিজে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে না। কিন্তু ইরানের প্রতিরোধ যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি মার্কিন সামরিক সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে আটকে থাকবে। একই সময়ে চীন পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগর এবং নিজের আশপাশের অঞ্চলে তুলনামূলক বেশি কৌশলগত সুযোগ পেতে পারে।
এই কারণে ইরানকে সীমিত সামরিক সহায়তা চীনের কাছে শুধু মধ্যপ্রাচ্যনীতি নয়; বরং বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার অংশ।
বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে চীনা প্রযুক্তির পরীক্ষা
ইরানের যুদ্ধক্ষেত্র চীনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্য একটি বাস্তব পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্র এখন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত বিমান, ড্রোন ও বৈদ্যুতিন প্রতিরোধব্যবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে।
চীনা প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই সংঘাত থেকে জানতে পারবে, তাদের ইনফ্রারেড ও অতিবেগুনি লক্ষ্যসন্ধানী প্রযুক্তি কতটা কার্যকর। পশ্চিমা বিমান থেকে ছোড়া বিভ্রান্তকারী বস্তু, তাপভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা এবং নির্দেশিত ইনফ্রারেড প্রতিরোধ প্রযুক্তির বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কেমন কাজ করছে, সেই তথ্য ভবিষ্যতের অস্ত্র উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কোন উচ্চতায় ক্ষেপণাস্ত্র বেশি সফল, কোন আবহাওয়ায় লক্ষ্য শনাক্ত করতে সমস্যা হয়, কোন ধরনের বিমান প্রতিরোধব্যবস্থা বেশি কার্যকর—এসব তথ্য সাধারণ মহড়ায় পুরোপুরি পাওয়া যায় না।
বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা চীনকে নিজের অস্ত্রের দুর্বলতা শনাক্ত করার সুযোগ দেবে। পরবর্তী সংস্করণে লক্ষ্যসন্ধানী ব্যবস্থা, বিস্ফোরক, পাল্লা ও প্রতিরোধক্ষমতা আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।
ইরানের নতুন ‘মোজাইক’ প্রতিরক্ষা
ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা কৌশলেও বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে দেশটি বড় রাডার, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করত। কিন্তু নির্ভুল পশ্চিমা হামলায় এ ধরনের স্থায়ী ব্যবস্থা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে তেহরান এখন বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যাকে ‘মোজাইক বিমান প্রতিরক্ষা’ বলা হচ্ছে। একটি বড় প্রতিরক্ষা দেয়ালের পরিবর্তে দেশজুড়ে অসংখ্য ছোট প্রতিরক্ষা ইউনিট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিটি ইউনিট স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। একটি অঞ্চলের রাডার বা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ধ্বংস হলেও অন্য এলাকার দলগুলো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ চালিয়ে যেতে পারে। ফলে শত্রুকে পুরো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকার্যকর করতে এক বা দুইটি বড় স্থাপনা ধ্বংস করলেই চলবে না।
শহর, পাহাড়, সামরিক ঘাঁটি, তেলক্ষেত্র, পারমাণবিক স্থাপনা এবং যোগাযোগপথের আশপাশে ছোট দল মোতায়েন করে তেহরান এক ধরনের বিচ্ছিন্ন কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী আকাশ প্রতিরক্ষা তৈরি করতে পারছে।
যুদ্ধ জেতাবে না, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ করবে
চীনা ক্ষেপণাস্ত্র ইরানকে আকাশযুদ্ধে নিশ্চিত বিজয় এনে দেবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, গোয়েন্দা ব্যবস্থা, দূরপাল্লার অস্ত্র এবং বৈদ্যুতিন যুদ্ধের শক্তি এখনো অনেক বেশি।
ম্যানপ্যাডসের পাল্লা ও উচ্চতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এগুলো বড় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পূর্ণ বিকল্পও নয়। প্রশিক্ষণহীন হাতে ব্যবহৃত হলে ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত বা বেসামরিক বিমানের জন্য ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কাও থাকে।
তবে যুদ্ধের লক্ষ্য সব সময় প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করা নয়। কখনো কখনো লক্ষ্য হয় শত্রুকে দ্রুত জয়ী হতে না দেওয়া, তার ব্যয় বাড়ানো এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।
চীনা অস্ত্র ইরানকে ঠিক সেই সুযোগটিই দিচ্ছে। তেহরান আকাশের মালিক হতে না পারলেও নিচু আকাশকে বিপজ্জনক করে তুলতে পারছে। প্রতিটি বিমান অভিযানকে ব্যয়বহুল করতে পারছে এবং প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক সম্পদ ব্যয় করতে বাধ্য করছে।
বদলে যাচ্ছে সংঘাতের গতিপথ
ইরানে চীনের তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছানো কোনো বিশাল সামরিক জোটের সূচনা নয়। কিন্তু এটি এমন এক সীমিত সহায়তা, যা যুদ্ধের সময়কাল ও ব্যয়ের হিসাব বদলে দিতে পারে।
বেইজিং খুব সতর্কভাবে এমন অস্ত্র বেছে নিয়েছে, যা ইরানকে টিকিয়ে রাখবে, কিন্তু চীনকে প্রকাশ্য যুদ্ধে টেনে নেবে না। তেহরানও এই অস্ত্র ব্যবহার করে ধ্বংস হয়ে যাওয়া কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষার জায়গায় ছোট, ছড়িয়ে থাকা ও সহজে শনাক্ত করা যায় না—এমন প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামনে এখন শুধু ইরানের বড় সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার চ্যালেঞ্জ নেই। তাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে অজানা স্থানে অবস্থান করা অসংখ্য ছোট ক্ষেপণাস্ত্র দলের সঙ্গে।
এই ব্যবস্থাগুলো ইরানকে সরাসরি বিজয় এনে না দিলেও দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ চালানোর শক্তি দিতে পারে। আর যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, পশ্চিমা শক্তির সামরিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যয় তত বাড়বে।
চীনের হিসাবও সম্ভবত সেখানেই। অল্প দৃশ্যমানতা, সীমিত ঝুঁকি এবং তুলনামূলক ছোট অস্ত্রের মাধ্যমে বেইজিং এমন একটি সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত রাখছে এবং ইরানকে সম্পূর্ণ পতন থেকে রক্ষা করছে।

